Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 8 months ago

    গল্পঃ অভিশাপ

    মোড়ে শুধু একটা চায়ের দোকান , ঠিক মোড়ে নয় বিশ পা এগিয়ে রাস্তার পাশে , দুটি অন্য ছোট দোকান অবশ্য মোড়েই। চায়ের দোকানের সামনে টং পাতা আছে। এলাকার বখাটে ছেলেরা এখানেই আড্ডা দেয়, কলেজের সুন্দরী মেয়েরা এ দিক দিয়েই হাটে। শরীফ তার দলবল নিয়ে বসে থাকে, এলাকায় যথেষ্ঠ প্রভাব এই বয়সেই, উপরে কাউন্সিলর বাবা আর ব্যবসায়ী বড় ভাইয়ের আশির্বাদে- কলেজে যাওয়া মেয়েদের দিকে কিছু কটূক্তি করার শক্তি সে আর তার দল পেয়েছে। নিজে দারুন হ্যান্ডসাম আর নাম শরীফ হলেও তার কর্মকান্ড এসবের বিপরীত। আর এটা একটা বিনোদন বটে। এলাকায় বদনাম হয়ে গেল, বাবার কাছে যে নালিশ যায়নি তা নয় কিন্তু বাবাধন নিজেও তার বয়সে এমনি ছিলেন। তার ছেলে তার মতই হয়েছে দেখে তিনি মিন মিনিয়ে হাসেন। ফলাফল- নালিশের কোন ফল কেউ কখনো পায়নি। কেউ যে শরিফকে বুঝায় নি তা নয়, মাথায় হাত বুলিয়ে সামাজিক আচরণ শেখায়নি তাও নয়- কি করে যেন এই বখাটেপনাতেই সকল সুখ বলে তার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে। কিন্তু শক্তি কেবল তার চেয়ে বড় শক্তির কাছেই হার মানে কিন্তু শরিফকে রুখবার মত শক্তি অন্তত সে তল্লাটে নেই। তাই সে হল লাগামহীন আর লাগামহীন কোন কিছু সহসাই দুর্ঘটনা বা বিপত্তি আনে ।

    একদিন একটি অনাচার আগের সবকিছুকে হার মানালো। কলেজের এক মেয়ের ওড়না ধরে টান দেয়া ছাড়াও বাদানুবাদের এক পর্যায়ে তাকে কষে চড় মেরে বসে শরীফ। মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

    -শালী আবার কাঁদিস, বেশি ন্যাকামি করবি তো কি হবে কোন আন্দাজ নেই, ভাগ এখান থেকে।

    এক নাগারে কেদেই যাচ্ছে মেয়েটা । এতগুলো মানুষ! ১৫-২০ জন তো হবেই, আরো কিছু মানুষ ছুটে আসছে কিন্তু কেউ এগুচ্ছেনা। কলেজের দিকে না গিয়ে নিজের হোস্টেলের দিকে রওনা দিল মেয়েটি। এই গলির রাস্তায় আর যাই হোক এর প্রতিকার নেই। অনেক দিন হলই দেখছে। পিছন থেকে শরীফ আর তার দলের বিশ্রী গালি শুনতে পাচ্ছে আর ভেসে আসছে কুৎসিত হাসির শব্দ। মেয়েটি ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর দ্রুত পা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অক্ষম যারা তারা অভিশাপ দেন, আর অভিশাপ ক্ষেত্রবিশেষে কার্যকর হয়। মেয়েটি কি অভিশাপ দিয়েছিল বোঝার উপায় নেই।

    কিন্তু দুপুরের পর থেকে শরীর কেমন জমে যাচ্ছে বলে মনে হল শরীফের, কণ্ঠটাও কেমন ফ্যাস ফ্যাস হয়ে আসছে। শাগরেদ বুলেট বলেই দিল

    -গুরু, তোমাকে ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছেনা, একটু শুকিয়ে যাচ্ছো মনে হচ্ছে আজকাল। গলার ভাষাও কেমন মিন মিন করছে, চোখ কেমন জানি হয়ে আছে, বাসায় যাও। রেস্ট নাও।

    অন্যরাও তাতেই মত দিল।

    ধুর , বাসায় কি রে? আজ সন্ধ্যায় বুফে তারপর গাঁজা অথবা ইয়াবা না হলে আর লাইফে মাস্তি কি। যা বেশি যত্ন দেখাস না।

    গুলশানে বুফেতে কোন রকমে উতরে গেলেও শরীর বেশ অবশ হয়ে এল শরিফের। কেমন জানি হচ্ছে , তোলপাড়। ঠিক বোঝা যাচ্ছে কেমন, এমন বোধ আগে কখনো হয়নি। ইয়াবার আসরে বসে থাকা আর হলনা। সবার কাছেই বোধগম্য- শরিফের কিছু একটা হয়েছে।

    দিদার বলে উঠলো-

    বাসায় দিয়ে আসি গুরু। ঠিক সামলাতে পারবেনা মনে হচ্ছে।

    সবাই এবার জোড় করার সুযোগ পেয়ে গেল।

    শরীফ এবার না করলো না

    -যাই তবে।

    বাসায় এসে নিজের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেল শরীফ।

    রাতে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন চোখ মেলে তাকিয়ে ঘড়ি দেখল-৩.২০ । চোখ কচলে বিছানায় দম নিয়ে বেশ ফ্রি লাগছে এখন। কিন্তু নিজের বুকের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠল শরীফ। ঠিক দেখছে তো! স্তম্ভিত অবাক হয়ে গা কাঁপতে লাগলো শরীফের । গায়ের কাপ যাচ্ছেনা। ভীষণ সাহসী সে কিন্তু ভয়ে যেন সব জমে গেছে ভিতরটা। গায়ের কাঁপুনি নিয়েই ওয়াশ্ রুমে গিয়ে নিজের গোপন স্থানের দিকে তাকিয়ে শরীফ অজ্ঞান হবার মত হল- বিশ্বাস হচ্ছেনা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছেনা। একি সম্ভব! কি হল আমার- কি হল আমার ! আমি মেয়ে হয়ে গেলাম কিভাবে! অবিশ্বাস্য নিজেকে ১৫-২০ মিনিট ধরে আয়নায় দেখলো, বিছানায় টিউব লাইটের নীচে নিজেকে বারংবার পরীক্ষা করলো শরীফ। সে শুধু মেয়ে নয় সুন্দরী একটা মেয়েতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। এক রাতেই চুল নেমে গেছে কোমরের কাছাকাছি। নিজের গলার স্বর খুঁজেই পেলনা , বদলে একটা সুরেলা মেয়েলি গলা চলে এসেছে। অবিশ্বাস্য কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় নেই শরীফের। সম্ভাব্য সব উপায়ে নিজেকে নিরীক্ষা করে নেওয়া শেষ। এখন উপায়? বেশিক্ষণ বাসায় থাকা যাবেনা। পালাতে হবে। সকাল হয়ে গেলে বাসার লোক, এলাকার লোক জানতে পারলে লজ্জার শেষ থাকবেনা। ড্রয়ারে টাকা আছে দেড় লাখের মত- নিজের বাইক কিছুদিন আগে বিক্রি করেছিল, নতুন একটা কেনার জন্য বাবার কাছ থেকে আরো টাকা নেওয়া হয়েছিলো । হাতে সময় নেই, নিজের ব্যাগে কাপড় চোপড় গুছিয়ে নিঃশব্দে ডাইনিং রুম থেকে নীচের গেট খোলার চাবি নিয়ে নীচে নামলো শরীফ। একটা জিন্স প্যান্ট আর শার্ট পড়া ছাড়া আর কোন উপায় পেলনা শরীফ। কিন্তু দেখলো বুক যথেষ্ট উঁচু হয়ে আছে। আপাতত কিছু করার নেই। গেট খুলে নীচে বেড়িয়ে যখন আসলো তখন ৪ঃ ২৫ বাজে। গলিতে আলো আধারি। গলিতে পা রেখেই শরীফ বুঝল সে এখন মেয়ে – এখন প্রতি পদক্ষেপ সাবধানে ফেলতে হবে। নিজের এলাকা দ্রুত ছাড়তে হবে। বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেল দুই চারজন আড্ডা দিচ্ছে । রাস্তা সুনসান । এলাকার সবচেয়ে সাহসী ছেলে কিন্তু মেয়ে হয়ে আর এগুতে চাচ্ছেনা সে। আর কোন সাধারণ মানুষ নেই রাস্তায়। অন্ধকার জায়গায় দাঁড়ালো শরীফ। সাহস করে এখনি যাওয়া ঠিক হবেনা। নারী হয়ে এই প্রথম পুরুষ যে আতঙ্কের বস্তু তা টের পেল শরীফ। একটু সময় না গড়ালেই নয়। গা কেমন ছমছম করছে- এখনো বেশ রাত। কেউ যদি বুঝতে পারে তাহলে আর রক্ষে নেই। গলা শুকিয়ে এল শরীফের। চার পচান্ন নাগাদ রাস্তার মোড়ে একটা লোকাল বাস এল। ফজরের আযান হয়ে গেছে। সাহস এল এবার । হাটা শুরু করে স্ট্যান্ডে এসে দেখল আরো দুই তিন জন যাত্রী বাসের অপেক্ষায়- সবাই পুরুষ। এত সকালে এক নারীকে দেখে তারা কিভাবে যেন চেয়ে আছে। তাদের চোখ দেখে কেমন সিটিয়ে গেল শরীফ। চোখের ভাষা ঠিক কেমন যেন পশুত্ব আছে। নারী না হলে এই চাহনিতে কি আছে তা জানা যেতনা। কেমন গা গুলিয়ে আসে। ভয় লাগে, ভয় লাগে। নিজেকে একটু তফাতেই রাখলো শরীফ। কোথায় যাবে বুঝে উঠতে না উঠতেই বাসটি চলে গেল।

    একটু পরে একটি আরেকটি লোকাল বাস আসল। যে দুই একজন ছিল তারাও উঠে গেল।

    -আপা আসেন ।

    কেমন অসস্ত্বির এই ডাক। সিটে বসে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়েও যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা- সত্যি সত্যি এ রকম কিছু হয়েছে! বাস মিরপুরের দিকে যাচ্ছে। মিরপুরে কাজ নেই কিন্তু মাথা কাজ করছেনা।

    -আপা ভাড়া দেন।

    হেল্পারের এমন ডাক যেন শুনতে পায়নি শরীফ।

    -ও আপা কি হল – ভাড়া দেন।

    এবার চমকে গেল শরীফ। তাকেই যে ডাকছে, একমাত্র সেই তো মেয়ে এই বাসে। নিজেকে কি এত সহজে এই অবিশ্বাস্য ঘটনার সাথে মানিয়ে নেয়া যায়!

    মিরপুর দশে যখন নামলো তখন রেস্টুরেন্ট গুলিতে নাশতার ভিড় । কি বাস , কি রাস্তা , কি রেস্টুরেন্ট সব খানেই সে পুরুষের আগ্রহের বস্তু হয়ে গেছে। ওড়না ছাড়া শার্ট জিন্স পড়া মেয়ে দেখে অনেকেই বেশ সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকছে। সকালের মচমচে পরাটার চেয়ে এই দৃশ্য কি কম উপভোগের! বেশ রসিয়ে দেখছে সবাই।

    ফাঁকা টেবিল দেখে বসে গেল। ওর্ডার নিয়ে গেল ওয়েটার। শার্টের উপরের বোতাম খুলে গেছে, ওয়েটার তার ফাঁক গলে কি দেখার চেষ্টা করলো কে জানে। শরীফ বোতাম লাগিয়ে দিল। কি করা উচিৎ তাই ভাবতে লাগলো শরীফ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে সে মেয়ে। রাত নামার আগেই সব ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে না হলে বিপদে পড়তে হবে। বিপদের কথা চিন্তা করতেই গা শিউড়ে উঠলো শরিফের। এমন চিন্তা কি একটা মেয়ের জীবনভর বয়ে যেতে হয়! সে সব পরে ভাবা যাবে- এখন মেয়েদের কিছু ড্রেস কেনা দরকার, রাতে কোথায় থাকা যায় , টাকা ফুরিয়ে গেলে কি করবে তখন – নানা চিন্তায় মাথা কেমন ঝম ঝম করে এল শরীফের।

    নাস্তা করে নিউ মার্কেট যাওয়ার বাস ধরার জন্য দাঁড়ালো শরীফ। মানুষ হুড়মুড় করে উঠছে এখন। বাসে উঠে গেল কিন্তু শরীফ কোন সিট পেলনা। বাসে একটু পরে ভিড় বেড়ে ফেটে পড়ার যোগাড় । আগারগাও আসার পর শরীফ বুঝল কেউ তার শরীরের বিশেষ জায়গায় হাত দিয়েছে। শরীর কেমন হিম হয়ে গেল এই ভীরে । কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। মাত্র গতরাতেই সে মেয়ে হয়েছে এই পরিস্থিতিতে কি করা উচিৎ তা বুঝে ওঠার আগেই অভ্যাসবশত শরীফ হাত চালিয়ে দিল লোকটির পেট বরাবর।

    কাই করে উঠল লোকটি, এই ভিড়েও একটু ভাঁজ হয়ে গেল যেন। আশেপাশের লোক ‘’কি হয়েছে জানতেই চাই’’ দৃষ্টি দিতেই শরীফ বলে উঠল

    -এরপর থেকে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার আগে আমার কথা মনে রাখিস।

    বাসে বেশ হট্টগোল হল। পক্ষে বিপক্ষে কথা গড়াতে লাগল এবং গড়িয়ে শরিফের চরিত্রে এসে ঠেকল। আর সামলাতে পারলোনা শরীফ- গলির গালি অভিধান বেশ মুখস্ত , অ থেকে চাঁদবিন্দু ছড়ার মত বেরিয়ে এল। বিপক্ষের তেনারা নির্বাক হয়ে একমত হলেন মেয়েটি ‘’ঐ টাইপের’’ অতএব কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

    রেডি মেইড থ্রি পিস কেনার পর মনে হল ব্রা প্যান্টিও তো লাগবে। হায় আল্লাহ, আমার সাথে এ কি করলে? চাঁদনী চকের দুইতলায় বেশ কিছু ব্রা প্যান্টির দোকান। কপাল ভাল এখানে মেয়েরাই বসে। একটু এগুতেই একদম জেঁকে ধরলো এপাশ ওপাশ থেকে।

    -আপা আসেন, ভাল ভাল ব্রা আছে।

    কানে যে কেমন ঘিন ঘিন করছিল তা শরিফের চিন্তার বাইরে। আগে কিনতো বাঘের খাঁচা আর আজ কিনতে হচ্ছে ব্রা-প্যান্টি।

    একটা ব্রায়ের দোকানে ঢুকে গেল। না কিনে উপায় আছে?

    সাইজ কত আপু? জিজ্ঞ্যেস করল মেয়ে দোকানী।
    এই রে।এখন? নারী হবার সাথে তো সাইজ পালটে এখন কত? মনে মনে কি বলবে ভেবে পেলনা শরীফ। ওদিকে মেয়েটা হা করে তাকিয়ে আছে।
    ছত্রিশ মনে হয়। শরীফের মনে পড়ে গেল এই মাপ খুব পপুলার। এটাই হবে হয়ত।

    মনে হয় মানে কি ? সিউর না?

    ইয়ে না না মানে জানিনা, একটু আন্দাজ করে দিন না কিছু একটা।

    প্রথমবার কিনছেন নাকি?

    জি আপু, প্রথমবার।

    বলেন কি আপু, এতদিন কিভাবে ছিলেন?

    মনে মনে শরিফ বললো- জাঙ্গিয়া পড়ে, বাঘের খাঁচা। মুখে অবশ্য বললো- ছিলাম আর কি।

    আমার মনে হয় আপনার ৩৬ সাইজেই কাজ হবে।

    দুই তিন সাইজ বড়ই দিন।

    কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে ৩৬-ই হবে।

    হবে না আপু, ক্ষণে ক্ষণে কত কি হয়ে যাচ্ছে, রাত অবধি কি হবে কে জানে, রিস্ক নিয়ে কাজ নেই।

    মেয়েটি কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। মাথামুণ্ডু কিছু যে বোঝেনি তা স্পষ্ট। শরীফ আবার বলল,

    বুঝেন নি তাই তো। অনেক কিছু আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা। আপনার যা ভাল মনে হয় দিন।

    মেয়েটি মাথা এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে ঠোটে হালকা হাসি মেখে বলল,

    আচ্ছা আপনি যেহেতু বলছেন আমি ৩৮ দিচ্ছি। প্যাকেট করার সময়ও সেই হাসি লেগে আছে।

    ব্রা প্যান্টি কিনে , শরিফা ভাবল- মেয়ে যখন হয়েছি তবে তো প্যাডও কিনতে হবে। সেটাও কিনতে হল।

    মেয়েটি এখনও মিন মিন করে হাসছে। তা সে কি আর জানে কাহিনী কি। নীচে নেমে ফুটপাতের উপর একটা টংয়ের দোকানে কিছু পুরুষের আন্ডারওয়্যার রাখা।একটু থমকে দাড়াল সে। আর কি পরা হবে- আন্ডার ওয়্যার। চেয়ে থাকতে দেখে দোকানী জিজ্ঞ্যেস করল

    আফা কিছু লাগবনি?

    না না। ঢোক গিলে হাটা শুরু করল শরীফ। ও জিনিস আর তার জন্য নয়।

    দুপুর পেরিয়েছে। অস্টব্যঞ্জনে খেয়ে নিল শরীফ । মাথায় চিন্তা ঘুরছে- কি করা যায়? রাতে কোথায় থাকবো? খাওয়া শেষ করে নিজের পরিচিত এক মেয়েকে নিজের দুই নম্বর সিম থেকে ফোন দিল শরীফ। দুইবার রিং দিয়ে তাকে পেল শরীফ।

    -হ্যালো আপু স্লামুয়ালাইকুম,
    -ওয়ালাইকুম আসসালাম, কে বলছেন প্লিজ ?
    -আমার নাম শরীফ- -আ , মানে শরিফা। আমি সাততলা এলাকার শরীফ ভাইয়ের পরিচিত। তিনি আপনার কথা বললেন। আপনি যে হোস্টেলে থাকেন সেখানে কি কোন সিট ফাঁকা আছে, শরীফ ভাই বললো আপনি নাকি ম্যানেজ করতে পারবেন।’’
    -আমার হোস্টেলে ফাঁকা নেই তবে সাততলা এলাকায় আমার বান্ধবীর হোস্টেলে ফাঁকা আছে, , খাওয়া দাওয়া ভাড়া মিলিয়ে ৬ হাজার পরবে, চলবে?
    -আপু এখনই ঠিক করুন আমি আজ সন্ধ্যায় আসবো। যদিও নিজের এলাকা এড়াতে চেয়েছিল শরীফা। তবে রিস্ক নেয়া ঠিক নয়।
    -আচ্ছা ঠিক আছে আপু। আমি ওকে জানাচ্ছি।

    সাততলা, মানে নিজের গলি। মেয়ে হয়ে যা সুন্দর হয়েছি , পল্টু বুলেট, দিদারদের সামনে পড়লে রক্ষা নেই কিন্তু উপায়ও নেই? ওদের সামন দিয়ে হেটে যাব কি করে? নিজের সামনে পিছনে তাকিয়ে শরীফার মনে হল- সে নিজেই এখন খাসা মাল। হায় কপাল! ছেলেদের মাথা ঘুরে যাবার সব যোগাড়যন্ত্র হয়ে আছে।

    সাততলার হোস্টেলের মেয়েটার নাম নাদিরা। নাদিরা আপুকে ফোন দিল শরিফা। যেতে বললো।

    সন্ধ্যা সাতটা। বাসে ভিড় গলিয়ে , পুরুষের ছোয়া বাঁচিয়ে বাস থেকে নামা অসম্ভব। ভীড়ে মেয়েদের শরীরের স্পর্শ পাওয়া পুরুষের নাগরিক অধিকার। নারীরা এমন স্বাদ দিতে যেন বাধ্য। তাই আর তেমন কিছু মনে হয়না। বাসের পিছন থেকে আসতে আসতে দুইজন পুরুষ নিতম্ভ স্পর্শ করেছে। একজন বেশ শক্ত করেই হাত দিয়েছে। তেড়ে উঠতে যাচ্ছিলো শরিফা, কিন্তু ততক্ষণে বাসের দরজায় থাকা হেল্পার, প্যাসেঞ্জার বেশ হাউকাউ শুরু করে দিল।
    -কে নামবে, কে নামবে? আসেনা কেন? ঘুমাইছে নাকি? আরে ধুর ছাইড়া দেন-নামবেনা।
    -এই যে আসছি, ভাই সরেন না একটু, ভাই প্লিজ একটু।
    কিন্তু এত সহজে কেউ সরার মাল নয়। যে ভাবে পারছে একটু ঘষা হলেও নিতে চাইছে। কেউ পা এমন ভাবে রেখেছে যাতে একটু হলেও উরুর ঘষা লাগে। যা দেখতে মেয়েটা, একটা ছোট স্পর্শ-আহ। নামতে নামতে শরিফা শুনলো- দেখেছিস সামনে পিছনে কেমন ঠিকরে আছে, মাল একটা। উফ। ড্রাইভারের বকুনির সাথে অবশ্য সেটা মিশে গেল- শালা, তোকে কত বলি মাইয়া চিজ পিছনে নিবিনা।

    নিজের এলাকা কিন্তু আজ সবকিছু আলাদা, অন্যরকম। প্রায় সবাইকেই চেনে। এলাকার ছেলেগুলো কেমন ঝোল্ পড়া দৃষ্টি দিয়ে চেটে দেখছে। তবে শরিফা ভয়ে আছে পল্টু দিদারদের নিয়ে। ওরা এ বেলায় টং এ বসে আড্ডা দেয়। হাড় কেমন শিড়শিড় করছে -লজ্জায়,উত্তেজনায়। কি যে হয়। কিন্তু সন্ধ্যায় বাঘ আসার বাগধারা প্রাচীন। সাততলা এলাকায় যাবার মোড়ে এসেই শরিফা দেখলো- তারা আছেন । কিন্তু এই পথ এড়ানোর উপায় নেই, বাঘের ডেরা ঘেষে যেতে বকরীর যে অবস্থা, শরিফারও তাই, সাথে লজ্জা তো আছেই।

    সন্ধ্যার আলোয় রাস্তা বেশ উজ্জ্বল। এমন আলোয় এমন রুপবতী কেউ হেটে আসবে তা পল্টুরা ভুলেও ভাবেনি। সবাই দাঁড়িয়ে গেল- ও মা গো, ও বাবা রে, বলে। এই চিজ কই যায়, এ মাল কে রে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুই একটা শরিফার কানেও গেল। ফোনে নাদিরা আপুর সাথে কথা বলছে সে।

    – আপনি একটু বাইরে আসেন না আপু। আমি চলে এসেছি। ফোন কেটে দিতেই শরিফা দেখলো তার প্রাক্তন শাগরেদ গ্রুপ তার পিছু নিয়েছে। হার্টবিট বেড়ে গেল। লজ্জা লজ্জা। এদিনও দেখতে হল!

    – ও সুন্দরী , নাম কি?

    – মন কাইড়া নিলো রে

    – এত্তো সুন্দরী ক্যামনে

    – সব জ্বলে গেলো রে, ফিউজ হয়ে গেল সব।

    দ্রুত পা চালিয়ে মেয়েদের হোস্টেলের সামনে এল শরিফা। নাদিরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল।

    এ কে ? সেই মেয়েটা যাকে চড় মেরেছিলাম, সেই মেয়েই তো। হা কপাল।

    গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতেও শুনলো- আমরা কিন্তু আছি, কিছু লাগলে বইলো টিয়া পাখি।

    নাদিরা উপরের সিড়ি মারাতে মারাতে বললো- এখানে থাকার এই এক জ্বালা। এদের সহ্য করতে হয় নিত্য। কপাল ভাল যে এদের কুত্তা লিডারটা আজ নেই। তোমার যা চেহারা, তোমার ভারী বিপদ আছে যদি সেই কুত্তা তোমায় দেখে।

    কুত্তাটার নাম কি শরীফ?

    হ্যাঁ, তুমি জান কিভাবে?

    শুনেছিলাম আর কি।

    একটা জাত কুত্তা, আমাকে এত জ্বালাতো তাই এই একদিন আগে ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলাম এসব তোর মাকে গিয়ে বল। এমন কষে একটা চড় দিল । সারাদিন কেঁদেছি আর মেয়ে জন্ম বলে আল্লাহকে যা তা বলেছি। আমি কেন মেয়ে ঐ কুত্তাটাকে মেয়ে বানালেই তো ভাল হত, বুঝতো মেয়ে হবার কি জ্বালা। এত্ত লজ্জা কাউকে বলিনি সেই কাণ্ড। একা একা কেঁদেছি আর অভিশাপ দিয়েছি।

    হার্ড ব্রেইক দিল শরিফা। সিড়ি ওঠা থামিয়ে হা করে চেয়ে আছে নাদিরার দিকে। ওরে, সমস্ত কিছুর গোড়া তবে এখানে। এমন অভিশাপ কেন দিয়েছিস বইন। তুই আমার মায়ের পেটের বইন- ফিরিয়ে নে তোর অভিশাপ, তুই জানিস না কি হয়েছে, তুই জানিস না।

    কি ব্যাপার হা করে চেয়ে আছো কেন? একদম ছয়তলায় উঠতে হবে। নাও, আসো।

    শরিফা পণ করলো নাদিরার পায়ে সরিষার তেল, কেরোসিন তেল পাম অয়েল জোঁকের তেল সব মালিশ করে হলেও অভিশাপ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু কি করে!

    দরজা ঠেলে ভিতরে গেলে শরিফা দেখল দুই তিনটে মেয়ে উঁকি দিয়ে দেখল। নাদিরা ছোট একটা কক্ষে নিয়ে গেল যেখানে শুধু একটা বেড একটা টেবিল কোনমতে পাতানো।

    দেখে নাও, তুমি আর আমি থাকব এখানে।

    হ্যাঁ আপু পছন্দ হয়েছে।

    ওকে, এডভাঞ্চের টাকা দিয়ে দিও আজ, আর তোমার জিনিসপত্র কোথায়?

    কাল আনি, এখন জাস্ট শপিং করে আসলাম, আর রাতের বেলা ঐ ছেলেদের সামনে দিয়ে আর যেতে চাচ্ছিনা।

    আর বলনা এই কুত্তা গুলোর জন্য জীবন শেষ, থাক দরকার নেই আজ। হাজার হলেও বান্ধবী তোমাকে রেকোমেন্ড করেছে। ফ্রেশ হয়ে আসো , তোমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। রাতে সবার সাথে গল্প করে ভালই লাগল শরিফার শুধু সাবধান করে দিল শরিফের গ্যাং সম্পর্কে। ওর নাম আসতেই তো দুই মেয়ে হাত তুলে নগদে মুনাজাত করে দিলঃ আল্লাহ ঐ শুয়োরটা যেন কুত্তা মরা মরে। ঢোক গিললো শরিফা।

    পরদিন সকালে উঠে বাইরে যাবার জন্য রেডি হতে লাগলো নাদিরা, দেখে শরিফাও রেডি হতে শুরু করলো।

    ওর সামনেই ব্রা পড়তে লাগলো নাদিরা , চট করে বুকের উপর বসিয়ে পিছনে হুক লাগিয়ে দিল। ছেলে হলে এই দৃশ্য দেখে পরম একটা পুলক আসতো কিন্তু আজ শুধু আফসোস হচ্ছে। কি লাভ?

    নাদিরার ব্রা পড়া দেখে শরিফা ভাবল,আজ অন্তত ব্রা টা পড়তে হবে। বেশ কিছুক্ষণ নিজে থেকে ট্রাই করলো কিন্তু পিছনের হুক লাগাতে গিয়ে হিমশিম খেল। নাদিরা দেখে বললো,
    আগে পড়নি নাকি। মিন মিনে হাসি নাদিরার মুখে। লাগিয়ে দিল নাদিরা।

    যাবার আগে নাদিরা আবার সতর্ক করে গেল। বখাটেদের এড়িয়ে চলবে। কথার উত্তর দেয়ার দরকার নেই।

    ঠিক আছে আপু।

    ১১ টার দিকে বের হবার জন্য রেডি হল শরিফা। ব্যাগ চাকুরীর বই আর ফটো আইডি না থাকলে যেকোন সময়ে বিপদ হবে। নীলক্ষেতে নকল ডলার চাইলেও বানিয়ে দেবে- এতই দক্ষ তারা। যাওয়া দরকার।

    মোড়ে এসে বাক নিয়ে টং চায়ের দোকানে চোখ দিতেই তিন সাবেক শাগরেদকে দেখতে পেল শরিফা। আজ আর লজ্জা নেই তবে ঠোটের রেখায় মুচকি একটা হাসি মাখালো শরিফা। কপাল মেনে নেওয়াই ভাল। শরিফাকে দেখে তিড়িং বিড়িং দাঁড়িয়ে গেল দিদার পল্টু আর বুলেট।

    টং থেকে একটু ফাঁকা রাস্তা পেতেই একদম গা ঘেষে এসে টিজিং শুরু করে দিল।

    – এ রুপের রহস্য কি, একটু নামটা বললে মন ভরে ডাকা যায়, চুলের কি সুবাশ দেখেছিস-দামী শ্যাম্পু।

    চট করে পিছন ফিরলো শরিফা।

    দিদার পল্টুরা একদমই প্রস্তুত ছিলো না।

    বুলেট বললো- এই এই থাম , থাম তোরা, মনে হয় নাম বলবে, মুখে কুৎসিত হাসি।

    বুলেটের দিকে শরিফা বললো- তুই বুলেট , বার্মা থেকে আসা ইয়াবার সাপ্লাই দিস গুলশান মহাখালী এরিয়ায়, সাথে পল্টু থাকে। তোদের নেতা শরীফ গায়েব হবার আগের রাতে তোদের সাথেই আড্ডা দিয়েছিল, তারপর থেকে সে হাওয়া, শরীফ গায়েব হলে কেইস তোদের উপর আসবে। পুলিশ খুঁজছে না পেলে রেডি থাক- এমন রাম কেলানি হবে না।

    এবার দিদারের দিকে নজর দিল শরিফা- এতক্ষণে তিনজনের চেহারা ছাইরঙা হয়ে আছে, পল্টু রীতিমত কাঁপছে, পুলিশে তার বেশ ভয়।

    -দিদার, তাই তো? দিদার একবার কোন রকমে ঢোক গিললো কিন্তু কথা মুখে আসছেনা।
    একটা মেশিন বাসায় লুকিয়ে রেখেছিস, ভাবছিস পুলিশ কিছু জানেনা আবার চায়ের টং গুলিতে পুরিয়া দিয়ে রাখিস বিক্রির জন্য। থানায় নিয়ে জায়গা মত এমন শক দেবোনা শালা হিসু করার সময় কান্না করবি জীবনভর। আর যেন তোদের এই এলাকায় না দেখি, আর একবার দেখলে তোদের কেইস আমি নিজের হাতে নেব। তারপর কি হবে তার জন্য সারা জীবন আফসোস করবি। ভাগ শালারা।

    শেষের কথা পুরো না শুনেই পল্টু হাওয়া, দিদার দ্রুত হেটে রাস্তা ছেড়ে পাশের এক গলিতে ঢুকে গেল , বুলেট হাফাতে হাফাতে দৌড়ে নিকেতনের দিকে গেল।

    কদিন পর মেয়েদের হোস্টেলে ঈদের আনন্দ। বড় আপু শেফালি সবাইকে ডেকে একাট্টা করলেন,

    -জানিস এলাকায় কি খবর ছড়িয়েছে?

    সবাই হা করে জানতে চাইলো,

    -কি খবর কি খবর?

    কুত্তা শরিফের নাকি কোন খোঁজ মিলছেনা, থানা পুলিশও জানেনা কোথায়। জোড় টাকা ঢালা হচ্ছে কিন্তু কোন খবর নেই। আবার কুত্তাটার সাগরেদরাও হাওয়া, কোথায় নাকি ভেগেছে। উফ বাবা এখন আরামে থাকা যাবে।

    মেয়েরা হই দিল। আবার মুনাজাত- আল্লাহ ঐ কুত্তা যাতে কুত্তা মরা মরে। সবার এমন হুই গুল গুল খুশি দেখে বিমর্ষ হল শরিফা। কতগুলি মেয়ের জীবন সে অতিষ্ঠ করেছিল! আহা ছেলে থাকার সময় যদি এর বিন্দুমাত্র বুঝতে পারতাম। কতটা মনোকষ্টে মানুষ এরকম বদদোয়া করে। নিজের রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল শরিফা। সেখানে মুখ রাখল । নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল- মেয়েদের এত কষ্ট হয়! নাহ, মেয়ে হয়েই থাকবো , আল্লাহর কাছে আর কান্নাকাটি করবোনা ছেলে বানিয়ে দেবার জন্য। দেখি এক জীবনে মেয়েরা কতটা সয়।

    8
    2 Comments
Skip to toolbar