-
গন্ধ।।
গত ২ মাস ধরে লকডাউনে থেকে সব কিছুর প্রতি কেমন যেনো বিরক্ত ধরে গেছে, সব কিছুই পানসে লাগে। বিছানাই এখন আমার জগত হয়ে গিয়েছে, কখোনো কখোনো জানালা দিয়ে একমনে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি কবে বের হতে পারবো, একটু মুক্ত হাওয়ায় মন ভরে নি:শ্বাষ নিতে পারবো।
আজ সারাটাদিন বৃষ্টি পরেছে, প্রায় সারাদিন জানালার পাশে বসে বসে বৃষ্টি দেখেছ।, সন্ধ্যার দিকে ঘুমিয়ে পরেছিলাম, ঘুম ভাংলো কলিংবেলের আওয়াজে, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। বিছানায় বসে কিছুক্ষন নিজেকে ধাতস্থ করে নিলাম। কলিংবেলটা অনবরত বেজেই চলেছে, কে রে বাবা, একটু ধৈর্য ধরতে পারেনা নাকি। মনে মনে কিছুটা বিরক্তই হলাম। ধিরে ধিরে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দেখি বন্ধু ফরিদ এসেছে, চোখে মুখে কেমন জানি বিদ্ধস্ত ভাব। আমি কিছুটা উচ্ছসিত হয়ে বললাম কিরে, কোথাই কামলা।দিয়ে আসছিস চোখ মুখের এই অবস্থা কেনো, ভিতরে আয়।
আর বলিসনা মেডিকেল এ গেছিলাম একটু দরকারি কাজ ছিলো, বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করলো ও। ফরিদ ঘরে প্রবেশ করতেই ঘরটা কেমন যেনো কটু গন্ধে ভরে উঠলো, না না খারাপ বা পচা গন্ধ নয়। গন্ধটা চেনা চেনা লাগছে।
কিরে মামা কি মেখেছিস বলতো এমন গন্ধ বের হচ্ছে কেনো, ফরিদের উদ্দেশ্যে কথা গুলো বললাম আমি।
আতর মেখেছি গন্ধটা খুব সুন্দর না? আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন টা করলো ও, ওর চোখের দিকে তাকাতেই কেমন জানি অন্যরকম মনে হলো, অনেকটা প্রানহীন চোখ। মনে মনে ভাবলাম হয়তাও বেচারার সারাদিন খুব খাটুনি গেছে, ক্লান্ত তাই অমন মনে হচ্ছে, বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দিলামনা।
ধুস শালা কিসের সুন্দর গন্ধ আমার তো নাক কেমন জলছে।ও কিছু বললোনা, কিছুক্ষন পর বলে উঠলো ফরিদ, বন্ধু একটু গোসল দিবো রে একটা লুংগি হবে। অবশ্যই হবে, বলে ওর হাতে আমার সদ্য ধোয়া লুংগি টা দিলাম।
কিছু না বলেই ও গোসল দিতে চলে গেলো।
বাথরুম থেকে ঝর ঝর করে পানির আওয়াজ আসছে, আর আমি বিছানায় বসে আকাশ পাতাল চিন্তা করছি, ফরিদের হয়েছেটা কি, যে ছেলে আমার বাসায় আসলে সবসময় প্রানবন্ত থাকে, বকতে বকতে মাথা ধরিয়ে দেই, গোসলে গেলে গলা ছেড়ে গান ধরে সে ছেলে এমন চুপচাপ কেনো। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই গন্ধটা আবার এসে নাকে ধাক্কা দিলো, গন্ধ বিষয়ে আমার একটু সমস্যা আছে, অতি কড়া গন্ধে আমার মাথা ধরে যাই, এবারেও তাই হলো। গন্ধটা আমার কেনো যেনো খুব পরচিত মনে হচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছিনা কিছুতেই।এসব আকাশ পাতাল ভাবছি,এমন সময় ফরিদ বের হলো বাথরুম থেকে, ওকে এখন ফ্রেশ দেখাচ্ছে মুখে আগের মত সজীবতা ফিরে এসেছে, কিছুটা খুশি হয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। চল ভাত খেয়ে নিবি, বলে ওর হাতটা ধরতেই চমকে উঠলাম, হাত অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা, পরক্ষনেই মনে পরলো আরেহ কেবল ই তো গোসল করে আসলো হয়তো সে জন্য ঠান্ডা হয়ে আছে।
নারে খাবোনা খুব ঘুম পাচ্ছে, একটু ঘুমুবো, বলেই বিছানায় শুয়ে পরলো ফরিদ। কিছুটা অবাক হলাম, আরেহ ওর হয়েছেটা কি, না শালা আবার ছ্যাক ট্যাক খাইসে, বিছানার কাছে এসে ওকে ডাকতে যাবো দেখি গভীর ঘুমে তলিয়ে পরেছে। আহারে বেচারা মনে হয় খুব ক্লান্ত, শোয়া মাত্র কেমন ঘুমিয়ে পরেছে, আর ঘাটালামনা ওকে। লাইট ওফ করে আস্তে আস্তে ওর পাশে গিয়ে শুয়ে পরলাম, যাতে শব্দ না হয়, এমনি বেচারা ক্লান্ত এখন শব্দ করে ওর ঘুম ভাংগানো ঠিক হবেনা। গন্ধটা বেড়েছে খুব, মাথা যন্ত্রনা করছে গন্ধের কারণে, ওটাকে একরকম ignore করেই ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম।
চোখে সকালে মিষ্টি রোদ পরতেই ঘুম টা ভাংলো, বহুদিনের অভ্যাস বশেই, চোখ খুলেই ফোন টা হাতে নিলাম তাকিয়ে দেখি, বন্ধু মেহেদি ৮ বার কল দিয়েছে, কি ব্যাপার কোনো সমস্যা হলো নাকি আবার এত বার ফোন। ফোনের লক টা খুলে, কল ব্যাক করতে করতে পাশ ফিরে দেখি ফরিদ নেই, ভাবলাম হয়তো বাথরুমে গেছে।
হ্যালো, হ্যা মেহেদি বল, এতবার ফোন দিয়েছিস কেনো কি হয়েছে।
ওপাশ থেকে মেহেদির করুন গলার আওয়াজ শোনা গেলো, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কিছু একটা বলছে। বিস্ময়ে বললাম কি হয়েছে কাদছিস কেনো। এরপরে মেহেদি যা বললো তা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলামনা, কথাটা শুনতেই মেরুদন্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে এলো যেনো। কলটা শেষ হতেই ধপ করে বসে পরলাম।
ফরিদ কাল রাতে auto accident এ মারা গেছে, মেডিকেল থেকে ফেরার সময় accident করে, spot dead।মাথায় দ্রুত কিছু চিন্তা খেলতে লাগলো, ফরিদ যদি কাল রাতেই মারা যাই, তাহলে তাহলে কাল রাতে যে ও…… এবার বুঝতে পারলাম কাল রাতে কিসের গন্ধ পাচ্ছিলাম, লোবানের গন্ধ, মানুষ মারা গেলে তাকে গোসল দেওয়ানোর পরে আতর, লোবান এইসব দেওয়া হয়, এই জন্যই গন্ধটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছিলো। তাহলে কাল রাতে আমি কার সাথে ঘুমিয়ে ছিলাম। কথাটা মাথায় আসতেই ভয়ে শরীর সিটিয়ে গেলো। দৌড়ে বাথরুমে গেলাম একি বাথরুমে তো আমার লুংগি টা পরে আছে, লুংগিটা ভাজ করাই আছে, দেখে বোঝাই যাচ্ছে লুংগি টা কেও পরেনি।
গন্ধটা হঠাৎ বেড়ে উঠেছে, পেছনে তাকাতেই দেখি ফরিদ দাঁড়িয়ে আছে, মুখে হাসি, চোখ টা আগের মতই প্রানহীন। গা কেমন যেনো শিউড়ে উঠলো, ওর হাসিটা এখন আমার কাছে পৈচাশিক, মনে হচ্ছে।
আসিরে বন্ধু, আর দেখা হবেনা তোদের সাথে, জানিস মাথাটা যখন থেতলে গেলো, খুব কষ্ট হচ্ছিলো, তোর মুখ টা চোখের সামনে খুব ভাসছিলো, মনে হচ্ছিলো শেষ দেখাটা মনে হয় আর হলোনা। আসিরে বন্ধু দেরি হয়ে যাচ্ছে, বলতে বলতে ফরিদের অবয়ব টা কেমন জানি মিলিয়ে গেলো বাতাসে। বাতাসে শুধুই ভেসে রইলো তার ক্ষীন কন্ঠস্বর, আর সেই কড়া লোবানের গন্ধ।
মনের অজান্তেই চোখ ভরে উঠলো পানিতে। আহারে বেচারা।।লেখা: উসমান।
1 Comment
Friends
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Prithula Zaman
@prithula
Shaikh-Mohidul-Islam
@shaikh-mohidul-islam
Md Tashnim Rahman
@wire-taseen
Reza e Rabbi
@rabbi121
Mesbah-Ahmed
@mesbah-ahmed
Rafiq-Ullah
@rafiq-ullah


বাহ্