Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 8 months ago

    এতোদিন পরে পোস্ট করছি মানে এই নয় যে এতোদিন লিখিনাই। আসলে থ্রিলার গল্প লেখা বেশ কঠিন। জানিনা এক্ষেত্রে আমি কতটুকু সফল হতে পেরেছি। ছাব্বিশ পর্ব পর্যন্ত লেখা শেষ। এখানে এক সাথে একুশ ও বাইশ পোস্ট করলাম। বাকি পর্বগুলো রিভিশান দিচ্ছি। রাতে আরও দুই পর্ব দিবো ইনশাআল্লাহ্‌। কালকে সকালে দিবো আরও দুই পর্ব। ছাব্বিশ পর্বে শেষ করতে পারবো ভেবেছিলাম কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। শেষ করতে হলে হয়তো ত্রিশ পর্ব পর্যন্ত যেতে হবে।

    পোড়বাড়ির_রহস্য
    পর্ব_একুশ_বাইশ

    মেয়েটা তালহাকে ড্রিঙ্ক করার জন্য সাধলো কিন্তু তালহা বিনয়ের সাথে ওকে ‘না’ বলে দিলো। কথার ফাঁকে ফাঁকে তালহা মেয়েটার নাম ঠিকানা, এখানে কীভাবে আসলো, থাকে কোথায় ইত্যাদি কথা জেনে নিলো। মেয়েটার নাম অনিতা। ওর বাবা একজন বড় মাপের ব্যবসায়ী।ওর বাবার রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা আছে। তালহা মেয়েটার বয়স ১৮ ভাবলেও মেয়েটার বয়স আসলে একুশ।অনেক কথা হলো অনিতার সাথে ওর। হঠাৎ করে অনিতা দাঁড়িয়ে তালহার হাত ধরে টেনে নাচের স্টেজের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। এতক্ষণ প্রায় ছয় গ্লাস ওয়াইন খেয়েছে মেয়েটা, তারপরও এতোটা স্বাভাবিক আছে দেখে তালহা রীতিমত অবাক হয়ে গেলো। তালহা অনেক কষ্টে অনিতার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। অনিতা বায় বলে অন্য একজনের সাথে নাচা শুরু করলো। রাত বাড়ার সাথে বারের পরিবেশ বদলে যেতে লাগলো। এখানে বাইরে থেকে যারা আসে তাদের অনেকে কিছু সময়ের জন্য আনন্দ ফূর্তি করতে আসে। রাত এগারোটা বারোটা পর্যন্ত থেকে চলে যায়। তাদের সবারই হয়তো বাসায় স্ত্রী পরিজন আছে। শুধু যে বিবাহিতরাই আসে তা কিন্তু না, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এখানে আসে। অনেকে চলে যায়, অনেকে রাতটা কাটানোর জন্য থেকে যায়। তালহার একটা কথা ভেবে খুব অবাক লাগলো। যখন পরবর্তী প্রজন্মকে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা অগ্রজদের গুরু দায়িত্ব তখন তারা নিজেরাই নানারকম অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

    রাত বাড়ছে আর ধীরে ধীরে বারের নীচ তলাটা ফাঁকা হতে থাকছে। যারা যাবার তারা চলে গেছে। বাকিরা এক একজন মেয়েকে বগল দাবা করে উপরের তলাগুলোতে চলে যেতে লাগলো। তখন যে লোকটাকে দেখেছিলো, সেই লোক বা লিটন কাউকেই আর দেখতে পেলোনা তালহা। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে তালহার হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিলো। তালহা মেয়েটার কাছ থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বেগে দোতলায় চলে গেলো। নিচতলাটা এখন ফাঁকা হয়ে গেছে। যে যার মত উপরের ঘরগুলোতে চলে গেছে। তালহা সব ঘরগুলোর কাছে গিয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ঘরের সামনে এসে তালহা থেমে যায়। দরজার উপরে লেখা কনফারেন্স রুম। বারের মধ্যে কর্পোরেট অফিসের মত সভা কক্ষ দেখে তালহার মনে সন্দেহ জন্মালো। ধীরে ধীরে দরজার নব ঘুরাতে লাগল তালহা। দরজাটা খুলে গেলো। তালহা ভেতরে ঢুকে পড়লো। চারটা বড় বড় বই এর আলমারি, একটা গোল টেবিল, একটা কম্পিউটার ও একটা তিন সিটের সোফা দিয়ে ঘরটা সাজানো।

    তালহা ভেবেছিলো এ ঘরটাতেই পাওয়া যাবে লোকটাকে কিন্তু না, ঘরটাতে কাউকে পাওয়া গেলোনা। দোতলা, তিনতলার বাকি ঘরগুলো সব বন্ধ। সবাই এখন অনৈতিক আদিম কাজে মগ্ন। তালহা দ্রুত নিচে চলে আসলো । জুয়েলকে চারিদিকে খেয়াল রাখতে বলে ও কাউন্টারের পাশের ছোট কাঁচের ঘরটার কাছে চলে গেলো। ভেবেছিলো খোলাই পাবে। কিন্তু দরজাটা বন্ধ। অবশ্য এসব তালা খোলা খুব সহজ কাজ। তালাটা খুলতে তালহার খুব একটা বেগ পেতে হলোনা। তালহা যা ধরণা করেছিলো তাই। এটাই ওদের সেন্ট্রাল ঘর। চারটা কম্পিউটার আছে ঘরটাতে। চারটা কম্পিউটারই চালু করলো তালহা। সবগুলোই পাসওয়ার্ড চাচ্ছে। কি পাসওয়ার্ড হতে পারে? তালহা আন্দাজে কি পাসওয়ার্ড দিবে বুঝে উঠতে পারলোনা। হঠাৎ মনে হলো বারের নামটা পাসওয়ার্ড হিশাবে ব্যবহার করলে কেমন হয়?

    যেই ভাবা সেই কাজ। পাসওয়ার্ডের জায়গায় n-u-r-j-a-h-a-n অক্ষরগুলো লিখে এনটার চাপার সাথে সাথে কম্পিউটারগুলো খুলে গেলো। তালহা কাঙ্ক্ষিত ফাইল খুঁজে পাওয়ার জন্য সার্চ অপশনে গিয়ে নানারকম শব্দ লিখে চেষ্টা করতে থাকে। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর নুরজাহান কথাটা লিখতেই ঐ নামেই একটা ফোল্ডার ওপেন হয়ে গেলো। শান্ত কুটিরের একটা ঘরের দেওয়ালেও যে ছবিগুলো টানিয়ে রাখা হয়েছে ঠিক সেই ছবিগুলোই এই ফোল্ডারের মধ্যে রাখা হয়েছে। তবে এখানে প্রতিটা ছবির সাথে ব্যক্তির বৃত্তান্তও দেওয়া আছে। তালহা ভালো করে সব পড়ে একটা নোট তৈরি করে ফেললো। নুরাজাহানের ফোল্ডারটার মধ্যে বিভিন্ন নামে আরও কতগুলো ফোল্ডার আছে। সেগুলো ঘাটাঘাটি করতে করতে একটা অনেক আগের আর্কাইভ নামে একটা ফোল্ডার খুলে যায়। অনেকগুলো ছবি আছে এমন একটা ফাইল বের হয়ে আসে। প্রথম ছবিটাতেই তালহার চোখ আঁটকে যায়। পছিশ বছরের এক যুবকের সাথে সতেরো বছরের একটা যুবতীর ছবি। দুজনের মুখে ভুবনভুলানো হাসি। লোকটাকে চিনতে তালহার অসুবিধা হলো কিন্তু মহিলাটা কে? মহিলাটার ছবির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই তালহা বুঝতে পারলো এই ছবিটা ও শান্তকুটিরেও দেখেছে। শান্ত কুটিরের সবগুলো ছবির ছবি ও ওর মোবাইলে তুলে রেখেছে। মোবাইলের ছবিটা বের করে মিলিয়ে দেখলো ও যা ভেবেছিলো তাই। শান্ত কুটিরে যে ছবিটা বাধাই করে বিশেষভাবে রাখা ছিলো সেই ছবির মানুষ আর এই ছবির মানুষ যে এক তা বুঝতে একদমই বেগ পেতে হয়নি তালহার। লোকটার সাথে মহিলাটার কি সম্পর্ক?ইত্যাদি হরেকরকম প্রশ্ন তালহার মনের কোণে উড়াউড়ি করা শুরু করলো। ও আরও ঘাটতে লাগলো। এরপর আর তেমন কোন কিছু খুঁজে পেলোনা। যে তথ্যগুলো পেয়েছে ওগুলো মেজোচাচ্চুর ই-মেইলে পাঠিয়ে দিয়ে মেজো চাচ্চুর মোবাইলে একটা মেসেজ দিয়ে রাখলো। কাজ শেষ হয়েছে মনে হলে ঘরটা থেকে বের হয়ে গেলো। আপাতত এখানে বসে থেকে তেমন কোন কাজ হবেনা। এখানে এখন ওর আর কোন কাজ নেই। বরং লোকগুলো এখানে থাকাকালীন সময়ে যদি শান্ত কুটিরটাতে ভালোভাবে তল্লাশি চালানো যেতো তাহলে হয়তো অনেককিছু জানা যেতো। কিন্তু এখন এই রাতের বেলায় এখান থেকে বের হয়েও লাভ নেই। এখান থেকে এতো রাতে গাড়ি ছাড়া যাওয়া সম্ভব না। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ নিরিবিলি। রাত দুইটা বাজে এসময় গাড়ি নিয়ে আসতে বলাটাও শোভনীয় হবেনা। তালহা তবুও ভেতর থেকে বের হয়ে বাইরের লনে এসে দাঁড়ালো। বারটার আশেপাশের জায়গাটা বেশ নির্জন। তালহা বাইরের লনে রাখা হেলানো চেয়ারে বসে সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।

    বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে তালহা। আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। সাথে সাথে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। সবাই মাতলামি ঘরে আমোদ ফুর্তি করে অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। এতো সকালে কারোর ঘুম ভাঙবে বলে মনে হয়না। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চায় তালহা। ফোন করে গাড়িটাকে আসতে বললে জানা যায় ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে ইতিমধ্যে এখানে আসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। তথ্যটা একদমই ভুল না। কিছুদূর হাঁটার পরই গাড়িটা পেয়ে গেলো তালহা। গাড়ি নিয়ে সোজা পোড়োবাড়িতে চলে গেলো ও। এই সময় এখানে কেউ আসেনা তা এই কয়দিনের আসা যাওয়াতে বেশ বুঝতে পেরেছে তালহা। বাড়িটাকে ওরা শুধুমাত্র ওদের সমাজবিরোধী বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। তালহা বাড়ির প্রতিটা ঘরে তল্লাশি শুরু করলো। দিনের বেলা হলেও ঘরগুলোতে আলোর অভাবে অন্ধকার ছেয়ে গেছে। ওর কাছে থাকা ছোট টর্চ দিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারছেনা। প্রথমে ভৌতিক শব্দটা কোথা থেকে আসে তা খতিয়ে দেখার জন্য শব্দের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো। শব্দটা যেহেতু সব জায়গা থেকে সমানভাবে শোনা যায় তাই তালহার মনে হলো শব্দযন্ত্রটা নিচে নতুবা ছাদের সাথে লাগানো আছে। তিন নং ঘর থেকে একটা ড্রাম নিয়ে এসে সেটার উপরে দাঁড়িয়ে ওর বরাবর ছাদের যে জায়গাটা গোল করে কাঁচের ঢাকনা দিয়ে আটকানো তালহা সেইটা বরাবর দাঁড়ালো। ওর আন্দাজই ঠিক হলো। এখানেই রাখা আছে শব্দ তৈরির যন্ত্রটা। তালহা হাত দিয়ে কাঁচের ঢাকনাটা খুলে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে বিকটভাবে শব্দটা কানে এসে ধাক্কা লাগালো। একটা ম্যাগনেটিক টেপ রেকোর্ডার চোখে পড়লো। বেশ বড় টেপ রেকর্ডারটা। ছাদের সাথে টেপ রেকর্ডাকে আঁটকে দিয়ে একটা ইউ পি এসের মাধ্যমে এটাকে কারেন্টের লাইনের সাথে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে।তালহা তারটা টেনে ছিড়ে ফেলার সাথে সাথে শব্দটা বন্ধ হয়ে গেলো। টেপ রেকর্ডারটা স্ক্রু দিয়ে ভালো করে লাগানো বিধায় ওটা খোলা সম্ভব হলোনা। ঐ ঘরের পাশের যে করিডোরটা আছে ওখানকার দেয়ালে একটা স্পেয়ার মেশিন লাগানো দেখলো তালহা। মেশিনটা কেন এখানে এভাবে লাগানো প্রথমে সেটা বোঝার জন্য যন্ত্রটার কাছে গেলো ও। পোড়োবাড়িতে ঢোকার পর যে বাজে গন্ধটা নাকে অনুভূত হয়, মেশিনটার কাছাকাছি যাওয়ার কারণে সেই গন্ধটা আরও প্রকটভাবে নাকের মধ্যে এসে ঢুকলো। শুধু গন্ধ না মেশিনটার কাছাকাছি আসার সাথে সাথে একটা বাতাসের ঝাপটা এসে ওর নাকে মুখে লাগলো। তালহা বুঝলো এটা একটা অটোমেটিক স্পেয়ার মেশিন যার কাজ অনবরত বাতাস স্প্রে করা যার সাথে একটা বাজে গন্ধযুক্ত দ্রব্য মিশানো আছে। মেশিনটা একটা প্লাগের মাধ্যমে কারেন্টের সাথে যুক্ত আছে। তালহা সুইচটা বন্ধ করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে বাতাস বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। গন্ধের প্রকটতাও কমতে লাগলো। এই জায়গাটা ঢোকার মুখে হওয়ায় বাইরের আলো কিছুটা হলেও এখানে পাওয়া যায়। কিন্তু ভেতরের দিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পোরোবাড়িতে নেমেই মুসায়েব এবং যায়িদকে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। আসার সময় চার্জার টিউব লাইট আনতে বলে দিয়েছে। এতক্ষণ চলে আসার কথা। তালহা ফোনটা নিয়ে মুসায়েবকে ফোন করে ওর ফোনটা বন্ধ পেল। যায়িদকে করতে যাবে তখনই ওরা দুজন হুড়মুড় করে প্রবেশ করলো।

    তালহা কপট রাগ দেখিয়ে বললো, কিরে এতো দেরি করলি কেন?

    যায়িদ মুসায়েবকে দেখিয়ে বলল, তোর ঘুম কাতুরে বন্ধুটাকে জিজ্ঞাসা কর। বাব্বাহ মানুষ কেমন করে এতো ঘুমায়!

    ইশ তোদের কি আরাম! আর আমি একটার সাথে আরেকটা ঘটনা জোড়া লাগাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। ঠিক আছে বাদ দে সেসব, কাজের কথায় আসি। মেয়েগুলোকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ওদেরকে আপাতত খবরটা গোপন রাখতে বলা হয়েছেতো?

    যায়িদ বলল, ছোট মামা বলেছে অপহৃত মেয়েগুলোকে উদ্ধার করা গিয়েছে এ সংক্রান্ত কোন খবর যেন তাদের পরিবারের মানুষ ছাড়া বাইরের কাক-পক্ষীও না জানে সেদিকে যেন তারা খেয়াল রাখে। উনারা এ ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছে।

    যাক বাঁচা গেলো। কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তালহা। বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলল, চল ভেতরের ঘরগুলো ভালোভাবে তল্লাসি করি।

    যায়িদ আর মুসায়েব একসাথে বলে উঠলো চল।

    তিনজন তিনটা চার্জার লাইট নিয়ে বাড়ি একপ্রান্ত থেকে শুরু করে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সবগুলো ঘর ভালোভাবে দেখা শুরু করলো। দুইটা ঘর থেকে বিভিন্ন ধরণের মাদক এবং প্রচুর পরিমাণ সোনার গহনা আবিষ্কার করলো ওরা।

    এতো গহনা দেখে মুসায়েব জিজ্ঞাসা করলো এগুলো ব্যাঙ্কের লকার ডাকাতি করে আনা হয়নিতো?

    তালহা বলল না, এগুলো দেখে মনে হচ্ছে বাইরে থেকে চোরাই পথে আনা হয়েছে।
    আচ্ছা আগের মত সেই ভৌতিক শব্দটা শোনা যাচ্ছেনা কেন? অবাক হয়ে প্রশ্নটা করলো মুসায়েব।

    শুধু শব্দের কথা কেন বলছিস এতোদিন যে বাজে একটা গন্ধ পাওয়া যেতো সেটাওতো দেখছিনা। কিরে তালহা তুই কিছু করেছিস?

    তালহা বলল, সবার মধ্যে যে ভয়টা কাজ করতো তা যে একদম অমূলক ছিলো আজ আমি তা প্রমাণ করে দিবো।

    কীভাবে? উৎসুক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুসায়েব কথাটা জিজ্ঞাসা করলো।

    তালহা বলল, একটা দুষ্টু চক্র বাড়িটাকে খালি পেয়ে তাদের সমাজবিরোধী কাজে ব্যবহার করছে। ওরাই এসব কৃত্রিম শব্দ ও গন্ধ তৈরি করে বাড়িটাকে ভীতিকর বানিয়ে রেখেছিলো যাতে মানুষ এর মধ্য প্রবেশ করতে না পারে। চল তোদেরকে দেখাই কীভাবে কাজগুলো করেছে। তালহা একে একে ওদেরকে দেখাতে লাগলো কীভাবে ভৌতিক শব্দ এবং বাজে গন্ধ সৃষ্ট করা হয়েছিলো।

    এই যে এই ম্যাগনেটিক টেপ রেকোর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ভৌতিক শব্দ তৈরি করা হয়। ভৌতিক্ শব্দ রেকর্ড করা একটা ক্যাসেট ঢুকিয়ে তা যেন বারবার বাজতে থাকে সে ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিলো। রাত বাড়ার সাথে সেই ভৌতিক শব্দটা বাড়তে থাকতো। এর একমাত্র কারণ রাতের নিস্তব্ধতা। দিনের বেলায়ও যাতে কেউ ঢুকতে না পারে এজন্য সারাক্ষণ যেন ক্যাসেটটা বাজতে থাকে তার জন্য একটা কারেন্টের সাথে টেপ রেকর্ডারটার একটা প্লাগের সাহায্যে সংযোগ করে রাখা হয়েছিলো। এদিকে আয় বলে তালহা যায়িদ আর মুসায়েবকে নিয়ে অটোমেটিক স্প্রেয়ার মেশিনটা যেখানে লাগানো ছিলো সেখানে গেলো। মেশিনটা তখনও দেওয়ালের সাথে লাগানো ছিলো। মেশিনটা দেখিয়ে তালহা বলল এই যে এই মেশিনটা দেখছিসনা? এটা ব্যবহার করে বাতাসের মাধ্যমে গন্ধের উৎপত্তি করা হতো। এটা এমনভাবে সেট করে রাখা হয়েছিলো যেন সেটা থেকে সারাক্ষণ বাজে গন্ধযুক্ত বাতাস বের হয়ে পরিবেশটাকে মানুষ প্রবেশের অনুপযুক্ত করে তোলে। আমি কারেন্টের সাথে এই মেশিনের সংযোগ লাইনটা কেটে দিয়েছি। তাই এখন এটা কাজ করছেনা।

    এই বাসাটা মূলত গহনা, নারী এবং মাদক পাচারে ব্যবহৃত হয়। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে মাদক ও গহনা পাচারকারী এবং নারী পাচারকারী একই লোক না।যাই হোক আমি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত না। তালহা প্রসঙ্গ পাল্টে বন্দুদের বলল, তোদেরকে যে তালা আনতে বলেছিলাম, এনেছিস?

    যায়িদ ওর ব্যাগের থেকে তিনটা তালা বের করে তালহাকে দিলো। তালহা ৩ নং ঘর এবং সন্দেহের জায়গা থেকে আরও দুইটা ঘর তালা মেরে দিলো। বন্ধুদেরকে বলল চল উপরটা ভালো করে তল্লাশি চালাতে হবে। নিচ থেকে বের হয়ে উপরে উঠতে যাবে তখনই শব্দগুলো ওদের কানে গেল। সামনের মানুষগুলোকে দেখে থমকে দাড়িয়ে পড়লো তিনজনই।

    পর্ব_বাইশ

    সামনের মানুষগুলোকে দেখে থেমে গেলো ওরা। বের না হয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেলো। দূর থেকে দেখলেও লিটন এবং আজাদ সাহেবকে চিনতে কষ্ট হলোনা তালহার। কিন্তু বাকি দুইজনকে একেবারেই নতুন মনে হলো ওর কাছে। ওরা কথা বলায় ব্যস্ত ছিলো বিধায় তালহারা ওদের দেখলেও ওরা তালহাদের খেয়াল করেনি।

    এতো সকালে লোকগুলো পোড়োবাড়িতে আসবে তালহা ভাবতেই পারেনি। তাহলে কি লিটন সাহেব রাতের বেলা বারে ছিলোনা? তালহা ভেবেছিলো সব মাতাল হয়ে রাতে গভীর ঘুম দিয়েছে, নিশ্চয় সহজেই ঘুম ভাঙবেনা। কিন্তু তালহার ধারণা ভুল প্রমাণ করে সকাল আটটার আগেই এরা শান্ত কুটিরে এসে উপস্থিত হলো! ভেতরে ঢুকলেও লোকগুলো এখনও ওদেরকে দেখেনি। ওরা ঢোকার আগেই তিনজন তিনটা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে তালহারা। তালহার মনে হলো এবার ওরা ধরা পড়ে যাবে। আর যদি ধরা পড়ে তাহলে মনে হয়না বেঁচে ফিরতে পারবে। তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ওর কাছে সতর্কতা মানেই আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। বন্ধুদেরকে দোয়া পড়তে বলে নিজে অনবরত দোয়া পড়তে লাগলো।

    লিটন এবং আজাদ চৌধুরীসহ মোট চারজন লোক এসেছে। বাকি দুইজনকে এর আগে কখনও দেখেনি তালহা। ভেতরে ঢুকেই লিটন আর আজাদ চৌধুরী থমকে দাঁড়ালো। আজাদ চৌধুরী বলে উঠল কি ব্যাপার, এমন নির্জন লাগছে কেন বাড়িটাকে?

    বুঝতে পারছেন না? এটার শব্দ ও গন্ধ তৈরির উৎস নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আমার ধারণা কাজটা যারা করেছে তারা এখনও ভেতরেই আছে। খুব সাবধানে ঢুকতে হবে। প্রত্যুত্তরে কথাটা বলল লিটন।

    মুসায়েব একটা তক্তপোষ হাতে নিলো ওদের মারবে বলে, তালহা ওকে হাত টেনে বাঁধা দিলো। একদম পিনপতন নীরবতা পালন করতে হবে। লিটন সাহেবের হাতে একটা ছুড়ি এবং অন্য একজনের হাতে রিভলভারটা দেখে ভয়ে তালহাকে জড়িয়ে ধরে মুসায়েব। ও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, তালহা ওর মুখ চেপে ধরলো।
    চারিদিকে দৃষ্টি রেখে লোকগুলো ভেতরে ঢুকে গেলো। সাথের লোকদুটোকে নিয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলো লিটন। দেখতে দেখতে ভেতরের দিকে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর এসে বলল, স্যার কাউকে পেলাম না। আমার মনে হচ্ছে এগুলো ঐ বিচ্ছুগুলোর কাজ।

    লিটনের কথাটা শুনে গর্জে উঠলো আজাদ চৌধুরী। ক্রোধের স্বরেই বললেন, ছেলেগুলোর কোন ব্যবস্থা করতে পারলেনা তোমরা? বাচ্চা ছেলে কয়টা। তাদের কাছে আমাদের নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে! তাহলে তোমাদের কাজ দিয়ে আমাদের লাভটা কি?

    স্যার ছেলেগুলো অনেক ধূর্ত। ওরা যখন একবার এই বাড়ির ভিতর ঢুকেছে, তখন আবারও যে ঢুকবে এটাতো জানা কথা। ওরা সহজে হাল ছেড়ে দেবে বলে মনে হয়না। আমাদের এরপর থেকে এখানে আরও বেশি সিকিউরিটি জোরদার করতে হবে। স্যার আমাদের পক্ষ থেকে আমারা করতে পারি যদি আপনারা আমাদের সেরকম পারিশ্রমিক দেন।

    তোমাদের একমাত্র কাজই ছিলো এই জায়গাটা পাহারা দেওয়া আর জায়গামত মালামাল পৌঁছে দেওয়া।

    না স্যার। আপনাদের সাথে আমাদের শুধু মালামাল পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিলো। এর মাঝে ছেলেগুলো এসে পড়ায় কাজ বেড়ে গেলেও আপনারা আমাদের পারিশ্রমিক বাড়াননি।

    ঠিক আছে আমি স্যারের সাথে কথা বলে দেখবো। মানুষটাও সম্পূর্ণ ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে।

    স্যার ভেতরটা কেমন ওলট পালট লাগছে। উত্তেজনার সাথে কথাটা বলল লিটন।
    পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে একটু আগেও কেউ এখানে ছিলো। ভালো করে খোঁজ কর। চারিদিকে ছড়িয়ে যাও। তাহলে ওরা আর পালাতে পারবেনা।

    ঠিক আছে স্যার। ওদের সঙ্গে আসা লোক দুইজনকে ঘুরে ঘুরে দেখতে বলে লিটন তিন নম্বর ঘরের কাছে চলে গেলো। দরজার লাগানো তালা খুলতে গিয়ে সেখানে অন্য তালা দেখে উত্তেজিত হয়ে গেলো লিটন। দ্রুত সবগুলো ঘরের তালা পরীক্ষা করতে লাগলো। সবকটা তালা বদলে ফেলা হয়েছে স্যার! চিৎকার করে কথাটা আজাদ চৌধুরীকে বলল লিটন।

    কথাটা শুনে আজাদ চৌধুরী বোকা বনে গেলেন। প্রতিপক্ষকে দূর্বল ভাবার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলেন। লিটনকে বললেন সি সি ক্যামেরাগুলো ঠিক আছে কিনা দেখেনতো।

    লিটন তালার বিষয়ে আজাদ চৌধুরীকে জানিয়ে লোক দুইজনকে শান্ত কুটিরে ঢোকার মুখে যে মোটা মোটা পিলারগুলো আছে তার পেছনে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা খুঁজে দেখতে বললো। লিটনের নির্দেশ মোতাবেক যেখানে পিলারের পাশে গুটিশুটি হয়ে তালহারা তিনজন বসে ছিলো ওদের দুজনের একজন মাত্রই সেদিকে আসা শুরু করেছিলো। তালহা তখনই ওর বন্ধু দুজনের হাত ধরে টান দিয়ে বাইরের দিকে দৌড় মারলো।

    ওদেরকে দৌড়ে বের হতে দেখে লোকটা চিৎকার করে উঠলো। লোকটার চিৎকার শুনে বাকিরাও পিছন ফিরে তালহাদের বের হয়ে যেতে দেখলো। সঙ্গে সঙ্গে আজাদ চৌধুরী ওদেরকে ধরার জন্য আদেশ করেলো। লিটন লোক দুইজনকে সঙ্গে করে নিয়ে পোড়োবাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো।

    তালহাদের গাড়ি রাজবাড়ির কাছে দাড় করিয়ে রাখার কথা। ওরা সেদিকে গিয়ে গাড়িতে না উঠে রাজবাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো। ভেতরে বেশ কতগুলো দল এসেছে পিকনিক করার জন্য। তালহারা দৌড়ে গিয়ে মানুষের মধ্যে মিশে গেলো।

    লিটন ওর বাকি দুইজন সঙ্গীকে নিয়ে কিছুক্ষণ দিশেহারার মত তালহাদের খুঁজতে থাকে। চারিদিকে নজর বুলিয়েও যখন ওদের দেখতে পেলোনা তখন উপায়ান্ত না দেখে লিটন লোকগুলোকে নিয়ে রাজবাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।

    লিটন ওর দুই সঙ্গীকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে তালহারা বের হয়ে আসলো। তালহা মুসায়েব এবং যায়িদকে গাড়িতে অপেক্ষা করতে বলে ওর জুব্বা টুপি পরে আবার শান্ত-কূটিরের উদ্দেশে রওনা দিলো। লিটনদের পাশ দিয়ে চলে গেলো অথচ ওরা ধরতেই পারেনি। তালহা দ্রুত পায়ে এমনভাবে হেঁটে গেলো যাতে করে ও লিটনদের আগেই পোড়োবাড়িতে পৌঁছাতে পারে। তালহা লিটনদের পিছনে ফেলে দ্রুত গতিতে পোড়োবাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো।

    তালহা বেশভূষা পরিবর্তন করেছে বলে ওকে লিটন চিনতে পারেনি। ও ঢুকেই দেখলো আজাদ চৌধুরী ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা নিয়ে চারিদিকে অস্থির দৃষ্টিতে দেখছে । সদর দরজার দিকে মুখ করে দাড়িয়ে ছিলো লোকটা। তালহার মনে হলো লোকটা ভয় পাচ্ছে। তাই সদর দরজা পেরিয়ে একটু ভেতরে ঢুকে লোকটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো ও। সাদা জুব্বা, মাথার উপরে সাদা ওড়না ঝুলানো তালহাকে দেখে লোকটা রীতিমত কে কে বলতে বলতে কাঁপতে থাকলো। ঠিক সেই মুহূর্তে লিটন ও তার সঙ্গীদের আসার পদশব্দ শুনে তালহা একটা ভালো জায়গা দেখে লুকিয়ে পড়লো। লিটন তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে শান্তকুটিরে ঢুকে পড়লো। আজাদ চৌধুরী তালহা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেদিকে হাত দেখিয়ে ওদেরকে বললো ভু—-উ—ত ভু——–উ—-ত।

    আজাদের হাত অনুসরণ করে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে লিটন দেখল সেখানে ফাঁকা, কেউ নেই। কারণ ততক্ষণে তালহা উপরে চলে গেছে।

    লিটন অবাকের সাথে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে বলল ভুত! কোথায় ভুত? স্যার আপনি ভুত বিশ্বাস করেন।

    আজাদ চৌধুরী তোতলাতে তোতলাতে কি বলল তা লিটনের বোধগম্য হলোনা। ঠিক তখনই একটা বিরস আওয়াজে আজাদ চৌধুরীর ফোনটা বেজে উঠলো। নিজেকে ধাতস্থ করে ফোন ধরতে সামান্য দেরি হওয়াতেই ক্ষেপে গেলো ওপাশের মানুষটা। রেগে গিয়ে বলল, ফোন ধরতে এতক্ষণ লাগলো কেন?

    আসলে স্যার ……………।

    কি তখন থেকে আসলে আসলে করছো। তোমরা এখন কোথায়?

    স্যার আমরা এখন শান্ত কুটিরে।

    তাহলেতো ভালোই হলো। শান্ত কুটিরের সি সি ক্যামেরেগুলোর কি হয়েছে? সব ত্রুটিপূর্ণ দেখাচ্ছে কেন?

    তাই নাকি ! কপট বিস্ময় নিয়ে কথাটা বলল লিটন। এ বাসায় যে কেউ ঢুকে সব এলোমেলো করে দিয়ে গেছে তা বোঝা যাচ্ছে।

    কারা করেছে এসব?

    কারা হবে আবার? ঐ বিচ্ছুগুলো নিশ্চয়। ওরা নিশ্চয় সি সি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

    কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো আজাদ চৌধুরী। বলল, আর এদিকে আর এক কাণ্ড ঘটেছে। অরিন্দম লাহিড়ীকে তার দুই সঙ্গীসহ আমাদের গোডাউনে পাওয়া গেছে।
    আমাদের গোডাউনে! কথাটা বলে লিটনের দিকে তাকালো আজাদ চৌধুরী।
    হ্যা আমাদের গোডাউনে। তোমরাতো কোন কাজ ঠিকমত করোনি। এখন তিনটা মেয়ে আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেলো। আমরা ওদের কাছে কি জবাব দিব?

    স্যার ঐদিন বারে আমি উপস্থিত ছিলাম না। আমি আপনার নির্দেশ মোতাবেক ফরহাদ সাহেবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।

    সেটাতো আমি জানি। তুমি এতো বাড়তি কথা কেন বলো? কাজের কথায় আসো। লিটনকে জিজ্ঞাসা করো ও কার কাছে মেয়ে তিনটাকে হস্তান্তর করেছে। আজকে সকালে শুভাশিস দত্ত ফোন করে জানালো অরিন্দম লাহিড়ী ফিরে যায়নি এবং ওকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছেনা। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তারপরেইতো কি একটা কাজে হাসানকে গোডাউনে পাঠিয়েছিলাম। ও এসে বলল, লাহিড়ী এবং তার দুই সঙ্গীকে কারা যেন বেঁধে গোডাউনে ফেলে রেখেছে। লিটনকে ফোনটা দাও।

    আজাদ মোবাইলটা লিটনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার কথা বলবে।
    লিটন ফোন ধরতেই ওপাশের মানুষটার চিৎকার শুনে ওর কান ফেটে যাওয়ার যোগাড় হলো।

    ক্রোধের সাথেই লিটনকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি গতকাল মেয়ে তিনজনকে কার কাছে হস্তান্তর করেছো?

    কেন, অরিন্দম লাহিড়ী?

    তুমি অরিন্দম লাহিড়ীকে চিনতে? ফোনের ওপাশের মানুষটা বাজখাঁই কণ্ঠে লিটনকে কথাটা জিজ্ঞাসা করলো।

    না স্যার উনাকে আমি চিনিনা মানে কোনদিন চোখের দেখাও দেখিনি। কেন স্যার কি হয়েছে?

    যাকে দিয়েছো এখন সে অরিন্দম লাহিড়ী ছিলোনা। অরিন্দম লাহিড়ীকে বেঁধ আমাদের গোডাউনে ফেলে রেখে লোকটা ওর পোশাক পরে নেয়। এসময় গোডাউনে আঁটকে রাখা গোয়েন্দা দুজনকেও বের করে নিয়ে যায়। আমার ধারণা ওদের দলনেতা কি যেন নাম তালহার কাজ এটা। একটা বাচ্চা ছেলে এভাবে ধোঁকা দিলো আর তুমি ধরতে পারলেনা।

    হঠাৎ কথার মাঝখানে ফোনটা কেটে দিয়ে লিটন আজাদকে জিজ্ঞাসা করলো স্যার ভুত কোথায় দেখেছেন?

    আজাদ হাত দিয়ে সদর দরজার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। ভুতনা আমি বলতে গিয়েছিলাম ভুতের বেসে একজন দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি জীন বিশ্বাস করি এবং ভীষণভাবে জীনকে ভয়ও পাই।

    বুঝেছি, আচ্ছে স্যার বলেনতো ভুতের বেসে দাঁড়িয়ে ছিলো বলতে লোকটার পোশাকের কথা বলছেন?

    হ্যা, সম্পূর্ণ সাদা ইয়া বড় একটা জামা পড়া ছিলো। আবার মাথায় উপর একটা ওড়না ঝুলিয়ে দেওয়া ছিলো। যার কারণে মুখটা ভালো করে বোঝা যাচ্ছিলোনা।
    লিটনের মনে পড়ে গেলো। আজাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা যখন রজবাড়ি পর্যন্ত গিয়েও বিচ্ছু তিনটাকে খুঁজে পেলামনা তখন আবার এই বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। তখন একজনকে এমন পোশাকে দেখলাম আমাদেরকে ছাড়িয়ে খুব দ্রুত সামনের দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছে। এবং এই পোশাক পরা লোকটাকে আমি গতকাল রাতে বার কাউন্টারে দেখেছি। দাঁড়ান জুয়েলকে জিজ্ঞাসা করলে ওর বৃত্তান্ত জানা যাবে। তবে আমার মনে হচ্ছে সে আমাদের আশেপাশেই আছে। কামাল আর রতন তোমরা বাড়িটাতে ভালো করে খোঁজ লাগাও। কথাটা শেষ করতে পারেনি আজাদ সাহেবের ফোনটা আবার বেজে উঠলো।

    আজাদ সাহেব ফোনটা না ধরে লিটনের হাতে দিয়ে বলল নিশ্চয় কথার মাঝে ফোন কেটে দেওয়ার জন্য এখন আর এক দফা বকা শুনতে হবে। কাজটা যেহেতু তুমি করেছো। তাই বকাটাও তুমিই শুনো।

    লিটন ফোন কানে নিয়ে সালাম দিলো।

    সালামের উত্তর না দিয়ে ওপাশ থেকে মানুষটা ধমক দিয়ে বলল, কথার মাঝখানে ফোন কেটে দিলে কোন সাহসে?

    আসলে একটা কথা মনে হওয়াতে আজাদ স্যারের সাথে আলোচনা করার জন্য না বুঝেই কেটে দিয়েছি। আসলে একটা ক্লু মনে পড়লো তাই উত্তেজনায় ফোনটা কাটা হয়ে গেছে। তারপর একটু আগে যেসব ক্লু বের করেছে সে ব্যাপারে লোকটাকে জানালো। একটু থেমে আবার বলল, স্যার আর একটা সমস্যা হয়ে গেছে।

    কি সমস্যা ওপাশের লোকটা কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো।

    স্যার আজকে যে মেয়েটাকে বিদেশী ডেলিগেটসদের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিলো তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা। আমরা ওকে একদিন অবচেতন থাকে এমন ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে গিয়েছিলাম। যে ঘরে রেখে গিয়েছিলাম সে ঘরের দরজায় আমাদের দেওয়া তালা নেই। তার বদলে নতুন তালা ঝুলছে। নতুন তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি ঘরটা ফাঁকা, কেউ নেই। এখানে গুরুত্বপূর্ণ চারটা ঘরের তালা বদলে ফেলা হয়েছে।

    কি বল? চিৎকার করে বলে উঠলো লোকটা। তোমাদের আমি দেখে নিবো। এই তোমাদের পেশাদারিত্বের নমুনা! তিনটা বাচ্চা ছেলে তোমাদেরকে ধোঁকা দিয়ে গেলো, আর তোমরা কিছুই করতে পারলেনা! আমার যে কত বড় ক্ষতি হলো! এরপর এরা আর আমার সাথে কোনরকম চুক্তিতে যাবেনা। এখন আমাকে ক্ষতিপূরন হিশাবে ওদের কাছ থেকে নেওয়া টাকাতো দিতে হবেই সাথে আরও লাখ টাকা দিতে হবে। সেটা তোমাদের পারিশ্রমিক থেকে দিবো। কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিলো।
    লিটন ফোনটা আজাদ চৌধুরীকে দিতে গিয়ে বলল, স্যার এবার ধরা খেয়েছি। এখন বিচ্ছুগুলোকে ধরতে পারি তাহলে হয়তো বেঁচে যাবো। নইলে বস যে পরিমাণ রেগে আছে, তাতে পারিশ্রমিকতো পাবোইনা আরও আর্থিক গচ্চা যেতে পারে।
    মানে কি? কি বলছো এসব তুমি?
    স্যার এ ধরণের কাজ আমি আর করবোনা। কার হয়ে কাজ করছি জানিনা। তাকে কখনও দেখিওনি। আমাদের সবসময় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় আর তারা আড়ালে বসে কলকাঠি নাড়তে থাকে। আবার তারা নিরাপদেও থাকবে। আজাদ চৌধুরীকে কোন কথা বলছে না দেখে লিটন আবার বলল, স্যার, এখন কি করবো? সবতো কেমন গোলমেলে ঠেকছে।
    আজাদ চৌধুরী চিন্তিত ভঙ্গীতে বলল, হ্যা সেটাইতো দেখছি। আচ্ছা তুমি কি যেন বলছিলে? জুব্বা পরা যাকে বারে দেখেছিলে তাকে এখানেও দেখেছো?
    এতক্ষণ নানারকম কথার ভিড়ে লিটন ভুলেই গিয়েছিলো কথাটা। আজাদ চৌধুরীর কথা শুনে মাথাটা ঝাঁকি দিয়ে বলল, হ্যা হ্যা, আমিতো বেমালুম ভুলে খেয়েছি। আমার ধারণা আপনি যাকে ভুত ভেবেছেন সে আর কেউ না, সেও ঐ জুব্বা পরা লোকটা। এবং আমার ধারণ সে এখন এখানেই আছে।
    তাহলে তুমি কি ধারণা করছো ঐ তিন বিচ্ছু ছাড়া আরও অন্য কেউ আমাদের কাজের পেছনে লেগেছ?
    হ্যা স্যার আমার তাই মনে হচ্ছে। কারণ ঐ জুব্বা পরা লোকটাকে সেদিন ওখানে একাই দেখেছি আবার একটু আগেও একা হেঁটে আসতে দেখেছি। কামাল এবং রতনের দিকে তাকিয়ে বলল, কি তোরা দুইজন এমন হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? বললাম না বাড়িটাতে ভালো করে তল্লাশি চালা।
    স্যার কখন বললেন? আপনি তখনতো কথাই শেষ করেননি। তার আগেইতো আপনার ফোন চলে আসে।

    লিটনের মনে পড়লো সে কথা শেষ করার আগেই তাদের বসের ফোন চলে আসে। যার কারণে ও কথাটা শেষ করতে পারেনা। কামাল এবং রতন তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে বলল, তখন বলিনি ঠিক আছে, কিন্তু এখনতো বললাম, তারপরেও এমন সঙয়ের মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

    স্যার কোথায় খুজবো?

    কোথায় খুজবো মানে? এখানে খুঁজে দেখবি।

    কামাল এবং রতন নিচ তলাটার তালাবদ্ধ ঘরগুলো ছাড়া সব জায়গায় ভালো করে তল্লাশি চালিয়ে কাউকে না পেয়ে ওরা ফিরে আসে।

    চলবে

    6
    1 Comment
    • ধারাবাহিকভাবে লিখে যাওয়া বেশ কঠিন কাজ। আপনি সেটা ভালোই করছেন।

Skip to toolbar