-
টুইন আর্থ
তৃতীয় পর্বঘর থেকে বেরিয়ে ই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমি / নিজের অজান্তেই লি এর ডান হাত টা চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে বললাম এ আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি ? এটা কি স্বর্গ ? আকাশ টা গারো নীল রংয়ের / আমাদের পৃথিবীর চেয়েও অনেক বেশি গারো নীল / দূরে দিগন্তের কাছে পাহাড়ের চূড়ায় সাদা সাদা বরফ / পাহাড়ের চূড়া থেকে এঁকেবেঁকে ঝরনা গুলো বয়ে যাচ্ছে / ঘন সবুজ গাছপালায় ভর্তি পাহাড় গুলো / ঘন নীল আকাশের মাঝে সাদা সাদা মেঘগুলো অনেক নিচু দিয়ে উড়ছে / কোন কোন মেঘ আবার গাছের সঙ্গে আটকে জমাট বেঁধে আছে / আর সমস্ত আকাশ জুড়ে বড় বড় পাখির মত কি যেন উড়ছে / আমি আকাশের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে প্রশ্ন করলাম এগুলো কি ? লি ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো / আমি শুনতে পেলাম এগুলো আমাদের স্বল্প দূরত্বে চলাচলের একমাত্র বাহন / আমরা হাঁটতে থাকলাম / রাস্তার দু’পাশে নানা ধরনের গাছপালা / নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ / ঝির ঝিরে ঠান্ডা বাতাস / আমার কেমন যেন একটু শীত শীত লাগছিল / আমি লি এর গা ঘেঁষে হাঁটতে লাগলাম / একটু সামনে আসতে ই দেখলাম সেই আকাশে ওড়া পাখির অনেকগুলো একটা মাঠে রোদ পোহাচ্ছে / আমরা তার একটাই চেপে বসলাম / ভিতরে বসে বুঝলাম এটা কোন পাখি নয় এগুলো আমাদের পৃথিবীর ছোট ছোট প্লেনের মতন / লি তার ড্রাইভিং সিটে বসে সামনের প্যানেল এর বোতামগুলো নিয়া নাড়াচাড়া করতে লাগল এবং পাখির মতন কিচিরমিচির শব্দ করে কারো সঙ্গে যেন কথা বলতে লাগলো / এক পর্যায়ে এই ছোট পাখিটি আস্তে আস্তে আকাশে উড়তে শুরু করল অনেকটা আমাদের পৃথিবীর হেলিকপ্টারের মত / কিন্তু এতে করে তেমন কোনো শব্দ আমি শুনতে পেলাম না / শুধুমাত্র আমাদের পৃথিবীতে ঘরে এসি চললে যেরকম একটা গুঞ্জন ধনী শুনতে পাই ঠিক সেইরকম একটা শব্দ হতে লাগলো / আমরা আকাশে ভেসে বেড়াতে থাকলাম / নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশ / গাছপালা এবং এই গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে ঘরবাড়ি সবই যেন আঁকা ছবির মতন / এক সময় আমরা উড়তে উড়তে সমুদ্রের তীরবর্তী একটা বিচ এর উপরে চলে এলাম / নিচে অনেক লোকের কোলাহল , কেউবা উদোম গায়ে রোদ পোহাচ্ছে অথবা কেউবা পানিতে লাফালাফি ঝাপাঝাপি করছে বিচের বালিতে দৌড়াদৌড়ি করছে , খেলছে / এই প্রথম আমি লি কে ছারা অন্য মানুষজন দেখতে পেলাম আমার খুব ভালো লাগলো / আমি ঘুরে লি এর দিকে তাকিয়ে বললাম চলনা আমরা নিচে নামি / লি প্যানেল থেকে চোখটা তুলে আমার দিকে তাকালো তারপর খুব মিষ্টি করে হাসল / আমি লি এর কথা শুনতে পেলাম , সমুদ্র পছন্দ করো তুমি ? সমুদ্র আমারও খুব ভালো লাগে / চলো আজকে আমরা সারাদিন এই সমুদ্রের তীরে ই কাটাব / চাইলে রাত্রি টাও এখানে কাটাতে পারো / যদি আমি রাত্রে এখানে থাকি তবে তুমি কি করবে ? তুমি কি চলে যাবে ? লি তখন পাখি টাকে মাটিতে নামাতে ব্যস্ত . প্যানেল বোর্ড থেকে চোখ না সরিয়েই মুচকি হাসতে লাগলো / এবং বলল না আমি তোমার গাইড যে পর্যন্ত না তুমি বাসায় ফিরছ সে পর্যন্ত আমি তোমার সাথেই আছি / এটা আমার অফিশিয়াল নির্দেশ / খুব দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে , যদি আমার সান্নিধ্য তোমার কাছে বিরক্তিকর ও মনে হয় তা হলেও আমার কিছু করার নেই / আমাকে তোমার সাথেই থাকতে হবে / আমরা আস্তে আস্তে মাটিতে নেমে এলাম /
ভোর হয়েছে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা আগেই / জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সূর্যোদয় দেখছিলাম / এখানে সূর্যোদয়ের দৃশ্যটা কিন্তু খুব সুন্দর / প্রথমে সমস্ত আকাশটা হালকা নীল হয়ে ওঠে / এরইমধ্যে কমলা রঙ্গের সূর্যটা ধীরে ধীরে নীল আকাশে কমলা রঙ্গের আলো ছড়াতে ছড়াতে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তোলে / কিন্তু আমার বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না / মনটা খারাপ হয়ে আছে / আয়েশা আরিয়া রাভিদ ওদের কথা বারবার মনে পরছে / এখন যদি আমি আমার ছেলে দের কাছে অস্ট্রেলিয়া তে থাকতাম তবে আমার এই নাতি নাতনি গুলো আমাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দিত না / আরিয়া বলতো দাদা ভাই ওঠো চলো হাঁটতে যাই / আবার রাভিদ এসে দাদাভাইয়ের গলাটা জড়িয়ে ধরে দাদা ভাইয়ের কাছে শুয়ে থাকতো / আর আয়েশা টা নতুন কোন দুষ্টামির প্লান মাথায় নিয়ে পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে দাদা ভাইয়ের রুমে ঢুকে ঘরের ভেতর দাঁড়াতো / তারপর এদিক ওদিক চোরা চোখে তাকিয়ে হিটার টা বন্ধ করে দৌড় / তখন তো আমাকে উঠতে ই হত / অস্ট্রেলিয়া তে যে ঠান্ডা , আমি ঠান্ডা একদমই সহ্য করতে পারিনা / হঠাৎ করেই ঘরের দরজাটা আস্তে আস্তে খুলে গেল এবং ঠিক পাচ সেকেন্ড পরে , হাতে একগাদা ফুল হাতে ,লি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো / আমি লি য়ের কথা শুনতে পেলাম ,কি ব্যাপার তুমি এখনো বিছানা ছেড়ে ওঠো নাই ? আমি মন খারাপ করে বললাম ভালো লাগছে না আমার / খুব মনে হচ্ছে নাতি-নাতনি গুলোর কথা / আমার এখানে একদম ভালো লাগছেনা / তাই মনটা খারাপ হয়ে আছে / বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না / লি ঘরে ঢুকে একটা ফ্লাওয়ার ভাসে ফুলগুলো রাখল , তারপর হেঁটে এসে আমার বিছানার সামনে এসে দাঁড়ালো / ওকে কোন চিন্তা নেই আমি তোমাকে একটা সুসংবাদ দিচ্ছি তাতে করে নিশ্চয়ই তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে / শোনো আমাদের গবেষণার কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে / ল্যাবরেটরির সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ / এই পরীক্ষায় প্রায় 99 শতাংশ সফলতা পেয়েছি আমরা / একটা ড্রাগ আমরা উদ্ভাবন করে ছি / ফাস্ট এবং সেকেন্ড ট্রায়াল’ পশু-পাখির উপর সাকসেসফুলি প্রয়োগ করা হয়েছে / এখন সর্বশেষ পরীক্ষা কোন মানুষের বডি তে এই ড্রাগ এপ্লাই করে এর রিএকশন এবং ফলাফল যাচাই করা / তুমি আরো জেনে খুশি হবে যে আমি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যাকে এই ড্রাগের পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়েছে / হয়তো বা আমি আমাদের এই গ্রহের প্রথম মানুষ হব যে সম্পূর্ণ আবেগ অনুভূতি ভালোবাসা নিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হব / কি ভালো লাগছে না তোমার খবরটা শুনে ? লি হাসি হাসি মুখ করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল / আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল বললাম এতে এত খুশি হওয়ার কি আছে ? ওষুধের রিয়াকশন এ তোমার শরীরের নানা প্রকার সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে এমনকি তোমার মৃত্যু ও হতে পারে / লি এর মুখের হাসিটা দপ করে নিভে গেল / কিন্তু মুখে বলল তাতে কি ? এই মৃত্যু টা ও বড় গৌরবের ; সম্মানের / আমি আমার জাতির জন্য নিজেকে সেক্রিফাইস করছি / আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম, মনে মনে বুঝতে চেষ্টা করলাম কে ঠিক ? আমি নাকি লি ? আমিতো শুধু আমার নিজের কথা ভাবছি ,নিজের জীবনের কথা ভাবছি , কিন্তু ওরা ? ওরা তো ওদের সমস্ত মানব জীবনের কথা ভাবছে / তবে কি আমাদের ভিতরে যে ভালোবাসা আবেগ অনুভূতি আছে তার সবই আমরা শুধু আমাদের নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করি ? আমাদের ভালোবাসা শুধুই কি আত্মকেন্দ্রিক ? আমরা যে আমাদের সন্তানদের ভালোবাসি সেটাও কি শুধু নিজেদের স্বার্থেই ?
বেশ কয়েকদিন যাবত লি এর কোন খবর নেই / এখানে যে বাড়িতে আমি থাকি সেটা পাহাড়ের উপরে একটা বাংলো টাইপের বাড়ি / বাড়িটার ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নিচে মনে হয় শুধু সবুজ আর সবুজ / দূরে পাহাড় , জঙ্গল / খুবই মনোরম দৃশ্য / আমি এই বাড়িতে একাই থাকি / কিছু কিছু রোবট সদৃশ্য যন্ত্র মানব এখানে আছে যারা আমার যাবতীয় কাজকর্ম করে দেয় / খুবই আধুনিক একটা বাড়ি / সন্ধ্যায় আপনা আপনি আলোগুলো জলে উঠছে আবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই একা একাই নিভে যাচ্ছে বাতি গুলো / রোবট গুলি সারাদিন নিরবে কাজ করে যাচ্ছে বাড়িঘর ক্লিন করছে ,সময় মত টেবিলে খাবার দিয়ে যাচ্ছে / খাবার শেষে টেবিল পরিষ্কার করে দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কখনোই তারা আমার সাথে কোন কথা বলেনা ; প্রশ্ন করলেও কোন উত্তর দেয় না / হঠাৎ আমার মনে হলো আচ্ছা এখানে কি আমি বন্দি ? কিন্তু কোন পাহারাদার তো নেই / লি এর কাছে জানতে হবে / বেশ অনেকদিন হয়ে গেল / লি এর কোন দেখা নেই / আমি সারাদিন ঘরের ভেতরে থাকি / মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়ে দূরে নীল পাহাড় গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি / হঠাৎ একদিন বিকেলে লি এসে হাজির / ঘরে ঢুকেই লি তার সবগুলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল , কেমন আছো তুমি ? আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম লি এর মুখের দিকে / লি কথা বলছে / নিজে ঠোঁট নেড়ে নেড়ে কথা বলছে এবং এবং আমি সেই কথা শুনতে পাচ্ছি / কিন্তু এটা কি করে সম্ভব ? লি এর তো আমার ভাষা জানার কথা নয় / তাহলে কিভাবে কথা বলছে সে ? আমি ঝট করে বিছানা ছেড়ে উঠে লি এর দিকে এগিয়ে গেলাম / লি এর হাতটা চেপে ধরে বললাম লি তুমি কথা বলতে পারো ? আমার হাতের আঙুলগুলো লি য়ের হাতের মাংসপেশী গুলো কে চেপে ধরে আছে / লি আমার হাতের দিকে অপলক দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রইল / লি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইল চোখের দৃষ্টি দুটো , হাত থেকে সরে গিয়ে আমার মুখের উপর স্থির হল / তারপর একটা হাসি দিয়ে বলল তুমি খুশি হয়েছো ? আমি তোমাদের ভাষা শিখে ফেলেছি / আমাদের সেন্ট্রাল কম্পিউটার সিস্টেম তোমাদের ভাষা কে খুব সহজভাবে শেখার পদ্ধতি বের করেছে এবং আমি প্রথম ব্যক্তি যে এই ভাষা শেখার সুযোগ পেয়েছি / ভালো লাগছে তোমার ? আমি হাসলাম / তারপর বললাম হ্যাঁ আমার খুব ভালো লাগছে , এখন তোমাকে আমার খুব আপন মনে হচ্ছে / লি তার চোখ দুটোতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন একে বলল তাই ? এবার আমার হাতটা দয়া করে ছাড়ো প্লিজ / আমি ব্যাথা পাচ্ছি তো / লি এর হাতটা ছেড়ে দিলাম আমি / হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললাম , যেদিন আমি তোমার হাতটা ধরলে তুমি আর ব্যথা পাবে না ধরে নেবে সেদিন ই তুমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়েছো / তোমাদের গবেষণার কার্যক্রম সফল হয়েছে / বলেই একটা রহস্যময় হাসি হাসলাম / লি কি বুঝলো আমি জানিনা বোকার মতো একটু হাসলো তারপর আবার বলতে শুরু করল আমি এই কয়েকদিন তোমার এখানে আসতে পারিনি কারণ প্রতিদিনই তোমার ভাষা শিখতে কয়েক ঘণ্টা করে সময় দিতে হতো আমার / দ্বিতীয়তঃ আমাদের তৈরিকৃত ওষুধের প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে আমার উপর / মোট তিনটা ডোজ নিতে হবে / এর মধ্যে দুটো কমপ্লিট হয়েছে / আরো সাত দিন পর আরেকটা নিতে হবে //
এই গ্রহটা সম্পূর্ণ একটা বাগানের মত / সবকিছু ই খুব সাজানো-গোছানো / কোথাও কোন ব্যতিক্রম নেই / আমি এমন একটা বাগানে ঘাসের উপর বসে আছি / চারিদিকে অনেক ফুল গাছ অনেক ফলের গাছ / ফুলগুলো থেকে এক ধরনের সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে / আমার সামনে বসে আছে / লি , এমনিতেই লি দেখতে অনেক সুন্দর কিন্তু আজকে কেমন যেন আরো সুন্দর লাগছে / আহ্লাদ আহ্লাদ করে কথা বলছে / অকারণেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে , আমার হাত দুটো নিয়ে খেলা করছে / একটা কথা বলব ? বললাম আমি ,আমার একটা কৌতুহল ছিল / লি আমার দিকে তাকিয়ে রইল / আমি বললাম আচ্ছা বলতো আমি কি এখানে বন্দি ? লি তার গভীর কালো চোখ দুটি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল /তারপর হেসে বলল , এখানে কাউকে বন্দী করে রাখা হয় না তবে প্রতিটি মানুষকে ই আমরা আলাদা আলাদাভাবে ট্র্যাক করতে পারি / আমাদের সেন্ট্রাল কম্পিউটার সিস্টেম ইচ্ছে করলেই প্রতিটি মানুষের গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারে / তবে আমরা কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে নজরদারি করতে পারিনা / আইনগত ভাবে নিষেধ আছে / একজন মানুষ ঘরের ভিতর থাকলে সে আমাদের কম্পিউটারের নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যায় / তখন তাকে আমরা ট্র্যাক করতে পারিনা / তোমার হাতে যে ডিভাইসটা লাগানো আছে / সেটাই তোমার এখানকার আইডেন্টিটি / আমি আমার যা বোঝার তা বুঝে নিলাম / আমি হেসে বললাম আর একটা প্রশ্ন করি ? লি হাসল , আমার চুলগুলো ওর হাত দিয়ে ধরে এলোমেলো করে দিল / তারপর বলল একটা না , একশটা প্রশ্ন তুমি আমাকে করতে পারো , কোন অসুবিধা নেই / তখন আমি লি এর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম , অনেকদিন আমি এখানে এসেছি / অনেকদিন ধরেই তুমি আমার সাথে আছো / তোমার সাথে আমার নানা বিষয়ে নিয়ে কথা হয় কিন্তু তুমি কখনো তোমার মা-বাবা বা তোমার ভাই বোন অথবা অন্য কোন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আমাকে কখনো কিছু বলোনি / তুমি কি তোমার নিজের ব্যক্তিজীবনের কথা কিছু আমাকে বলবে ? আমাকে কি একদিন তোমার বাসায় নিয়ে যাবে ? লি অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে আমার দিকে দিকে তাকিয়ে রইল , তারপর আস্তে আস্তে মাথা নিচু করে বলল , তোমাদের মত আমাদের পারিবারিক কোন বন্ধন নেই / আমার মা বাবা র সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই / এখানে একজন দম্পতির একটির বেশি সন্তান নেওয়ার পারমিশন নেই / এই একজন সন্তান নিতে হলেও একটি দম্পতিকে পূর্ব অনুমতি নিতে হয় / তাই আমার আর কোন ভাই বোন ও নেই / আর অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ? এসব আমাদের নেই / আমরা সাধারণভাবে আমাদের মা-বাবা পর্যন্ত ই চিনি / তারপরেও ছেলে মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পর সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট এর নিয়ম অনুযায়ী তাদের আর বাবা-মা এর সঙ্গে থাকার কোন পারমিশন নেই / খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে আমাদের তেমন কোনো পারিবারিক বন্ধন নেই আমরা সবাই একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব / সেন্ট্রাল গভমেন্ট আমাদের মালিক , মা বাবা নয় / মা-বাবা 18 বৎসর বয়স পর্যন্ত তাদের সন্তানদের দেখাশোনা করার অধিকার রাখে / তারপরেই একজন সন্তান সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ / তার সমস্ত কাজকর্ম শুধুমাত্র রাষ্ট্রকে ঘিরেই / সেখানে তার আর কোন দায়িত্ব নেই / আমি একটা ডরমেটরি তে থাকি সেখানে আমার সাথে আরো অনেক ছেলে মেয়েই থাকে / আমি খুব , খুব আশ্চর্য হলাম , বললাম দাঁড়াও দাঁড়াও আমাকে তোমার কথাটা বুঝতে দাও / তুমি বলছো তোমাদের পারিবারিক তন্ত্র বলতে কিছু নেই এবং এটা তোমাদের নিয়ম / তাহলে আবেগ ভালোবাসা এসব কেন চাইছ ? পারিবারিক বন্ধন ছাড়া আবেগ ভালোবাসা এসব কোথায় তুমি পাবে ? তোমাদের এই প্রোজেক্টের গোড়াতেই তো গলদ / শোনো ভালোবাসার সৃষ্টি একটা পরিবারের ভিতরে / মানুষের মনের ভিতরে / শরীরের কোন অর্গান এটা সৃষ্টি করতে পারে না / তুমি কি বলতে পারবে মন জিনিসটা কি ? এর অস্তিত্ব কোথায় ? মানুষের মনে র বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই / মনকে তুমি কখনো ছুঁতে পারবে না কিন্তু আবেগ দিয়ে অনুভব করতে পারবে / এবং জেনে রাখ এই মনের ভিতরে ই ভালোবাসার বসবাস / যদি সত্যিকার অর্থেই আমাদের মত মানুষ হতে চাও তবে তোমাদের এই অংকের নিয়ম ভেঙে ফেলতে হবে / খুদা দারিদ্র অভাব অনটন এরা সবাই ভালোবাসার সাথে হাত ধরাধরি করে চলে / আমি খুদার অনুভূতি বুঝতে পারি বলেই আরেকজন ক্ষুধার্তকে দেখলে আমার মধ্যে ভালোবাসার অনুভূতি জন্মায় / নিজের ক্ষুধার কথা ভুলে গিয়ে তার ক্ষুধা মেটাতে পেরে মনটা খুশি হয়ে ওঠে . এটাই ভালোবাসা / তোমাদের এখানে ক্ষুধা নেই দারিদ্রতা নেই , নেই কোনো অনিয়ম / তাই তোমাদের মাঝে ভালোবাসার ও অস্তিত্ব নেই / লি ভেজা দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে আমার ডান হাতটা তার হাতের মধ্যে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো / মাথাটা নিচু করে বসে রইল / আমি বুঝতে পারলাম না লি কাঁদছে কিনা / কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম যে লিয়ের শরীরটা খুব অল্প অল্প কাঁপছে / আমি অবাক হয়ে লিয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম / লি এর দুচোখ বেয়ে ফোটা ফোটা জল গড়িয়ে পড়ছে / আমি মনে মনে ভাবলাম আমি কি ভুল দেখছি ? লি কাঁদছে ? (চলবে)
#Shahadat Hossain2 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
M A Kuddus Hossen
@makuddushossen
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
@mohammad-shahzaman



অভিনন্দন।