-
*আতপ চালের পিঠা 🏵️
আর দশটা দিনের মতো ইদ্রিস মিয়া রুমের সামনে রাখা বেঞ্চিতে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছেন। মুখে ধবধবে দাড়িগুলো অগোছালো হয়ে রয়েছে ; পরনের গেঞ্জিটা সাদা থেকে বেশ খানিকটা হলুদ হয়ে পড়েছে- কেউ হুট করে দেখলে হলুদ গেঞ্জি বলেই মনে করবে। মাথার চুল পড়ে টাক পড়ে গেছে- সেই রক্ষে! নয়তো এলোমেলো অযত্নের চুলগুলো হয়তো আরো বিভৎস দেখাতো।
বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় ইদ্রিস মিয়া প্রতিদিন নিয়ম করে বসে থাকেন- ঘন্টার পর ঘন্টা। সামনে কিছু দূর পরেই একটা ছোট্ট গেইট, গেইটের ওপাশ দিয়ে একটা ছোট্ট রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি যায়। ইদ্রিস মিয়া এতদূর অব্দি চোখ যায় না, ঝাপসা ঝাপসা দেখেন, তবুও নিজের স্থবির পৃথিবীতে একটু নড়াচড়া দেখতেই যেন ভীষণ ভালো লাগে। নিজের খয়েরী ফ্রেমের চশমাটা অবশ্য ভেঙেছে বছরখানেক হয়ে যাচ্ছে, নতুন চশমা কেনাটা এখন একরকম বিলাসিতা বটে!
বৃদ্ধাশ্রমের ছোট্ট গেইটটা মাড়িয়ে খুব একটা মানুষ আসে না। ইদ্রিস মিয়া মাঝে মাঝে দোয়া করেন দিনে অন্তত একজন মানুষ আসুক, অপরিচিত মানুষ- অন্তত নাম-টাম জিজ্ঞেস করা যায়, তাতেও একটু কিনা সময় কাটে!
ইদ্রিস মিয়ার অবশ্য সেদিনকার সকাল ভালো ছিল, গটগট করে এক যুবক আসে বৃদ্ধাশ্রমে। এসেই ম্যানেজারের খোঁজ করে। বৃদ্ধাশ্রমের রান্নার বাজার করতে ম্যানেজার বাজারে গেছেন- আসতে দেরি হবে- দারোয়ান সামনের বেঞ্চিতে বসতে বলে।
যুবক ইদ্রিস মিয়ার পাশে প্রথমেই বসে না। খানিক চারদিক পায়চারী করে। রুমগুলো দেখে আসে।স্যাঁতস্যাতে গন্ধে নাক চাপা দেয়। তারপর কিছু পরে ফোনে কার সাথে কথা বলে,” রুমা, খারাপ দেখছি নে, এখানেই এডমিট করে দেবো-”যুবকের দেখাশোনা চলে আরো খানিকক্ষণ। তারপর অপ্রস্তুতভাবে ইদ্রিস মিয়ার পাশে এসে বসে।
ইদ্রিস মিয়া ধারণা করেন, এ যুবক তার কথার জবাব দিবে না, তারপরো তিনি প্রশ্ন করেন, “কাউকে ভর্তি করাতে এসেছো, দাদু?”যুবক জবাব দিল, তবে ছোট্ট করে, “জ্বি!”
-মা না বাবাকে?
-জ্বি, মা-কে! ভর্তি করাতে এসেছি, কিভাবে বুঝলেন?ইদ্রিস মিয়া হাসেন, “বৃদ্ধাশ্রমে যুবকদের মূলত দুই ধরনের কাজে এখানে আসতে দেখা যায়। এক হলো ভর্তি করাতে, দুই খাবার দাবার বা অনুদান দিতে- তবে দুজনার চেহারা দেখলেই টের পাওয়া যায় কে কোন কাজে এসেছে। অনুদান দেওয়া যুবকরা কড়া গলায় কথা বলে, স্বেচ্ছায় কথা বলে যায়- ভর্তি করানো যুবকরা চোরের মতো আসে, কোনমতে এখান থেকে সরলে বাঁচি-এরকম মনোভাব থাকে।”
ইদ্রিস মিয়া কাশেন। তারপর ফের বলেন, “আরো একধরনের যুবক থাকে, যারা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাওয়া মা-বাবাদের সাক্ষাতের জন্য আসেন- তবে ও অমবস্যার চাঁদের মতোই, বছরে একবার যদি দেখা যায়, তবেই মনে হয় সার্থক!”যুবক বুঝতে পারে সে কোন দলে পড়ছে। বিরক্ত হয়, ইদ্রিস মিয়ার কথার পিঠে কথা বলে না। দারোয়ানকে ধমকে বলে, ” কি ব্যাপার, এখনো ম্যানেজার আসে না কেন?”
ইদ্রিস মিয়া চুপ করে যান, কথা বলেন না অনেকক্ষণ। পরের কথাটা পাড়ে যুবক নিজেই।
“প্রত্যেকের জীবনে ঘটনা থাকে চাচা। এমনিতে কেউ কি আর সাধে মা কিংবা বাবাদের এখানে রেখে যায়? এই আমারেই দেখেন, বউ সহ্য করতে পারে না আম্মারে, সারাদিন ঝগড়া থাকে, এখন কি করব? ফেলে তো দিচ্ছি না, বৃদ্ধাশ্রমে খাইয়ে পড়িয়ে রাখবো-”
ইদ্রিস মিয়া হাসেন। সরাসরি কিছু বলতে যান না। রাস্তার দিকে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটাসময় বলেন, ” বুড়ো হওয়াটা আশীর্বাদ, বুঝলে দাদু? আমরা মনে করি অনেকে, বুড়ো হলে পৃথিবী বুঝি বর্ণহীন হয়ে যায়, সেটা ঠিক নয়। তুমি যখন বুড়ো হবে, এই পৃথিবীর বেশিরভাগ ঘটনার আগাম ফলাফল তুমি বলে দিতে পারবে। অতীত জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে তুমি কি করে এসেছো, কি করা তোমার উচিত ছিল- সবকিছু কি জানো তো কাঁচের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।”
ইদ্রিস মিয়া বলতে থাকেন, ” আমি গটগট করে ইংরেজি বলতে পারতাম তোমাদের সময়ে। বাবা বড় আয়েশে আদরে বড় করেছিলেন আমাকে। মানুষের নানারকম শখ থাকে। আমার বাবার একমাত্র শখ ছিল, তিনি তাঁর ছেলেকে অনেক বড় করবেন।
বাবার শখ পূরণ হয়েছিল, সেই সময়ে এত পড়াশোনা পাঁচ গাঁয়ের মানুষ কেউ করেনি। পড়াশোনা শেষ করলাম, বিদেশে পাড়ি জমালাম। এসে শহরে বাড়ি করলাম। মা-বাবা গাঁয়েই থাকলেন। কখনো কোন প্রয়োজনে যেতাম, একটা সময়ে প্রয়োজনেও যেতাম না। বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, আমি বলি এদিকে অনেক ব্যস্ত। অথচ কক্সবাজারে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে যাই। ভালোই লাগতো না তখন সেইসব স্থবির মানুষগুলোকে দেখতে।
মা মারা গেলেন, কাজের অজুহাতে বড় ভাইয়ের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলাম।মনে আছে সেই দিনের কথা, ফোনে খবর পেলাম আব্বা মারা গেছেন। অফিসে ছিলাম, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, তারপর আবার কাজে লেগে পড়লাম- যেন কিছুই হয়নি। বরং প্রকৃতিতে যা হবার ছিল, তাই হয়েছে!”
ইদ্রিস মিয়া মলিনভাবে হাসেন। তারপর বলেন, ” সেই ঘটনার মাত্র পনেরোটি বছর পরে আমার ছেলেরা বিদেশ চলে যায়, স্ত্রী মারা যায়; ছেলেরা এই বৃদ্ধাশ্রমে আমায় ভর্তি করিয়ে যায়!
এখন আমার পৃথিবীটা স্থবির, একটু কথা বলবার তৃষ্ণায় বুকটা ফেটে কাঠ হয়ে যায়। এখন বুঝি কি করেছি, কি করা দরকার ছিল- বুড়ো সময়টা তাই এত সুন্দর, এত নির্মম সুন্দর।”
যুবক কথা বলে না। বৃদ্ধাশ্রমের মেঝের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ইদ্রিস মিয়া যুবকের কাঁধে হাত রাখেন। হেসে বলেন, “লুঙ্গি পড়বার অভ্যাস আছে? না করলে করে ফেল! আজ থেকে পনেরো-বিশ বছর পরে এভাবেই যে হলদে গেঞ্জি আর ছেঁড়া লুঙ্গি পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হবে গেটের সামনে। তখন তোমার জীবনে কোন অভিমান থাকবে না, যা থাকবে – তা শুধুই অনুশোচনা; কেবলই অনুশোচনা!”
যুবক আরো কিছুসময় বসে থাকে। তারপর কিছু একটা বলতে যায় ইদ্রিস মিয়াকে, বলতে পারে না। দারোয়ানের দিকে একবার তাকিয়ে কি মনে করে উঠে যায়, ছোট্ট গেইটটা ডিঙিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথ ধরে।
যুবক চলে গেলে দারোয়ান ম্যানেজারের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ে। ম্যানেজার প্রৌঢ় খালেদ সাহেব বেরিয়ে আসেন। লম্বা দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ইদ্রিস মিয়ার পাশে বসেন। খালেদ সাহেব আর ইদ্রিস মিয়া এই ঘটনা গত পাঁচ বছর ধরে করে যাচ্ছেন। নতুন কোন যুবক আসলেই, খালেদ সাহেব অফিস রুমের ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে রেখে দেন। ইদ্রিস মিয়া তখন সামনের বেঞ্চিতে বসে থাকেন। যুবকেরা উশখুশ করে, ম্যানেজারকে না পেয়ে বেঞ্চিতে বসে ইদ্রিস মিয়ার সাথে কথা বলে। ইদ্রিস মিয়া তার জীবনের কথা বলেন, বলেন যুবক বয়সে কি ভুল করেছেন তিনি- যুবকরা শুনে যায়। সবাই ফেরত যায়, কেউ পরদিন আবার আসে, খালেদ সাহেব তখন তাদের ভর্তি করিয়ে দেন।কেউবা ইদ্রিস মিয়ার জীবনে নিজেকে খুঁজে পায়, হলদে গেঞ্জি আর ছেড়া লুঙ্গিতে বিভৎস ইদ্রিস মিয়া যেন সেই যুবকেরই প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠেন, যুবকরা আর আসে না….
খালেদ সাহেব জিজ্ঞেস করেন, ” ইদ্রিস ভাই, কি মনে করেন, এই ছেলেটা আবার আসবে ?”
ইদ্রিস মিয়া হাসেন, ‘ হয়তো আসবে, নিজের স্ত্রীকে ভালোবেসে মা-কে রেখে যাবে। হয়তো আসবে না, এখন পথ চলতে চলতে মুদি দোকানের পাশে হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে দোকানে সারি সারি চালের বস্তার দিকে। মাকে ফোন দিয়ে বলবে, “মা, তোমার হাতের আতপ চালের পিঠে খাইনা অনেকদিন! আজকে আনি? চালের গুঁড়ি করে ভাপা পিঠে করবে, নারকেলও না হয় এক-দুটো আনলাম,করবে তো মা?”
ফোনের ওপাশের যুবকের মা হয়তো খুশিতে গদগদ হয়ে যাবেন, কিছুসময় কথা বলতে পারবেন না, তারপর একে একে বলতে থাকবেন কি কি লাগবে কি কি লাগবে না – এরকমও তো হতেই পারে, তাই না?”বৃদ্ধাশ্রমের অন্ধকার বারান্দায় বসে ইদ্রিস মিয়া আর তার আতপ চালের পিঠের গল্প শুনে মলিনভাবে হাসেন ম্যানেজার খালেদ সাহেব…
2 Comments
Friends
পৌষী পাল
@poushee-paul
Farhana Hossain
@farhana-hossain
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot



ধন্যবাদ গল্পটার জন্য । শুধুমাত্র যুবক না আমাদেরও অনেক কিছু শিখার আছে ।