Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    • 3 years, 11 months ago

    পোড়োবাড়ির_রহস্য
    পর্ব_আটাশ
    হোটেলটায় মোট ছয়টা তলা আছে। নীচতলাটা সম্পূর্ণ জুড়ে গ্যারেজ হিশাবে রাখা হয়েছে। দোতলা তিনতলা রেস্তরাঁ। চারতলা থেকে ছয় তলা পর্যন্ত আবাসিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উপরের ঘরগুলোতে যাওয়ার জন্য তালহার মন আনাচান করছে। কিন্তু কীভাবে এতগুলো মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে উপরে যাবে।
    এখানে আর এক মুহূর্ত থাকতে ইচ্ছা করছেনা। মিউজিকের শব্দের কারণে একজন অন্যজনের কথা ঠিকমত শুনতে পারছেনা। একজন যুবক এসে তালহাকে কিছু খাবারের নাম বলে সেগুলো তিনতলার সভাকক্ষে নিয়ে যেতে বলল। তালহা এমনই একটা সুযোগ খুঁজছিলো। তালহা খাবারগুলো নিয়ে তিনতলায় চলে গেলো। সভাকক্ষের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে খাবারাটা রাখার সময় আড় চোখে রুমের মানুষগুলোকে দেখে নিলো। কাউকেই পরিচিত মনে হলোনা। খাবারের ট্রেটা একটা টি টেবিলের উপর রেখে সবার পাশে নাস্তা আর চায়ের কাপ রাখতে রাখতেই ওদের আলোচনা শুনতে থাকলো তালহা। মিটিং বাংলায় হচ্ছিলো, তালহাকে দেখে ইংরেজিতে কথোপকথন শুরু করে দিলো। কিন্তু তালহার ওদের কথা বুঝতে একদমই অসুবিধা হলোনা। নাস্তা পরিবেশন শেষে রুমটা থেকে বের হয়ে আসলো। ওদের আলোচনা পুরাটাই ছিলো ব্যবসা সংক্রান্ত। এই হোটেলের মালিকের একটা পোশাক ইন্ডাস্ট্রি আছে। মুলত নুরজাহান ফ্যাশন ডিজাইন কোম্পানি থেকে এখানখার সব পোশাকের ডিজাইন নির্বাচন করা। এ বছরের প্রায় একশটা নতুন ডিজাইন ইউরোপের দেশগুলোতে পাঠায় তারা। অন্যান্য আরও দশটা ডিজাইন কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হয়েছে। সেই সুবাদে আজ পার্টির ব্যবস্থা করা হয়ছে। পাঁচটা দেশের পাঁচজন প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছে। এক সপ্তাহ বাংলাদেশে থাকবে তারা। তাইতো তাদের বিনোদনের জন্য নারীর ব্যবস্থা করেছে তারা। পুজিবাদি বিশ্ব নারীকে একরকম পণ্য হিশাবেই দেখে। আরও কিছুক্ষণ সভাকক্ষে থাকার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু কাজ শেষে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা শোভনীয় হবেনা। একটা ব্যাপার এখনও তালহার মাথায় কিছুতেই ঢুকছেনা যে এখানে যদি মেয়েটাকে আনা হয় তাহলে লিটন আর আজাদ সাহেবই বা কোথায়? তালহা সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে খুব সাবধানে চার তলায় চলে গেলো। সবগুলো ঘরের দরজা বন্ধ। তালহা করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো এবং প্রতিটি দরজায় কান পেতে ভেতরের কেউ আছে কিনা বা থাকলেও কোন আওয়াজ পাওয়া যায় কিনা শোনার চেষ্টা করলো। বেশিরভাগ ঘরের ভেতরের শুনশান নীরবতা ধরা দিলেও একটা ঘরের দরজায় কান পেতে চমকে উঠলো তালহা। একটা মেয়ের কান্নার শব্দ সাথে ধস্তাধস্তির শব্দ কানে এসে বিঁধল তালহার। আর একটু ভালো করে কান পাতলো তালহা। একটা নারী কন্ঠ কানে আসলো। তালহা নিচে গিয়ে একটা ট্রেতে করে কিছু বাদাম, ওয়াইন এবং স্নাক্স জাতীয় খাবার নিয়ে আসলো। ঐ ঘরের কাছে এসে দরজা নক করতে লাগলো। বেশ কয়েকবার শব্দ করে ধাক্কানোর পরে এখন মাঝ বয়সী লোক এসে দরজাটা খুলে দিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিদেশী। তালহা ইংরেজিতে তাকে খাবারটা নিতে বললো। লোকটা খাবারটা নিয়ে ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে গেলে তালহা বাঁধা দিয়ে বলল সে রুমের বিছানার চাদরটা বদলে দিতে চায়। লোকটা তাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানালো। কাজ করতে করতে লোকটার সাথে আলাপ জুড়ে দিলো তালহা। ঘরে ঢুকেই সে অরিনকে দেখতে পায়। একটা খোলামেলা নাইটি পরে কাঁচুমাচু হয়ে সোফার উপর বসে আছে। তালহা খুব বিব্রত বোধ করলো। মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও এসব পোশাকে অভ্যস্ত না। তালহা আসার সময় খুব সাবধানে ওর হাতে একটা কাগজ গুজে দিয়ে বেরিয়ে আসলো। কথা বলে লোকটার নাম জানতে পারে তালহা। হেনরি, হলান্ডের বাসিন্দা। বাকি রুমগুলোর দিকে আর গেলোনা তালহা। অরিনকে বের করে নিয়ে যাওয়াই ওর মূল উদ্দেশ্য। তালহা অরিনের দিকে আর একবার তাকিয়ে ওকে আশ্বস্ত করে সেখান থেকে বের হয়ে নিচে নেমে গেলো। নিচে এখন আগের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে মনে হলো। ফুল ভলিউমে ইংরেজি গান চলছে তার সাথে নাচতো আছেই। গানের তালে তালে নাচতে নাচতে সবাই বেহুঁশ হয়ে দামী মখমলের কার্পেটের উপর এবড়ো থেবড়োভাবে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকার শব্দ ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো। তালহা যায়িদ এবং মুসায়েবকে এদিকটায় খেয়াল রাখতে বলে আবার উপরে চলে গেলো। আসা সময় একটা বোরকা সাথে করে নিয়ে এসেছিলো যাতে করে অরিনকে খুব সহজেই বের করে নেয়া যায়। তালহা অরিন যে রুমটায় ছিলো সেখানে মৃদু টোকা দিতে থাকলো। বেশ কিছু সময় পেরিয়ে যাওয়ার অরিন দরজা খুলে বের হতে গেলে তালহা ওর হাতে বোরকার ব্যাগটা ধরিয়ে দিলো। অরিন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে বলল, এর ভেতর একটা বোরকা আছে পরে তারপর বের হন। অরিন মাথা কাত করে সাঁয় দিয়ে ভেতরে চলে গেলো। মিনিট পাচেক পরে বোরকা, হিজাব নিকাব পরে বেরিয়ে আসলো। তালহা ওকে নিয়ে নেমে আসলো। নিচের হল রুমটায় পা রাখার জায়গা নেয়। একজন অন্যজনের গায়ের উপর পড়ে আছে। নাক ডাকার বিদঘুটে আওয়াজ আর গরম নিঃশ্বাসে বেহাল অবস্থা হলঘরটার। ওরা ছাড়া বাকি যে চারজন ওয়েটার ছিলো তাদেরকে হাত পা বেঁধে রান্নাঘরে ফেলে রাখা হয়েছে। কাজটা মুসায়েব এবং যায়িদ করেছে। সব বাতি বন্ধ করে হলঘরটাকে অন্ধকার করে ফেললো তালহা। যাতে করে ওদের বের হয়ে যাওয়া কারোর নজরে না পড়ে। যদিও সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবুও সতর্ক থাকা ভালো। বের হতে গিয়ে গেটের দারোয়ানকে কোনরকম প্রশ্ন করতে না দিয়ে দ্রুত অরিনকে নিয়ে রাস্তার অন্যপাশে দাঁড়ানো গাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো।
    অরিনকে ওর বাসায় পৌঁছে দিয়ে খুব সাবধানে থাকতে বলল তালহা।
    আমরা এখন কোথায় যাবো?
    যায়িদের কথায় উত্তরে তালহা এখন মাদ্রাসাগুলোতে গিয়ে আরাফের খোঁজ করবো। আমার ধারণা আরাফের খোঁজ পেলে আনিসের খোঁজও পাওয়া যাবে।
    এখন কয়টা বাজে সে খেয়াল আছে? নিজের হাত ঘড়িটা তালহার সামনে মেলে ধরে কথাটা বলল যায়িদ।
    ভোর চারটা। খেয়াল থাকবেনা কেন?
    এসময় তোর জন্য কে জেগে বসে থাকবে?
    আমাদের যাপিত জীবনের সাথে মাদ্রাসার যাপিত জীবন যাপনের মধ্য বিস্তর ফারাক আছে। এসময় বাচ্চার উঠে তাহাজ্জুত পড়ে কোরআন পড়তে বসে। পোড়োবাড়ির কাছের বড় বড় মাদ্রাসাগুলোতে খোঁজ করেও কোথাও আরাফ বা আনিসের সন্ধান পেলোনা তালহারা। সকাল দশটা পর্যন্ত এক নাগাড়ে ছোট বড় মিলে দশটা মাদ্রাসা এবং এতীমখানায় তল্লাশি চালিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো তালহা।
    মাদ্রাসাগুলোতে ওদেরকে পাওয়া গেলোনা। এখন কোথায় খুঁজবি?
    যায়িদের প্রশ্ন শুনে মুসায়েব বলল, কীসের খোঁজাখুঁজি? আমার পক্ষে আর ঘোরাঘুরি করা সম্ভব না। এখন আগে খাওয়া দাওয়া করবো, তারপর অন্যকিছু নিয়ে ভাববো।
    মুসায়েবের কথার সাথে তাল মিলিয়ে তালহা বলল, আজকে এই মূহুর্তে আর কোথাও যাবোনা। এখন বাসায় ফিরে যাবো। কাল আনিসের নানুবাড়ি কালিগঞ্জ যাবো।
    সেখানে আমাদের কি দরকার?
    আমার ধারনা সেখানে গেলে আমি আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পারো। তাছাড়া আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আরাফ এবং আনিস দুজন ওখানেই আছে। তবে তার আগে ওখানকার ঠিকানা যোগাড় করতে হবে। কাজটা আমি আজকেই করবো। তোদের ইচ্ছা হলে আমার সাথে যোগ দিতে পারি অথবা বিশ্রাম নিতে পারিস।
    যায়িদের এখন আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই। তালহার শেষের বাক্যটাকে পাত্তা না দিয়ে ওর সন্দেহের কারণ জানতে চেয়ে বলল, তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ কি?
    শুধু এটা নয়, আমার আরও অনেক কিছু মনে হয়।
    কি মনে হয়?
    আমার এসব কাজের মূলে এমন একজনকে সন্দেহ হয় যার কথা তোরা ভাবতেও পারবিনা।
    কে সে? যায়িদ উৎসুক দোখে তালহার দিকে তাকালো।
    এখন কিছু বলবোনা কারণ আমি আন্দাজ করেছি। তবে আন্দাজ করলেও আমার বিশ্বাস আমি ভুল ভাবিনি। চল এখন নানুবাড়ি চলে যাই। আমি আর একটু গবেষণা করে নেই তারপর সব জানতে পারবি।
    মুসায়েব এখন তালহার নানুবাড়ি যেতে চায়না। ওখানে গেলে এখন সকালের নাস্তা পাওয়া যাবে। কিন্তু ওর এখন মানে এখুনি খুব ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। তালহাকে ওর ইচ্ছার কথা জানালো।
    তালহা বলল, তাহলে চল কোন রেস্তোরাঁ থেকে খেয়ে তারপর যাই। ছোট মামা আমার বিকাশে টাকা পাঠিয়েছে। খাওয়া দাওয়া করতে এখন অসুবিধা হবেনা।
    খাওয়া দাওয়ার আলাপ একদমই ভালো লাগছেনা যায়িদের। ওর মাথায় এখন তালহার বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। তালহাকে সেই ব্যাপারে আবারও কিছু জিজ্ঞাসা করতে গেলে ওকে থামিয়ে দিয়ে তালহা বলল, এ বিষয়ে পরে কথা হবে। এখন বরং চল আমরা একটা ভালো রেস্তোরাঁ দেখে সেখানে গিয়ে আগে ক্ষুধা নিবারণ করি। এখনই না খাওয়ার ব্যবস্থা করলে মুসায়েবের মার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কথা বলেই মুসায়েবের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলো।
    মুসায়েব কপট রাগ নিয়ে তালহার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।
    তালহা ঠোঁটের কোণায় হাসি ঝুলিয়ে রেখে মনে মনে ভাবে মুসায়েবের এই স্বভাবটা ওর বেশ লাগে। একটা রেস্তোরাঁ গিয়ে পেট পুড়ে খেয়ে নিলো ওরা। রেস্তোরাঁর খাবারটা ভালোই ছিলো। তবে সেখানে নানারকম ছোট মাছ আর ভত্তা ছাড়া কোনরকম গোস্ত বা বড় পাওয়া গেলোনা। এটাই নাকি এই রেস্তোরাঁর বৈশিষ্ট্য। তালহা এ ধরণের খাবার খেলেও যায়িদ আর মুসায়েবের এগুলো মুখে রোচেনা। তারপরও নানারকম ভত্তা আর ছোট মাছ দিয়ে গোগ্রাসে উদর পূর্তি করলো তিনজনে। আসলে ক্ষুধা লাগলে তখন সব খাবারই অমৃত লাগে।
    খাওয়াটা মনে হচ্ছে বেশি হয়ে গেছে। এখন বাসায় গিয়ে একটা ঘুম দিতে হবে।
    মুসায়েবের সাথে তাল মিলিয়ে যায়িদও একই কথা বললো।
    গাড়ি বাড়ির গেটে পৌঁছানোর সাথেই কালক্ষেপণ না করে মুসায়েব দৌড়ে দোতলায় উঠে গেলো। ঘুম কাতুরে মুসায়েবের এমন আচরণের সাথে বেশ পরিচিত তালহা আর যায়িদ। ঘুম এবং ক্ষুধা এই দুইটার সাথে কোন আপোশ করতে চায়না ছেলেটা। এখন টানা দুই তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠার পর স্বাভাবিক হবে ও। যায়িদও উপরে চলে গেলো। তালহা ড্রাইভারের সাথে ওর পরবর্তী কাজ সম্পর্কে আলোচনা করে দুই ঘণ্টার জন্য ছুটি দিয়ে দিলো। ওরও এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। গতকাল রাতে কিছুক্ষণ ঘুমালেও বেশিরভাগ সময়ই নির্ঘুম কেটেছে তালহার। বাসায় ঢুকে একটা শাওয়ার নিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমানোর জন্য দুই বন্ধুর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

    চলবে

    5
    2 Comments
Skip to toolbar