-
টুইন আর্থ
সপ্তম পর্বআমি খাওয়ার টেবিলে বসে লিন্ডা কে আমার আমেরিকা তে ফিরে যাওয়ার কথা জানালাম / প্রথমে লিন্ডা রাজি হতে চাইল না / সে বারবার যুক্তি দেখাতে চাইল যে সে ছাড়া আমার আপনজন তো আর কেউ নেই তবে কেন আমি আমেরিকায় ফিরে যাব ? লিন্ডা বলতে থাকলো তোমার জীবনের উপরে অনেক ঝড় বয়ে গেছে / এবার একটু স্থির হও / একটু রেস্ট নও / এখানে তোমাকে আমি সুন্দরী একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করিয়ে দেব / মন দিয়ে আনন্দ চিত্তে সংসার করো / আমি হাহা করে হেসে উঠলাম / বললাম আমাকে আবার কে বিয়ে করবে ? লিন্ডা হাসল / বড় বাবা তুমি তো জানোই না / মেয়েদের কাছে তুমি তো একজন হিরো / আমার কয়েকজন বান্ধবী তো যখন জেনেছে তুমি আমার বড় বাবা তখন তো তারা দারুণ খুশি / তারা বলে রেখেছে যদি তোমার বড় বাবা বিয়ে করতে চায় তবে যেন তাদের কথা আমি ভুলে না যাই / আমি লিন্ডার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম / তার চোখেমুখে যেন একটা আনন্দের ঝিলিক উপচে পড়ছে / তার এই আনন্দটা আমার নষ্ট করতে ইচ্ছা করল না / তাই মুখে তাকে বললাম ঠিক আছে আমি আমার কাজগুলো শেষ করি তারপর আমার মা এর কাছে এসে থাকবো / আমার মা যা বলবে আমি তাই শুনবো / তবে এখন আমি আমেরিকায় ফিরে যাব / কারণ নাসার মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা টা ওদের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন / শুধুমাত্র এ কারণেই এখন আমার আমেরিকায় ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী / লিন্ডা মুখে আর কিছু বলল না চুপ করে মাথাটা নীচু করে মন খারাপ করে বসে রইল /
এয়ারবাস A380 যখন ওয়াশিংটন ডিসি এর আকাশে পৌঁছলো তখন এয়ার হোস্টেস ঘোষণা দিলেন যে আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যান্ড করতে যাচ্ছি / আমি একটু রিলাক্স বোধ করলাম / এত লম্বা জার্নি আমার মোটেও ভালো লাগেনা / আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এসে নাসার একজন অফিসার কে আমার নাম সম্বলিত একটি প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম // আমি সোজা তার সাথে নাসার হেড অফিস এ চলে এলাম / অফিসের ভেতরে ঢুকতেই রিসিপশনের মেয়েটি আমাকে একটা ভিআইপি গেস্টরুমে নিয়ে গেল / মুখে বলল স্যার আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে / স্যার একটা বিশেষ মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন / মিটিংটা শেষ হলেই আপনি ভেতরে যাবেন / স্যার আপনাকে কি এক কাপ কফি দিতে বলব ? আমাদের এখানে বিখ্যাত Turkish Coffee আছে / আপনার ভালো লাগবে / আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম /
আমি মহাপরিচালক সাহেবের রুমে ঢুকলাম , বিশাল রুম / রুমের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় বেশ বড়োসড়ো একটা সেক্রেটারিয়াট টেবিল , টেবিলের উপরের ফুলদানিতে কিছু টকটকে লাল তাজা গোলাপ / পাশে একটা ল্যাপটপ / টেবিলের আরেক কোনায় বিভিন্ন রংয়ের চারটে টেলিফোন / নিপুন ভাবে গোছানো সমস্ত রুম টি / পিন পতন নিস্তব্ধতা / একমাত্র এসি টার মৃদু একটা গুঞ্জন / আমি আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম / হালকা-পাতলা গড়নের বুদ্ধিদীপ্ত সুদর্শন একজন মানুষকে চেয়ারে বসে আছেন / আমাকে দেখে তিনি আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং আমাকে অঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বসতে বললেন / এরপর মুখে একটা হাসি নিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন , কেমন আছেন আপনি ? আমি মলিন কণ্ঠে বললাম বুঝতেই তো পারছেন কিরকম থাকতে পারি আমি / আমার পরিচিত প্রিয় মুখগুলো কেউ আর এখানে নেই / সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে / মহাপরিচালক সাহেব তার ল্যাপটপের ভেতর কি যেন খুঁজলেন তারপর আমাকে বললেন / পৃথিবীর সময় অনুযায়ী আপনার বয়স এখন 190 বৎসর / যা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার / সাধারণভাবে পৃথিবীতে একজন মানুষের সর্বোচ্চ বেঁচে থাকার রেকর্ড আছে 120-130 বছর / আপনার জীবনে এমন একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে যা কখনো কারো জীবনে ঘটে না / সুতরাং এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি টাকে মেনে নিয়ে বর্তমানের সঙ্গে মিশে যেতে চেষ্টা করুন / এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার কাছে আমার একটা প্রস্তাব আছে / বলেই তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন / কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন , তারপর আবার বলতে শুরু করলেন , আমরা নাসার পক্ষ থেকে নতুন একটা প্রজেক্ট ওপেন করতে যাচ্ছি / পৃথিবী থেকে আমরা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাকাশযান মহাশূন্যে প্রেরণ করতে যাচ্ছি / যার কাজ হবে মহাশূন্যে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করা / আমাদের সৌরজগতের নিকটতম যে সৌরজগৎ টি আছে তার নাম Proxima Centauri / পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব 4.24 আলোকবর্ষ / এই সৌরজগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণা অস্পষ্ট / খুব ভালো ধারনা নেই আমাদের / কিন্তু বেশ কিছু বিজ্ঞানীর মতে এই সৌরজগতের মধ্যে যে সমস্ত গ্রহ আছে তাদের কোন কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার অনুকূল পরিবেশ রয়েছে / তাই এই সৌরজগত সম্পর্কে ডিটেলস তথ্য আমাদের দরকার / আমরা একটা মহাকাশযান সেখানে পাঠাবো বলে মনস্থির করেছি / বেশকিছু উন্নত প্রযুক্তির কিছু রোবট এবং কয়েকজন মানুষের সমন্বয় একটি টিম এর সহযোগিতায় এইসব গবেষণামূলক কাজগুলি পরিচালিত হবে / এই মহাকাশযানের মধ্যে তিনটি ছোট ছোট লেন্ডার থাকবে যার সাহায্যে আপনারা যে কোন গ্রহের অরবিট থেকে ওই লেন্ডার এর মাধ্যমে আপনারা যেকোনো গ্রহে নামতে পারবেন / এবং ওই গ্রহের কাজ শেষ করে আবার মহাকাশযানে ফিরে আসতে পারবেন / আমি আপনাকে এই মহাশূন্যযান টির দায়িত্ব ভার নিতে অনুরোধ করছি / যেহেতু আপনার কোন পিছুটান নেই তাই দায়িত্ব নিয়ে মানবজাতির উন্নয়নকল্পে নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারেন / আমি কথাগুলো শুনে একটা ধাঁধা র মধ্যে পড়ে গেলাম / বুঝতে পারলাম না আমি কি জবাব দিব ? আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত / শুধু মুখে বললাম আপনি আমাকে ভাবার জন্য কিছুদিন সময় দিন / মহাপরিচালক সাহেব বললেন নিশ্চয়ই আপনি কিছুদিনের সময় পাবেন / তবে সেটা খুব বেশি দিন নয় এই ধরুন আপনাকে এক মাসের সময় দেয়া হলো এর মধ্যেই আপনি আপনার ডিসিশন জানালে আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করব / আমরা আপনার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব এবং এই মহাকাশযানের ভেতরে আপনার দায়িত্ব সম্পর্কে বিশদভাবে জানানো হবে / আর হ্যাঁ আপনার নিরাপত্তা ও অন্যান্য দিক বিবেচনা করে আপনাকে আমাদের নির্দিষ্ট গেস্ট হাউসে আপাতত আপনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে / আমি সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম /
আমি আমার বরাদ্দকৃত গেস্ট হাউসে চলে এলাম / সুন্দর গোছানো ছিমছাম তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট / 22 তলা বিল্ডিং এর পঞ্চম তলায় এই ফ্ল্যাটের অবস্থান / 2 বেডরুম একটি ড্রয়িং রুম এবং বেশ বড়োসড়ো একটা ডাইনিং স্পেস সহ আঠারোশো স্কয়ার ফিটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট / এই 22 তালা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে যারা বসবাস করেন তারা সবাই এই নাসা তে কর্মরত / ফ্ল্যাটটি সুন্দর করে গোছানো এবং ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সবকিছুই এখানে আছে / এমনকি সুন্দর একটি আধুনিক কিচেন ও আছে / ইচ্ছে করলে ই আমি এখানে রান্না করে খেতে পারব / আবার চাইলে রুম সার্ভিস কে ফোনে বলে দিলে ওরাও আমার পছন্দমত খাবার পৌঁছে দেবে / পরিবেশটা আমার খুবই পছন্দ হলো / একা একা থাকার জন্য একটি আদর্শ স্থান / ডাইনিং রুমের একপাশে পুরো দেয়ালটাই মোটা এইট মিলিমিটার কাচ দিয়ে মোড়ানো যেখান দিয়ে তাকালে দূরে সমুদ্রের সৈকত দেখা যায় যেখানে সমুদ্রের ঢেউগুলি দিনরাত আছরে পরছে / এত কষ্টের মাঝেও প্রচন্ড একটা ভালোলাগার অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল / হঠাৎ করে আমার লি এর কথা মনে পড়ে গেল / বহুদিন আমি আর লি এমনই সমুদ্রের তীরে কাটিয়েছি / একটা জমাট বাঁধা ভালোবাসার মধ্যে আমরা দুজনে হাবুডুবু খেয়েছি / লি এর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে / অত সুন্দর মানুষটা দ্বিধাহীন চিত্তে আমার ভালোবাসার কাঙাল হয়ে থেকেছে / কেমন আছে লি এখন ? মনটা কেমন যেন ছটফট করে উঠলো , খুব দেখতে ইচ্ছে করল লি কে / লি এর সেই হাসি হাসি মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা , লি কে আমার হৃদয়ের ভেতরে দেখতে পেলাম / মনের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো / আমি স্থবির হয়ে বসে মনে মনে লি এর কথা ভাবতে লাগলাম /
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিছানায় গেলাম / নতুন জায়গায় নতুন বিছানা , আমার ঘুম আসছিল না / শুয়ে শুয়ে শুধু এ পাস ওপাশ করছিলাম / হঠাৎ করেই আমার ছেলেদুটোর কথা মনে পড়ে গেল / বড় ছেলেটা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই হায়ার এডুকেশনের জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে গেল / বড় ছেলেটার যাওয়ার এক বছরের মাথায় ছোটটা ও চলে গেল সেই অস্ট্রেলিয়াতেই পড়াশোনা করতে / একসময় পড়াশোনা শেষ হলো / কিন্তু ততদিনে অস্ট্রেলিয়াতে ওদের শীকড অনেক গভীরে চলে গিয়েছে / ওরা আর দেশে ফিরে এলোনা ওখানেই সেটেল হয়ে গেল / অবশ্য বছরে একবার 1/2 মাসের জন্য ছুটিতে বেড়াতে আসত / কিন্তু ওদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে ওরা দেশে আশাও কমিয়ে দিল / ছেলেরা সবসময়ই মায়ের একটু বেশি ভক্ত হয়ে থাকে / আমাকে বারবার তাগিদ দিতে থাকলো অস্ট্রেলিয়া তে চলে যাওয়ার জন্য / প্রথমে আমি রাজি হয়নি কিন্তু পরে আমার আদরের আরিয়া রাভিদ ও আয়েশার ভালোবাসার টানে আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আমি রাজি হয়ে যাই / কিন্তু সেই সময় ই ঘটে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় / আমার জীবনটা উলটপালট হয়ে যায় / আমি হারিয়ে যাই আমার এই পরিচিত ভুবন থেকে / হঠাৎ করেই লিন্ডার দেওয়া সেই ডায়েরি টার কথা মনে হল / আমি ডায়েরি টা বের করে ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতি গুলি নিভিয়ে দিয়ে শুধু বেড সাইডের বাতিটা জ্বালিয়ে পড়তে শুরু করলাম / একান্তই ব্যক্তিগত ডাইরি / এটাকে ডায়েরি বললে মনে হয় সঠিক বলা হবে না / তার জীবনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলো কেই এখানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে / এখানে আছে আয়েশা এর প্রেমের কথা , মনের ভালোলাগা ক্ষোভ দুঃখ এসব কথা এবং মাঝে মাঝে আমার কথা / আমার খুব ইচ্ছে হলো আয়েশা এর প্রেম ভালোবাসার কথাগুলো পড়তে / কেমন করে আয়েশা প্রেমে পরল / কিভাবে সেই দুষ্টু আয়েশা তারা ভালোবাসার মানুষের সাথে আবেগি ভাষায় কথা বলতো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করলো / কিন্তু না আমার মন আমাকে সায় দিল না / কারো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে তার সম্মতি না নিয়ে মোটেই পড়া উচিত নয় / আমার তো এখন আর সম্মতি নেওয়ার কোন সুযোগ নেই / আমি পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে অংশ গুলোই পড়তে থাকলাম / এক জায়গায় এসে চোখটা আটকে গেল / তারিখ 5/9/2030 /আজকে আমি আরিয়া আপু এবং রাভিদ ভাইয়া তিনজনে মিলে পার্কে বসে গলাগলি ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলাম / রাভিদ ভাইয়া মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য / তাই সে মেলবোর্ন চলে যাবে / এসেছিল আমাদের সাথে দেখা করতে / বিকেলে আমরা হাঁটতে বের হলাম / পার্কে হাটছিলাম আর কথা বলছিলাম / হঠাৎ রাভিদ ভাইয়া বলে উঠলো ওই যে দাদা ভাই , বলেই দৌড় / আমরাও রাভিদ ভাইয়ার পিছু পিছু দৌড় / পার্কে র পাশের ফুটপাতে দিয়ে একজন লোক হেটে যাচ্ছিলেন / রাভিদ ভাইয়া পিছু থেকে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বলল দাদাভাই / লোকটা ঘুরে অবাক দৃষ্টিতে রাভিদ ভাইয়া এর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর জিজ্ঞাসা করলেন , দাদাভাই ? কে তোমার দাদাভাই ? রাভিদ ভাইয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল / মুখে বলল সরি আমার ভুল হয়ে গেছে / আমি ভেবেছিলাম আমার দাদাভাই যাচ্ছে / আমি দেখলাম লোকটার মুখেও দাদাভাইয়ের মত সাদা পাকা মুখ ভর্তি দাড়ি / লোকটা হাসল , তারপর বলল না ঠিক আছে , কোথায় থাকে তোমাদের দাদাভাই ? আমরা তিনজন ই একসাথে বললাম আমাদের দাদাভাই বাংলাদেশ থাকতেন / অনেকদিন আগেই দাদাভাইয়ের আমাদের এখানে আসার কথা ছিল / কিন্তু উনি আসেননি / কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন / লোকটি আমাদের তিনজনের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন / বললেন ভেবো না তোমরা ,নিশ্চয়ই তোমাদের দাদা ভাই খুব শিগগিরই তোমাদের কাছে চলে আসবেন / তিনি তার পকেট থেকে অনেকগুলো চকলেট বের করে আমাদেরকে দিলেন মুখে বললেন খাও / রাভিদ ভাইয়া কিছুক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর হাত বাড়িয়ে চকলেটগুলো নিল / আমরা এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম / লোকটা চলে গেল / আমরা তিন ভাই বোন অনেকক্ষণ লোকটার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম তারপর আবার পার্কে এসে বসে তিন ভাই বোন গলাগলি ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলাম /
1/1/2031 . রাভিদ ভাইয়া আজকে ইয়া বড় একটা জন্মদিনের কেক নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিল / ভাইয়া একটা গেঞ্জি পরে এসেছে / গেঞ্জিটা র বুকে লেখা দাদাভাই / আজকে আমাদের দাদাভাইয়ের জন্মদিন / তাই রাভিদ ভাইয়া নিজে দাদাভাই সেজেছে / আমি বললাম তুমি যদি আমাদের দাদাভাই হও তবে তোমার সেই কাঁচাপাকা মুখ ভর্তি দাড়ি কোথায় ? রাভিদ ভাইয়া হাসল / বলল আরে আমি তো ছোটবেলার দাদাভাই আমার দাড়ি আসবে কোত্থেকে / আমরা ঘটা করে দাদাভাইয়ের জন্মদিন পালন করলাম / আমার গুরুগম্ভীর রাগী নানু ও আমাদের সাথে এসে যোগ দিলো / কেক খেলো / আমার নানা ও আমাদের সাথে এসে সোফার এক কোনায় বসে থাকল / নানা সাধারণত কোন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে থাকেন না / কিন্তু তিনিও এসে আমাদের কাছে বসে থাকলেন / অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর দেখলাম রাভিদ ভাইয়া সোফায় চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে / তার দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে / রাভিদ ভাইয়াকে সান্তনা দিতে গিয়ে আমাদের চোখ দুটো ও জলে ভিজে গেল / এরকম ছোট ছোট টুকরো টুকরো অনেক ঘটনাই এখানে লেখা আছে / ঘটনাগুলো আমি পাতা উল্টে উল্টে পড়ছিলাম / কিন্তু মনের ভিতর এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল / চোখ দুটো জলে ভিজে যাচ্ছিল /মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম / ডায়েরি টা পড়া বাদ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম / ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে ঢকঢক করে খেলাম / বুকের ভেতরে প্রচন্ড অস্থিরতা কাজ করছিল সেই অস্থিরতা কাটানোর জন্য এই গভীর রাতে ঘরের ভিতরে পায়চারি করতে থাকলাম / একরাশ শূন্যতা গভীর হতাশা আমাকে যেন গিলে ফেলল / একসময় নিজের মনে মনেই বললাম না এই পৃথিবীতে আমার আপনজন কেউ নেই / কি হবে আমারএখানে থেকে ? না আমি চলে যাব / এই পৃথিবী ছেড়ে আমি চলে যাব / অসীম গভীর কাল অন্ধকার মহাশূন্য ই আমার জন্য ভালো / আমি আমার মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিলাম / আমি জানি এখন গভীর রাত / নাসা এর অফিস বন্ধ হয়ে গেছে সেই বিকেল পাঁচটায় তারপরেও আমি নাসার মহাপরিচালকের বিশেষ একটা নাম্বারে কল দিলাম / ফোন কলটা রিডাইরেক্ট হয়ে মেসেজ বক্সে চলে গেল সেখানে আমি আমার প্রয়োজনীয় মেসেজ রেখে দিলাম / এরপর লিন্ডা কে ফোন দিলাম / হিসাব করে দেখলাম নিউজিল্যান্ড এখন দুপুর দুইটা / পরপর তিনটা রিং হওয়ার পর লিন্ডার উচ্ছ্বসিত কন্ঠ শুনতে পেলাম / কেমন আছো তুমি বড় বাবা ? তোমার কাজ শেষ হয়েছে ? কবে আসছ তুমি ? আমি কিন্তু তোমার জন্য মেয়ে দেখে রেখেছি / আমি নিশ্চিত তোমার পছন্দ হবে / খুবই লক্ষী মেয়ে / একনাগাড়ে কথা বলে গেল লিন্ডা . কোনরূপ বিরতি ছাড়াই / আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম / মেয়েটার মনে কষ্ট দিতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল / তার পরেও আমি লিন্ডা কে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম / লিন্ডা আমার কথা শুনে মনে হল চুপসে গেল / কিছুক্ষণ চুপ করে রইল / তারপর ভেজা গলায় আস্তে আস্তে বলল ঠিক আছে তোমাকে আমি বাধা দেবোনা / কিন্তু যাওয়ার আগে কথা দাও তুমি আমার সাথে দেখা করে যাবে তুমি / কয়েকদিন আমার সঙ্গে থাকবে / বড় বাবা তুমি কথা দাও তুমি আমার কথা রাখবে / আমি পরিবেশটাকে একটু হালকা করার জন্য হেসে বললাম চিন্তা করো না / আমি আমার মায়ের সাথে দেখা না করে কিভাবে যাব ?অবজারভেটরি টাওয়ারে আমার কম্পিউটারের সামনে বসে আমাদের 5 বিলিয়ন পিক্সেল এর নিজস্ব ক্যামেরায় তোলা একটি গ্রহের কিছু ছবি দেখছিলাম / গ্রহটিকে সাধারণভাবে দেখলে অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতোই মনে হয় / পাহাড় সমতল ভূমি সবই আছে / কিন্তু এই গ্রহে মাটি বলে কিছু নেই / সমস্ত গ্রহ টাই নিরেট পাথর দিয়ে তৈরি / অথচ সাধারণভাবে দেখলে আমাদের পৃথিবীর মতই দেখা যায় / অদ্ভুত এক গ্রহ / বিভিন্ন রঙের বিচিত্র ধরনের পাথরের দিয়ে তৈরি এই গ্রহ / সমতল ভূমি মাঠ নদী সবকিছুই ছবিতে দেখা যায় / কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নদী পানি গাছপালা এগুলো বিভিন্ন রঙের পাথরের তৈরি / সাধারণভাবে দেখলে মনে হয় গ্রহটি জীবন্ত কিন্তু পাথরের মধ্যে কি জীবনের অস্তিত্ব থাকতে পারে ? এরকম প্রশ্ন যখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন হঠাৎ করেই এলার্ম বেজে উঠলো / আমি আমাদের সেন্ট্রাল কম্পিউটারের যান্ত্রিক কণ্ঠ শুনতে পেলাম / আমাদের খুব কাছেই প্রায় তিন কোটি কিলোমিটার দূরে একটি গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি আমরা / প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানের পর মনে হচ্ছে গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে গ্রহটিতে বায়ুমণ্ডল আছে / এই বায়ুমন্ডলে প্রায় 76 % নাইট্রোজেন এবং 21 % অক্সিজেন এবং অন্যান্য গ্যাস দুই পার্সেন্ট / যা প্রায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনুরূপ / বায়ুমন্ডলে মিথেন গ্যাসের অস্তিত্বও আছে যা এর অনুপাত সব জায়গায় একই রকম নয / এক জায়গায় একেক রকম / এতে প্রাণের অস্তিত্বের ধারনাটা আরো জোরালো হচ্ছে / আমি আমার টেবিলে থাকা কম্পিউটার থেকে সেন্ট্রাল কম্পিউটারে কিছু নির্দেশ পাঠালাম/ আমি গ্রহটির জুম করা ছবি দেখতে চাইলাম / পরমুহূর্তেই আমার সামনে এলইডি স্ক্রিনে একটি গ্রহের জুম করা ছবি ভেসে উঠলো / আমি গ্রহটিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলাম / পৃথিবীর মতোই নীল রঙের একটি গ্রহ / গ্রহটি টিকে দেখে কেন যেন আমার মনে হতে লাগলো এই ছবিটা আমি এর আগেও দেখেছি কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না তা কিভাবে সম্ভব ? আমি আবার আমাদের সেন্ট্রাল কম্পিউটারে কিছু নির্দেশ পাঠালাম / গ্রহটির একটা ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করতে বললাম / গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের আরো ডিটেলস তথ্য জানতে চাইলাম / কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চাহিদা মত যাবতীয় তথ্য আমার কম্পিউটারের মেইলবক্সে এসে জমা হল / গ্রহটির ত্রিমাত্রিক ম্যাপ টি কে অবজারভেটরি টাওয়ারের বড় স্ক্রিনে ওপেন করলাম / আমি দেখলাম গ্রহটিতে সমুদ্র নদী পাহাড় সবকিছুই আছে / আবারও কেন যেন মনে হল এই গ্রহটিকে আমি আগে কোথাও দেখেছি / আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গ্রহটিকে দেখতে লাগলাম / হঠাৎ করেই আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল / ঐতো ইউরোপ মহাদেশ , ঐতো আটলান্টিক মহাসাগর , ঐতো আরব সাগর / সম্পূর্ন পৃথিবীর মত দেখতে আর একটি গ্রহ / আমার মুখ থেকে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এল টুইন আর্থ ? যমজ পৃথিবী ? সম্পূর্ণ পৃথিবীর আদলে গঠিত আর একটি গ্রহ / গ্রহটির ভর 5.972 × 10^13 kg জি এর মান 9.8 মিটার/সেকেন্ড২ যা প্রায় পৃথিবীর মতই / আমি হিসাব করে দেখলাম আমাদের পৃথিবী থেকে এই গ্রহের দূরত্ব 3.9 লাইট ইয়ার / আমার কৌতুহল বেড়ে গেল / আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম / মনের ভেতর গ্রহটিকে দেখার প্রচন্ড একটা ইচ্ছে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আমি আবার আমার কম্পিউটার থেকে সেন্ট্রাল কম্পিউটারে নির্দেশ পাঠালাম / আমাদের গতিপথ পরিবর্তন করে আবিষ্কৃত গ্রহের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দিলাম / সেন্ট্রাল কম্পিউটার আমাকে জানা ল রুট পরিবর্তনের জন্য কিছু সময় প্রয়োজন / নতুন একটা রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে / আমি সম্মতিসূচক নির্দেশ দিয়ে নতুন প্রজেক্ট অনুমোদন করে দিলাম / সেন্ট্রাল কম্পিউটার আমাকে আবারো জানালো যে রুট ম্যাপ টি সময়ের ভেতর দিয়ে করতে হবে অর্থাৎ মহাশূন্য জান টি কে আবার আলোর গতিতে ভ্রমণ করতে হবে এজন্য মহাশূন্যযানের টি 815 ইঞ্জিন টি চালু করতে হবে / আমি সবকিছু র অনুমোদন করে দিলাম / এরপর বুকের ভিতর এক ধরনের আশা নিয়ে এলইডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম / আমি গ্রহটির নাম দিলাম টুইন আর্থ /
আমরা যখন গ্রহের আরবিটে প্রবেশ করলাম তখন আমাদের এই মহাকাশযানের ঘড়িতে পেরিয়েছে মাত্র তিন ঘন্টা 32 মিনিট / আমাদের মহাকাশ যানটি টুইন আর্থ কে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় থার্টি টু থাউজেন্ড কিলোমিটার বেগে প্রদক্ষিণ করছিল / আমাদের 5 বিলিয়ন পিক্সেল এর ক্যামেরা দিয়ে আমরা প্রায় কয়েক শত ছবি তুললাম / ছবিগুলো দেখে আমরা যারপরনাই উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলাম / ছবিতে আমরা গাছপালা নদী পাহাড় সমুদ্র ঘন সবুজ বনভূমি সবি দেখা যাচ্ছে/ পৃথিবীর মত আরেকটি গ্রহ যেখানে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে / নানান ধরনের জীবজন্তু মাঠে চরে বেড়াচ্ছে / সেন্ট্রাল কম্পিউটারকে নির্দেশ পাঠালাম , আমি গ্রহটিতে ল্যান্ড করতে চাই / একটি ল্যান্ডার কে রেডি করতে বললাম এবং এখানকার বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়া সম্পর্কে ডিটেইলস তথ্য চাইলাম / ডাটা সিটে দেখতে পেলাম গ্রহটির তাপমাত্রা অঞ্চলভেদে – 25 ডিগ্রি হতে 40 ডিগ্রি পর্যন্ত / অত্যন্ত সুন্দর আবহাওয়া / আমরা পৃথিবীর অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ যে অঞ্চলে অবস্থিত সে অঞ্চলে নামা র প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম / সেখানকার তাপমাত্রা এই মুহূর্তে 10 ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে 15 ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে / আমি রেইন কে সঙ্গে নিয়ে ল্যান্ডারের ক্যাপসুলে আসন গ্রহণ করলাম / আমাদের গ্রহটিতে ল্যান্ড করার জন্য সর্বমোট 47 মিনিট সময়ের প্রয়োজন হবে / আমরা কিছু টুকিটাকি যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিলাম / যেমন পানির বিশুদ্ধতা পরিমাপের যন্ত্র মাটিতে খনিজ পদার্থের বিশ্লেষণের জন্য যন্ত্র কম্পাস এবং নিজেদের আত্মরক্ষা জন্য কিছু লেজার নিয়ন্ত্রিত লেজারগান / লেন্ডারটি প্রথমে মুল জানথেকে আলাদা হয়ে গ্রহটি কে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করলো তখন তার গতিবেগ অত্যন্ত বেশি প্রায় 8 হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় / আমরা প্রথমে এর গতি কমানোর দিকে মনোযোগ দিলাম / লেন্ডারের ইঞ্জিন চালু করে গতিবেগ কমিয়ে অস্তে অস্তে ঘন্টায় 700 কিলোমিটার এ নিয়ে এলাম / একই সাথে লেন্ডারটি অরবিট চেঞ্জ করে টুইন আর্থ এর সবচেয়ে নিচের অরবিটে চলে এলাম / তখন আমাদের মাটি হতে প্রায় চারশো কিলোমিটার উপরে / এরপর গতি আরো কমিয়ে গ্লাইডিং করে অনেকটা আমাদের পৃথিবীর হেলিকপ্টারের মতন সফট ল্যান্ডিং করে মাটিতে নেমে এলাম / আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম / আমাদের মুলজান থেকে আমাদের উপর সর্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছিল / এভাবে বেশ কিছুক্ষন বসে থাকার পর মুল জান থেকে যখন কনফার্ম হল না কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই তখন আমাদের নামার অনুমতি দেওয়া হল / নামার জন্য লেন্ডার থেকে একটা সিঁড়ি মাটি পর্যন্ত নেমে এলো আমরা সেই সিঁড়ি বেয়ে প্রথমে আমি এবং আমার পিছু পিছু রেইন আস্তে আস্তে ধীর পদক্ষেপে নিচে নেমে এল / অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য / আমাদের চোখ দুটো এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখে জুড়িয়ে গেল / জায়গাটা সমতল ভূমি বড় বড় সবুজ ঘাসে ভর্তি / আমাদের ডানপাশে একটি নদী বয়ে চলেছে / ফটিকের মত স্বচ্ছ সেই নদীর পানি / বা পাশে প্রায় হাফ কিলো মিটার দূরে গভীর জঙ্গল / আমরা আমাদের চারিপাশে পাখির নানা ধরনের কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেলাম / নদীর অপর প্রান্তে দূরের দিগন্ত রেখার কাছে সারি সারি পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে / সবুজ পাহাড় গুলোতে ঝর্ণাধারা গুলো এত দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আমি এবং রেইন একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম / রেইন অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো আমরা কি আমাদের পুরনো পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে এসেছি ? আমি উত্তরে বললাম না আমরা পৃথিবী থেকে প্রায় 3.9 লাইট ইয়ার দূরে অবস্থান করছি / আমরা দুজনে আস্তে আস্তে হেঁটে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম / সূর্য টা তখন প্রায় মাথার উপরে / নদীর পানি বয়ে চলেছে /আমরা নদী থেকে কিছু পানি সংগ্রহ করে আমাদের ল্যান্ডারের ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করলাম / 99 পয়েন্ট 99 শতাংশ বিশুদ্ধ পানি / রেইন কিছুটা পানি নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালো / আমি ইশারায় অনুমতি দিলাম / রেইন আস্তে আস্তে কয়েক চুমুকে পানিটুকু গলাধঃকরণ করল / আমি রেইন এর মুখের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি / রেইন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো তারপর আস্তে আস্তে হাসিতে তার মুখটা ভরে গেল / মুখে বলল নাইস / দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম / রেইন আরও কিছুটা পানি নিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল / আমি পানির পাত্রটা হাতে নিয়ে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলাম তারপর ঢকঢক করে সমস্ত পানি একেবারে গলাধঃকরণ করে ফেললাম / সুন্দর সুমিষ্ট ঠান্ডা পানি / আনন্দের আতিশয্যে দুজনেই ঘাসের উপর শুয়ে পড়লাম /শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে থাকলাম / নীল আকাশ , মাঝে মাঝে সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে / একেবারেই আমাদের পৃথিবীর মতো পরিবেশ / আমাদের মুল জান থেকে আমাদের জানানো হলো জঙ্গল এর ভেতরটা নানা ধরনের জীবজন্তুর আনাগোনা রয়েছে বিশেষ করে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি অনেক বেশি / এখান থেকে প্রায় 40 কিলোমিটার দূরে মানব সাদৃশ্য কিছু প্রাণীর অস্তিত্ব আমাদের ক্যামেরার ছবি তে দেখা যাচ্ছে / তবে প্রাণীগুলো হিংস্রও হতে পারে সুতরাং সাবধান / আমরা দুজন আবার আমাদের লেন্ডারে চড়ে বসলাম তারপর ইঞ্জিন স্টার্ট করে আকাশে উঠে এলাম / আমাদের গন্তব্য 40 কিলোমিটার দূরের সেই বসতি / আমরা আকাশ থেকে দেখতে পেলাম মাঠে ফসলের ক্ষেত , মহিষ গরু চড়ে বেড়াচ্ছে মাঠের মধ্যে / কিছু কিছু মানুষ সদৃশ্য প্রাণী ও দেখতে পেলাম মাঠে কাজ করছে / একসময় দূর হতে মানুষের বসতি আমাদের নজরে এলো / নদীর ধারে লতায় পাতায় ছাওয়া ঘরবাড়ি / মানুষজনের পরনে অদ্ভুদ ধরনের পোশাক / তবে প্রায় সবাই সশস্ত্র / নানা ধরনের জীবজন্তুর হাড় দিয়ে তৈরি মারণাস্ত্র / আমরা লোকালয়ে হতে হাফ কিলোমিটার দূরে অবতরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম / আমরা হঠাৎ করেই লোকালয় এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখতে পেলাম / তা রা আমাদেরকে দেখতে পেয়েছে / মনে হল মানুষজন চিৎকার চেচামেচি করছে / আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলে একে অপরকে কি যেন বোঝাতে চাইছে / আমরা নেমে এলাম মাটিতে / দেখতে পেলাম লোকজন দৌড়ে হাতে অস্ত্র হাতে আমাদের দিকে আসছে / আমরা আমাদের লেন্ডার থেকে নেমে লেজার গানগুলো অন করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম / যদি ওরা আমাদের আক্রমণের চেষ্টা করে তবে আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য লেজার গানের সাহায্য নেব / তাছাড়া আমাদের মূল জান থেকেও আমাদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা আছে / তারাও আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতে পারবে / সুতরাং ভয়ের তেমন কিছু নেই / কিন্তু মানুষগুলো আমাদের কাছাকাছি এসে সবাই থেমে গেল / এরপর সবাই তাদের নাক মাটিতে গুঁজে শুয়ে পড়ল / শুয়ে শুয়ে তারা চিৎকার চেচামেচি কান্নাকাটি করতে লাগলো / আমরা দুজন আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে ওদের কাছে গেলাম , হাত তুলে ওদের কে ইশারায় বসতে বললাম / ওরা সবাই আস্তে আস্তে উঠে মাটিতে বসে রইল / হঠাৎ করে দেখলাম ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে পরনে তার চামড়া র অদ্ভুত ধরনের পোশাক / দৌড়ে আমাদের দিকে আসছে / মেয়েটির যখন কাছে চলে আসলো তখন মেয়েটির দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম উস্কোখুস্কো চুল / চুলের মাঝখানে নানা রঙ্গের পাখির পালক / কানে গলায় অদ্ভুত ধরনের গহনা / মেয়েটি দৌড়ে এসে আমার গায় মুখ দিয়ে থুতু ছিটিয়ে দিতে লাগলো তারপর হাত দিয়ে সেই থুতু গুলি আমার শরীরে মাখিয়ে দিতে লাগলো / আবার কিছুক্ষণ বুক চাপড়ে চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে লাগলো আবার কিছুক্ষণ পর আবার আমার গায়ে থুতু ছিটিয়ে মাখাতে লাগলো / আমি প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম / কিছুক্ষণ পর দেখলাম আরো একটি ছোট মেয়ে এসে একই কাজ করতে লাগলো এবং আমাকে বারবার জড়িয়ে ধরতে লাগলো / আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না / এরপর মেয়ে দুটির মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই আমি চমকে উঠলাম / মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এলো আরিয়া ? আমি মেয়েদুটোকে কাছে টেনে এনে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম না আমি ভুল দেখছি না , এরা আমার হারিয়ে যাওয়া আরিয়া ও আয়েশা / আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কি দেখছি ? এরপর সেই ভিড়ের মধ্যে দেখলাম রাভিদ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে / আমি ইশারায় ওকে কাছে ডাকলাম / রাভিদ দৌড়ে এসে একইভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরে গায়ে থুতু মাখাতে লাগলো / আমি বুঝলাম এটাই ওদের ভালোবাসা জানানোর পদ্ধতি / কিন্তু এরা কারা ? এরা কি সত্যিই আমার প্রিয় আরিয়া আয়েশা রাভিদ ? এরা এখানে কেন ? তবে কি সত্যিই এই গ্রহটা আমাদের পৃথিবী র ই একটা কপি ? এরপর আমি উপস্থিত লোকজনদের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম / অনেকেই আমার পরিচিত মনে হল / আরিয়া আয়েশা রা ভিদ ওরা আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকলো / উপস্থিত লোকজন আনন্দ উল্লাসে কেউ বুক চাপড়াচ্ছে আবার কেউবা ধেই ধেই করে নাচছে / প্রায় এক কিলোমিটার হাটার পর আমি ছোট্ট ভাঙাচোরা কুটীরের সামনে এসে দাঁড়ালাম / ওরা কেমন যেন এক অদ্ভূত শব্দ করে চেঁচামেচি করতে লাগলো / দুইজন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো / পরনে তাদেরও গায় চামড়ার পোশাক / এলোমেলো মাথার চুল যেন পাখির বাসা / হাতে কাঁধে নানা ধরনের হিবিজিবি আঁকা / নাকে গলায় পশুপাখির হাড়ের গহনা / তারা এক মুহুর্ত থমকে দাঁড়ালো তারপর দৌড়ে এসে আমার গায়ে থুতু ছিটাতে লাগলো / আমি মহিলা দুজনকে একটু ভালো করে খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম এরা দু’জনই আমার দুই ছেলের বউ / রেইন একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল মনে হচ্ছিল তার খুবই অস্বস্তি হচ্ছে / আরিয়া আয়েশা ওরা আমাদেরকে ঘরের ভেতর নিয়ে মাটিতে বসিয়ে দিল / কিছুক্ষণ পরে দেখি গরু মহিষ অথবা বাই সন এর বড় একটা আস্ত রান আগুনে পুড়িয়ে এনে গাছের লতা দিয়ে বেঁধে আমাদের সামনে ঝুলিয়ে দিল / আমরা বুঝতে পারছিলাম না কি করব / আরিয়া আয়েশা রা ভিদ ওরা মাংসগুলো হাত দিয়ে ট্রেনে ছিড়ে অথবা দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিড়ে আমাদের দুজনকে খাইয়ে দিতে লাগলো / আর ইশারায় আমাদেরকে একই কাজ করতে বলল / আমরা বুঝলাম এটাই ওদের খাওয়ার নিয়ম / আমিও খাওয়া শুরু কর লাম / মাংসটা খেতে খুবই মজার / আমার ভালো লাগছিল / পেটে খিদে ও ছিল / তাই গ্রোগ্রাসে গিলতে লাগলাম / কিন্তু রেইন সামান্য একটু মুখে দিয়েই সব সব ফেলে দিল / আরিয়া আয়েশা ওরা খিলখিল করে হাসতে লাগলো / আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম / জায়গা ও আবহাওয়া ভেদে মানুষের গঠন ,গায়ের রং , এবং ভাষার পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু তাবৎ সৃষ্টির হাসি ও কান্না একই রকম / এটাই মনে হয় সৃষ্টির আসল ভাষা /সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে আকাশের রং রক্তিম হয়ে সূর্য যখন বিশ্রামের আয়োজন করছে তখন আমি দেখতে পেলাম দূরে কিছু লোকজনকে সরু মেঠো পথ ধরে বাড়ি ঘরের দিকে ফিরে আসছে / আমি দেখলাম একটা বাসের মধ্যে বড় একটা হরিণ শিকার করে বেঁধে নিয়ে দুজন মানুষ বাস টাকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে আসছে / খালি গা খালি পা পরনে পশুর চামড়ায় তৈরি পোশাকে শরীরের নিম্নাংশ ঢাকা / খুব কাছে আসতেই দেখতে পেলাম ওদের শরীরের নানা ধরনের হিজিবিজি আঁকা / আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম ওরা দুজন আমার দুই ছেলে রাজিব এবং সজীব / আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম / ওরা আস্তে আস্তে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো / আমার দিকে তাকিয়ে রইল / তারপর কাধের হরিণটিকে মাটিতে ছুরে ফেলে দৌড়ে আমার কাছে এসে এক ধরনের শব্দ করে আমাকে জড়িয়ে ধরতে লাগলো দুজনে মিলে আমাকে কাঁধে নিয়ে নাচতে লাগলো / আরিয়া আয়েশা রা ভিদ ওরাও ওদের বাবার সঙ্গে যোগ দিয়ে নাচতে লাগলো / রাতে সবাই বাড়ির খোলা জায়গায় একসঙ্গে গোল হয়ে খেতে বসলাম / গোটা হরিণের বড় একটা ঝলসানো দেহ যথারীতি গাছের লতা দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হলো / আমরা সবাই গোল হয়ে বসেছি / কিছু গাছের শিকর বাকর ও মাংসের পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে / আমরা সবাই একসাথে সেখান থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করলাম সঙ্গে সেই শিকর বাকর ও মুখে দিতে লাগলাম / একসময় খাওয়া শেষ হল / একটা বিষয় আমি বিশেষভাবে খেয়াল করলাম / এদের নিজস্ব কোন ভাষা নাই / আকার ইঙ্গিতে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করে / অনেক রাত পর্যন্ত আমরা উঠানে বসে রইলাম / আরিয়া আয়েশা রাভিদ বসে বসে মশালের আলোয় আমার গায়ে লতাগুল্মের রস ব্যবহার করে নানা ধরনের ছবি একে দিল / চুলে পাখির পালক গুঁজে দিল / এরপর আমরা মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম / রেইন ও স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে শুয়ে পড়ল /
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ছেলে দুটো শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে/ / আমিও প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম / রেইন কে বললাম তুমি ফিরে যাও / আমি ফিরে পেয়েছি আমার পুরনো পৃথিবী কে / আমি আর আমার প্রিয়জনদের কে হারাতে চাইনা / আমার দিকে তাকিয়ে রেইন গভীর মমতা নিয়ে হাসল / আমাকে বলল উইশ ইয়ার গুড লাক / আমি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম / খালি গায়ে খালি পায়ে ছেলেদের সাথে বেরিয়ে পড়লাম আমি / (সমাপ্ত)
2 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
M A Kuddus Hossen
@makuddushossen
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
@mohammad-shahzaman


সুন্দর গদ্য। ধন্যবাদ।