Profile Photo

সুমাইয়া বিনতে করিমOffline

  • Sumaiya03
  • এম্বুলেন্স….(গল্প)

    প্যাঁ-পোঁ….প্যাঁ-পোঁ…প্যাঁ-পোঁ…. শব্দ তুলে ভুস করে এম্বুলেন্সটা স্বাতীর সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। ভেতরে কে আছে কে জানে। উঁকি দিয়েছিলো, শুধু দেখলো সোনার চুড়ি পড়া একটা হাত পাখা দিয়ে সামনের বেডে শোয়ানো কোনো একজনকে তুমুলবেগে বাতাস করে যাচ্ছে। এর বেশি কিছু দেখা গেলো না। হতে পারে শুয়ে থাকা মানুষই চুড়িটা কিনে এনেছিলো, আবার হতে পারে এটাই ওদের একমাত্র সম্বল! স্বাতী বিড়বিড় করে দোয়া করতে লাগলো, “ইয়া মাবুদ, সুস্থ করে দাও, হায়াত বাড়িয়ে দাও, সুস্থ হয়ে যাক। কার না কার বাবা, কার না কার ঘরের একমাত্র আয়ের মানুষ। সুস্থ করো, সুস্থ করো।”

    “আফা, আমারে কিছু কইন?” রিকশাওয়ালা কখন যে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে অবাক চোখে দেখছে, স্বাতী খেয়ালই করে নি। আজকে মনে হয় বেশি জোরেই বিড়বিড় করছিলো?

    ” না,না আপনাকে কি বলবো মামা! ঘাড় ঘুড়ায় রিকশা চালাচ্ছেন, নিজেও মরবেন, আমাকেও মারবেন!” স্বাতী অপ্রস্তুত অবস্থা কাটিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এত সহজে কি তা কাটিয়ে ওঠা যায়?

    #######

    দিনটা আর দশটা স্বাভাবিক দিনের মতোই ছিলো। স্বাতীর জীবনটাও। ও সেদিনও ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়েছে,বড় ভাই অফিসে যাওয়ার পর বাবাকে ওষুধ দিয়েছে, ছোট ভাইকে স্কুলে দিয়ে এসে নিজে কলেজের জন্য রেডি হয়েছে। কোথাও কোনো ঘাপলা নেই, এমনকি ঘাপলা যে থাকতে পারে সেই আশংকাও নেই বা ছিলো না। বেলা গড়াতে বড় ভাই বাদে সবাই যার যার মতো বাড়িও ফিরে এসেছে, দুপুরের খাবার খেয়েছে। একটা নিখুঁত পরিবারে যা হয় আর কি। ও আচ্ছা বুঝতে মনে হয় পারছেন যে, স্বাতীর মা নেই। ছোট ভাইটা হবার বছর দুয়েক পড়েই উনি মারা যান। এরপর বাবার কাছেই তাদের বড় হওয়া। কিন্তু আজ দুপুরে খাবার টেবিল সবসময় হাসি-গল্পে মাতিয়ে রাখা বাবা একটু চুপচাপ ছিলেন, সেটা স্বাতী খেয়াল করেছে, কিন্তু খুব একটা পাত্তা দেয় নি। প্রায় চার বছর হতে চললো বাবার রিটায়ারমেন্টের,এখনো নিশ্চয়ই বাচ্চাদের মতো সবসময় হৈ হৈ করে বেড়াবেন না! হয়তো কিছু নিয়ে ভাবছেন, এটাই ভেবে নিয়ে স্বাতী ব্যস্ত হয়ে যায়। আজ দশ বছর পর এখনো ও নিজেকে, নিজের সেই ব্যস্ততাকে ক্ষমা করতে পারে না।

    ########

    স্বাতীর বাবা, হাসমত সাহেব, রিটায়ার্ড ক্যাশ অফিসার, জনতা ব্যাংক। লম্বায় প্রায় ৫ফুট ৮ ইঞ্চি মতো, গায়ের রঙ একটু কালো, হাসিমুখ এবং মিশুকে একজন মানুষ। স্বাতী তার বাবার মতো হাসতে খুব কম মানুষকেই দেখেছে। বাবা হাসার সময় তার চোখ যেন কেমন ঝিকিমিকি করে উঠতো। বাবার গানের গলাও ছিলো দরাজ। কখনো কখনো হাঁক ছেড়ে গেয়ে উঠতেন, ” চোখ যে মনের কথা বলে…!” যাই হোক, অন্য কোনো দিন তার ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা যাবে। সেই সন্ধ্যায় কি হলো শুনুন।

    সন্ধ্যা নেমে আসার পর হাসমত সাহেব ক্লান্ত গলায় স্বাতীকে বললেন, ” বাবা, চা বসাও তো, খেয়ে মাথায় একটু পানি দেই। শরীরটা ভালো লাগছে না।”

    স্বাতী ফোনে ব্যস্ত ছিলো, কথার জবাবে হ্যা বলেছিলো ঠিকই কিন্তু বাবার চেহারার দিকে তাকানো আর হলো না। তাকালে দেখতে পেত, সেই হাসিমাখা মুখে পান্ডুর ছায়া! কিছুটা আনমনেই রান্নাঘরে এসে চায়ের পানি বসাতে না বসাতেই ধরাম করে আওয়াজ এলো বাথরুমের ভেতর থেকে! স্বাতী চমকে উঠে দৌড়ে গেলো সেখানে। ছোট ভাইটাও তখন ছুটে এসেছে।

    ” আপু, বাপি পড়ে গেলো নাকি?”

    দরজাটা ভেজানো ছিলো, ততক্ষনে তো স্বাতী বারবার ডাকছে বাবাকে, কিন্তু সাড়াশব্দ আসার কোনো লক্ষণ নেই। ভয়ে, আতংকে, কাঁপা কাঁপা হাতে স্বাতী বড় ভাইকে ফোন করলো।

    ” ভাইয়া, বাবা তো বাথরুমে পড়ে গেছে, দরজার ওপর তাও, আমি বের করবো কিভাবে? তুমি কই?”

    ” কি বলিস! আমি তো অফিস থেকে বের হয়ে জ্যামে আটকা পড়লাম। দেখ তো পাশের বাসায় কাউকে পাস কিনা, আমি আসতেসি। ভয় পাস না।”

    স্বাতী ভয় পেলো, ভালোভাবেই পেলো। বাবাকে সে বের করবে কিভাবে, ভাইয়া কখন আসবে, এম্বুলেন্সের নাম্বার তো বাবা লিখে রাখে, কিন্তু সেটা এখন কোথায় খুজবে, পাশের বাসায় যেন কে থাকে, তাকে খবর দিলে কি কাজ হবে? এদিকে ছোট ভাইটা যে হাউমাউ করে কাঁদছে ওকে থামাবে কে?এতকিছু ছাপিয়ে স্বাতীর মাথায় ঘুরতে থাকলো একটাই কথা,” বাবা বাথরুমে কিভাবে পড়ে গেলো”!

    সেই সন্ধ্যা, সেই কাল সন্ধ্যা! পাশের বাসার বয়স্ক চাচা কোত্থেকে ধরে পেতে দুইজনকে জোগাড় করে আনলেন, তারা টেনে-হিঁচড়ে হাসমত সাহেবকে বাথরুম থেকে বের তো করলেন, কিন্তু এ যেন শুধু একটা প্রাণহীন শরীর। পাড়ার ফার্মেসি থেকে একজন ডাক্তারও জোগাড় হলো, কিন্তু উনি এসে স্ট্রোক বলেই দায় সারলেন, বাকি কি করতে হবে সেটা বলার বা করার দরকার আছে বলে মনে হলো না। স্বাতীর ভাই জ্যাম ঠেলে, দৌড়ে, হাপিয়ে যখন বাসায় ঢুকলো ততক্ষণে প্রায় ঘন্টা পার হয়ে গেছে। আসতে আসতে একটা এম্বুলেন্স তো সে জোগাড় করেছিলো ঠিকই, কিন্তু সেটার আর আসার নামগন্ধ নেই!

    অবশেষে আরোও আধা ঘন্টা পার করে সেই এম্বুলেন্স যখন পৌছালো, স্বাতীর মনে হলো বাবার শরীরে দম হয়তো আর অবশিষ্ট নেই! স্ট্রেচারে করে ভাই আর হাসপাতালের লোকেরা যখন বাবাকে নিয়ে যাচ্ছে স্বাতী তখন ভাবলো, এ যেন এক শবযাত্রা! না চাইতেও ওর কেন যেন মনে হলো, বাবা আর ফিরবে না! প্রচন্ড শব্দে এম্বুলেন্স যখন রওনা হলো, স্বাতীর শুধু মনে হলো, এই প্রচন্ড আওয়াজ তার জীবনের সমস্ত শব্দ শুষে নিয়ে চোখের আড়াল হচ্ছে!

    #######

    সেদিনের পর বাবা আসলেই আর ফেরেন নি! হতে পারে কখনো কখনো কিছু চলে যাওয়া না ফেরার জন্যই হয়!

    © সুমাইয়া

    8
    8 Comments
Skip to toolbar