Profile Photo

রাহুল চন্দ্র দাসOffline

  • ৫১।
    ব্যানার, বিলবোর্ড, বিজ্ঞাপনের আছে নানাবিধ ভুতুড়ে ক্যাঁচাল
    মাঝেমাঝে বৃক্ষ, পত্রভেদী বিদ্যুতের তারের প্যাঁচাল
    রাস্তার ডিভাইডারে উদ্ভিদের সৌন্দর্যবর্ধন
    ব্যাংকে, ক্লিনিকে, রেস্তোরাঁয় আমাদের সার্ভিস স্টেশন।
    রাস্তার ছেঁড়াফাঁড়া ইট, মবিল-চোবানো লিনেন, কটন
    টুকরো টুকরো কাগজের নির্মোক
    পতাকা, নিশান ওড়ে পুরনো শহরের লুপ্তপ্রায় মেট্রোতে
    গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোর বৃষ্টিভেজা ছাদের ট্রে-তে
    পড়ে আছে সশব্দ কাপ; পেয়ালার ঘ্রাণ লেপ্টে আছে
    ওভারব্রিজ, মোড়, পুলিশবক্স, যাত্রীছাউনী, দৈনিকের পাতায়।
    মানুষের ভিড়, বাক্স বাক্স বাসের বগলদাবা মানুষেরা
    আর ওড়ালসড়ক, মেট্রোরেলের পথ মানুষের ঢেউয়ে সাগরভ্রমাত্মক
    কেঁচো খুঁড়ে সাপ তোলা ড্রেনের পঙ্কিলে আমাদের অচঞ্চল চোখ
    আমাদের দুপুরের চাহনির স্থির নিস্তব্ধতা।
    টিনে বদ্ধ শুকনো সামুদ্রিক অচেতন মাছের মতন
    যান ও বাহন
    আমাদের বদ্ধ আর বমি করে উগড়ে দেয় যখন তখন
    গলাধঃকরণ করার পরপরেই সেসকল অবলীলায় ঘটে।
    ৫২।
    টেকনিক্যাল, গাবতলি, তুরাগের ব্রিজ, আমিনবাজার
    হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, থানাস্ট্যান্ড, সাভার
    রেডিও কলোনি, সিএমভি, বিপিএটিসির পর
    আমাদের অদ্ভুত জাহাঙ্গীরনগর।
    কত অজস্রবার খাচাবন্দি পাখির অব্যক্ততা নিয়ে
    খোপাকার বাহনের জানালার থেকে
    তাকিয়ে তাকিয়ে চলে গেছি দূরে; এসেছি আবার।
    হাইওয়ের ফুটপাথে মৃত ঝোপ, অপার ধূসর ভাগার
    অনতিদূরে ইটভাটা, কৃষকের অর্থপূর্ণ সহজ শ্রমে
    ফসলের আগমনী, বিরান প্রান্তর হয়ে পার
    হাতের ডায়েরিটিকে মনে হল বাস
    বাসের জানালা খুলে দেখে নেয়া যায় অবিকল
    সাইনবোর্ড, সেতুর রেলিং, অর্থবছর… এসকল
    এমনকি কিটস, শেলি, জিডিপি, বাজেট, উচ্চমূল্য সার।
    ৫৩।
    দুশ্চিন্তা দূর অস্ত! আঁধারের পর্দা ছিঁড়ে
    ক্রমশ কুয়াশাভেদি, ভরতের নাট্যমঞ্চে কৃত্য সহকারে
    প্রবেশ করে
    নির্জীব অ্যামাইনো এসিডের মাংসের চিন্তাপ্লুত মন
    মানবজীবন এক ইটভাঙা মেশিনের শব্দের মতন।
    আপন ভূমিকা শেষে স্তব্ধতায় লুপ্ত চরাচর
    একাঙ্কিকার যবনিকায় নিশ্চেতনা; সকলেই দৃষ্টির অগোচর
    কোনদিকে বাজবে না আর সাইন জহুরের সুর
    তখন অস্তির তটে আছড়ে পড়ে পুরনো পাথর-বিচূর।
    সম্ভবত সভ্যতার দিনান্তের রবে
    এই দায় থেকে যাবে শ্রমিকের পাওনার উৎসবে-
    টাকার অঙ্কের সংখ্যায় শোধ করে দিতে হবে প্রেম, ঘৃণা
    ছাড় পাবে না এক কণা।
    ধ্বংসের হাত থেকে শস্যের, সংবাদের
    আগুনের মত ছড়াবে আগুন উস্কে দেয়া ইকবালের
    পাঁজরের মশালের কন্ট্রোলার হবে কি না ড্রাগন নিঃশ্বাস
    কামারের পুঞ্জিভূত গলা কাটা কাস্তের পাশে ঠায় আছে বসে
    তার অপ্রাপ্তির আতপ্ত আশ্বাস।
    ৫৪।
    নির্ণেয় দালানের দেয়ালে লতানো এয়ার কন্ডিশন
    শ্রমিকেরা হাতুড়ি পেটানো শ্বাস মুক্ত করে
    বিমল বাতাসে ইস্পাতগন্ধী কিলোটন- কিলো কিলো টন
    বর্গ, ঘন, আয়ত, ট্রাপিজিয়াম জ্যামিতিক
    বিন্দু বিন্দু সারে সারে বিশ্বময় ঢাকার দালান।
    দালানের ছাদে ছাদে অলিতে গলিতে, মিছিলে, বস্তিতে তার
    দুই কোটি মানুষের মেট্রোপলিটন।
    আন্দিজ, হিমালয়ের বিশাল বিপুল শৃঙ্গময় প্রদেশ, প্রান্তরে
    বিন্দু বিন্দু বল্মীকের স্তুপের গুহামানবেরা
    উত্তর প্রাগৈতিহাসিক বিদ্যুতের তারের সরল, কূটিল রেখায়
    মাকড়শার জালের নিচে দিয়ে মানুষের মাছের মাথার ওপরে কারেন্ট জাল
    ড্রোনশটের ভেতরে দিব্যি হেঁটে চলে যায়
    মানুষেরা; শার্ট প্যান্ট জুতা মোজা টাই-এ ফিটফাট।
    আশ্চর্য গতকাল রাতে
    অদ্ভুত প্রভাতে
    পাপী অহল্যার নিশ্চেতন পাথরে সাড়া জেগে ওঠে
    নির্জনতার কোলাহলে মগ্নতার বোধ যখন ওঠে মেতে।
    স্বপ্নের ভেতর খানিক পাগলামির খড়কুটো
    গৃহের উপপাদ্য প্রমাণীকরণকার্যে নিযুক্তি লাভ করে ঠোটে।
    কাকের বাসার মতো ঝড়ে অস্থিরমতি গৃহবোধ দোলে
    প্রলেতারীয়, ভবঘুরে হৃদয়ের আঙুরক্ষেতের আরো তলে।
    প্রত্যুত্তরের গতকালের রাতে
    প্রভাতের পরের তফাতে।
    ৫৫।
    মীরপুরের সকাল; কোন এক দালানের ছাদ-
    নীলিমার চেয়ে চারদিকে দালানের ধূসরতা বেশি।
    কোটি কোটি জানালায়, বারান্দার গরাদে, ছাদের দড়িদড়ায়
    ঝুলছে জামাকাপড় নির্বাচনের পোস্টারের মত প্যান্ট, স্যালোয়ার কামিজ, ওড়না
    চিলের মতো আকাশে উড়ছে শিশুদের রঙবেরঙ জামা।
    ত্রিমাত্রিক বাড়িঘরের ব্লকের কোথাও কোথাও
    পায়রার খোপ, কার্নিশে চড়ুই, ফিঙে
    ওড়ে যায় তীক্ষ্ণ; লেবু, পেয়ারার বনসাইয়ের দুর্দম তৃণাঙ্কুর ঘেঁষে
    পানির, গ্যাসের লাইন বেয়ে হাহুতাশ নিম্নবিত্তের দীর্ঘশ্বাস আটকে থাকে, বয়-
    নিচে, অনেক নিচে কবরের আন্ডারগ্রাউন্ড
    তরতর গলিপথ; গলিপথে টুংটাং রিকশার মহড়া
    সবজিবিক্রেতার ভ্যান, সেলুন, চায়ের দোকান, আয়রন…
    সমস্ত শব্দকে কুয়াশায় মজ্জমান করে
    নির্মাণাধীন দালানের বাবুই পাখিরা- লোহারু শ্রমিকের যান্ত্রিক করাত-
    ঝালাইয়ের, কাটাকাটির মেশিনের শব্দের ভেতরে ম্লান কুয়াশার ব্যাকগ্রাউন্ড।
    অলিগলিতে বাংলা ইংরেজি সাইনবোর্ডে অস্তিত্বের অসহ্য লঘুতা
    সিড়ি বেয়ে নেমে গেলে পর
    শ্মশানের খুলিময় কঙ্কালের বসে থাকা, ইগোর তরঙ্গ তোলে
    উত্তেজনাহীন দুপুরের বাসের, মাজারের নিরালোক ঈষৎ নড়াচড়ার ভেতরে।
    ৫৬।
    দুর্দান্ত অতীত পলিটিক্যালের গতিশীল স্তব্ধতার বেলা অবসান
    আমাদের যেকোন ইসলামনগর আমাদের অন্তহীন প্রেরণার বান।
    আমাদের বারান্দা, ছাদে উঠার মই, খনির গভীর অতল
    সংগ্রামের নোটবুক সৃষ্টির শুরু এ মফস্বল।
    প্রলেতারীয় বাক-বচন, চালচলন ধূলোপড়া দেহে
    সাভার-আশুলিয়া যেন খ্যাতনামা শিকাগো-ম্যাঞ্চেস্টার
    বিখ্যাতি রয়েছে তার শ্রমঘন কারখানাসঙ্কুল স্নেহে।
    গেরুয়া, পানধোয়া, আমবাগান…কলা ও কাঁঠাল বাগান
    আশুলিয়া শুশুলিয়া পাথালিয়া সেনওয়ালিয়া বিরুলিয়া
    গুশুলিয়া ইত্যাদি অমর আছে; লিরিকের তেঁতুলিয়া বাদে
    গুচ্ছ গুচ্ছ নামের হ্যাঙ্গারে ঝুলে আছে নিরন্ন জীবন
    ন্যাতানো টিশার্টমতো লোপ করে স্বপ্নের আবাদে।
    অসমতল পথঘাট, সৃজ্যমান ধুলো ধুলো মোড়
    রাস্তা নয় যেন লুপ্ত উপনদী শাখানদীর কিছুটা ফ্যাক্টর।
    স্যাঁতস্যাঁতে কাঁকড়ের লালপথ; অতঃপর
    ইসলামনগর।
    এ নগরে আমাদের জীবিকা সন্ধিৎসু ইস্টিশন
    এ নগরে হাট, মেলা, বাজার, ভার্সিটি
    বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, মধ্য আর উচ্চ বিত্তের শহর।
    ছাঁচে গড়া চাহিদারা স্বপ্নের পথের পাথেয় বিকোয় এখানে
    অদূরে বংশীর ধারা ম্লান হয়ে আসে
    অনতিদূরে চেতনার স্মৃতিসৌধ- এই তো নবীনগর।
    আর অদূরেই তার জাহাঙ্গীরনগর
    শালবনের ভেতরে শহর- রাতজাগা চাঁদের আগুনে
    শীতরাতে অনৈতিহাসিক সুপারিবাগানে ব্যাডমিন্টনে
    ইসলামনগর আমাদের চিন্তার বাতিঘর।
    আমাদের গন্তব্য-ঘেষে প্লাটফর্ম-
    তীর্থের স্থান- রক্তের গরম!
    ইসলামনগর যেন আমাদের ফাঁপরের পড়ন্ত মাচান।
    ৫৭।
    বাঁশ কাঠ টেবিলের টুকরো বেঞ্চির ফিমার
    অনার্দ্র উদ্ভিদের লাকড়ির ডালপালার
    স্পন্দিত প্রোজ্জ্বল আগুনের শিখামালা
    জ্বলে উঠে হোমাগ্নির উষ্ণতায় হৃদয়ের বিক্ষিপ্ত
    দমিত অবসর; শীতের নির্মেদ রাতের পালা।
    একটি শীতের রাত, একটি নির্ঘণ্টিকী মৌসুম
    প্রাগৈতিহাসিক বরফযুগের
    সুপারি ও নারকেল বাগানের
    জাহাঙ্গীরনগরের ব্যাপ্তিলাভ করে।
    শৈশবের শাসানির নিষিদ্ধ গিটারের মদমত্ততা
    ওপারের উষ্ণতার মহাকালের সবুজ অঙ্গারে
    উত্তাপের উৎস হয় ভ্যান গঘের পাঁজরের হাড়ের মশাল
    ছাইরূপে পড়ে আছে উত্তুঙ্গ মৃত্যুর সূর্যমুখী অনেক প্যাঁচাল।
    করোটির অঙ্গার তার থেকে অন্য অসংক্রামক
    রূপকথার প্রতীতি জন্মে অন্য হাস অন্য আলো
    অন্যান্য ঘোড়ার।
    প্যালেটের স্ট্রোকের নিয়ন সাইনে হাইপারসনি
    টকটকে কমলারঙ জোনাকির আগ্নেয় বিস্তার।
    অলস নৃত্যগীত পৃথিবীর পরিধির ক্ষেত্রের তলে
    মাতিসের সঙ্গীতের যৌথতার গলন্ত যখন
    অনুরাগ, উষ্ণতার সংগীতের লাভার সঞ্চার।
    ৫৮।
    যেখানেই যাই দেখি সৃজ্যমান সিভিলাইজেশন-
    বাসের খুড়ে তোলা পথ, মরণোন্মুখ নদ, অটোর স্টেশন
    অটোমেশনে রত পাখালি, গেরস্থালি, ভূমিষ্ট প্রজাতি
    লাতিন পানার ফুলে আনারস; মনে হয় না তবু বিলিতি মতন।
    জ্ঞানের মতই তারা ছড়িয়েছ; শ্যাওড়ার মত তার জ্ঞাতি
    বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র যেন সেদ্ধ চায়ের আতিপাতি।
    কালিঝুলি ছাপরার নিচে ধোঁয়া ওঠা স্তুপাকার চায়ের অঙ্কুর
    তদের ঘ্রাণ ছড়িয়েছে শীতের সূর্যের তাতে মিশে আছে সুর।
    পৌষ-সন্ধ্যার সবিতা যেন আপেলের মসৃণতল কমলার ঘুড়ি
    বাসের জানালা থেকে খেজুর তাল বাঁশঝাড় ব্যানারে লুকোচুরি।
    পোষা কুকুরের প্রায় পায় পায় চলে আসে সূর্যের রাবারের বল
    থেমে গেলে সেও থামে; কদমের ডালে একফোঁটা কুসুম-অনল।
    গাজরের মত সূর্যের রঙ মেখে আবেগের মত কেঁপে
    সশরীরে প্রাণ- প্রাণী, উদ্ভিদের জীব সবদিক রয়েছে ব্যাপে।
    মৃত্যুর উন্নাসিক হিমেল তুফানে মন যেন ছেঁড়া ঢেউটিন
    পেপারক্লিপে আটকে থাকা দেহ নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যাত্রার কঠিন।
    পথপার্শ্ব জুড়ে দৃষ্টিতে পোড়াদেহ শ্রমিকের ভাটার মিনার
    প্রার্থনার অনুরূপ শ্রমদিবসের ভাগে আপাত অস্ফুট আগ্নেয় বয়লার।
    তারা কাজ করে, বিড়ি খায়, বসে মৃত্তিকার ঘাসের সোফায়
    স্বীকৃতির কামনাহীন মুখ মোছে ধুলোর ন্যাকড়ায়।
    এইসব ভাবি বসে বাতাসের বেগে সব বাতাসে যখন
    আসে যায় মুখাবয়ব; জানালায় অদৃষ্ট বাতাসের মতন।
    ৫৯।
    মোমের মতন
    সুরদাসের চোখগলা রক্তের কবোষ্ণ লাভার গরল
    যেন চলতি পথের অস্থানে আহত জীবাশ্ম
    শামুকের শরীরের ভেতরের মাংসের তন্ত্রের কালো
    নোনতা তরল।
    সভ্যতার পলিবাহিত পরতের নৃতাত্ত্বিক বরফের
    চাইয়ের অতলের থেকে উঠে আসে।
    এ আমার মজুরি দাসত্বের শ্রমের থেকে ঘামের মত
    উঠে আসে গলা খাঁকারি কেশে
    খ্রিস্টোত্তর কুয়াশার ভজঘট সমারোহ
    সভ্যতার পথের অন্তিমে
    গোত্রের যুগের ফ্রাত্রির সম্ভাবনা আদিম তবু
    শিরিষের অপল্লব বীজধৃত শিমে।
    একপতিপত্নির উপন্যাসের বৈবাহিক বানোয়াট
    ইজারা দলিলে
    মন আমার জাল প্রেম রেলপথে স্লিপারে রাখে ফেলে
    সিগনালে লালবাতি; প্রেম তার শরীরের শব রেখে যায়
    অঘটনের অগোচর প্রকৃত প্রেমের পরকীয়ায়।
    লুপ্ত অথচ কল্লোলিত ইরকোয়াস বিভাস তালিমে
    এককোষী উষ্ণতম সংকীর্ণ বুনো বিমূর্ত ডিমে
    রেললাইন যেন পাঁজরময় ডাইনোসরের মেরুদণ্ডের কঙ্কালের হাড়
    এরকম বাস্তব প্রাক্কালে।
    প্যাট্রিসিয়ান, প্লেবিয়ান ছাড়ানো দূর আদিম সমাজে
    সমাজ যেখানে ছিলো; রাষ্ট্র তার সহোদর পুলিশের ব্যাজে
    ম্যানেজার, ম্যাজিস্ট্রেট, বিমূর্ত তন্ত্রের আমলা
    ছিলো দূর, দূর পরাহত।
    জিনোমে এখনো কি রয়ে গেলো দুর্নিবার সেসকল
    বর্বর টোটেমের ঘোড়া?
    ব্রোঞ্জের যুগেরও আগের অনিকেত, বেদুইন
    দৃষ্টির সংগুপ্ত বিস্তার;
    সীতাকুণ্ডের, নায়াগ্রার, এঞ্জেল ফলসের
    জলের ফোয়ারা?
    নইলে আর
    কে আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিলো পার্ট ভুলে যেতে
    ইশারায় অন্ধকারে বসে থাকা নিয়মের নিশ্চয়ই সে
    যাত্রার দলের প্রম্পটার।
    ঐতিহাসিক সে বিশ্ব পরাজয় স্ত্রীজাতির ঘটেছে নাকি?
    বিভাজিত শ্রমে রৌদ্রে
    মন্দ্র অভিসার-
    প্রজাতির সকলেরেই দিয়ে গেলো অবশেষে ফাঁকি
    কী থাকলো বাকি?
    উৎপাদককেই পণ্য করা সমূহ কর্পোরেশনের
    সমূহ ডাকাতি বণিকী
    গুগল, মেটা, অ্যালফাবেট; টিকটক- কর্পূর টুইটার?
    কী রয়েছে বাকি স্বর্গের চালাকি যদি নিহত
    ঈশ্বরেরই শব
    তীরভাঙা কালনিকূলে মেনে নিলো সমাধিভাঙা
    ভূমিহীন ব্যক্তিগত ক্ষত, পরাভব
    দানিয়ুব, রাইন, ফোরাত, নাইল, আমাজন
    ভূমধ্য ও কৃষ্ণ সাগরের পাড়ে উদ্বাস্তু কেঁদে ফেরা
    আমার মতন
    আরো কেউ রয়ে গেছে নিয়ানডার্থাল, ইরেক্টাস,
    পিথাক্যানথ্রপাস, স্যাপিয়েন্সের পূর্বে ও পরে
    এথেন্স, কনস্টান্টিনোপল, সোনারগাঁ, মুর্শিদাবাদ,
    ঢাকা, দিল্লি, মুম্বাই, করাচি, লাস ভেগাসের পাড়ে।
    মানুষ আন্তর্ণাক্ষত্রিক হয়ে উঠে, তবু
    কেউ কেউ আমি মেতে উঠি আপতিত বিকারের
    দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগরের
    কুকুর কামনার যোনির ঝিনুকের জ্বরে।
    তবু মনে রাখা ভালো
    প্রাচীন গুহাজীবনের ধাতবগলানো আদিম আগুন;
    আরণ্যক, প্রস্তরিত, পাললিক আঁধারের আলো
    আমাদের প্রত্যাশার ভবিতব্য নয়; ছিলো না কখনো।
    দাসব্যবসায়ী সিজারের রোম, ফারাওদের নীল মিশর
    অথবা গির্জার সাম্রাজ্যের ভূমির বিস্তার,
    ভূমিদাসত্বের অন্ধকার-
    সামন্ত রাতের কালো মধ্যযুগ
    বাজার, বণিক, পণ্য, বিনিময়, বিনিয়োগ
    হোক ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা কুষ্টিয়ার
    কোথাও অস্বপ্ন ছিলো রেড়ির তেল শোষণ করার
    বনভূমি থেকে দূর দীঘল চাবুকের মত কুপির
    সলতে পাকিয়ে
    লম্বা প্রাচীন রাতজুড়ে ট্রয় গ্রিস নগর গড়ার।
    প্রতিশ্রুতি ছিলো যেন উপনিবেশিত
    সম্পত্তির জাত
    তৈরি করে দিতে হবে নাগরিক আলোর প্রাকার।
    অথবা হেগেলের হিসেবের ক্যালকুলেটরের
    মধ্যাহ্ন দুপুর-
    তার আগেকার ভোর;
    সেইসব প্রত্যুষে, প্রদোষে
    না থাকার কথা নয় আজকের আমার।
    মধ্যযুগ জুড়ে দেখি গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও
    যখন নেয়নি জন্ম লেনিন কি কমরেড মাও
    মালিকানা, পরিবার, কারখানা- সেসব অনেক ব্যাপার
    তখন জন্ম হয়নি রেনেসাঁর
    ইউরোপ, ইউফ্রেটিসের মধ্যযুগ নিজেই সামন্ত প্রভু যেন
    জমিদার; তারা সব পর্বত আকার
    নগরময় আদিপত্য তার।
    সে কবে বিদ্রোহ করেছিলো দূর স্পার্টাকাস
    ফকির-সন্ন্যাস আর তেভাগায়; গারো, সাঁওতাল
    স্বদেশী সন্ত্রাস-
    খ্রিস্টীয় শতকের সেসমস্ত রাতের শিশিরে
    সেই সব শেয়ালেরা
    জ্যোৎস্নায় ঝলসানো মাংস চেখেছিলো
    শুষে নিয়েছিলো রক্তাক্ত তৃষিত নিঃশ্বাসে
    মানুষের বেওয়ারিশ উষ্ণ রক্ত
    মানুষের হাড়ে ঢেরা পিটিয়েছিলো শকুনের প্রতীকেরা
    মানুষের চামড়ায়।
    তারাও- হায়েনারা; একশ বছরের পরে মৃতপ্রায়।
    তাদের তরে আর শোক করার নেই কেউ
    সাম্রাজ্যের ইঙ্গ-মার্কিন শোকাকুল সেনারা তার ফেউ
    লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, কোরিয়ায়
    বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, ভিয়েতনাম, ঢাকায়।
    একজন কেউ পদ্মাপুরাণের থেকে উঠে এসে
    তুলসীদাসী পুঁথি, ভেলুয়া, মহুয়া, মলুয়ার পালায়
    মাহফিলের অলস আঙ্গিনায়
    চাদরে জড়ানো শীত নিয়ে কেউ আসে
    শিশিরে নেশাতুর আমার চোখ ভিজে যায়।
    তাদের ওয়াইনের গোত্রবদ্ধ অনুমেয় ঘ্রাণ
    একদিন ছিলাম যেখানে পার্বত্য রেড ইন্ডিয়ান
    মনে হল যেন সেখানের জলসার নাচের থেকে
    একুশ শতকের রেললাইনে পড়েছি ছিটকে
    টঙ্গী অথবা কমলাপুরের এই ইস্টিশনে
    সালিশের মাঝখানে
    অভিযুক্তির আবিষ্কারে; অবাক তার কাঠগড়ায়।
    ৬০।
    রাস্তাকে মনে হয় নদীর মত; তার আছে শাখা-প্রশাখা,
    নদী-উপনদী; তীরে তীরে তার মানুষের বাড়িঘর, বালি।
    পুরনো ভাঙা, পরগাছা জড়িত পোড়া ইটের জমিদার
    বটের শ্যাওলাধরা বাড়িগুলোর প্রত্নতত্ত্বে সময়ের সুপ্রাচীন ভয়,
    বিস্মৃতি, বিস্ময়
    তেমনতর বাড়িগুলো নানাভাবে সাপ শেয়াল পেঁচা
    গিরগিটি, সরীসৃপ, পাখির আশ্রয়।
    পুরনো, ভাঙা, মৃত সামন্তের মনোভূমি আজ যখন আর অক্ষয় নয়।
    জলসাঘর, বৈঠকখানা, কাচারি, নায়েব-গোমস্তা-
    অন্তঃপুরের পুরোভাগে এনেছে অবক্ষয়
    নগদ টাকার কাছে তাদের হয়েছে পরাজয়।
    পরাজিত সেসমস্ত সাধনার উইঢিবি-ঢাকা আছে তাদের মন্দির।
    মানমন্দিরে মরে আছে পুরোহিত; শাপগ্রস্ত তাদের হৃদয়
    তাদের আশীর্বাণীর দেবদাসীরা তাদের করেছিলো সেক্সটয়।
    কালের স্মৃতির মত পুরাতন বৃক্ষদের দেখে আজ
    পৌরাণিক দেবতাদের, ঋষিদের, বৃক্ষদের মনে হয়
    পৃথিবীর স্থলজ ভূগোলকে ড্রোনশট করার সময়।
    পার্শ্বচারী দৃষ্টিরেখা- ধুলোবালি, মলিনতা, হাওয়া
    পোস্টার সাইনবোর্ড ব্যানার বিজ্ঞাপন;
    কাঁকড়ময় পথপার্শ্ব দেখে দেখে পথকে নদীর মত মনে হয়;
    নদীর মতন তারা অন্তঃপুরে অমসৃণ ভূমিরূপ নয়।
    ভূমির সর্বস্ব তারা- ইট, পাথর, পিচে
    ফুলে ওঠা, ফাঁপা, তেলে-ভাজা ইস্টঋদ্ধ ময়দার গরিমাময়।
    পথের দুপাশে চামর দোলায় কলার গাছের তোরণ
    সেসমস্তই অজস্র পূজার জলঘট
    অন্ধকারে না থাকালেও তাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়
    আমাদের মাথার উপরে ঝুকে থাকে অন্ধকার বন
    নারকেল, সুপারি, পেয়ারা, বাঁশঝাড় একটানা ঠায়।
    বাস যেন বাস নয়; তারা সব তিমি;
    হাঙরের উপমা হবে চলমান একেকটি ট্রাক
    মোটরবাইকের শোরুমে উঁকি দেয়ামাত্র দূর
    আস্তাবলের স্মৃতি চলে আসে-
    বাইকগুলো যেন সব সারে সারে ঘোড়ার কঙ্কাল।
    লাঠি লজেন্স কেউ যেন রোপন করে দিলো
    লাল-সাদা ডোরাকাটা বামন খাম্বা
    নদীর ঢেউয়ের মতো পথের সেতুর আগে পরে।
    ইতস্তত নানামাত্রিক ছোট ছোট অপদেবতা, করদ রাজা
    ছোট-বড়-মাঝারি বৃক্ষের জন্মলাভ করেছে কলিযুগে
    হাওয়ার ওড়াওড়ি; সেসব সাগরে তারা
    প্রতিসরিত তীর্যক রেখারা
    ঈষৎ উল্লম্ব কেউ আনুভূমিক কেউ কেউ; বিচ্ছিন্ন বিপন্ন
    গলুইয়ের মত কাঁপে, ভাঙা ভাঙা ছায়া ফেলে
    ফেলে রাখা সেইসব চাকার উপযোগিতার জৈব, অজৈব
    কংক্রিট খাম্বারা।
    কাঁপে তারা তরঙ্গিত বাতাসের স্রোতে।
    কেউ কেউ দোল খায়, টলে
    গাছেরা
    কবন্ধ; বাদুড়ে-খাওয়া তাদের অনেকের মাথা।
    জীর্ণ কাপড় যেরকম বাতাসের তোড়ে উড়ে যায়
    পড়ে থাকে ছাতাহীন ব্যাঙের ছাতা
    সেসকল গাছেদের অনেকের উড়ে গেছে মাথা।
    ঘাড় ঘোরালেই দেখা দেয় একফালি আনারস
    নাকি কমলার এক কোয়া
    কামড়ে ফেলা ভাপা পিঠা নাকি চিতই আকাশে ঝুলছে
    ভাঙা চাঁদ সেসময় শীতের রাতে
    কুয়াশার ঘ্রাণ
    পৃথিবীর নাকের ডগায় বাতাসে ছড়িয়েছে।
    ট্রেনের জানালা যেন আমারই গায়ের চাদর
    মাঝেমাঝে চাদরের খুঁট টেনে হিমেল হাওয়ার আঁচ নিই।
    ভূতের গল্পপাঠের রোমাঞ্চ, ভয়ালতা
    আজ এই একুশ শতকে
    সংরক্ষিত অভয়ারণ্যে আমারে তাড়া করে ফেরে।
    ট্রেনের জানালার চাদরের ফাঁকে
    বাসের জানালার আর্কটিক শীতে
    অবতল জানালায় ভেতরের নীল আলো খেলে
    বাইরের নানান আলোকে।
    বিভ্রম তৈরি হয় নিজেকে বাইরে দেখার তাতে।
    বুলেটের মতো আচমকা চলে যায় কানঘেষা বাহন
    বসে থাকা আমার চলমান বাহনের বিপরীতে।
    কাচের দেয়ালে কম্পমান কোচের দোলনা
    তার প্রতিবিম্ব চুরমার হয়ে পড়ে
    হাইপারসনিক শব্দের ভিড়ে।
    হর্নের ধমকে
    চাঁদের ভাপাপিঠা-তার থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে
    যত্রতত্র চিনির দানার মত সারারাত তারারাজি।
    বিদ্যুতের খুটি কেন কবরের যত্রতত্র
    সারি সারি ক্রুশের আকার?
    পরস্পর সমান্তরাল নিঃসীম অনেক ক্যাবল
    কোয়ান্টাম কণিকার গতির মূর্ততা যেন তার
    শ্রমের শুরুর থেকে অনিঃশেষ সূত্রতার সারারাস্তা ধরে।
    সূর্য ডোবে গেলে পরে
    পৃথিবীর আহ্নিক আঁধারের ভিড়ে
    আলো জ্বলে যখন তখন ইখনাটনের প্রার্থনার শেষে
    নক্ষত্রের ছিটেফোঁটা অন্ধকার পৃথিবীতে ভেঙেচুরে পড়ে।
    ইস্পাতের গন্ধময় লৌহযুগের নির্মাণের বাজারে
    ওয়ার্কশপের ঝালাইয়ের যেন তীব্র আলো জ্বলে
    কুয়াশায় ঘিরে রাখা রাতের আঁধারে
    ডালিম, কমলা, আপেল, আঙুরের প্রায় জ্বলে
    বালবগুলো
    ডাব যেন বাবুইয়ের থোকা থোকা নীড়
    ডাবের জলধৃত ক্যাকটাসে উটের গলার বাওবাব গাছ।
    টিউবলাইট জ্বলে শীতল শসার মতো বুক তার ডাব।
    আমোদের মদে ঠোট লাল করে চুন পান ঘষে
    গল্পের মশগুলে
    সহযাত্রীরা বসে আছে রেস্তোরাঁয় সেরকম ঠেকে।
    নীলালোক নিচে
    নোকরি, শাদি, নিন্দা, স্তুতিতে, মদে, মশকরায়
    চোখে পড়ে আদিগন্ত সর্ষের সতেজ সবুজ
    সহযাত্রীরা নির্বিবাদে ক্ষয় মৃত্যু আকস্মিক নয় এমন ভাবে
    সত্য নয় রকমের ভুলে যায়।
    যখন সড়কের মসৃণতলে একবাস লোক
    ক্যারমগুটির মত পিছলে চলে যায়।
    যেতে যেতে ডানে বায়ে, সামনে পিছনে
    ড্রাইভার নুহ নবি নির্ঘাত দেখতে শুনতে পায়
    কাচা ও পাকা লঙ্কার তেজোময় চেতনা
    পতাকায় রঞ্জিত জলপট্টি
    পতাকার রঙে রঞ্জিত জলপট্টি জ্বরগ্রস্ত লোকটির মাথায়।
    প্রধান পালনীয় দিবসের সবুজ আর লাল ঝাড়বাতি
    তার কাছে হয়ে আছে ঘৃণিত আরতি
    সে যখন কাটা পড়ে রেললাইনে, জ্যামে
    একান্তর, বিপ্রতীপ কোণের জ্যামিতি
    হয়ে পড়ে থাকে হাড়
    ভাঙা এক হালের আকার
    যখন দেখে সে তীরবর্তী ধুলোপড়া গরীবের
    চায়ের দোকান- টংঘর- সংসারের স্তুপাকার
    ঘাটে বাঁধা বেদেদের ডিঙির মতো চালাসহ
    ঢেউয়ে দুলে বহুদিন একদিন খেয়ে গেলো মার।
    পথে পথে মসজিদ তাকিয়ে আছে তার দিকে চোখ রেখে
    মসজিদ্গুলো যেন মুসল্লির হৃদয়ের ফিলিং স্টেশন
    একেকটি সিগারেট একেকটি কবিতার অবসরের মতন।

    6
    2 Comments
Skip to toolbar