-
অনুপ্রাণনা -২
ও বলেছিলো, অরিনদের বাসায় যেতে হবে আর তার আগে একটা বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড প্রিন্ট করতে হবে যেখানে আমার আর ওর নাম লেখা থাকবে ]
আমি তারপর জিজ্ঞাসা করলাম ।
-আপনি কি সিরিয়াস ?
রিদা – আপনার কি মনে হয় ? এইভাবে জীবন কাটবে আপনার ? আপনিকি জানেন যে এটা আপনার সেকন্ড লাইফ ? আপনার যে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিলো তাতে আপনার ব্রেইন হ্যামারেজ হয়ে এতোদিন কবরবাসী হওয়ার কথা কিন্তু আল্লাহ্’র অশেষে রহমতে তেমন কিছুই হয়নি । আর আপনি আবোল-তাবোল খেয়ে সেই জীবন ধ্বংস করে যাচ্ছেন কার জন্য, আপনার লিভারের অবস্থা জানেন আপনি ? এমন একটা মানুষের জন্য, আপনি যার চোখের বালি । আচ্ছা সে নিজেকে কি মনে করে ? শুধুমাত্র তার কিছু কথার জন্য আপনার জীবনের ট্রেনটা সম্পূর্ণ ভুল ট্র্যাকে চলে গিয়ে একটা ডেড এন্ডে ধাক্কা মারতে চলেছে আর সে কিনা এরকম একটা অসম্পূর্ণ সিগন্যাল দিয়ে নিজে ডানা মেলে আপনার জীবনের ধ্বংসস্তপের উপর উড়তে চলেছে this is not fair.আমি – এতে হয়তো তার কোন সীমবিদ্ধতা ছিলো।
রিদা – সীমাবদ্ধতা না, ছিলো অবজ্ঞা ও দ্বায়ীত্বজ্ঞানহীনতা । সে শুরুতেই যদি আপনাকে ভুল ট্র্যাকে না তুলে দিতো তাহলে আপনাকে এভাবে বিদ্ধস্ত হয়ে ধ্বংসের পথে ধাবমান হতে হতো না।আমি- কিন্তু আপ…
আমাকে থামিয়ে দিয়েই রিদা বললো, আর কোন কথা না সময় নেই।
আমি- কিন্তু আপনি তো আমাকে ঠিকমতো চিনেন বলেও মনে হয়না।
এবার রিদার মুখ না, হাত চললো মানে সরাসরি কোন কথা ছাড়া গিয়ার-লিভার ঠেলে দিলো, ভাগ্যিস আমার ব্রেক প্যাডেলে পা ছিলো।এখন ব্যাপারটা আমার ব্রেইনের প্রসেসিং ক্ষমতার বাইরে দিয়ে যাচ্ছে, তাই আমি নিজে কিছু ভাবার চেষ্টা না করে জাস্ট ওর কমান্ড ফলো করে যাচ্ছি।
প্রথমে গেলাম মিরপুর ১০ এ একটা প্রিন্টারের দোকানে । দোকানে যে ছেলেটা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে সে বেশ দক্ষ দশ পনের মিনিটের মধ্যে একটা দারুন কার্ড ডিজাইন করেফেলেছে সে । কার্ডটা দারুন হয়েছে । একটা কার্ডই প্রিন্ট করা হলো ।এখন যাচ্ছি অরিনদের বাসার উদ্দেশ্যে মানে যাত্রাবাড়ির দিকে । এই বিজয় সারনীর জ্যামে যখন বসে আছি তখন হঠাৎ মাথাটা ঘুরে বমি আসতে লাগলো । গাড়িতো জ্যামে দাড়ানো, আমি বমি আটকাতে কোন মতে এসিটা বাড়িয়ে সিটা চিৎ করে ফেললাম ।
রিদা আমার এই কান্ড কারখানা দেখে গাড়ি থেকে নেমে গেল, আমি যে জিজ্ঞেস করবো যে কোথায় যাচ্ছেন এখনি সিগন্যাল গ্রীন হয়ে যাবে সে অবস্থা আমার ছিলোনা ।
ও এসে ড্রাইভার সাইডের ডোর ওপেন করে বললো,
– একটু কষ্ট করে সেকেন্ড সিটে যান ।আমি একটু ধাতস্থ হয়ে বিশেষ এক কায়দায় গাড়িথেকে না বের হয়েই সেকেন্ড সিটে চলে গেলাম । ও বসলো ড্রাইভিং সিটে। ভালোই চালায়। অন্তত আমার মত গাড়ি চালাতে চালাতে গালি-গালাজ করে অন্য বেহুদা ড্রাইভার, আর হুট করে সামনে চলে আসা ব্রেইন লেস পাবলিকের গুষ্টি উদ্ধার করেনা, দেখেন এর মধ্যেই আমার মনে মনে গালি-গালাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে সাধারণত এই শব্দ বোমা জনসম্মুখে প্রয়োগ করিনা৷ জ্যাম ঠেলতে ঠেলতে যাত্রাবাড়ী চলে এসেছি, সেকেন্ড সিটে বসে ওকে ডিরেকশন দিতে মন্দ লাগছেনা। এরই মধ্যে আমার ছোট ভাইকে বলে প্ল্যান অনুযায়ী আব্বুর ফোনটা আব্বুর কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
আমরা অরিনদের বাসার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। আমি রিদাকে জিজ্ঞেস করলাম কাজটা করা কি ঠিক হচ্ছে, মানে এই কাজের অর্থ কি?
রিদা বললো- করেই দেখুননা, বাকিটা পরে দেখা যাবে।আমি অরিন দের বাসার কলিং বেল টিপলাম।
এখানে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলাম যে আজ আমার মধ্যে কোন উত্তেজনা কাজ করছেনা নিজের ভেতরটাকে সমুদ্রের হাজার মিটার গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন শান্ত নিরব তলদেশের মতো লাগছে অথচ আগে নিঃশ্বাসে তুফান বয়ে যেত৷ আজ অরিন বাসায়ই আছে, ওর রুমের জানালাটা এদিকেই৷ রুমে লাইট জ্বলছে। ওর হাজবেন্ট হারামিটাও সম্ভবত আজ এখানেই আছে।ইচ্ছা করছে M249 light machine gun দিয়ে যতক্ষণ তৃপ্তি না মিটবে ততক্ষণ গুলি চালিয়ে শালার বুক ঝাজরা করে দেই। কিন্তু কিছু করার নেই। রিদা মৃদু ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি ভাবছেন ?
আমি- কিছু না, তবে আজ এখানে আসা ঠিক হয়নি চলেন ফিরে যাই।
রিদা- কেন ? এতোদুর আসলেন আবার ফিরে যেতে চাইছেন, কি ব্যাপার বলুন তো ?
আমি- আসার সময় তো জানতামনা যে অরিন বাসায় থাকবে আর সম্ভবত ওর হাজবেন্ডও।
রিদা- কি করে বুঝলেন ও বা ওরা বাসায় আছে ?
আমি- অরিনের রুমের দিকে ইশারা করে বললাম ওটা অরিনের রুম, আলো জ্বলছে । ওর রুমে ও বা ওরা ছাড়া এই সময়ে অন্য কারো থাকার কথা না।
রিদা – যদি সত্যিই, কি যেন নাম ? হ্যা অরিনরা বাসায় থেকে থাকে তাহলে ব্যাপাটা আরো ভালো। আমি শুরু থেকেই এটাই ভাবছিলাম যে ওরা যেন বাসায় থাকে।
তিনবার বেল বাজানোর পর কারো নেমে আসার আওয়াজ পেলাম ।
বিভীষন (অরিনের ছোট ভাই) এসেছে দরজা খুলতে। ইচ্ছা করছিলো নাক বরাবর একটা ঘুষি মারি, ইচ্ছা সংবরন করে চেহারাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করলাম। তবে বিভীষন আমাকে এই সময়ে এখানে আশা করেনি । ওর মুখে ভয় বা কোন অঘটনের আশঙ্কা স্পষ্ট।সে দরজা খুলতে খুলতে বললো,
– ভাইয়া কেমন আছেন ?
আমি – ভালো, অরিনরা বাসায় মনে হয় তাই না ?
– হ্যা ।
আমি- ওর বিয়ের সময় তো আমা দাওয়াত ও দিলেনা ! অনেক দিন কারো বিয়েতে যাওয়া হয়না তাই ভাবলাম নিজেই বিয়ে করে নেই । রিদা কে দেখিয়ে বললাম,
তোমার হবু ভাবি রিদা। ওর এক বান্ধবীকে আর তোমাদের সবাইকে কার্ড দিতে আসলাম।
রনি (অরিনের ভােইয়ের নাম) রিদাকে সালাম দিয়ে বললো ভিতরে আসুন বাইরে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকবেন ?
আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো- আপনার তো জানার কথা, চাচা-চাচীরা তো এসেছিলেন। আপনি আসেননি দেখেই বরং আমি অবাক হয়েছিলাম।বেচারার মুখ দেখে বোঝা গেল এখন সে দুঃশ্চিনতা মুক্ত হলো । ভালোই হলো, ওর ওই ফ্যাকাশে মুখ দেখে ওকে ভুতের মতো লাগছিলো, এখন আর তেমনটা লাগছেনা ।
ওপরে যেতে যেতে আমি বললাম, জানোতো আমি আলাদা থাকি। আমাকে কেউ জাানায়নি। যাক বাদ দাও । চাচা বাসায় আছেন ?
রনি- হ্যা।
দরজা খোলাই ছিলো আর অরিন ওর হাসবেন্ড আর চাচা ড্রইংরুমেই বসে ছিলো। আমাকে দেখে চাচা খুব একটা অবাক না হলেও অরিন ভুত দেখার মতো চমকে গেল আর হাজবেন্ড, ও শালার আমাকে চেহারায় চেনার কথা না তাই সে স্বাভাবিকই থাকলো।আমার চাচাকে সালাম দিতে ইচ্ছা করলোনা তাই সালাম দিলামও না, লোকটা মাত্রাতিরিক্ত দাম্ভিক। কিন্তু রিদা সালাম দিয়ে দিলো।
চাচা- এনাম তোমার তো দেখাই পাওয়া যায়না, অরিনের বিয়েতেও আসলে না। কোন কাজ তো করো না, থাকো কোথায়? আর উনি কে ?এইযে, খোঁচাটা মারলো এটাই তার স্বভাব। নিজে একজন উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা তাই বাকিদের তিনি মানুষ বলে গোনে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারন আছে এবং ভদ্রভাবে অপমান করায় তার কোন জুড়ি মেলা ভার তবে লোকটা সৎ।
আমি উত্তর দিলাম – এই ঘুমিয়েই থাকি বেশিরভাগ সময়, কি আর করবো আর মাঝে মাঝে উবার চালাই। [ কথাটা সত্য না, চাকরি ছাড়ার পর আমি যে বিজনেসটা দাড় করিয়েছি সেখানে উনার মেয়ের জামাইয়ের মতো ৫ চাকরী করে ] আর ওর সাথে সম্পর্ক এই কার্ড টা পড়লে বুঝতে পারবেন বলে কার্ডটা উনার হাতে দিলাম।
চাচা কার্ডটা রিদাকে বললেন তুমি ডাক্তার!?
রিদা – জ্বী।
সে যে অবাক হয়েছে তা তাঁর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো? এখন তার ব্রেইন উবার ড্রাইভার আর ডাক্তারের সম্পর্কের সমীকরণ মিলাতে ব্যাস্ত।অরিন প্রথমে সীমাহীন বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো। কিন্তু এখন ওর দৃষ্টিভঙ্গী তেমন নেই । এবং সে আমাকে জাস্ট বরাবরের মতো ইগনোর করে চলেছে এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে এইযে তার ইগনোর করাকে আমি এখন থোড়াই কেয়ার করছি ।
চাচা এতক্ষনে আমাদেরকে বলছে তোমরা দাড়িয়ে আছো কেন ? বসো, তাই বলে চাচি কে চা দিতে বললেন।
আমি বললাম – চাচা এমইতেই রাত হয়ে গিয়েছে, অন্য একদিন আসবো ।
চাচা- আরে বসোইনা । ড্রাইভার গিয়ে তোমাদের নামিয়ে দিয়ে আসবে।
আমি- ধন্যবাদ চাচা, তবো আমাদের সাথে গাড়ি আছে ।
চাচা- তাহলে আর সমস্যা কি ?
আমি গিয়ে বসলাম অরিনের হাজবেন্ডর পাশে আর রিদা আমার দিকেরই একটা সিঙ্গেল সোফায় ।
চাচা অরিনকে প্রশ্ন করলেন তুমি কোন মেডিকেল কলেজে ছিলে ?
রিদা- এ. এফ. এম. সি [ Armed Forces Medical College ]
চাচা – তোমার বাবা কি করেন ?
রিদা – আমার বাবা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জরুল ইসলাম।[ এইবার আমি অবাক না, সিরিয়াস লেভেলের ধাক্কা খেলাম।৷ ওর বাবা মা দুজনকেই আমি খুব ভালো ভাবে চিনি এবং তারাও আমাকে সেভাবেই চেনেন। রিদার মা একটা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল। উনাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের যাবতীয় কাজ আমার কোম্পানি করেছে, ওদের বাসায়ও আমি দু-তিনবার গিয়েছিলাম কিন্তু ওর সাথে কোনবারই দেখা হয়নি। আমি লেখালেখি করি ঠিকই কিন্তু আমার পাঠকের সংখ্যা খুব বেশি না তাই প্রথম দিন ও যখন বলেছিলো “আমি আপনাকেও চিনি। প্রথমে চিনতে একটু দেরি হয়েছিলো কারন আপনার ব্লগে আপনার চশমা পরা ছবি দেওয়া ছিলো তবে ড্রেসিং এর পর আর কোন ডাউট ছিলোনা। আমি আপনার ব্লগের একজন ফলোয়ার” তখন আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এসেছিলো যে ও আমার ব্লগের লিংক পাইলো কই ! তার মানে আমাকেও কেবল ব্লগের ছবি দেখেই না, বাস্তবেও আগে দেখেছে । যাই হোক ধাক্কাটা আমি সামলে নিলাম ]
চাচা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – তো উবার চালিয়ে কিরকম ইনকাম হয় তোমার ?
আমি- কোন ফিক্সড ইনকাম নেই, ফ্ল্যাট ভাড়া আর হাত খরচ উঠে গেলেই চলে ।
আমার এরকম দ্বায়ীত্ব জ্ঞানহীনের মতো উত্তরে সে আমাকে আরেকটা খোঁচা মারার স্কোপ পেয়ে গেলেন ।
চাচা- তো ঘরজামাই থাকার পরিকল্পনা নিশ্চয়ই ।
আমি – না । সেরকম পরিকল্পনা নেই ।আমি চা পানে মনোযোগ দিলাম, চায়ে চিনি কম হয়েছে । সরাসরি অরিনকেই বললাম চায়ে চিনি আরেকটু লাগবে, দিয়ে নিয়ে আসেন তো ।
সে কাপটা হতে নিয়ে চলে গেলো ।
হুম এইবার চিনি ঠিক আছে । আমি অরিনের হাজবেন্ড বললাম যে বোনের বান্ধবী হওয়ার সুযোগটার ভালোই কাজে লাগিয়েছেন । [ আর তার কানের কাছে আস্তে করে দ্রুত বললাম যাতে কেউ শুনতে না পায় সেই প্রথম থেকেই আমার সন্দেহটা ছিলো কিন্তু আপনার আরেক ভাই সম্পর্কে, কারণ আমি আপনাকে চিনতাম না ! ]
আমার এই কথায় সবাই চুপ হয়ে গেল,আমি পরিস্থিতি স্বভাবিক করার জন্য বললাম, আরে দুলাভাই আপনার সাথে মজা করলাম। বিয়ের সময় তো আসতে পারিনি..
আরো কিছু বলতে যাবো তখন এক লোক এসে চাচাকে বললো, স্যার আপনাদের গেস্টের গাড়িটা সরাতে হবে। আরেকটা গাড়ি বের হতে পারছেনা। আমি রিদাকে বললাম তুমি বসো [ওদের সামনে ওকে আর আপনি বললাম না] আমি গাড়িটা সরিয়ে দিয়ে আসি।
চাচা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি বসো। আমি ড্রাইভার কে ডাকছি ওকে চাবি দাও ও সরিয়ে দিবে।
আমি ড্রাইভার কে চাবি দিলাম, বেচারা কিছুক্ষণ পর ঘুরে এসে বললো। স্যার এই গাড়ির সিস্টেম আমি বুঝতে পারছিনা।
চাচা আমাকে বললেন তোমাদের আগের গাড়িটা না ?
আমি – না চাচা, এটা আমার। কিছুদিন হলো নিয়েছি।
চাচা – কি গাড়ি নিয়েছো ?
আমি – Audi A8L[ ২০১৩ মডেল, কেউ আবার মনে করবেননা কোটি টাকার গাড়ি চালিয়ে বেড়াই ]
চাচা – ওই গাড়ি দিয়ে তুমি উবার চালাও !!?
আমি – জ্বী চাচা, চলেতো। আচ্ছা চাচা আমরা তাহলে এখন উঠি। পরে আবার আসবো।এখন এই লোকের মাথা সম্পূর্ণ উল্টেপাল্টে গিয়েছে। উনি এখন আমার আব্বুকে ফোন করবেন, কিন্তু ফোনে পাবেন না। কারণ আপনারা জানেনই।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসলাম। এখন আমিই ড্রাইভ করছি, আমি ওর ওর হোস্টেলের দিকে যেতে শুরু করতেই রিদা বললো ওদিকে যেতে হবেনা মাওয়া ঘাটের দিকে চলেন।
আমি- আপনি শিওর?
রিদা – আপনার কি মনে হয়?
আমি মাওয়া ঘাটের রাস্তাই ধরলাম।। কিছু দুর গিয়েই এতক্ষণের ঘটনা মনপড়ে আমি আর আমার হাসি আটকে রাখতে পারলামনা। আজ আসলে কি করছি, কেন করছি কিছুই মাথায় ঠিক মতো কাজ করছেনা।
রিদা – ব্যাপারটাতে মজা পাচ্ছেন ?
আমি- হুমম, আপনার কথায় না ভেবে চিন্তে কান্ডটা ঘটিয়ে ফেললাম ঠিকই । কিন্তু যখন ওরা বুঝতে পারবে যে জাস্ট একটা সাজানো নাটক ছিলো,…….মানে এটাকে ইস্যু করে খোঁচা মারার আরেকটা রাস্তা তৈরী করে আসলাম আর কি!
রিদা কিছু বললোনা, আমার ধারণা ব্যাপারটা সেও বুঝতে পেরেছে ।আমাদের মাওয়া ঘাটে পৌছাতে খুব বেশী সময় লাগলো না কিন্তু তার পরেও এখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে মানে রিদার আজ হোস্টেলে ফেরা সম্ভব না তবে আমার ধারনা ও ব্যাপারটা কোন ভাবে ম্যানেজ করে নিয়েছে বা নিবে, আমার প্রশ্ন সেইটা না । আমার কথা হলো ও এখনে করবেটা কি ? আমি এখন খুব বেশী দুরদর্শী চিন্তা বাদ দিয়ে এখন এই মেয়েটার কাান্ড-কারখানা পর্যবেক্ষনে মনোনিবেষ করাটাকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি । অতি নিকটে অপমানের যে ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনা তৈরী করে রেখেছি তা নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই, আমার চামড়া যথেষ্ট মোটা । আমি একটা পানের দোকানের সামনে আমরা দাড়ালাম, দীর্ঘক্ষন বিড়ি টানা হয়নি ।
আমি নেমে চায়ের দোকানওয়ালা মামাকে দুটো চা দিতে বলে সিগারেটটা ধরালাম, না রিদার লাইটার দিয়ে না দোকানের লাইটার দিয়ে । রিদা বললো আপনি কি করে বুঝলেন যে আমার এখন চা পান করতে ইচ্ছে করছে ?
আমি – আমি সেটা বুঝতে পেরে দাড়াইনাই । ওইযে সামনে ফার্মেসীটা দেখেছেন, ওইটা দেখে দাড়িয়েছি ।
রিদা- ও, এ্যান্টিটাসিভ ?
আমি- সিডেটিভও লাগবে দু পাতা, এ আমাকে দিবে না। প্রেস্কিপসনের ছবি যে ফোনে ছিলো ওটা একটু আগে চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়েছে, গাড়িতে চার্জে দিয়েছি চাার্জ হয়ে অন হতে সময় লাগবে। আর দুটো এক সাথে নিলে সন্দেহ করবে । আপনার আই.ডি কার্ড সাথে আছেনা আপনি গিয়ে সিডেটিভটা নিয়ে আসেন। পরে আমি যাচ্ছি ।
রিদা- অদ্ভুত লোক আপনি !
তো এই কাজ শেষ করার পর আমি রিদাকে জিজ্ঞেস করে বললাম এখন কি করবেন, কোথায় যাবেন ?
রিদা- কোন নির্জন জায়গায় চলেন, তবে জায়গাটা নদীর ধারে হতে হবে। চরে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। নৌকায়ও যাওয়া যেতে পারে৷ আমি আলোক দূষণ মুক্ত নক্ষত্র খচিত আকাশ দেখতে চাই। সেই কবে ছেলেবেলায় দাদাবাড়ীতে গিয়ে দেখেছিলাম!রিদা যে আয়োজন করতে বললো তা আসলেই করতে পারলে মন্দ হয়না, তবে ওর নিরাপত্তার একটা বিষয় আছে। আর আমার, আমার আবার কিসের নিরাপত্তা ? কি নিবে আমার কাছ থেকে ? গাড়ি ? নাহ্ ওটা নিলেও হজম করতে পারবেনা। মোবাইল বা টাকা পয়শা ? কেন নিবে বলুন তো, নেশা-ভাঙ করার জন্য ? সেরকম হলে আমিই ওদের সাথে বসে যেতাম, ওরা বরং আমার সাথেই মিশে যেত । কিন্তু রিদার ব্যাপারটা আলাদা । গাড়িতে অস্ত্র বলতে একটা লোহার রড ছাড়া কিছু নাই । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নৌকায় যাওয়ার পরিকল্পনাটাই সিলেক্ট করলাম । কিন্তু এতো রাতে নৌকা আর মাঝি কোথায় পাবো !
টাকা হলে যেমন বাঘের চোখ যেমন পাওয়া যায় তোমনই রাত ১ টার দিকে মাঝি, নৌকা ও খাবার সবই পাওয়া গেলো । ইঞ্জিন ওয়ালা নৌকা । নৌকা চালানোতে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই, তাই বলে একবারে পারবোনা তা না কিন্তু পদ্মার মতো নদীতে আমি কোন রিস্ক নিতে রাজি নই । নৌকা মাঝিই চালাবেন । আমি তাকে নির্দেশনা দিলাম যে নৌকা মাঝ নদী মানে তীর থেকে যতটা সম্ভব দুরে নিয়ে যেতে হবে তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে স্রোতের সাথে ভেসে যতদুর যাওয়া যায় আরকি এবং নৌকাতে কোন আলো জ্বালানো যাবেনা । এই শর্তে শাঝি বললো নৌকায় আলো না থাকলে বড় সাইজের নৌজান এসে ধাক্কা মেরে একটা দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে ।
আমি বললাম, আমাদের নৌকায় আলো থাকবেনা । কিন্তু যে নৌযান ধাক্কা মারতে আসবে তাতেতো আলো থাকবে, সেটা দেখে নৌকার দিক পরিবর্তন করে নিবেন এবং প্রয়োজন বোধে নিরাপদ দুরত্ব বজায় থাকতেই আলো জ্বেলে অপর নৌযানকে সতর্ক করে দিবেন, কি বলেন ক্যাপ্টেন সাহেব ?
উনাকে ক্যাপ্টেন সাহেব বলায় তিনি বেশ খুশি হয়েছেন তা বোঝা গেল উনার চোখ দেখেই । তো আমরা গাড়িটা ক্যাপ্টেন শফিক সাহেবের বাসায়ই রেখে উনার সাথে রওনা দিলাম, সাথে চললো উনার সহকারী চীফ ইঞ্জিনিয়ার সেলিম । অন্ধকার পথে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সেই আমাদের ঘাটে বাঁধা নৌকার দিকে নিয়ে যেতে লাগলো । এরই মধ্যে চীফ ইঞ্জিনিয়ার সেলিম কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্যের ব্যাবস্থা করবে নাকি জিজ্ঞেস করলো । আমি না করলাম, এখন হুঁস হারানোর সময় না । এখানে রিদার নিরাপত্তার ব্যাপারটা জড়িত । তো আমরা নৌকায় গিয়ে উঠলাম, আমি আর রিদা নৌকার একেবারে সামনে গিয়ে বসলাম । চীফ ইঞ্জিনিয়ার সেলিম , ইঞ্জিন চালু করলো আর ক্যাপ্টেন শফিক হাল ধরে বসলেন ।
এই মুহুর্তে রিদা আমাকে যা বললো তাতে আমার মতো লোকেরও শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো, এই মেয়ে সাঁতার জানে না আর নৌকা এতক্ষনে যে জায়গায় এসেছে সেখানে পানির গভীরতা কম করে হলেও ৮০/৯০ ফিট !
আমি এক সময় কল্পনা করতাম যে অরিন যদি এরকম গভীর পানিতে পড়ে যায় তখন আমি কি করবো, সাঁতারের যতটুকু এখন আমার আয়ত্ত আছে তাকে সাঁতার জানা বলে না। তখন মনে হতো সাঁতার জানি আর না জানি সাথে সাথে আমিও ঝাপ দিবো । ব্যাপারটা ভাবলে বুকের পাজরে অদ্ভুত একটা ব্যাথা অনুভুত হতো । আজ ঠিক সেই অনুভুতিটা রিদার জন্য হচ্ছে…
ধুর শালা কি যে ভাবি আমি ! আমি বললাম- চীফ ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, ম্যাচ দাও । বিড়ি ধরাবো । সে বেশ খুশি হয়েই ম্যাচ দিলো আমি একটা ধরালাম আর সে নিজে একটা ধরিয়ে আবার পেছনে চলে গেলো ।
রিদা- সিগারেট ধরিয়ে তার ধোঁয়ায় যা আড়াল করতে চাচ্ছেন তা কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ?
আমি – কি বুঝতে পারলেন ?
রিদা – আপনার আশঙ্কা এবং ঘটতে পারে এমন কোন দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়ার উপায় আপনার হাতে না থাকায় আপনার মস্তিষ্কে সৃষ্ট অসহায়ত্ব যা আপনি আড়াল করতে গিয়েই ধরা পড়লেন, আপনি যদি এই আড়াল করার চেষ্টাটা না করতেন তাহলে হয়তো ধরতে পারতাম না ।
আমি – আমার দুঃশ্চিন্তা কিন্তু আপনাকে নিয়ে। আপনি সাঁতার জানেনা সেটা আগে বললে আর কিছু না হলেও পাঁচ-সাতটা দুই লিটার পানির বোতল খালি করে সাথে নিয়ে আসতাম ।
রিদা – তারপর কি করতেন ওই বোতল গুলো আমার সাথে বেধে আমাকে বসিয়ে রাখতেন ?
আমি- না, ঠিক তা নয়, তবে বিপদ হলে কাজে তো আসতো তাই না ?
রিদা – আর আপনি কি করতেন ? ভাবেননি তাইতো ?
সত্যি বলতেকি আমি অন্য সব সময় যেমন ধরুন, একবার আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের শশুরবাড়ি ঘুরতে গিয়েছিলাম । সেখানে যেতে হলে তখন ছোট লঞ্চে পদ্মানদী পাড়ি দিতে হতো, তখন কিন্তু আমি মুখে কিছু না বললেও আমার ও আমার চাচাতো ভাই দুজনের জন্যেই আপদকালীন পরিস্থিতি সামলানোর পরিকল্পনা তৈরী করে রেখেছিলাম । কিন্তু এইবার আমি আমার নিজের জন্য কোন পরিকল্পনাই করিনি । এমন একটা ভাব যেন, কি আর হবে…
আমি বললাম – আমি এখন এমন একটা মানসিক অবস্থায় আছি যে আমার না আছে কোন কিছু হারানোর ভয়, না আছে নতুন করে কোন কিছু পাওয়ার আশা ! আসমান আমার কাছে ছাদ আর জমিন হলো বিছানা । এরকম মানসিক অবস্থায় উপভোগ করার মতো কিছু বিষয়ও আছে, এই দৃষ্টিকোন থেকে পৃথিবীটাকে দেখলে পৃথিবীর অন্য একটা রুপ দেখা যায় । সামনের ঘটনা গুলোকে বড্ড কৃত্তিম মনে হয় । নিজেকে মনেহয় চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন একজন অবজারভার । মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক গুলোকে খুবই মেকি মনে হয় । এই অবস্থায় পৌছালে নিজেকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্’র খুব নিকটে মনে হয় । যেন তিনি এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে দিয়ে আমাকে বলছেন দেখ বান্দা দেখ কি জিনিস আমি বানিয়েছি ! আল্লাহ্’র এত নিকটে থাকলে নিজেকে নিয়ে কোন পরিকল্পনা করতে হয়না, তিনিই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি যা পরিকল্পনা করে রেখেছেন তা ঘটবেই, এই পরিস্থিতিতে তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা সমূহ বাস্তবায়ীত হওয়ার দৃশ্য উপভোগ করাই শ্রেয় ।
রিদা – তাহলে আগে নিজেকে নিয়ে পরিকল্পনা করতেন কেন, তখন কি আল্লাহ’র থেকে দুরে ছিলেন ? আর আমাকে নিয়েই বা দুঃচিন্তা কেন, আমি কি আল্লাহ্’র নিকটে নই ?আমি – আপনার প্রথম প্রশ্নটার উত্তর আমি আগেই দিয়েছি আপনি হয়তো খেয়াল করেননি, সেটা হলো আগের ও বর্তমান সময়ের পরিস্থিতির পরিবর্তন । আমি প্রথমে মনে করতাম যে আমি যেটা যেভাবে ভাববো সেটাই হবে কিন্তু আমি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে কি হবে, কিভাবে হবে, কখন হবে সেটা নির্ধারনকারী আমি না, আল্লাহ্ । আর দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর একটু জটিল কিন্তু আমার ধারনা আপনি বুঝতে পারবেন । কারণ আপনার চিন্তার গন্ডি আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতো সীমিত না, সীমাহীন। তাহলে উত্তরটা শোনেন,
[এরই মধ্যে মাঝীর সহকারী কি যেন নাম ছেলেটার ? হ্যা সেলিম, সেও আমাদের পাশে এসে বসেছে । তার চোখে মুখে কিছুটা বিশ্ময়ের ছাপ । সেরকমটাই হওয়ার কথা, কারণ রাত ১ টার সময় মুখে যত সংখ্যা বলা যায় তত টাকা ভাড়া চাওয়া মাত্র দিতে রাজি হওয়া দুজন যুবক যুবতি এরকম উদ্ভট ও কিছুটা অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলার জন্য নৌকায় উঠবে এটা সে আশা করেনি । তো চলুন উত্তরে বিষয়টাতে আশা যাক]
আমি বলতে শুরু করলাম –
Friends
Shaikh Mohammad Nafiz Barakah
@shaikhnafiz
Drako Shajib
@drako
আব্দুল্লাহ
@g-m-abdulah
Nipun Chandra
@nipunch
Badsha Mohammad Najjashi
@najjashi-badsha
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
