-
পথ হারানোর নেশা.
১.চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুড়ন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে হা তাকিয়ে আছি,বাতাস লাগছে বলে মনে হচ্ছে না,যা লাগছে তা ভ্যাপসা গরম,ঘামের গন্ধে ভরা। গ্রীষ্মের দুপুরের অকল্পনীয় রকমের গরমের কাছে এসি আর ফ্যান দুটোই হার মেনেছে। অফিস রুমের দিকে তাকিয়ে একবার মনে হলো কোনো এক বিশাল মাইক্রোওভেনের ভিতর বসে বসে রোস্ট হচ্ছি।
অফিসের দরজার সামনে পিনকু নামের যে আনসার সদস্য দাড়িয়ে আছেন তার শরীরে মোটা কাপড়ের ইউনিফর্ম, মাথায় টুপি আর পায়ের প্রায় অর্ধেকটা বুট জুতার ভিতরে।তাকে দেখে প্রাণটা কেপে উঠলো, ওর জায়গায় আমি থাকলে এতক্ষণে বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারাতাম। বেটার মাথার উপর একটা ফ্যানও নেই। কোথা থেকে পয়লা বৈশাখের স্টিকার মারা প্লাস্টিকের এক হাত পাখা জোগাড় করেছে তা দিয়েই বাতাস করছে।
অতিরিক্ত গরমের কারনেই হয়তো ভুল দেখতে শুরু করেছি। কিছুক্ষণ আগে এক ভদ্রলোককে দেখেছিলাম চেক হাতে লাইনে দাড়িয়া আছেন। এখন হটাৎ চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো উনার কান দুটি ঠিক যের হাতির কানের মত বিশাল আকার। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকায় ভদ্রলোকর হয়তো নার্ভাস লাগতে শুরু করে ছিলো তাই তিনি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমিও কাজএ মন দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
পাশের চেয়ারে মি.ভট্টাচার্য শার্ট খুলে তার চেয়ারে ঝুলিয়ে রেখেছেন, শুধু এক সাদা সাইকেল গেঞ্জি গায়ে অফিস করছেন। যেই আসছে তাকেই বলছেন, “প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড, আজকে গরমটা সহ্য করতে পারছি না।”। লাঞ্চ ব্রেকে আবার দেখলাম গরম সহ্য করতে না পারা মি.ভট্টাচার্যই দু কাপ গরম চায়ের অর্ডার দিলেন। গরমের মধ্যে চা খেলে বাকী সহকর্মীর কী ভাববে তা চিন্তা করে আমি অর্ডার দিচ্ছিলাম না, মি.ভট্টাচার্য এর দেখাদেখি অর্ডারটা দিয়েই দিলাম।চায়ে প্রথম চুমুক দিতেই ফোন বেজে উঠলো, ছোট ভাই সোহানের ফোন। প্রতিদিন এই টাইমে কল করে সে একটা না একটা আজগুবি প্রশ্ন করবেই। কাল জিজ্ঞাস করছিলো সিগারেটের বদলে কারো মুখে এক টুকরো কয়েল ধরিয়ে দিলে তার কি বেশি ক্ষতি হবে না কম। এর আগের দিন জিজ্ঞেস করেছলো হিটলারের শিল্পকর্মের শিল্প হিসেবে কোনো দাম আছে কিনা। আমি দম নিয়ে আজকে প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতি নিলাম।
ফোন ধরতে ধরতে চায়ে চুমুক দিচ্ছেলাম, সোহানের কথা শুনে শুধু জিহবা না, মনে হলো ভিতরের কলকব্জাও কিছু জালিয়ে ফেলেছি।মামি আর নানিকে বাসায় একা রেখে বড় মামা আবার নিরুদ্দেশ।
এটা অবশ্য আশ্চর্যজনক কোনো ঘটনা না বা এমনো না যে এরকম প্রথমবার হচ্ছে। গত এক দশকে মামা প্রায় ৩-৪ বার ঘর-বাড়ি ছেড়ে,কাউকে কিছু না বলে উদাও হয়ে গেছেন। প্রতিবারই এক বছর পর ফিরে এসেছেন, আবার একবছর পর উদাও। গত ৪-৫ বছরে এই প্যাটার্ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের সকলেরই ধারণা হয়েছিলো যে এইবার মামা সংসার জীবনে মন দিয়েছেন। কিসের কি, মামা আবার চললেন রাস্তায় রাস্তায় হাটতে।
রাতে বাসায় ফিরে দেখি নানি,মামি আর দুই মামাতো ভাইবোন বাসায় উপস্থিত। বিস্তারিত শুনে যা বোঝা গেলো তার সারমর্ম এই- মামা রাতের বেলা চুরের মতো বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছেন, যাওয়ার আগে বাড়ির গেইটের পাহারাদার রুস্তমকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়ায় তাকে দুটো চড় মেরেছেন। রুস্তম চড় খেয়ে আর কোনো প্রশ্ন করতে পারে নি। খাবার টেবিলের উপর সকালে একটা চিড়কুট পাওয়া গেছে যাতে ছোটখাটো একটা কবিতার মাধ্যমে তিনি পরিবারকে বিদায় জানিয়েছেন।মামার মধ্যে কবি কবি ভাবের ছিটেফোঁটাও নেই, জীবনে কোনো কবিতার বই কিনেছেন বলে মনে হয় না, পড়া তো দূরের কথা। তবে প্রতিবারই হারিয়ে যাওয়ার আগে এরকম অখাদ্য কিছু লিখে যান, যা থেকে নিশ্চিত হয়া যায় যে আগামী এক বছর তার আর দেখা পাওয়া যাবে না।
২.
ওই দিনটির কথা আমার এখনো বেশ স্পষ্ট মনে আছে, যেন কালকের ঘটনা। স্কুলে বসে আছি, বাহিরে মুষুলধারে বৃষ্টি। ছুটির ঘন্টা বাজতে তখনো দশ পনেরো মিনিট বাকি। অন্যান সরকারি স্কুলের মতো আমাদের স্কুলেও লাস্ট পিরিয়ডে স্যারদের খুব একটা দেখা যায় না। ঐ দিনো স্যার আসেন নি। পাশের ক্লাসে জহির স্যার ক্লাস নেওয়ায় ছেলেদের কেউই বারান্দায় ঘুরঘুর করার সাহস পাচ্ছে না। নাহলে এতো সময়ে বোতল ফুটবলের ম্যাচ শুরু হয়ে যেত।
আমার পাশেই রাসেল তার চৌদ্দগোষ্টির ভৌতিক অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে বসেছে। আধ ঘন্টা ধরে বকবক করছেই, থামার কোনো লক্ষ্ন নেই। তার নানার এক অভিজ্ঞতাএ কথা বলছে, গল্পটা কিছুটা এরকম-
নানার ব্যাবসা ছিলো গ্রাম থেকে একটু দূরে। প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যেতো। এক রাতে বাড়ি ফিরছেন, হটাৎ লক্ষ্য করলনেন বাড়ির সামনের পুকরঘাটে সাদা টুপি পাঞ্জাবি পড়া এক লোক নামাজ পড়ছেন। পাড়াগাঁয়ের লোকেরা সচরাচর একে অন্যকে চিনে। কিন্তু নানা লোকটিকে চিনতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন নামাজ শেষ হয়ার আগে পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, নামাজ শেষ হলে ব্যাক্তিটির নাম-পরিচয়,উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাস করবেন। পুকরে হাত-মুখ ধোয়ে উঠতে যাবেন এমন সময় দেখলেন লোকটি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।
ঘটনা এখানে শেষ হলেই হয়তো ভালো হতো, তবে ঐ রাতে নানা এক বিভৎস দুঃসপ্নে দেখলেন একটা শিশু কি একটা নামা না জানা রোগে আক্রান্ত হয়েছে, শরীরের ভিতর থেকে হাড় গলে যাচ্চে। মাথার খুলি গলে যাওয়ায় চোখ দুটো কোটর থেকে ঝুলে আছে, মুখ দিয়ে মগজের কিছু অংশ বেড় হয়ে আসছে আর বেশ শক্ত সামর্ত এক লোক শিশুটির আঙুলের নখ এক এক করে তুলে নিচ্ছে।
এর দুই দিন পরেই পুকুরে অজ্ঞাত একটা কাটা হাত ভেসে উঠে। ভোতা কোনো অস্ত্র দিয়ে ঘাড়ের নিচ থেকে কাটা। আশ্চর্যজনক ভাবে কাটা হাতটার নখগুলোও উপড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই নানা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসেন।
আগেরবার এই গল্প শুনেই আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গিয়েছলো। এই বার আর ততো ভয় করে নি কারণ আগেই একবার এই কাহীনি শুনেছি, তাছাড়া এই ভর দুপুর বেলা ভূতের গল্প বলার কোনো মানে হয়? ভূতের গল্পের জন্য ঠিকঠাক পরিবেশ দরকার।.
.To be continued?
ইনিন
4 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
Niaz Aziz Dip
@niazdip



সুন্দর লেখা। অভিনন্দন।