-
শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ শিশুরা
রাহুল চন্দ্র দাস, হবিগঞ্জ
নতুন বোতলে পুরনো মদের মতো কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতির স্থলে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হয়েছিলো। তা-ও ব্যাকরণ, গণিত, ইংরেজি বাদে। কোচিং ও মুখস্থনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটতে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেছিলো সে সময়। একুশ শতকের বৈশ্বিক মান, বিশেষত বাজার মান বজায় রাখার স্বার্থেই এমনটি করার দায় তৈরি হয়েছিলো- তা বলাই বাহুল্য। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোতে মিশ্র অর্থনীতির দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে একটি রাষ্ট্রের শিক্ষায় পরামর্শ দিয়ে ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখে দেশের শিশুদের বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী ভবিষ্যতের নাগরিক করে তুলতে প্রয়াস করে, তার মূল্য অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে বৈশ্বিক দাতা সংস্থা ও দেশীয় সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে নানা সময়ে নানা শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিলো। স্বাধীন দেশে অনেকগুলো শিক্ষা কমিটি গঠিত হলেও শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা যায় নি কখনোই। শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ব্যর্থ সেসকল উদ্যোগের। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় নানা উল্লেখযোগ্য গুণগত ও পরিমাণগত অর্জন সম্ভব হলেও সাফল্যগুলো ধারাবাহিক থাকছে না। নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাও অবহেলিত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। নানা নিরীক্ষার চাপে দিশেহারা হয়ে গেছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার চাপ ও বইয়ের বোঝা তো আছেই।
কোচিং-এর নামে, গাইড বইয়ের নামে, নানা ফি-এর নামে বাচ্চাদের শৈশব আনন্দহীন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা, শিক্ষকদের সাথে পাঠ্যের সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। ৬৩ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন সরকারি। স্কুল ফিডিং, উপবৃত্তির আওতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ঝরে পড়ার হার রোধে ভূমিকা রাখছে। তবুও ৩০ শতাংশের বেশি স্কুল শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া অগ্রহণযোগ্য। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও স্থিতিশীল, টেকসই, যুগোপযোগী কোন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারার উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চেপেছে; প্রচণ্ড মানসিক চাপ, তথাকথিত ভালো রেজাল্ট নিশ্চিত না করতে পারার হতাশা, অভিভাবকের তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অপচয়ের দরুণ সার্বক্ষণিক মানসিক অশান্তি সমাজের সর্বস্তরে হতাশা জাগিয়ে রেখেছে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব এমনিতেই সমাজে হ্রাস পেয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে, তার অবনমন ঘটে চলেছে ক্রমশ আমলাতান্ত্রিক শিক্ষার প্রসারে। ১১ ধরনের বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িয়ে তুলেছে বৈষম্য, শিশুদের মধ্যেকার ভাবনার তফাৎ, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা ও শিশুদের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ, দূরত্ব ও সামাজিক মেলবন্ধনের সুযোগ। নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত, সাধারণ, ইবতেদায়ী, কিন্ডারগার্টেন, দাখিল, পাঠ্যক্রমের ভিন্নতা, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি, বেসরকারি, কওমী, মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডাভিত্তিক শিশুশিক্ষা ইত্যাদির সমন্বয়হীনতা সমাজ ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে শিশুকাল হতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। শিশুদের বর্তমান সঙ্কটগ্রস্ত হলে জাতির ভবিষ্যতও ইতিবাচক হবে না। অথচ পরীক্ষা থাকা-না থাকা, এক শিক্ষাবর্ষে একাধিক পরীক্ষা, পিইসি-জেএসসি, কতটুকু হবে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর, শিশুর বয়স নির্ধারণ, বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় প্রভৃতি বিভাজন যা একজন সুস্থ শিশুকে তীব্র চাপের মধ্যে রাখে- এ সকল ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এখনও এইসকল সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয়হীনতা শিশু-কিশোরদের ভোগাচ্ছে। সর্বশেষ(২০১০) শিক্ষানীতির আলোকে অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও, কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও বাস্তবে সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোন সিলেবাস বা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা যায় নি। এইসব শিক্ষা-সম্পর্কিত নিরীক্ষার করুণ বলির পাঠা হয়েছে বাংলাদেশের সর্বস্তরের শিশু-কিশোর। একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগের চাহিদার আলোকে প্রণীত শিশুশিক্ষার কার্যক্রমকে বেগবান করা সময়ের প্রয়োজনীয়তা।
শিক্ষার সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বারবার এমনকি একই শিক্ষাবর্ষে একাধিকবার পাঠ্য নির্ধারণ, শিক্ষা-সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালা প্রণয়নজনিত অনিশ্চয়তা-সিদ্ধান্তহীনতা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কাঠামোতে এই দোলাচল আমাদের গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, শিশুর স্বার্থরক্ষাকে ক্ষুণ্ন করে। সকল স্তরের শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট লোকজনকে সাথে নিয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। গাইড, নোট, কোচিং ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও তা কার্যকর করার মাঠপর্যায়িক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশু-মনস্তত্ত্বের সাথে যায় না এমন কোন প্রকল্প চাপিয়ে দেয়া যাবে না। অথচ, নানা সময়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও সাবলীল, স্বতস্ফূর্ত বিকাশের ও শিক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্র তার শিশুদের নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং মাঠপর্যায়ে লাগামহীন প্রতিযোগিতা, শিশুমনের অন্তরায় এমন পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে যা গ্রাম-শহর নির্বিশেষে প্রতিকূল পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে- তা-ই প্রমাণ করে। স্কুলগুলোতে শারীরিক শিক্ষা, কারুকলা সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় হিসেবে বিবেচ্য। অথচ, নৈতিকতা-মূল্যবোধের সাথে সাথে সৌন্দর্যের চর্চা আবশ্যক। শুধু পড়াশোনা, শুধু ভালো ভালো রেজাল্ট শুধু শুধু প্রচুর সনদপত্র নির্দেশ করে। প্রতিবছর নানা পাবলিক পরীক্ষায় লক্ষ লক্ষ অসাধারণ ফলাফলের সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু সমাজজীবনে সেরকম উল্লেখযোগ্য অর্জন দেখা যায় না। একের পর এক আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর প্রজন্ম দেশের লোকবল কেবল বাড়িয়ে গেলে আত্মতুষ্টির কোন কারণ এতে থাকে না। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বিতর্ক, ব্যবসামুখী শিক্ষার পরিবেশ ইত্যাদি সঙ্কটগুলো এক দিনে সমাধান হবার নয়। ধারাবাহিক উন্নতির কোন লক্ষণ দৃশ্যমান নেই- এ-ই হলো আসল ট্র্যাজেডি।3 Comments
Friends
অরণ্য মিথিল
@aronnonaim
ভাস্কর
@vaskarchou
অনুপম হাসান
@anupam-hasan
Keya Islam
@keyamoni6970
Gazi Rafsan Shahab
@rafsan-shahab
Jubayer Al Mahmud
@jubayer
অরিন্দম সাইফুল্লাহ
@arindam-saifullah
Fahmida Akter
@fahmida420
রাসেল আদিত্য
@raseladitta


Right