-
কাজলিয়াত: এক প্রেম কথা
আঠার বছর আগের এক শীতে আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম। বিগত জীবনের স্মৃতি সাথে করে পেছনে ফেলে এসেছিলাম জন্মের মায়া, বেড়ে ওঠার পিছুটান, জোড়া পায়ের দীর্ঘ ছাপ, কিছু প্রিয় পরিজন আর আশ্রয়ের তিনটে ঘর।
শহরে এসে উঠেছিলাম নগণ্য ভাড়ার একটা পুরনো টিনের ঘরে। শহরের মানুষগুলো হয় বস্তিতে, না হয় বাসায় থাকে, বাড়িতে বা ঘরে থাকে না। অথচ আমরা শহরের ভৌগলিক সীমায় থেকেও গ্রামের চেয়ে নিচুমান, না বস্তি, না বাসা, ভগ্নপ্রায় একটা ঘরে থাকতাম। এক রুমে চার ভাই, অন্য রুমে মা; দুই রুমের ঘরে পাঁচজন। অন্য তিনটে পরিবারের সাথে এক চুলায় রান্না, ভাগাভাগির টয়লেট আর লাইন ধরে গোসল। ঘন্টা, মিনিট, সময়ের মাপে দিন, রাত, সপ্তাহ অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চললেও আমাদের জীবন ঘড়ির বেতাল কাঁটা তখন চলছিলো শম্বুক গতিতে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
০২.
শহর থেকে গ্রাম অথবা গ্রাম থেকে শহর, দূরত্ব বেশি ছিল না। চাইলে হেঁটেই যাওয়া যেতো, গিয়েছিও কয়েক বার। শুরুর দিকে প্রায়ই গ্রামে যেতাম। বেশিরভাগ সময় দিনে দিনেই ফিরে আসা হতো, থাকা হতো না। আর যখন থাকার প্রয়োজন হতো আমাদের রেখে আসা ঘরেই থাকতাম। কিন্তু যত্নের অভাবে এবং দীর্ঘদিন মেরামত না করায় ঘরগুলো একসময় ভেঙ্গে পড়ে। আমাদের ভিটায় ঘর তোলে মেজো চাচা। তখন কাগজ-কলমে আমাদের একটা ভিটার ঠিকানা থাকলেও আশ্রয়ের ঘর আসলে ছিল না। মামার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় ঘরহীন আমরা ঐ সময়টাতে মামা-চাচার ঘরে থাকতাম।এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় ষোল বছর চলে গেল। আমাদেরকে কাজের সূত্রে দেশ-বিদেশে থাকতে হয়, গ্রামে যাওয়ার সুযোগ খুব বেশি হয় না। কিন্তু আম্মা নিয়মিত গ্রামে যান। ওই গ্রামে তাঁর মা, বাবা, স্বামীর কবর। সোঁদা গন্ধ ঐ গ্রামীণ মাটিতে তাঁর আশৈশব কেটেছে, কেটেছে কৈশোর, যৌবন। এই গ্রামের প্রতি জন্মের টান আমাদেরও আছে কিন্তু মায়ের টানের কাছে তা যেন খুব নস্যি!
তাই মায়ের জন্য হলেও গ্রামে একটা আশ্রয়ের ঠিকানা বড় প্রয়োজন।
০৩.
একসময় আমার দেশের বাইরে পোস্টিং হয়। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগে গ্রামে আম্মার থাকার মত একটা ঘর তৈরির প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করি। সুতরাং আমার চলে আসার মাসখানেক আগে জোরেশোরে কাজ শুরু হলো। কিন্তু শেষ করা গেল না।অবশেষে মেজো ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে আম্মার জন্য একটা আশ্রয় দৃশ্যমান হলো।
০৪.
আশ্রয় তো হলো, এবার তার একটা নাম দেয়া প্রয়োজন। আমার ইচ্ছে, একটা গ্রামীণ নাম দেই। আম্মার নাম মিলিয়ে ঠিক করলাম- কাজল ভিলা, কাজল কটেজ অথবা কাজল কুটির। ভিলা এবং কটেজ শব্দ দুটি ইংরেজি, কেমন শহুরে গন্ধ তাতে! সুতরাং কাজল কুটির চূড়ান্ত। কাউকে বলা হল না, মনে মনে ঠিক করে রাখলাম।কিছুদিন পরের একদিনের কথা- মামাতো ভাই ফোন করে জানালো, আম্মা ঘরের একটা নাম দিতে চান এবং নামটাও নাকি ইতোমধ্যে ঠিক করেছেন।
আম্মা মনে মনে এমনটা ভেবেছেন শুনে আমি বেশ অবাকই হলাম। অবাক হওয়ার কারণ জাগতিক এসব বিষয়ে আম্মার আগ্রহ কোনদিন চোখে পড়েনি।
০৫.
আম্মা-আব্বার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। একই গাঁয়ে, একই পাড়ায় কাছাকাছি বাড়ি, দুজন দুজনকে সম্ভবত পছন্দ করতেন। তাদের প্রেম ছিল কি-না জানিনা, বিয়েটা পারিবারিক আয়োজনেই হয়। কখনো দুজনকে ঝগড়া করতে দেখিনি, ভাব ছিল খুব। একটা ব্রাশ দুজন ব্যবহার করতেন।যতদূর মনে পড়ে, একবারই আমি আম্মাকে দেখেছিলাম রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যেতে। আমার দুই মামার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার দুই ফুপুর। এই সম্পর্কগুলো এমন লতায়-পাতায় জড়ানো থাকে যে এক সংসারে সমস্যা হলে তা অন্য সংসারেও সংক্রমিত হয়। এরকমই কোন এক ঘটনার প্রেক্ষিতে আম্মা বাপের বাড়ি চলে যান। আমি তখন বেশ ছোট এবং ছোট ভাই স্তন্যপায়ী। আমাদের দুই বাড়ি পশ্চিমে এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আম্মা ছোট ভাইকে দুধ খাইয়ে আবার চলে যেতেন, মনে পড়ে।
এই একমাত্র ঘটনার বাইরে আম্মা এবং আব্বার মাঝে কোন বিষয়ে মনোমালিন্য মনে পড়ে না।
০৬.
আব্বা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন, সাথে ছিল হার্নিয়ার সমস্যা। আম্মাকে আব্বার পাশে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। বাড়িতেও আব্বার জন্য কম মসলায় আলাদা রান্না করতে হতো। কিন্তু আম্মার বিরক্ত ভরা মুখ কখনো চোখে পড়েনি। অথচ আব্বা মারা গেলে আম্মাকে গগন বিদারী চিৎকারে কান্না করতে আমি দেখিনি। কেমন যেন বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। আমি বরং খুব কান্না করেছিলাম এবং আম্মা আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। আসলে নিজের ছোট ছোট সন্তানদের কথা চিন্তা করে তাকে হয়তো তখন এমন শক্ত হতে হয়েছিল। তাছাড়া দীর্ঘদিন যমের সাথে যুদ্ধ করে করে আব্বা যে এভাবে একদিন হেরে যাবেন সেটা বুঝেই আম্মা হয়তো নিজেকে এমন পাথর রূপে প্রস্তুত করেছিলেন।আমাদের সেই মা নিজের জন্য যখন একটা ঘর হল প্রথমেই চিন্তা করলেন ঘরটির সাথে মৃত স্বামীকে কি করে জড়িয়ে দেয়া যায় এবং নামটাও বেছে নিলেন ওভাবেই।
০৭.
আম্মার নাম কাজল, তখনকার সময় বিবেচনায় বেশ আধুনিক নাম। আমার ধারণা, আম্মাকে এই নামটা আব্বা-ই দিয়েছিলেন। আব্বার অনেক কাগজপত্রে, এমনকি রান্নার পাতিলে, মুড়ির টিনের গায়ে খোদাই করে লেখা ছিল আম্মার নাম- কাজল। স্বামীর বেঁচে থাকা দিনগুলোতে আম্মা হয়তো ‘বাবুর বাপ’ (আমার বড় ভাইয়ের নাম বাবু) ছাড়া আব্বাকে অন্য কোন নাম দিতে বা অন্য কোন নামে ডাকতে পারেননি। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের নামের সাথে স্বামীর নাম জড়িয়ে দিয়ে নতুন নীড়ের নাম রাখতে চাইলেন- কাজলিয়াত। কাজলের সাথে লিয়াকতের যোগ- ‘কাজলিয়াত’।একবার মনে হল আম্মাকে বলি, ‘লিয়াকত-কাজল কুটির’ নাম রাখি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল তাতে তো দুজন দুজনে মিশে রইলো না।
সুতরাং কাজলিয়াত-ই সই।
০৮.
আমাদের মা কোন সেলিব্রেটি নন। বিরুশকা (বিরাট এবং আনুশকা), দীপবীর (দীপিকা এবং রণবীর), রণলিয়া (রণবীর এবং আলিয়া) ব্রাঞ্জেলিনা (ব্র্যাট পিট এবং অ্যাঞ্জেলিনা জোলি), শোয়েনিয়া (শোয়েব মালিক এবং সানিয়া মির্জা)- আমাদের আম্মা এবং আব্বাকে এদের মত সন্ধিবদ্ধ করে সাংবাদিকেরা পত্রিকার পাতায় নতুন নামে সংবাদ ছাপবে না। তাইতো আম্মাকে নিজেকেই তাঁর ঘরের নাম ঠিক করতে হলো।মাতৃভাষার জন্য জীবন দেয়া সালাম, বরকত, রফিক এবং জব্বারদের অভিধানে একটা নতুন শব্দ দিল আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদবিহীন মা- কাজলিয়াত।
আমার কেন জানি মনে হয়- মনে মনে নামটা ঠিক করার পরও না জানি কত সহস্র লজ্জার ভারী পর্দা সরিয়ে আম্মা মুখ ফুটে কাজলিয়াত শব্দটা উচ্চারণ করেছেন।
০৯.
এক মর্মর পাথরের কঠিন বুক খুঁড়ে কাজলিয়াত নামটি লেখা হয়নি আজও, দেয়ালটা রয়ে গেছে ফাঁকা। তবে দিবো, একদিন গড়ে দিবো এই নাম। এবং সবাইকে জানাবো, সম্রাট শাহজাহানের মত প্রেমিকেরাই কেবল তাজমহল গড়ে না, কাজলের মত নিঃস্ব প্রেমিকারাও প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিকে ধরে রাখতে কাজলিয়াত মহল গড়তে জানে।তাজমহলের গা ছুঁয়ে বয়ে চলা আগ্রার যমুনা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভাটির দেশে পাড়ি জমায় বুঝি সেই দারুণ প্রেমের সাক্ষী হতেই- কাজলিয়াত মহল!
১০.
পৃথিবীর অন্য অন্য মানুষেরা ভিন্ন ভাবতে পারে, আমাদের আবেগের কানাকড়ি মূল্য তাদের কাছে না-ই থাকতে পারে, তবে আমাদের জন্য মা-বাবাই পৃথিবী।তাই অন্তত আমাদের কাছে এক অমর প্রেমের অন্য নাম ‘কাজলিয়াত’।
1 Comment
Friends
Anika-Rahman
@anika-rahman
মোঃ সাইফুল ইসলাম
@saif007
SK MUNTASIM FUAD
@detyi89
আর্য্য সপ্ত দর্শী
@nandini
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
কলমে পৃথিবী
@asin432
Mizan Rahman, Editor: Dainik Journal Asia
@mizan-rahman
রিয়েল আবদুল্লাহ আল মামুন
@realabdullah
নোমান খালভী
@nomankhalovi


খুব সুন্দর গল্প! ভালোবাসার এমন সুন্দর সরল প্রকাশ সত্যি মন কাড়লো!