-
প্রিয় সুভাষিনী,
কেমন আছো তুমি?
অনেক দিন তোমার কোন খোঁজ খবর পাই না।
জল, স্থল অন্তরিক্ষ সব জায়গায় আমি তন্য তন্য করে খুঁজেছি তোমায়।
কিন্তু তুমি যেন কোন একটা মন্ত্র বলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছো।
এমন না যে , যাদের সাথে আমার পরিচয় আছে তাদের সাথে সারাক্ষণ আমি লেপ্টে থাকি।সময়েই নেই আমার। কেউ ফোন দিলে রিসিভ করে একজায়গায় বসে তার সাথে কথা বলার সময় পর্যন্ত আমার নেই।যে ফোন দেয়, সে প্রচন্ড বিরক্ত হয় জানি।কারণ আমার সাথে কথা বলার সময়ে প্রেসার কুকারের সিটি , কিচেন হুড এর শব্দ, জুসার- ব্লেন্ডারের শব্দের মধ্যেই তাকে কথা বলতে হয়।
যদি এই হয় আমার পরিস্থিতি তাহলে কি এমন কারণ আছে যে আমি তোমাকে গরু খোঁজার মত করে খুঁজছি?
তাহলে তোমাকে বলি শোন সুভা- কেউ যখন আমাকে অবহেলা করে এবং তার কারণ টা আমি জানি, আমি কিন্তু আর তাঁর ছায়া টাকেও ফিরে দেখি না। এমন ই আমি।
কিন্তু তোমার এই অন্তর্ধান এর কারণটা আমার জানা নেই।
কারণটা না জানা পর্যন্ত আমি আমার এই খোঁজ অব্যাহত রেখেছি।
যখনই কারণটা জানা হয়ে যাবে তখন থেকেই আমার এই “খোঁজ The search” এর সমাপ্তি ঘোষণা করবো আমি।
এবার আসি তোমার সাথে আমার / আমার পরিবারের পরিচয় কিভাবে হলো, সেই প্রসঙ্গে।
আমার বেড়ে ওঠাটা ছিলো শিক্ষা নগরী , রেশম নগরী , আমের শহর রাজশাহীতে।
আর আমার আম্মা , আব্বা ছিলেন এমন অতিথি পরায়ন যে , যার ই প্রয়োজন হতো শিক্ষা, চিকিৎসা , মামলা-মোকোদ্দমা, চাকরি এ সব সংক্রান্ত যে কোন প্রয়োজন এ সবাই আমাদের বাসাতেই আসতেন।এমন অনেকে আসতেন যাদেরকে আমার আম্মাও চিনতেন না, আমার চেনারতো প্রশ্ন ই আসে না।
সুভা,
লতায় পাতায়ও তোমার সাথে আমাদের পরিচয় ছিলো না।ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তুমি এলে আমাদের বাসায়, সাথে আসলো তোমার জমজ ভাই।
আমি আড়াল থেকে অবাক হয়ে দেখলাম- আরে এরা আবার কেমন জমজ!? নেই কোন চেহারায় মিল?
আমি যদিও জানতাম Fraternal/ dizygotic twins রা একরকম দেখতে হয় না Identical twins/monozygotic twins দের মতো , তবু্ও যেন আমি চাচ্ছিলাম যে তোমরা দুই ভাই বোন কেন একরকম না?
একজন খেলে অন্যজনও খাবে একজন হাসলে অন্য জনও হাসতে এই রকম কেন না?
আমি তখন মনে হয় অনার্স ২য় বর্ষে পড়ি, কঠিন দূর অবস্থা আমার। শুধু তখন কেন? পুরো শিক্ষা জীবন টাই ছিলো আমার বিভিষীকাময়।আমাদের বাসায় লোকজন এর আনাগোনা প্রচুর থাকলেও আমার সামান্যতম সময় ছিলো না তাদের সাথে কথা বলার।বড় ভাই এর কড়া নির্দেশ ছিলো – আমার পড়ালেখার কোন ক্ষতি হতে দেওয়া যাবেনা। যতখুশি লোকজন বাসায় আসুক না কেন ,আমার ঘরে তারা ঢুকতে পারবেনা।যেন অলিখিত ভাবে আমার ঘরের দরজায় “বিপদজনক ” লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে।
পড়া লেখা করতে করতে আমার এমন অবস্থা যে, সারাক্ষণ আমার মুখটা বাংলার ৫ এর মত থাকতো।
একটা মজার কথা বলি শোন- আপাকে নাকি পাড়ার অনেকে বলতো- রুনাতো পড়তে পড়তে পাগল হয়ে যাবে!
আপা এসে এই কথাটা বড় ভাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে আম্মাকে বলেছিলো। বড় ভাই তখন আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে আম্মাকে বলেছিলেনঃ কেউ যদি পড়তে পড়তে পাগল হয়ে যায়, এর চেয়ে ভালো কিছু হয় না। অন্তত মানুষ বলবে- আহারে মেয়েটা পড়তে পড়তে পাগল হয়ে গেছে!বড় ভাই তাঁর এক ছাত্রীর গল্প শুনাতেন- যে মেয়েটা প্রচন্ড ভালো ছাত্রী ছিলো কিন্তু এম বি বি এস ফাইল পরীক্ষার আগে আগে পাগল হয়ে গিয়েছিলো।
আমি শুনে মনে মনে বলতাম – সেই মেয়েটারো কি আমার মতো এমন ভয়ংকর বড় ভাই ছিলো নাকি?
পাড়ার সব মায়ে্রা তাদের ছেলে মেয়েকে আমাকে দেখিয়ে বলতেন- দেখ রুনা কত পড়াশোনা করে! ঈদের দিনেও মেয়েটার ছুটি নেই।
এখন রেহানের এক বন্ধু থাকে পাশের বাসায়, আমাদের জানালা দিয়ে দেখা যায় ছেলেটা সব সময়ে টেবিলে পড়াশোনা করছে।নাহ নাহ, আমি মোটেও রেহানকে তার কথা বলি না। কিন্তু আমার পালক পুত্র (যার বাবার কারণে আমার শিক্ষা জীবনের দফারফা হয়েছে) , সে রেহানকে দেখায় – রেহান ,তোমার বন্ধু তো সারাক্ষণ পড়াশোনা করে।
কিছুদিন পরে দেখা গেলো রেহানের সেই বন্ধুর পুরো ব্যালকনিতে পর্দদা।
পালক পুত্র বললো- রেহান, তুমি কি তোমার বন্ধুকে শাসিয়েছো নাকি?😅😁
সুভা,
বড় ভাইয়ের দোষ দেই কিভাবে? আমিও যে ছিলাম TTP( টেনেটুনে পাশ) একটা মেয়ে।
সেই যে আমার পড়াশোনার উপর বিতৃষ্ণা হয়েছে , এখন আমি নিজের ছেলেদেরকে স্বাধীন করে দিয়েছি।পড়তে বলতে আমার ইচ্ছে করে না। আর আমার নিজেরও পড়াশোনার ধারে কাছে যেতে ইচ্ছে করে না। কেউ যদি আমাকে কোন বিষয় এ শেখাতে আসে তখন মনে মনে আমার প্রিয় সংলাপটা বলি” তোরে কইছে, তুই বেশী জানস! ইস্ রে কি বড় প্রফেসর সাহেব আসছে!”
তো সুভা , তুমি এলে আমার জীবনে এমনি এক সময়ে।
এসেই যেন আমাদের বাসার সবার মন জয় করে নিলে।
আমার আব্বা আম্মা যেন তোমার নিজের খালাম্মা খালু , আমার বোন -ভাই, ভাবিরা যেন তোমার নিজের বোন – ভাই, ভাবি ,আর আমি যেন তোমার নিজের রুনা আপা।
তুমি রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে, হলে সিট পেয়ে চলে গেলে মন্নুজান হলে।
আমার আম্মা – আব্বা কিন্তু তোমাকে ভুলে গেলেন না।
বাসায় কোন ভালো রান্না হলে তোমাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসতেন।
তোমার পরীক্ষার জন্য একবার ঈদে তুমি বাড়ি যেতে পারলে না।আব্বা, তুমি সহ তোমার রুমমেটদের জন্য টিফিন ক্যারিয়ার এ খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। তোমাদের পরিবারের সবাই আমাদের বাসায় আসতেন। এবং আমার জীবনের আশ্চর্য ঘটনা হয়েছিলো – এমফিল পড়ার সময়ে তোমার সাথে রেলিকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলো সেই ঘটনা। এর আগে আমাকে রাজশাহী শহরেই একা কোথাও যেতে দেওয়া হতো না।
সুভা, তোমার কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছিলাম , যেমন- কিভাবে মশারী ভাজ করে রাখতে হয়, কিভাবে শাড়ি পরে হাঁটতে হয়, কিভাবে রান্নাঘর গুছিয়ে রাখতে হয়!
আরও কত কিছু।
এরপর আমার বিয়ের বিষয়টিও আমি তোমার এবং আমার বান্ধবীদের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছিলাম।
আমার হলুদের শাড়ি পড়ানো থেকে শুরু করে ঘর সাজানো সব কিছু তুমি ভাবির বোনদেরকে সাথে নিয়েই করেছিলে।প্রথম চাকরির টাকা পেয়ে আম্মাকে শাড়ি কিনেদিয়েছিলে তুমি।
এরপর চলে গেলে বিদেশে পিএইচডি করতে। তখন যদি যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে, তাও মেনে নিতাম( তবে মনে নিতাম না)
লেখা পড়া শেষ করে ফিরে আসার আগেও ফোন দিয়েছিলে- আমার জন্য কি নিয়ে আসবে জানার জন্য।
কিছু আনতে হবে না জানার পরে বলেছিলে আমার পছন্দের ব্যাগ তুমি কিনেছো আমার জন্য, তবে ব্যাগের একটাই সমস্যা চেন নেই। ঢাকা শহরে চেন ছাড়া ব্যাগ নিয়ে ঘোরাঘুরি করা সমস্যা সেটাও তোমার চিন্তায় ছিলো।
দেশে ফিরে এলে যথা সময়ে সেটাও জানালে এবং খুব শীঘ্রই আমাদের সাথে দেখা করতে আসবে সেটাও বললে।
এরপর ই তুমি হারিয়ে গেলে।
তোমার বোন, আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখলাম আমি কারো সাথে ই যোগাযোগ করতে পারছি না। ফেসবুক সহ সব কিছু যেগুলোতে আগে তোমার সাথে যোগাযোগ হতো , সব কিছু থেকেই আমি বিচ্ছিন্ন।
এক সময়ে আবিষ্কার করলাম আমাকে তুমি এবং তোমরা ব্লক করে দিয়েছো। অবাক হলাম, কারণ জানার জন্য আগ্রহী হলাম, রাগ হলো, অভিমান হলো।
একবার মনে হলো- তুমি কি আমার জন্য নিয়ে আসা ব্যাগটা অন্যকে দিয়ে দিয়েছো জন্যই মনে হয় যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছো😇?
আরও অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেলো- আমার রাগ, অভিমান কমতে শুরু করলো , সেই জায়গা দখল করলো দুশ্চিন্তা। কি হলো তোমার?
আমার বান্ধবী মুক্তি বললো – “রুনা তুই ক্ষমা চেয়ে নে সুভার কাছে, যদি কোন ভুল করে থাকিস।
আমাদের বয়স হয়েছে ,যে কেউ যে কোন সময়ে চলে যেতে পারি।”
আরে আমি যদি কখনো ভুল করি সেটা যার সাথেই হোক, (ছোট্ট /বড়) করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে একটুও লজ্জা বোধ করি না। কিন্তু কেউ যদি দোষ করে আমার কাছে ক্ষমা না চায় তবে আমি তাকে কোন দিনও ক্ষমা করি না।
আর সেটা জানার জন্যই আমি খুঁজে চলেছি তোমাকে।
জানি আমার এই চিঠি তোমার বা তোমার পরিবারের কারো ই চোখে পড়বে না , তবু্ও চেষ্টা করতে তো আর দোষ নেই!বিশাল একটা পত্র লেখে ফেললাম , এই আশাতে যে, যদি তুমি আটলান্টিকের ওপারেও থাকো তবু্ও যেন আমার এই পত্র পড়ে মুড়ির টিন মার্কা বিমানের টিকেট কেটে ছুটে আসবে।”পত্র পাঠ ছুট” বলতে পারবো আমি।
সুভা, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি তুমি ভালো আছো, সুখে আছো।
তোমার রুনা’পা এখনো সেই রুনা’পা ই আছেন। কিছু না করতে পারি তোমার জন্য শুধু তুমি আমার হাতটা ধরে থাকলেও তোমার অনেক ভালো লাগবে আশা করি।ইতি
তোমার রুনা’পা
০৮/০৭/২০২৪
বিঃদ্রঃ পত্রে লিখিত সমস্ত তথ্যই সঠিক, শুধু নামটা বাদে।6 Comments-
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 12 July 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
-
Friends
Hasina Sultana Rima Rima
@hasinasultanarimarima
আনিকা মারজান ইরা
@anikamarjanera
Marketing Online
@marketingonline
Munmun Chakraborty
@munmunchakraborty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
আনিকা ইসলাম হৃদিতা
@hridita
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Song For Peace
@songforpeace
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat



অনিন্দ্য সুন্দর কথামালা… 💙🖤