Profile Photo

কলমে পৃথিবীOffline

  • asin432
  • Profile picture of কলমে পৃথিবী

    কলমে পৃথিবী

    1 year, 9 months ago

    আমি ৭১ দেখিনি তবে ২৪ দেখেছি!
    রণক্ষেত্র থেকে বলছি

    ৩ আগস্ট, ২০২৪

    দিনটা ছিল বিজয়ের, বিজয়ের মিছিল হাসিমাখা মুখ যুদ্ধে জয়ের। কিন্তু কে জানত সেই হাসিমাখা মুখ খানি রক্তে রক্তাক্ত হবে। কারণ, রাক্ষুস গুলো সেই রাতে মিরপুর-১০ আদর্শ স্কুল দখল নিলো আর জড়ো করলো হাজারো রাইফেল, বুলেট, ছুড়ি, চা-পাতি।

    ৪ আগস্ট, ২০২৪

    সময়টা প্রায় সকাল ১১টা বের হয়ে গেলাম ঘর থেকে এই ভেবে যে হয়ত আর কখনো বাড়ি ফিরে নাও আসতে পারি; কারণ যুদ্ধে নামলে মনে সেই বল নিয়েই নামতে হয় যদি তুমি ভয় পাও তাহলে তুমি পিছিয়ে যাবে আর যদি এগিয়ে যাও তাহলে জয় তোমার নিশ্চিত।
    চলে গেলাম মিরপুর-১০, সেখান থেকে হেটে চলে গেলাম মিরপুর-২, আবার চলে আসলাম মিরপুর-১০ সেখান থেকে চলে গেলাম আইডিয়াল স্কুলের পেছনে কারণ, ছাত্র জনতা এই দিনটায় পিছিয়ে গেলো রাক্ষুসের কাছে, মিরপুর-১০ তখন রীতিমতো রাক্ষুসের কবলে, হাঁতে রাইফেল, বুলেট, রাম দা যা রীতিমতো নিরীহ প্রাণ গুলো নেওয়ার জন্য। কোন কিছু না ভেবে ধীরে ধীরে সবাই স্থান নিলাম স্কুলের পেছনে সবাই জড়ো হওয়ার পর নেমে পড়লাম সুন্দর আমার এই দেশটাকে রক্ষা করতে। সময় অনেকটা ১২টা, যেই সামনে আগালাম ঠিক মুহূর্তের মধ্যে হামলা হলো আমাদের ওপর রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়া শুরু হলো; সবাই পেছনে দৌড়ে গেলো তখনও যেন এই ছোট্ট প্রাণটা ভয় পেলো না।
    কিছুদূর দৌড়ানোর পর যখন নিজেকে সেইফ করতে গেলাম তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কেউ একজন পেছন থেকে কি দিয়ে যেন আঘাত করলো আমার মাথায়, কিছু একটা ফিল করতে পারলাম যে হয়ত কিছু একটা হয়েছে আমার সাথে কিন্তু পরিস্থিতি আর সময়টা এমন মোটেও ছিল না যে নিজের দিকে খেয়াল করে দেখবো যে আসলে কি হলো আমার সাথে। তখন সময় প্রায় ১২:৩০ টা শুরু হলো মিরপুরে আমার উপরেই প্রথম হামলা করার ওদের লক্ষ্য। কিছুক্ষণ হেঁটে যখন সামনে এগিয়ে গেলাম ঠিক তখন পাশ থেকে একটি মেয়ে বলে উঠলো আপু আপনার মাথা দিয়ে অনেক রক্ত পড়তেছে আমি বললাম না তেমন আঘাত তো লাগেনি তাহলে তো আমি হাঁটতে পারতাম না যেহেতু আমাকে কখনোই অপ্ল আঘাতে ঘায়েল করতে পারে না।
    যেহেতু হিজাব টা সাদা ছিল এজন্য হয়ত মেয়েটির চোখে পরেছে আমি পেছনে হাত দিয়ে যখন হাতটা সামনে আনলাম দেখলাম রক্ত অনর্গল জড়ছে সেটা দেখেও আমি তখন তেমন একটা ভেঙ্গে পড়িনি। সাদা হিজাবটা মুহূর্তেই রূপ নিলো লাল রক্তে জাপানি পতাকায়। তারপর পাশের একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে সেখানে একজন আন্টি তার ঘরে নিয়ে আর আমার পাশে মেয়েটি ছিল এই দুইজন মিলে আমার মাথায় টিসু দিয়ে চেপে ধরল তাও রক্ত বন্ধ হওয়ার কোন নাম নেই, বরফ নিয়ে চেপে ধরল বলতেছে রক্ত থামছে না তোমার হসপিটাল যাওয়া উচিত আমার মাথায় তখন একটা বিষয়ই কাজ করছিল আমি হসপিটাল যাবোই না কারণ সবাই এখানে এই যুদ্ধে এইটুকু আঘাতে ভেঙ্গে পরলে হবে না।
    আন্টিকে আর ঐ মেয়েটিকে যার নাম ছিল হাফিজা বললাম কোন রকম রক্ত পরাটা বন্ধ করে দেন প্লিজ। অনেক চেষ্টা করার পর কিছুটা থামলো তারপর একটা কাপড় বেধে নেমে পড়লাম আমাকে কেউ রাস্তায় নামতে দিল না আর আমি সেই রকম অবস্থায় ছিলাম না। ইতিমধ্যে প্রাইমারি মেডিক্যাল টিম আসলো তাদের কে বললাম কিছু একটা করে রক্ত টা থামানোর কথা তারা ভায়োডিন দিয়ে ব্যাণ্ডেজ করে দিল। আমার সেই আঘাত দেখে পাশে থাকা অন্য একটি মেয়ে senseless হয়ে গেলো, অন্য আর একটা মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল এই সব দেখে কোন ভাবেই আমি হসপিটাল যাওয়ার কথা ভাবতেই পারিনি যুদ্ধে যখন নেমেছি হয় মরবো না হয় মারবো। ঐ দিকে বাইরে অনর্গল বুলেট, টিয়ারশেল ছুড়ছে আর এক এক করে বাসায় ঢুকছে আহত অবস্থায়। নিজের হাঁতে রেখে দেখেছি বুলেটে আক্রান্ত নিরীহ প্রাণটি কীভাবে ছটফট করছে। এভাবে ঘন্টা দুয়েক চললো, কিন্তু রাক্ষুসের বুলেট শেষ হচ্ছে না, তারপর একদম আমরা যেই বাসায় শেল্টার নিয়েছিলাম ঠিক সেই বাড়ির গেটের সামনে এসে নন-স্টপ বুলেট ছুড়ছে এই দেখে মেয়েরা সব কান্না শুরু করে দিয়েছে, কোন ভাবেই সুযোগ নেই যে বেঁচে ফিরবো। কেউ একজন বলে দিয়েছিল যে আমরা ঐ বাসায় শেল্টার নিয়েছি সেটা শুনে আইডিয়াল স্কুল দখলে নিয়ে সেটার ভেতর থেকে বুলেট, টিয়ারসেল ছুড়তে লাগলো; প্লান টা এমন ছিল ওদেরকে বুলেট ছুড়তে দেওয়া কতক্ষণ ছুরতে পারে তারপর দেখা যাবে কারা মরে আর কারা বাঁচে; আমরা অস্ত্র বিহীন তাও তোদের এত ভয়; কিন্তু বুলেট শেষ হওয়ার কোন সুযোগ দেখছি না; তারপরও আমাদের কেউই হার মানলো না নেমে পরলো আবারো। কিন্তু আমাদের কেউ হার মানবার নয় এটাই মনে প্রানে বলেই বেরিয়েছি বেঁচে হয়ত ফিরবো না কিন্তু অন্যায়কে জিতে দেওয়া যাবে না।
    বেলা ৩ টা আর্মি এসে সাউণ্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে রাক্ষুসদের ছত্র ভঙ্গ করে দিল, আমরা সবাই মিরপুর-১০ গোল চত্বরে জড়ো হই তখন পুরো মিরপুর-১০ আমাদের দখলে মানে জয় আমাদের, বিজয় মিছিল দিচ্ছি, বিজয় পতাকা উড়িয়েছি নিজ হাঁতে এই অনুভূতি সর্বশ্রেষ্ঠ অনুভূতি। তখন পর্যন্ত খবর আসলো মৃত্যু ৭জন, আহত অগনিত। তবুও ভেঙ্গে পড়ার নেই। আর্মি দের নিয়ে বিজয় মিছিল হচ্ছিল কিছুক্ষণ পর আর্মি চলে গেলো তার ২মিনিট পর চার পাঁচটা ড্রোন দিয়ে আমাদের অবস্থান দেখে গেলো, মিনিট দু’ইয়ের মধ্যেই আবার হামলা হলো, বুলেট ছোড়া শুরু হলো, মুহূর্তের মধ্যে আবার রনখেত্রে পরিণত হলো সময় প্রায় ৬টা। আমার সাথে দুটো মেয়ে ছিল, বুলেটের আওয়াজে একজন ভয় পেয়ে আমার হাঁতটা ছেড়ে কোথায় গেলো আর পেলাম না, আর অন্য যে ছিল ওকে নিয়ে আমি চলে গেলাম আমার পাশেই পরিচিত একজনের বাসায় সেখানে মাঝ পথে পরে গিয়ে হাত কেটে যায়। ওর বাসায় কিছুক্ষণ থেকে খেতে দিল ঐ সময় তো খাবার পেটে দেওয়ার মত না তাও কোন রকম ফ্রেস হয়ে খেয়ে ঐ মেয়েকে (লিজা) বাসার একটু দূরে নামিয়ে দিয়ে আসলাম সময় ৯টা, যেহেতু ঐ এরিয়া টাও অনেকটা রিস্ক এজন্য আমি নিজেও একা ওখানে বেশি সময় না কাটিয়ে চলে আসি তার ওপর আমার মাথা ব্যান্ডেজ কথা দিয়েছিলাম ওদেরকে বাসায় নিরাপদে পৌঁছে দিব, কিন্তু একজনকে পৌঁছে দিতে পারিনি অনেক সময় অপেক্ষা করেছি মেয়েটি আসে কিনা ফিরে, ওর বাসায় ফোন করেছি কয়েক বার কেউ রিসিভ করেনি। আমি ৯:৩০টা নাগাদ আন্টির বাসায় যাই সেখানে গিয়ে মাথার ব্যান্ডেজ খুলে বাসায় ঢুকি কারণ ঐ দিকে আমার পরিবার নিয়েও টেনশন ছিল আমার এমন দেখলে হয়ত আমার পরিবারের উপর আঘাত আসতে পারে। আমি বাসায় আসার কিছুক্ষণ পর আন্টি আমাকে নাপা মেডিসিন দিয়ে গেলো। রাত ১১টা মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা কোন ব্যান্ডেজ নেই কিছু নেই; এই অবস্থা আমার আন্টির ছেলে (সম্পর্কে ভাইয়া) আমাকে এসএমএস দিলো যে, আমি আম্মুকে কে দিয়ে ভায়োডিন পাঠাচ্ছি তুমি ওটা মাথায় লাগিয়ে ঘুমাও, আমি বললাম যে না ভাইয়া আম্মু আছে জেনে যাবে; ভাইয়া বললো জানলে জানবে কিন্তু তোমার মাথার যেই অবস্থা এইভাবে থাকলে তোমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে যেহেতু আম্মুকে কিছু বলিনি চিন্তা করবে বলে। আমি ভাইয়াকে বারবার না করলাম; বললাম আন্টি বারবার আসলে আম্মু বুঝে যাবে। আর যদি আসে তাহলে বাসার পাশে ঐদিকে যে মেডিসিনের শপ আছে ঐদিক দিয়ে ঘুরে আসতে বইলেন এর মধ্যেই আম্মু চলে আসছে বাসায় বললাম ভাইয়া আম্মু চলে আসছে আপনি আন্টিকে পাঠাইয়েন না। আপনি যদি কাউকে পাঠাতে চান তাহলে আঙ্কেলকে পাঠান কারণ আঙ্কেল যেহেতু সিগারেট খায় আম্মু সন্দেহ করবে না ভাববে সিগারেট খেতে বের হয়েছে; ভাইয়া বললো ঠিক আছে। তারপর ভাইয়াকে বললাম আম্মু বাইরে গেলে তখন আসতে বলেন আঙ্কেলকে ভাইয়া বললো ঠিক আছে। সময় রাত ১টার মত আঙ্কেল আমাদের বাসার গেইটের সামনে আসলো আমি বের হয়ে ভায়োডিন-টা নিয়ে লুকিয়ে ঘরে ঢুকলাম। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে একা একা যতটুকু পেরেছি ভায়োডিন কাটা জায়গায় লাগিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু ঘুম আর আসলো না। এভাবেই কোন ট্রিটমেন্ট না নিয়ে লুকিয়ে থাকলাম ভাইয়া আমাকে প্রাইমারি ট্রিট্মেন্ট দিচ্ছিলো কিন্তু সেটা তেমন সুবিধার ছিল না কিন্তু হসপিটালে যাওয়ার মত পরিস্থিতিও আমার ছিল না। ঐ ভাবে দুই দিন কাটালাম। চুরি না করেও চোর এমন একটা অবস্থা। পরিবার যেখানে সব কিছু তারপরও অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাটাকে আমি কখনো মনুষ্যত্ব বলি না। ৭১’র বর্বরতা দেখিনি তবে ২৪’র বর্বরতার শিকার হয়েছি; একজন পরিপূর্ণ গর্বিত বাঙ্গালী হতে পেরেছি; একজন মুক্তিযোদ্ধা হতে পেরেছি। দাগটা থেকে যাবে তবে মনে স্বস্তি রয়ে যাবে যে আমি ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিলাম না।

    ৫ আগস্ট, ২০২৪ লং মার্চ

    সকাল ১০টা চলে গেলাম আন্টির বাসায়। ভাইয়াকে বললাম কোন রকম ব্যান্ডেজ করে দেন ভাইয়া যেহেতু এইসব ভয় পায় আমার জন্য কষ্টকর হয়ে গেলো। তারপর ডেকে আনলো পরিচিত এক ছোট ভাইকে দু’জন বলতেছে হসপিটালে যাওয়া উচিত আমি বললাম না, ঘরে বসেই যা করার করতে হবে। তারপর দু’জন মিলে কাটা জায়গা থেকে আংশিক চুল কেটে ফেলে জায়গাটা ওয়াশ করে ব্যান্ডেজ করে দিলো। কিছুক্ষণ পরে নিউজে আসলো ফ্যাসিস্ট সরকার পদত্যাগ করেছে।
    দিনটা অনায়াসেই আনন্দের দিন বিজয়ের দিন কিন্তু যেতে পারিনি মাথায় আঘাত লাগার কারণে, তবুও থেমে থাকিনি বিকেলে আন্টিকে নিয়ে হেঁটে চলে গেলাম মিরপুর-১০ আর চারিদিকে বিজয়ে মিছিল দেখছিলাম আর ভাবছিলাম এত মানুষ আমার এই মিরপুরে এই মানুষগুলো যদি এগিয়ে আসত তাহলে হয়ত এত গুলো তাজা প্রাণ হারাতে হতো না। বিজয়ের হাসি হাসলাম একটি পতাকা কোটি মানুষ।

    ৬ আগস্ট, ২০২৪

    দু’দিন নিজের এলাকায় লুকিয়ে রইলাম। তারপর চলে গেলাম হসপিটাল আর কোন ভয় না রেখে ডাক্তার দেখে একটু বকাঝকা করলো তারপর ডিরেক্ট দিল সেলাই করে সেলাই করতে গিয়ে দু’বার সেলাইয়ের সুতা ছিঁড়ে গেলো, চুলটা অবশ্য বাসায় থেকেই কেটেছিলাম কোন উপায় না দেখে। তারপর চলে আসি বাসায়,৭ দিন পর যেতে বললো সেলাই কাটতে কিন্তু ড্রেসিং এর কি করবো এত বার বার তো হসপিটাল যেতে পারবো না, হঠাৎ মনে পরে গেলো আমার কলেজের এক ছোট ভাইয়ের কথা কল দিলাম ৮ তারিখ বাসায় এসে ড্রেসিং করে দিয়ে গেলো, প্রচণ্ড ব্যথা, আবার ১০ তারিখ এসে ড্রেসিং করে দিয়ে গেলো, ১৩ তারিখ সেলাই কাটতে চলে গেলাম হসপিটালে সেলাই কেটে চলে আসলাম বাসায়।
    আমি ৭১ দেখিনি কিন্তু ভয়াল ২৪ দেখেছি যা কখনো ভুলে যাবার নয়, যা ইতিহাস সাক্ষী, যা অন্যায়ের প্রতিবাদি কন্ঠের প্রতিধ্বনি, যা বার বার ফিরে আসবে কন্ঠে। ভয়াল সেই দিনটা নেই কোন বাঁচার আশা, নেই কোন বাড়ি ফিরে আসার নিশ্চয়তা তবুও বুক ভরা বিজয় ছিনিয়ে আনার আশা। বলে কখনো বুজানো যাবে না।

    চম্পা আক্তার,
    মুক্তিযোদ্ধার লেখা

Skip to toolbar