-
অমরত্বের ক্লান্তি
প্রীতম বিশ্বাস২০৮৫ সাল। পৃথিবী তখন দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে। মানুষের মৃত্যুভয় দূর করার লক্ষ্যে “প্রজেক্ট ইমরটাস” নামে এক যুগান্তকারী গবেষণা চালাচ্ছে বিজ্ঞানী প্রীতম । তার লক্ষ্য একটাই—মৃত্যুকে চিরতরে পরাজিত করা।
প্রীতম মস্তিষ্কের চেতনা ডিজিটাল রূপে স্থানান্তর করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন। মানুষের চেতনাকে সংরক্ষণ করে একটি কৃত্রিম দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়, যেখানে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক অপরিবর্তিত থাকে। প্রথম সফল পরীক্ষা হয় একজন ধনী ব্যবসায়ীর ওপর।
কিন্তু প্রীতম নিজের আবিষ্কারে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন, “আমার জীবনে যদি এই প্রযুক্তি কাজ করে, তবেই আমি বুঝব, এটা সবার জন্য নিরাপদ।”
একদিন একটি দুর্ঘটনায় প্রীতম মৃত্যুর মুখোমুখি হন। তার সহযোগী, ডাঃ রুমি তাকে কৃত্রিম দেহে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। মৃত্যুকে এড়াতে তার চেতনা সফলভাবে একটি অ্যান্ড্রয়েড শরীরে স্থাপন করা হয়।
প্রথমবারের মতো কৃত্রিম শরীরে জেগে উঠে প্রীতম বললেন,
“রুমি… আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি?”
রুমি হেসে বললেন, “আপনি শুধু বেঁচে নেই, আপনি এখন চিরজীবী। মানুষ আপনাকে নিয়ে ইতিহাস লিখবে।”প্রীতম চুপ করে গেলেন। তার শরীর শক্তিশালী, তার প্রতিটি অনুভূতি যেন আগের মতো। কিন্তু কিছু যেন হারিয়ে গেছে।
কিছু মাস পর প্রীতম বুঝতে পারলেন, অমরত্ব একটি বোঝা। যখন তার স্ত্রী রিতু একটি হৃদরোগে মারা গেলেন, তিনি অনুভব করলেন শোকের গভীরতা। তার স্ত্রী চিরকালীন জীবন গ্রহণ করেননি।
রুমি এসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
“প্রীতম, রিতু মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু আপনি? আপনি তো পৃথিবী বদলানোর জন্য বেঁচে আছেন।”
প্রীতম এক গ্লাস জল নিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। “আমি পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে কি সম্ভব, রুমি? জীবন থেকে যদি মৃত্যু সরিয়ে দিই, তবে কি সেটা আর জীবন থাকে?”রুমি কিছু বলার সাহস পেল না।
দুই শতাব্দী পার হয়ে গেছে। পৃথিবীতে তখন শুধুই কৃত্রিম দেহে বেঁচে থাকা মানুষ। আবেগের কোনো স্থান নেই। প্রেম নেই, শোক নেই। সমাজে মৃত্যু বলতে কিছু নেই।
প্রীতম একটি বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিলেন। তার মেয়ে রুহির স্মৃতি তার কাছে ঝাপসা হয়ে গেছে। অথচ এক সময় সে ছিল তার পৃথিবী। তিনি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন,
“আমি কি এখনো মানুষ? যদি মৃত্যু না থাকে, তবে জীবনের অর্থ কী?”একদিন তিনি রুমির স্মৃতিফলক দেখতে গেলেন। সেখানে লেখা ছিল:
“জীবন তখনই সুন্দর, যখন তার শেষ আছে।”প্রীতম গভীরভাবে চিন্তা করলেন।
প্রীতম নিজের গবেষণাগারে একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করলেন। এটি এমন একটি যন্ত্র, যা চেতনাকে স্থায়ীভাবে মুছে দেবে। এই যন্ত্র চালু করা মানে চিরতরে বিদায় নেওয়া।
তার প্রাক্তন সহকর্মী দীপ এসে বললেন,
“স্যার, আপনি কি সত্যিই এই যন্ত্র চালু করবেন? আপনি তো ইতিহাসের মহান বিজ্ঞানী!”
প্রীতম শান্ত গলায় বললেন,
“আমি হয়তো ইতিহাসের একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু আমার ভুলে মানুষ তাদের মানবিকতা হারিয়েছে। জীবন যদি চিরকালীন হয়, তবে আবেগ, প্রেম, দুঃখ—সবকিছু মুছে যায়। আমি চাই, মানুষ আবার জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝুক।”যন্ত্রটি চালু করার আগে তিনি একটি চিঠি লেখেন:
“আমি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্ত হয়তো নতুন জীবন ফিরিয়ে আনবে।”যন্ত্রটি চালু হতেই সব অন্ধকার হয়ে গেল।
প্রীতমের আত্মত্যাগ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ বুঝতে পারল, চিরকালীন জীবন কেবল একটি অভিশাপ। একে একে অনেকেই তাদের চেতনাকে মুক্ত করে দিল।
পৃথিবীতে আবার নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব হলো। প্রকৃতি ফিরে এল তার আগের রূপে। মানুষ শিখল, জীবনের সৌন্দর্যই হলো তার ক্ষণস্থায়িত্ব।
1 Comment
Friends
সুশোভন ইফতেখার শাওন
@shosovon
Prithula Zaman
@prithula
এস এম সজিবুল ইসলাম
@shojib-rumman
Md-Shajib-Sikder
@md-shajib-sikder
Queen Ritu
@smilee88
ইয়াসিন আরাফাত
@easir-arafat
মো: কামরুল হাসান (অপু)
@kamrul-hasan
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
Ikram Akbar
@ikram-akbar


অমরত্ব বলে কিছু নাই; তবু সবাই তার সন্ধান করে। অভিনন্দন।