Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    1 year, 3 months ago

    গিনিপিগ

    পাত্রী চাইঃ
    পাত্র ৫ ফিট ৪ ইঞ্চি। ঢাকার ধানমন্ডিতে পাত্রের নিজস্ব বাড়ি আছে। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান পাত্রের জন্য লম্বা, সুন্দরী, সুশিক্ষিতা, রন্ধন বিষয়ে পারদর্শী,ইংরেজি ভালো জ্ঞান সম্পন্ন পাত্রী চাই। ছেলে সাময়িক ভাবে খানিকটা মানসিক ভারসাম্যচ্যুত।পাত্র বিশিষ্ট মানসিক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসাধীন।

    পাত্রী নিজে অথবা পাত্রীর অভিভাবক বিভিন্ন পোজের ৪ কপি ছবি, বায়োডাটা, মেডিকেল রিপোর্ট সহ সরাসরি নিম্নলিখিত ঠিকানায় অতিসত্ত্বর যোগাযোগ করুন। যোগাযোগ সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।
    যোগাযোগের ঠিকানা –
    ঘটক উট ভাই
    মোবাইলঃ ০১৭১২০০০০০…

    বিজ্ঞাপন দেখে ঘাবড়াবেন না। এ ধরনের বহু বহু বিজ্ঞাপন আপনি পত্রিকা খুললেই দেখতে পারবেন।

    যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানের যে কোন পরীক্ষা করার জন্য পরীক্ষণ পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় গিনিপিগ, ইঁদুর, বানর, খরগোশ, শিম্পাঞ্জি। কিন্তু আপনারা কি জানেন, এর চেয়ে অনেক কঠিন, কঠিন পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় মেয়েদেরকে?
    মনে করা হয় তারা গিনিপিগ। তাদের জন্মই হয়েছে অন্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে।

    ব্যাখ্যাঃ ধরুন কোনো ছেলে মানসিক ভাবে অসুস্থ। ডাক্তারের পরামর্শেই হোক আর ছেলের দশজন শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শঃ ছেলেকে বিয়ে দেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
    ছেলে পক্ষের সবাই দল বেধে ছুটলো মেয়ে দেখতে। পাত্র মানসিক রুগী হয়েছে তো কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে নাকি! পাত্রী নিতে হবে লক্ষ্মী প্রতিমার মতো। যাতে পাত্রী দেখেই পাত্রের রোগ অর্ধেক সেরে যায়। তাই কখনো পাত্রী পক্ষের অমতে বা না জানিয়ে, কখনো বা জানিয়ে বিয়ে দেয়া হলো, সেই মানসিকভাবে অসুস্থ পাত্রের সঙ্গে।

    এরপর পাত্রের বাবা,মা অথবা পাত্রীর বাবা মা কি একবারের জন্যও ভাবেন- যে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে সর্বোপরি একজন মানসিক অসুস্থ রোগীকে কিভাবে বসে আনবে পাত্রী ? সে তো ডাক্তার বা ওই রোগ সম্পর্কে তার সামান্যতম জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, ধারণাও নেই। তবু্ তাকে এটা মেনে নিতে হবে। কারণ সে মেয়ে, এটাই তার পাপ।
    আবার কোন পাত্র মাদকাসক্ত। বাবা মা পাড়া প্রতিবেশীর ধারণা, ছেলের (পাত্র) বিয়ে দেন সব ঠিক হবে।

    কি ঠিক হবে? আপনার ছেলে আপনার ঘরে ফিরে আসবে?

    ঢাকঢোল বাজিয়ে দেয়া হলো বিয়ে। বাসর রাতে বৌকে বসিয়ে রেখে মাদক নেওয়ার জন্য চলে গেলো। ফিরে এলো দুই দিন পরে। বৌ আস্তে আস্তে বুঝতে পারলো তার এটাই ভাগ্য। বাবা, মা পাড়া প্রতিবেশী কেউ কি এগিয়ে আসবে মেয়েটার সমস্যা সমাধান করতে?

    ছেলে পরকীয়ায় আসক্ত বা অবৈধ প্রেমে পড়েছে? চিন্তা কি? খোঁজ করো একটা গিনিপিগ। বাবা, মা চেষ্টা করেন- কোন ভাবে যদি বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে পারি তাহলে ছেলের সব মোহ কেটে যাবে। লজ্জাবতী গিনিপিগের সঙ্গে জোর করে হোক বা কথার মারপ্যাঁচেই হোক, দেয়া হলো বিয়ে। পাত্র প্রতিটি মুহূর্তে তার প্রেমিকার সঙ্গে তুলনা করবে নতুন বৌ- এর। নাহ! তোমার নাকটা বোঁচা, তোমার গালে টোল পড়ে না। ওর গায়ের রং দুধে আলতা, ওর কণ্ঠে মধু ঝরে, তুমি কিছু কিছু পারো না!
    এত কিছু শোনার পরেও বৌ যদি বাবার বাড়ির কষ্টের কথা ভেবে যেতে না পারে তবে তার একমাত্র পথ আত্মহত্যা। এর এই মৃত্যুর দায় বহন করবে কে? ছেলের বাবা মা? আর একটা উপায় অবশ্য আছে, দেনমোহরের টাকার জন্য স্বামী নামের ওই নরকের কীটের পিছনে ছোটাছুটি করা এই তো জীবন গিনিপিগের?
    আবার বৌ এমন ধারণাও করতে পারে,দেনমোহরের টাকা দেয়ার ভয়ে তার স্বামী তাকে কাছে টেনে নেবে এটাই বা কি কম গিনিপিগের! আরে বোকা মেয়ে এর চেয়ে তোকে টানবাজারে নিয়ে বেচে দিয়ে অনেক টাকা পাবে তোর ওই নরকের কীট।

    কোনো ছেলেকে কোনো মেয়ে প্রতারণা করেছে। সেই ছেলে তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বেছে নিল আর একজন মেয়েকে। তার সংগে প্রেমের অভিনয় করে তার প্রতি আসক্ত করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রতিশোধ নিল তার উপরে প্রতারণার।

    এতো কিছু ঘটনা সত্ত্বেও মেয়েদের বিয়ে করতে হয় আর ছেলেরা মেয়েদের বিয়ে করে উদ্ধার করে। যতো উচ্চ শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মেয়ে হোক তাকে যে বিয়ে করতেই হবে। কারণ যাকে সে বিয়ে করবে সে তার থেকে যতোই অযোগ্য হোক তবুও সে পুরুষ। সে তাকে আশ্রয় দেবে,নিরাপত্তা দেবে,আরো অনেক অনেক কিছু দেবে।আবার সেই স্বামীই সুযোগ পেলে স্ত্রীকে ছেড়ে পালাতেও দ্বিধা করবে না। তবুও সে একজন স্ত্রীর নিরাপত্তার লাইসেন্স। সে তোমাকে পার্টিতে, বসের চেম্বারে নিয়ে একটার পর একটা উন্নতির শিখরে উঠবে তবুও সে তোমার স্বামী। এই হলো আমাদের সমাজ।

    এইসব নিরাপত্তা, বিয়ে নামের সার্টিফিকেটের জন্য মেয়ের বাবা,মা মেয়ের বিয়ের বয়স হলে বা না হলেও যোগ্য পাত্র খোঁজে। কারণ সৎ পাত্রে কন্যা দান করতে হবে। এখনো তো গ্রামে মেয়ে দেখতে এসে কোরবানির গরু দেখার মতো করে দেখা হয়। শহরের শিক্ষিত মেয়েদের ওভাবে না পারলেও দুই একটা প্রশ্ন যে করে না এমন নয়। যেমন – মা বলো তো কোন শহরকে বিগ আপেল(Big Apple)বলা হয়? আর অল্প শিক্ষিত কুলসুমকে বলা হয় – মা বলো তো ডাক্তার আসার পূর্বে ই রোগী মারা গেলো এর ইংরেজি কি হবে?

    খোঁজ খবর নিয়ে বাবা, মা ই বিয়ে দিক বা সাত / আট বছর প্রেম করে নিজেই বিয়ে করুক, বিয়ের পর যখন জানতে পারবেন পাত্রের নানা গুনকীর্তন তখন মেয়েরতো শুধু চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
    আর বাবা, মা বলবেন, কি আর করবে মা! মেয়ে হয়ে জন্মেছিস ভাগ্যে যা আছে তাতো মানতেই হবে। আর আপনিও নিজেকে গিনিপিগ হিসেবে ধরে নিয়ে চেষ্টা করতে থাকবেন মানসিক রোগীকে, মাদকাসক্তকে বশ করে সংসারি করতে। না পারলে ঘাবড়াবেন না, আছে তো আরো গিনিপিগ।
    আবারও খোঁজা শুরু হবে পাত্রী চাই…..
    পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন।

    বিঃদ্রঃ লেখাটি ৯/১১/১৯৯৯ এর যায়যায়দিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো । ২২ বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ এ এখন বাস করি। এখন নারীকে উন্নত প্রযুক্তির “পরীক্ষণ পাত্র ” / “গিনিপিগ ” হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

    3
    3 Comments
Skip to toolbar