Profile Photo

তুলিOffline

  • TulTuli
  • Profile picture of তুলি

    তুলি

    1 year, 2 months ago

    পর্ব ১০
    ~রুম নাম্বার ১২০
    তুলি

    তরী :
    জায়গাটা মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর রে তিয়াশ! থ্যাঙ্ক ইউ।
    তিয়াশ:
    হ্যাঁ, এখন তো তোর সাথে আমার থ্যাঙ্ক ইউ এর সম্পর্কই!

    (তিয়াশের মন খারাপের কারণ বুঝতে পারে তরী। টরেন্টোতে যখন তাদের বন্ধুত্ব হয়, তখন তারা একজন আরেকজনকে কখনও সরি, থ্যাঙ্কস বলবে না বলেছিল তরী। বন্ধুত্বে এত ফর্মালিটি ভালো লাগেনা তার। আজ নিজেই সেই রুলস ভুল গিয়েছে বলে কষ্ট পেয়েছে তিয়াশ!) প্রসঙ্গ পাল্টাতে তরী বলে উঠল,
    আমি যদি হঠাৎ করে হারিয়ে যাই, নিজেকে সামলে নিতে পারবি না?

    তিয়াশ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় তরীর প্রশ্নে। প্রচন্ড অভিমানে গলার মধ্যে কান্নারা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। আবার এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে ইচ্ছা করছে কষে চড় মারতে। নিজেকে কোনোমতে সামলে তরীর দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে বলল,
    সেটা নির্ভর করবে কেন হারিয়ে যেতে চাচ্ছিস তার উপরে।
    তরী একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে সামনে হাঁটতে লাগল। এমন একটা সময় তৈরি হয়েছে যে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাকেও মন খুলে সব বলতে পারছে না।
    তিয়াশও দ্রুত পায়ে হেঁটে পাশাপাশি এসে জানতে চাইল,
    কি হয়েছে তোর তরী?
    তরী:
    বেশ ঝাল দিয়ে ফুচকা খেতে ইচ্ছা করছে তিয়াশ।
    তিয়াশ চায়না জোর করে জানতে চেয়ে তরীর কষ্টটাকে আরও বাড়িয়ে দিতে। তাই তরী কথা ঘুরালে তিয়াশও এমন ভাব করে যেন কিছুই হয়নি।
    তিয়াশ সামনের একটা ফুচকার দোকান থেকে ফুচকা আনতে গেলে তরীর চোখ বেয়ে অজান্তেই কষ্টগুলো গড়িয়ে পড়ল।

    সেদিন ওটি শেষে বাড়ি ফিরে ঠিক ভুল আর দ্বিধা দ্বন্দ্বের হিসাব অমীমাংসিত রেখেই রিডিং রুমে গিয়ে ৭ বছরের বন্ধ বাক্সটা বের করেছিল তরী। তার মন বলছিল কোনো না কোনো সূত্র এই বাক্সেই আছে। বাক্সটা তরী পেয়েছিল তন্বীর খাটের নিচ থেকে। কিন্তু কখনও খুলে দেখার সাহস হয়নি। আজ নামাযের বিরতিতে তিয়াশকে নিয়ে যে ভ্রম তৈরি হয়েছে তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই বাক্স তাকে সাহায্য করতে পারে অনুমান তার!

    বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলতে যাবে তখনই একটা ছোট্ট কালো বিড়াল মিউ ডেকে দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল রিডিং রুম থেকে। তরী খুবই অবাক হয়ে ভাবতে থাকল, তার বাড়িতে বিড়াল কি করে এলো!
    অবশ্য এর আগে আয়ানের মুখে এমন কালো বিড়াল দেখার কথা শুনেছে তরী। কিন্তু খুব একটা আগ্রহ দেখাইনি আয়ান ভয় পাবে বলে। এমনকি বেলীগাছের নিচেও এমন দেখেছিল বজ্রপাতের রাতে! ডিসেম্বরের কনকনে শীতেও তরীর কপালে ঘাম জমে যাচ্ছে! দোয়া দরুদ পড়ে বাক্সটা খুলে ফেলল তরী। বাক্স খুলতেই অবাক হয়ে গেল তরী! অবিকল তন্বীর মত দেখতে একটা পুতুল! আর সাথে পিরামিডের মত কিছু নকশা, কিছু পেন্টাগন আর অজানা অক্ষর, জিওম্যাট্রিক সিম্বল! তরী এবার বেশ ভয় পাচ্ছে। কিন্তু তাকে তো এর শেষ দেখতেই হবে। তন্বীর মৃত্যু আত্মহত্যা বলা হলেও তরীর ৮০% বিশ্বাস এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য আছে। সেই রহস্য হয়তো সমাধান করেই ফেলত বাক্সটা হাতে পাবার পরে, যদি না মাঝখানে বেলীর দুর্ঘটনা ঘটত। বেলী চলে যাবার পর তার সব মনোযোগ আয়ানকে দিতে হয়েছিল। বেলীর হার্টে VSD ছিল। পরপর ২ বার অপারেশন করে কারেক্টশন করার পরও হায়াতের রুটিনকে আটকাতে পারেনাই কেউ। সেই ঝড়ের রাতে তরীর হৃদয়ে ঝড় তুলে বেলী চলে যায় আল্লাহর কাছে। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, বেলী যেদিন মারা যায় সেদিন বেলীর ইনহেলার টিউবটাই ছিলনা ড্রয়ারে। অথচ শ্বাসকষ্ট হত বলে সবসময়ই ড্রয়ারে ডাবল ইনহেলার থাকত। সেই ইনহেলার পরে পাওয়া গিয়েছিল বেলী গাছের নিচে!
    বেলীর আকস্মিক চলে যাওয়াতে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যান বেলী আর তরীর মা রুকাইয়া বেগম। মায়ের দেখাশোনা, আয়ানের দেখাশোনা আর নিজের পড়াশোনা নিয়ে এতটা ব্যস্ত হয়ে যায় তরী যে তন্বীর বিষয়টা নিয়ে আর আগাতে পারেনা। তন্বী মারা যাবার পর থেকেই তরীর সাথে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন তার মনে হত তন্বী রুমেই থাকে। নিয়ম করে পড়তে বসে, ঘুমাতে যায়। প্রথম দিকে হ্যালোসিনেশন ভেবে বিষয়টাকে ইগনোর করলেও বেলী মারা যাবার দিন থেকে তরীর আর স্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু সময়টা এমন ছিল যে তরী এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতেও সময় পাচ্ছিল না।
    তরী যখন ইন্টার্নী করছে, তখন একদিন তরীর মাও চলে যায় আল্লাহর কাছে। প্যারালাইজড হবার পর থেকে স্ক্র্যাচে ভর করে হাঁটতে হত রুকাইয়া বেগমের। কিন্তু সেদিন স্ক্র্যাচ ২ টা রুমে না থাকায় রুকাইয়া বেগম উঠতে গিয়ে পড়ে যান। ময়না দৌঁড়ে এসে এই অবস্থা দেখে তরীকে কল দেয়। তরী কলেজ থেকে দৌঁড়ে আসে। তরীর হাত শক্ত করে ধরে ‘তন…’ কিছু বলতে চেয়েছিলেন রুকাইয়া বেগম। কিন্তু পুরা কথা বলার আগেই শান্তির ঘুমে তলিয়ে যান। তরী কেন যেন ঠিক বুঝে গিয়েছিল তিনি তন্বীর কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কারণ তরী নিজেও অস্বাভাবিক বিষয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। আর ক্র্যাচ ২ টা যখন নিচের রিডিং রুম থেকে পাওয়া যায় তখন তরীর সন্দেহ আরও গেড়ে বসে।

    রুকাইয়া বেগমের মৃত্যুতে তরীর বাবা সিকদার চৌধুরী খুবই ভেঙে পড়েন। তিনি একদম চুপচাপ হয়ে যান। সেদিন রাতে তরীর গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। আর তরী খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখে। পরদিন আয়ান তরীকে জানায় রিডিং রুমে একটা কালো বিড়াল তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তরীর কলিজাটা ধক করে ওঠে। সে আর কাউকে হারাতে চায়না।
    তরী তাকবীর ভাই আর ফুফুকে জানায় সে FCPS করতে টরেন্টো যেতে চায়। আয়ানের এখন চারবছর বয়স। তাকে হাফেজি মাদ্রাসায় দিলে ভালো হবে। সে দেশে ফেরার পর নাহয় আবার তার কাছে নিয়ে আসবে। জন্মের পর থেকে তরীই দেখাশোনা করত বলে, তার সিদ্ধান্ততেই রাজি হয়ে যায়। যদিও আসল কারণ তরী কাউকে জানায়নি। সিকদার চৌধুরী ছাড়া তরীর আপন বলতে আর কেউই ছিলনা তখন। তরী কোনোভাবেই সিকদার চৌধুরীকে হারাতে চায়না। কিন্তু তরী কাছে থাকলে কিংবা এই বাড়িতে থাকলে যদি তার বাবার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, সেই ভয়ে বাবাকে নিয়ে টরেন্টোতে চলে যায় তরী। যদিও টরেন্টোতে তরী একা থাকে বলেই সবাই জানে। বাবার কথা কাউকে বলেনাই তরী। এমনকি তিয়াশও জানেনা। কিন্তু আর বেশিদিন এই লুকোচরি খেলতে হবেনা। তরী হয়তো সমাধান করে ফেলেছে সব। সত্যিই কি সব সমাধান হয়? নাকি সমাধানের শেষে সমীকরণের একটা পক্ষ সবসময়ই শূন্য থেকে যায়?

    -কিরে! ফুচকা খাবি না, তরী!
    তিয়াশের ডাকে চোখ মুছে নেয় তরী।
    ফুচকা শেষ করে তরী বলে ওঠে,
    আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিবি তিয়াশ? হাঁটতে ইচ্ছা করছে।
    তিয়াশ মাথা নাড়ে।
    তরী আজকের সময়টুকু স্মৃতিতে জমাতে চায়। সেজন্য যতটুকু সময় পাড়ছে কুড়িয়ে নিচ্ছে। তিয়াশ কি জানতে পারবে তরীর মনে কি ঝড় চলছে?

Skip to toolbar