-
মন কেমন কেমন করে!
কৃষ্ণজন (মোঃ মজনুর রহমান জন)ছিদ্রটা শেষ করা গেল শেষে! নিজেকে দক্ষ কাঠমিস্ত্রি মনে হলো শিপনের। কাঠমিস্ত্রি ভাবতে লজ্জা লাগলেও সাফল্যের আনন্দে আসল কাজে মনযোগ দিল। দরজার ছিদ্রতে উঁকি দিল সে। ওপাশের ঘরটি মোটামোটি দেখা যাচ্ছে। আশ^স্ত হলো। পনেরো দিন ধরে খুব গোপনে ছিদ্রটা করে যাচ্ছে সে। এতদিন লাগার কথা না। শিহাব ঘরে থাকলে কাজটা করতে পারে না শিপন। তবে আনন্দের বিষয়! শিহাব মাঝে মাঝেই বাড়ি থাকে না। সে ফাঁকেই ছিদ্র করার কাজটি চালিয়ে যায় শিপন। প্রায় একমাস ধরে তার মাথা খারাপ হয়ে আছে! মাথাটা খারাপ করেছে তাজ। শিপনের বন্ধু। সকল ‘সুকর্মের’ সঙ্গী। তাজু সেদিন তারুণ্যের শ্রেষ্ঠ রসগোল্লাটি উপভোগ করার স্বাদ পেয়ে যায়। তাজুর মামা শফিক পাটোয়ারী। ভাল ব্যবসায়ী। রাজশাহী থাকে। নতুন বিয়ে করে ঢাকা এসেছে হানিমুন করতে। তাজুর মা জোর করে শফিক ও তার বৌকে নিজেদের বাড়িতে রেখে দেয়। তার এক কথা, যতদিন ঢাকা থাকবি আমার বাড়িতেই থাকতে হবে। এতে তাজুদের আরো লাভ হয়েছে। শফিকের হাত বড়। প্রতিদিন নানা মজার মজার খাবার খেয়ে বাড়ির সবাই মহাআনন্দে আছে!
সেদিন রাত ১০টা। তাজু সিগারেট খাওয়ার জন্য বারান্দায় গেল। এ বয়সেই কড়া স্মোকার হয়ে গেছে। এই নিয়ে বন্ধুদের কাছে গর্বেরও শেষ নেই তার। মজার ব্যাপার হলো, নতুন দম্পত্তিকে যে রুমে থাকতে দেয়া হয়েছে সেটি বারান্দা সংলগ্ন। সিগারেট খেতে খেতে তাজু লক্ষ্য করল জানালটি ভিড়িয়ে রাখা। সামান্য ফাঁক দিয়ে হালকা আলো বারান্দায় এসে পড়েছে। এসব আমলে না নিয়ে সিগারেট ফুঁকতে লাগল তাজু। কিন্তু অবচেতনভাবেই কান সর্তক হয়ে উঠল তার। ভিতরের কিছু অদ্ভুত ও অস্পস্ট আওয়াজে তাজুর কৌতুহল সৃষ্টি হলো। মনকে শত বাধা দেয়ার পরও কৌতুহলের চরমে উঠল তার। অতঃপর! জানালার ফাঁক দিয়ে ভিতরে দৃষ্টি দান।
কথাটা শুনে, বিশেষ করে সার্বিক বিবরণ শোনার পর শিপনের মাথাটা গরম হয়ে যায়। রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। ১৮ বছর বয়সে তাজু যে মূল্যবান গুপ্তবিদ্যা দর্শন করে ফেলল সে তার কিছুই করতে পারল না! বসে বসে আঙ্গুল চোষা ছাড়া! এটা শিপন মেনে নিতে পারছিল না। হঠাৎ করে তার মাথায় আসলো পাশের রুমের ভাড়াটিয়া সাব্বিরের কথা।শিপনদের বাড়িটা টিনসেডের একতলা। মেইন গেট বরাবর একটি সরু গলি, দুপাশে একাধিক ঘর আর পিছনের দিকে রান্নাঘর ও বাথরুম। বাড়তি আয়ের জন্য ওর বাবা একটি রুম ভাড়া দিয়েছে। ভাড়াটিয়ার নাম সাব্বির। তার রুমটি শিপনদের রুমের পাশাপাশি। মধ্য দিয়ে কাঠের একটি দরজা আছে। দরজাটি সাব্বিরদের দিক থেকে আটকানো। অনেকদিন ধরেই শিপন চাচ্ছিল সাব্বিরদের উঠিয়ে পাশের রুমটি দখল করার। শিহাবের সাথে থাকতে শিপনের ভাল লাগে না। শিহাব শিপনের বছর দেড়েকের বড়। শিপনের মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই শিহাব অতিমাত্রায় হুজুর শ্রেণির হয়ে উঠেছে। বড়বড় দাঁড়ি রেখেছে, জুব্বা পড়ে, আতর মাখে। বছর দুয়েক ধরে তাবলীগে যায়। ঘরে থাকলে শিপনকে নামাজের জন্য চাপ দেয়। নানা রকম ধর্মীয় ওয়াজ নসিহত দান করে। শিপনের চোখে এগুলি প্রচÐ যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু নয়! বয়সে বড় তাই ধাপকি দিয়ে থামিয়ে দিতে পারে না। বাবা-মার কাছে বললে বলে, শিহাব তো ভাল কথাই বলে। তুই মানার চেষ্টা করিস না কেন? ওতো তোর মঙ্গলের জন্যই বলে। আজকাল শিপনের মনে অন্য একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। শিহাব যে সব বইপত্র ঘরে আনে সেগুলো তাবলীগের বই মনে হয় না। পুরোপরি না বুঝলেও শিপনের মনে হয় বইগুলি উগ্রবাদী ধরনের কিছু। তার মনে বদ্ধ ধারণা হয়েছে, শিহাব কোন জঙ্গী সংগঠনের সাথে জড়িত! তাবলীগের সাথে নয়। তাবলীগের বাহানা দিয়ে অন্য জায়গায় যায়। বিষয়টা মা-বাবাকে জানায় শিপন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হলো না। বাবা বলে,
শিহাব যাই করুক তোর চেয়ে অনেক বেশি ভাল কাজ করে। ওর উপর আমাদের পুরো বিশ্বাস আছে।
এসব আজেরা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই সে পাশের রুমটি চেয়েছে কয়েকবার। বাবা রাজি হয়নি। মনে মনে ভিষণ মনক্ষুণœ শিপন! তাজুর গল্প শোনার পর থেকেই শিপনের মনে হলো, যে করেই হোক সাব্বিরের রুমে উঁকি দিতে হবে।সাব্বির বিয়ে করছে বছর খানেক হলো। সে একটা ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করে। সাব্বির মেধাবী ছাত্র ছিল। নেশায় আসক্ত থাকায় উচ্চ শিক্ষা শেষ করতে পারেনি। যে প্রতিষ্ঠানে সে অনায়াসে একজন ফার্মাস্টিট হওয়ার যোগ্যাত রাখতো, নেশার গুণে সেধরনের একটি প্রতিষ্ঠনে প্রোডক্শনের শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। বিয়ে করার পরপরই শিপনদের বাড়িতে ভাড়া আসে। বিনয়ী, ভদ্র ও ভাড়া নিয়ে কোন ধরনের ঝামেলা না করায় শিপনের বাবা-মা খুব খুশি সাব্বিরের উপর। তবে খুশি হওয়ার আরো কারণও আছে। সাব্বির প্রায়ই বিভিন্ন দরকারি মেডিসিন তাদেরকে দিয়ে থাকে। কীভাবে যোগার করে- এসব শিপনদের মাথা ব্যাথা নয়। তারা মাগনা পাচ্ছে এটাই বড় কথা। সবাই খুশি হলেও শিহাব একদম খুশি নয় সাব্বির মিয়ার উপর। শিহাব তাকে দেখতেই পারে না। শিহাবের কথা একথাটাই – নাস্তিক ব্যক্তির কোন গুণই গুণ নয়। সাব্বির নাস্তিক ধরনের লোক। এটা সে নিজেই স্বীকার করে। সাব্বিরকে তালিম দিতে গিয়ে শিহাব উদ্দীন বড়সড় একটা হোঁচট খায়। বিষয়টা সে তখনই ভালভাবে বুঝে। রাগটাও তখন থেকেই। সাব্বিরকে নিরিহ গোছের মানুষ মনে করে শিহাব অনেকদিন ধরেই তাকে তালিম দেয়ার তালে ছিল;
সাব্বির ঘরের ভিতরে কখনো সিগারেট খায় না। এমন না যে রুমা পছন্দ করে না, তাই। আসলে এটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। তার বাবা ছিলেন ভীষণ কড়া। এক ধমকেই মুতে দেয়ার মতো অবস্থা! বাপের ভয়ে যত নেশাপানি সাব্বির সব বাইরে থেকে সেরে আসতো। সে অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। শিহাব দেখল সাব্বির গেটের বাইরে বিড়ি ফুঁকছে, ভাবল এই সুযোগ। এগিয়ে গেল সাব্বিরের দিকে।
সাব্বির ভাই, নামাজ বেহেশতের চাবি। নামাজ বিহীন কোন গুণই গুণ না-এটা নিশ্চয়ই শুনেছেন?
হুম, শুনেছিরে ভাই, তোমার যত না বয়স তার চেয়েও বেশিবার শুনেছি।
শুধু শুনলেই হবে? মানতেও তো হবে, নাকি?
কেন মানবো? নামাজ পড়লে বেহেশতে যাব, তাইতো? কিন্তু বেহেশতে গিয়ে করবো কী? মদ খাব আর অনেকগুলি নারী আকৃতির জীব নিয়ে ফুর্তি করবো? শেষেমেষ এই তবে মানব জীবনের স্বার্থকতা? পার্থিব জীবনে আত্মউন্নয়ন ঘটিয়ে ঐ জীবনে গিয়ে লাম্পট্য প্রদর্শন? আবার হুরের যে বর্ণনা শুনি তাতে তো রুচিই আসে না। রক্তনালীও বলে দেখা যাবে! আরে মিয়া, নারীর স্বাদ কী কখনো পরী দিয়া হয়?
এভাবে বলছেন কেনরে ভাই? ঐসব তো পুরস্কার হিসেবে পাবেন। একালের কষ্টের ফল।
আর হুরের সমন্ধে না জেনেই বলছেন কেন? তাদের সৌন্দর্যের উপমা দিতে গিয়েই এরকম বলা হয়েছে। স্বচ্ছ-স্ফটিকের মতো তাদের সৌন্দর্য! আসলে সাব্বির ভাই আপনাকে তো শয়তানে ধরছে! তাই আপনি কাফির-নাস্তিকদের মতো কথা বলছেন?
যে কোনো একটা বল শিহাব। হয় কাফির নয় নাস্তিক। দুইটা এক জিনিস না। যাকগে, আমি কাফির না, আমি নাস্তিক। আর শয়তানের কথা বললে না? শয়তান হলো মহাজগতের সর্বপ্রথম বিপ্লবী।
মানে?
সে মানে তুমি বুঝবে না। আর আমি তোমাকে সে ব্যাখ্যাও দেব না। সেই ব্যাখ্যা সহ্য করতে তো পারবেই না বরং শোনার পর আমাকে খুন করার চিন্তা মাথায় ঢুকবে। তোমাদের তো ভাই আবার ভাল না লাগলেই তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জবাই দেয়ার চেষ্টা কর।
সাব্বির ভাই আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি তাবলীগের সাথে জড়িত। তাবলীগকারীরা বুঝিয়ে আল্লাহর রাস্তায় আনার চেষ্টা করে অন্যভাবে নয়।
সে হলেই ভালো ভাই।
দেখ শিহাব, ধর্ম মানে কী?
সারক্ষণ স্রষ্টাকে ভয় পাওয়া! কোন কাজই ভয়শূন্যভাবে করতে না পারা। তার মানে সারাক্ষণ মাথায় টেনশনের লোড নেয়া। এতে কী হয় বলতো? এতে ব্রেইনের উপর চাপ পড়ে, হার্টে ক্ষতি হয়। এসব ছাড়াও নানা শারীরিক ক্ষতি হয়। আমি ভাই টেনশন মুক্ত থাকতে পছন্দ করি। হো হো করে হাসা ইসলামে না-জায়েজ কিন্তু আমি হো হো করেই হাসতে পছন্দ করি। এতে হার্ট ভাল থাকে। আমি ভাই ভয় মুক্ত জীবন চাই।
অসহিষ্ণু হয়ে উঠলো শিহাব। চেচিয়ে বলতে লাগলো,
কিসের মধ্যে কি? কিসের সাথে কিসের তুলনা! ইসলামে বেহুদা হাসি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামই একমাত্র আপনাকে ভয়মুক্ত জীবন দিতে পারে। আসলে আপনি ভাই পুরাই পাগল হয়ে গেছেন! আপনি মুসলমান, এসব কথা বলে আর গুনাহ কামাবেন না। মসজিদে আসুন, কুরআন পড়ুন। আমি শুধু নিশ্চিত নই কথাও দিচ্ছি, আপনি যদি আমল শুরু করেন তবে সব প্রশ্নের উত্তরই একে একে পেয়ে যাবেন।
আমাকে এসব বলে লাভ নেই। আমি সাত ঘাটের পানি খাওয়া। তুমি এত আমলদার তো তোমার ভাই এমন কেন? তোমরা না পিঠাপিঠি? তাকে লাইনে আনতে পারছ না কেন? যাও গিয়ে নিজের ভাইকে আগে লাইনে আনো।
শিহাব বুঝতে পারল সাব্বিরের সাথে তর্ক করা অর্থহীন। সে কোন কারণে ইসলামের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ পোষণ করে।
শিহাব বলল, সাব্বির ভাই নাস্তিকদের কাছে যুক্তি সবসময় বেশি থাকে। তারা যুক্তি দিয়েই চলতে চায়। কিন্তু শুধু যুক্তি দিয়ে তো জীবন চলে না, জীবনের জন্য কিছু বিশ্বাসেরও প্রয়োজন আছে। সে বিশ্বাস আপনাকে দিবে ইসলাম। আল্লাহ আপনাকে হেদায়াত দান করুন।
মনে মনে প্রচণ্ড একটা ক্ষোভ নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে সরে আসে শিহাব। তখন থেকে শিহাবের মাথায় একটা কথা ঢুকে, বেশি বোঝা মানুষগুলিই আল্লাহর দুশমন। আর ভদ্র হলেই মানুষ ভাল হয় না।শিপনের জন্য আজ রাতটা অবিস্মরণীয়। সন্ধ্যা থেকেই অস্থির হয়ে আছে। কখন যে মধ্যরাত হবে? একটা ভয় গুমরে খাচ্ছে তাকে। রাতে বাতি নিভিয়ে ঘুমাবে না তো? সে সম্ভাবনা কম। নিজেকে সান্ত্বনা দিল শিপন। অবশ্য এই সান্ত¡নার কারণ আছে। যখন থেকে শিপন পাশের রুমের প্রতি আগ্রহ বোধ করছে, তখন থেকেই সে দরজাটির দিকে খুব লক্ষ্য রাখে। সে দেখেছে, প্রায় সারা রাতই বাতি জ্বালানো থাকে। আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে রাত ১২টার মতো বাজতেই নিজের ঘরের বাতি বন্ধ করে শিপন দরজার কাছে গিয়ে ছিদ্রতে চোখ রাখলো। সাব্বিরের স্ত্রী রুমা ছোটখাটো টাইট ধরনের একজন মেয়ে। শান্ত, একা একা নিজ ঘরে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। শিপনের মা আজো বুঝতে পারলো না মেয়েটা কোন প্রকৃতির। শিপন ছিদ্র দিয়ে বড় বড় করে তাকানোর চেষ্টা করল। রুমা সাব্বিরের পাশে শুয়ে আছে। একা একা কথা বলে যাচ্ছে, সাব্বির কোন উত্তর দিচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে সাব্বির মরার মতো ঘুমাচ্ছে। রুমা হাত দিয়ে ধাক্কা দিল কয়েকবার, সাব্বির কোন সাড়া শব্দ করলে না। রুমা কিছুক্ষণ গুঙ্গিয়ে গুঙ্গিয়ে কাঁদল এরপর পাশ ঘুরে শুয়ে পড়লো। ভিষণ হতাশ হলো শিপন! এতো পরিশ্রমের এই রেজাল্ট? কেন জানি সাব্বিরের উপর শিপনের খুব রাগ হতে লাগল। শালা! বিয়ে করেছ মাত্র এক বছর, এখনই এতো আগ্রহ কম কেন? মনে মনে সাব্বিরকে ইচ্ছামতো কিছু গালি দিয়ে শুয়ে পড়লো শিপন।
মাস তিনেক হয়ে গেছে। প্রতিদিন একই ঘটনা। প্রথম প্রথম শিপন খুব অবাক ও বিষ্ময়বোধ করতো। আশ্চর্য! নতুন বিয়ে অথচ…..? সাব্বিরের বিষয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠে শিপন। কিছু খোঁজ-খবর নিতেই জানতে পারল সাব্বিরের মারাত্মক বদভ্যাসের কথা। সাব্বির মারাত্মক নেশাখোর। এমন কোন নেশা নাই যে সাব্বির করেনি। এখন সে নিয়মিত এলকোহল পান করে। ঔষধ ফ্যাক্টোরিতে কাজ করার দরুন এলকোহল যোগার করা তার জন্য কোন ব্যাপার নয়। প্রতি রাতে কারখানা থেকে বেড়িয়ে বন্ধুদের নিয়ে এলকোহল খেয়ে চুপটি করে ঘরে এসে ঢুকে। তাজু বলল,
বুঝলি শিপন ঐ ব্যাটা এলকোহল খাইয়া খাইয়া শেষ কইরা লাইছে সব। এর লেইগাই হের বউ গুনগুনাইয়া কান্দে। তোর জন্য তো দারুণ সুযোগ! এই চান্সে দেখ হের বউর সাথে খাতির করতে পারস কিনা।
তাজুর কথা শিপনের মাথায় দারুণভাবে ঢুকে গেল। তাজুর কাছে ভাল সাজার ভাণ করলো।
যা বেটা কী কস? এইটা ঠিক হইব না।
তোর ব্যাপার ভাই। আমার বাড়ির হইলে আমি চান্স ছাড়তামই না।
তাজু কোন উত্তর দিল না। কিছুদিন যেতেই ভিতরে ভিতরে দারুণ মরিয়া হয়ে উঠল। প্রথম যৌবন আর কাকে বলে!শিহাবের আজকাল প্রায়ই বাইরে বাইরে থাকতে হয়। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে হেদায়েত করতে হয়। জিহাদের দাওয়াত দিতে হয়। সব কিছুই করতে হয় খুব গোপনে। শিহাবের মনে বড় কষ্ট- একটি মুসলিম দেশ হয়ে মুসলমানদের জিহাদের আহŸান করতে হয় গোপনে! শিহাব দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, যে করেই হোক দেশটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। শিহাব যে সংগঠনটির সাথে জড়িত তার নাম ইসলামী জিহাদ সঙ্ঘ। সংক্ষেপে ওঔঝ, সংগঠনটির সাথে হঠাৎ করেই তার পরিচয় হয়ে যায়। শিহাব মূলতঃ তাবলীগ জামায়াতের সাথে জড়িত ছিল। এলাকার মসজিদ থেকে তাবলীগ-এর প্রচারণায় সে এই বিষয়ে উৎসাহি হয়ে ওঠে। প্রথম তিন দিন করে লাগানো শুরু করে এরপর চিল্লায়ও যায়। এভাবে চলছিল। ভেজালটা লাগল তখন, যখন সাথী ভাই সিরাজের সাথে অন্তরঙ্গতা বাড়লো। সিরাজ তাকে নতুনভাবে ইসলামী দায়িত্বের কথা বোঝাতে শুরু করল। জিহাদের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বোঝাল। বোঝায়, এ দায়িত্বই ইসলামের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, এই দায়িত্ব ফেলে রেখে অন্য আমল একদম মূল্যহীন। শিহাব ভাবনা পরিবর্তন হতে লালগ। সে ভাবে, এতোদিন শুধু মানুষকে বুঝিয়ে মনে করেছি দায়িত্ব শেষ, ও মা! দায়িত্বতো দেখি এতো সোজা না। ভিতরে ভিতরে শিহরিত হয়ে ওঠে শিহাব। একটা বিষয়ে খটকা লাগাতে শিহাব জিজ্ঞেস করে:
সিরাজ ভাই এসব কথা তো তাবলীগ জামায়াতের কেউ বলে না, আপনি এসব কথা পেলেন কোথায়?
আরে এই জন্যইতো তাবলীগ পরিপূর্ণ ইসলাম নয়।
এমন কথা শিহাব আশা করেনি, সে ভিষণ অবাক হয়!
তাহলে আপনি তাবলীগ-জামায়ত করেন কেন ?
আমি তোমার মত প্রকৃত ইসলামী সেনানীদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। তাবলীগের ভিড়েও তাই খাঁটি সোনা খুঁজি।
সিরাজ ভাই আপনাদের কথা কি এরা কেউ জানে?
আরে না।
-এটা জানতে পারলে সমস্যা আছে। তারা অতি নমনীয় মতাদর্শ অনুসরণ করে। জানলে তারা তো কোন সাহায্য করবেই না উল্টো জানাজানি করে আমাদের বিপদে ফেলবে।
-আমাদের দাওয়াত অতি গোপনীয়ভাবে হয়। আমরা অনেক বিচার করে শুধু তাদেরকেই বলি যাদের আমাদের কাছে প্রকৃত মুমিন মনে হয়। তোমাকেও আমরা তাই মনে করি। তুমি যদি সত্যিই আল্লাহ’র প্রিয় বান্দা হতে চাও তবে আমার সাথে আমাদের সংগঠনে যোগ দাও।
-এই দুনিয়া কিছুই না রে ভাই সেই দুনিয়ার কাছে! তাই সেই দুনিয়ার জন্য কামাও। মুক্তি পেয়ে জান্নাতে যেতে পারবে। ইসলাম প্রচার প্রসার ও কামিয়াবী না হওয়ার জন্য প্রত্যেক মুসলমানকে জবাব দিতে হবে। কোন কথা বলে তখন পার পাবে না। ইসলামের প্রকৃত খেদমত তোমরা যদি না কর তবে কারা করবে?
শিহাব রক্তের গন্ধে রোমাঞ্চ অনুবভ করে। বলে ওঠে,
অবশ্যই ভাই আমি প্রস্তুত।IJS-র বিভিন্ন বই পড়ে শিহাব জিহাদ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানে। শিহাবের মনে দেশটাকে প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন জেগে ওঠে। তাবলীগ-জামায়ত শিহাবের কাছে এখন আর ভালো লাগে না বরং এটার প্রতি এখন কিছুটা বিদ্বেষই পোষণ করে। এখন শিহাবের মতে-এরা কোন কামের না! শিহাবের কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার, যে কোন অবস্থাতেই জিহাদ করতে হবে। ইসলামের দুশমনকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে কতল করতে হবে। সহযোদ্ধাদের সাথে জিহাদ নিয়ে আলাপে নতুন নতুন তথ্য পায়, মক্কার এক কবি একবার হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে নিয়ে কবিতার মাধ্যমে নানা রকম কুৎসা গাইতে লাগলো। মদিনায়ও এখবর এসে পৌঁছল। তখন মুহাম্মদ (সঃ) বললেন, কে আছো ঐ ব্যক্তির হাত থেকে আমাকে নিষ্কৃতি দেয়ার জন্য? এক বা দুই সাহাবা উঠে দাঁড়ালো, গোপনে মক্কায় গিয়ে তাকে কতল করে আসল। এ গল্পটি শিহাবের মনে চরমভাবে ঢুকলো। সে চিন্তা করতে লাগল ইসলামের দুশমনকে যদি অন্য জায়গায় গিয়ে কতল করা যায় তবে নিজের ঘরে যে ইসলামের দুশমন বসে আছে তাকে কী করা উচিৎ? শিহাব একটা সিদ্ধান্ত নিল মনে মনে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথও আঁকতে লাগল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, শিহাবের এই পরিবর্তন তাবলীগের সাথী ভাইরাই কেউ বুঝতে পরল না, বাড়ির কেউ আর বুঝবে কী?
শিপন এখন আর ছিদ্র দিয়ে চোখ দেয় না। জানে এটা নিরর্থক। বরং একজন নারীর নিঃশব্দ কান্না তাকে কষ্ট দেয়। শিপন রুমাকে দেখলে বড় বড় করে তাকায়, চোখ দিয়ে তাকে ভষ্ম করে দিতে চায়। সে এখন বাইরের চেয়ে বাড়িতেই বেশি সময় দেয়। আকার-ইঙ্গিত বুঝতে পেরেও রুমা প্রথম দু’চারদিন পাত্তা দিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। যৌবনের ডাক অস্বীকার করা বড় কঠিন। রুমার চোখে রিপিট আমন্ত্রণের তীব্র ভাষা দেখে শিপন মস্তবড় ধাক্কা খেল! টাইফুনের ঝড় বহা শুরু করল তার হৃদয়ে। যেন স্বর্গ হাতে পেল! শিপনের আর তর সইছিল না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাহস করে একদিন একটা চিঠি দিল। চিঠির উত্তর ‘হ্যা’ হওয়ায় শিপনের আর কোন বাধা রইলো না। খুব দ্রæতই রুমার সাথে অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়ে গেলো। নিভৃতে একে অপরকে কাছে পাওয়াটাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। সাব্বির মাঝে মাঝে নাইট উিউটি করে। যেদিন নাইট ডিউটি করে সেদিন রাতে আর বাড়ি ফেরে না। শিহাব তাবলীগের দোহাই দিয়ে মাঝে মাঝে ঘরে থাকে না। কিন্তু মুশকিল হলো, সাব্বির যখন নাইট ডিউটি করে তখন শিহাব বাড়িতে থাকে আবার শিহাব যখন বাইরে থাকে তখন সাব্বির বাড়িতে থাকে। শত কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও দাঁত কামড়ে শিপন ধৈর্য ধরতে লাগল একটি সুযোগের আশায়! এমন একটি রাত, যেদিন শিহাব বা সাব্বির দুজনের কেউই বাড়ি থাকবে না।
শিহাব তার প্রথম জিহাদের পরিকল্পনা পূর্ণ করে ফেলেছে। সিদ্ধান্ত নিল, কাজটা করতে হবে মধ্য রাতে। শিহাবের প্রায় প্রতি রাতেই একবার করে টয়লেট-এ যাওয়ার অভ্যাস আছে। অনেকেরই এই অভ্যাস আছে, যেমন আছে সাব্বিরের স্ত্রী রুমারও। সে দেখেছে প্রায়ই এসময়ে রুমা বাথরুমে যায়। শিহাবদের একতলা টিনসেডের বাড়িতে রান্নাঘর ও বাথরুম সব কমন। ঐদিকে যাতায়াত করলে স্বভাবতই এটা চোখে পড়ে। শিহাব জিহাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হলেও ফাঁসিতে ঝুলতে রাজি নয়। তার মতে, তাকে আরো অনেক জিহাদ করতে হবে। কাজটা করতে হবে তাই গোপনে। জবাই করার জন্য ধারালো চাপতিও যোগার করল সে।
শিপনের যেন সময়ই কাটছে না। শিপন আজ খুব খুশি! উত্তেজনায় টগবগ করছে। শিহাব গতকাল তাবলীগের কথা বলে গেছে, দুদিনের আগে আর ফেরার সম্ভাবনা নেই- এটা জানে শিপন। এদিকে সাব্বিরের আজ নাইট ডিউটি। সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছে রাত ১২টা বাজার জন্য কিন্তু কিছতেই কাটছে না। বার বার ক্ষেপে উঠছে ভিতরের বাঘটি, কিছুতেই আর মানানো যাচ্ছে না! সময় যে এতো দীর্ঘ হতে পারে শিপন আজ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বেহেস্তি সুখের অপেক্ষা করতে করতে যখন হালকা তন্দ্রাভাব এসে পড়ল ঠিক তখনি শিপন দুই রুমের মাঝখানের দরজাটা খোলার আওয়াজ পেল।
শিহাবদের বাড়ির ছাদ বেয়ে ওঠা খুব সহজ। ১০ সেকেন্ডের বেশি লাগে না ছাদে উঠতে। রাত ১টা থেকে ছাদের উপর ঘাপটি মেরে বসে আছে শিহাব। হঠাৎ করে তাকে দেখলে কেউ জীনও মনে করে বসতে পারে। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, আরবীয় জুব্বা, সুন্নতি দাঁড়ি। চাঁদের আলোয় মুখটা নুরানী নুরানী লাগছে। বুকটা ধরফর করে উঠল শিহাবের যখন দেখল সাব্বিরের বউ ঘর থেকে বেড়িয়ে বাথরুমের দিকে যাচ্ছে। সাহস বাড়ালো শিহাব। মনে মনে বলল, ঝড়ের বেগে কাজটা সারতে হবে। রুমা বাথরুমে ঢুকতেই নিচে নেমে আসল শিহাব। বেড়ালের মত নিঃশব্দে সাব্বিরের ঘরে ঢুকলো। বাতি নিভানো তাই পকেট থেকে মোবাইলটা চাপ দিয়ে আলোকিত করল। বিছানার কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। অল্প আলোতে ঘুমন্ত মানুষটিকে ঠিকমতো বোঝা গেল না। গলাটা অনুমান করে সজোরে কোপ চালালো শিহাব। প্রথম কোপটা জায়গামতো পড়লো না। দ্রæত দ্বিতীয় কোপটা চালালো শিহাব। বিভৎসভাবে একটা চিৎকার তার কানে আসতে-আসতে দ্বিতীয় কোপটাও গলায় বসিয়ে দিল শিহাব।
‘বড়ড়ড়ড়ড় ভাইইইই,
শব্দের চিৎকারটা শুনে চমকে উঠল শিহাব! অতি পরিচিত শব্দটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল! মোবাইলটা আলোকিত করে আবার মুখে ফেলল। অব্যক্ত এক যন্ত্রণায় গুঙ্গিয়ে উঠল শিহাব! থরথর করে কাঁপতে লাগল! চাপাতিটা মেঝেতে পড়ায় ঠন্ করে একটা শব্দ হলো। চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই জেগে উঠলো। হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো রুমা। নিজের রুম থেকে অদ্ভুত একটা চিৎকার আসাতে ভীষণ ভয়ে পেয়ে গেছে সে। রুমে ঢুকেই লাইট জ্বালালো। রক্ত হিম করা একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রুমা। কী হয়েছে! কী হয়েছে! বলতে বলতে শিপনের বাবা সাব্বিরের ঘরে ঢুকল, পিছনে অন্যরাও। সব কিছুরই বোধ হারিয়ে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিহাব। কোন কিছুর দিকেই লক্ষ্য নেই। তাকিয়ে আছে শুধু ধর বিচ্ছিন্ন ভাইয়ের লাশটির দিকে।
Friends
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
ishan_syed
@put23009laoia-com
ঐন্দ্রিলা আপু
@tjb02611toaik-com
মৌমিতা
@ofd66076toaik-com
Avik_kazi
@rlw81159toaik-com
আহান খান
@ukm39186laoia-com
Mohammad Solayman
@solayman
afrida-jahar
@afrida-jahar
Md-Akadullah
@md-akadullah