-
লজ্জা
কৃষ্ণজনমতিঝিল নামার পর মনে হলো, রিকশায় না উঠে বাকি পথটুকু হেঁটে যাই। মনরোম আবহাওয়া, মজার কিছু স্বপ্ন ভেবে হাঁটা যাবে।
দাওয়াত খেতে যাচ্ছি চাচার বাড়ি। ধুপখোলা, গেন্ডারিয়া। হাঁটছি আর দেশের মহৎ মহৎ উন্নতি নিয়ে স্বপ্ন দেখছি! অনেক অনেক টাকা পেলে, কী কী করতাম দেশের মানুষের জন্য। অনেক বড় না হলে তো আসলে কিছুই করা সম্ভব না। আমি একটা কথা খুব পছন্দ করি- বিগ পাওয়ার বিগ রেসপন্সিবিলিটি। হাঁটতে হাঁটতে মেথর পট্টিতে এসে গেলাম। মতিঝিল থেকে গেন্ডারিয়া যাওয়ার পথে এ জায়গাটা পড়ে। রোডের পাশে দোতলা মার্কেটের মতো, তার উপর-নীচে বোধয় তারা থাকে। আগে এমনটা ছিল না, তখন ছিল বস্তির মতো। এখনও বস্তি তবে উন্নত হয়েছে, এখন দোতলা বস্তি। অনেক আগে এখানে রাস্তার দুপাশে শুয়র দেখা যেত। রিক্সা থেকে সেগুলিকে যখন দেখতাম একধরনের ভয় মিশ্রিত ঘৃণায় শরীর শিরশির করে উঠত। জাতিভেদের কারণে নাকি নোংড়া হওয়ার কারণে, কে জানে? হাঁটছি আর দু’পাশ দেখছি। চোখ পড়াতে দেখলাম,
দোতলার বাড়ান্দা থেকে এক মেথরনি দড়িতে শুকাতে দেয়া কাপড়গুলি তুলে ফেলছে। দড়ি থেকে কাপড় নামাতে গিয়ে মেথরনি হঠাৎ একটা কাপড় নীচে ফেলে দিল। ওটা জামা না ওড়না বুঝলাম না এবং বোঝার আগ্রহও বোধ করালাম না। মহিলাটির তেমন কোন ভাবান্তর দেখতে পেলাম না। মেথরনিটা কেমন যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওপরদিক থেকে একজন মহিলাও হেঁটে আসছিল। কাপড়টা যেখানে পড়েছে তার কাছাকাছি চলে এসেছি, দেখলাম ঐ মহিলাও হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে পড়ে থাকা জামাটির পাশে চলে এসেছে, ঠিক তখনই মেথরনি ঐ মহিলাকে ডাকতে শুরু করল কিন্তু মহিলাটি না শোনার ভান করে এবং কোন সারা না দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল, আমি মনে মনে ভাবলাম কাম সেরেছে! আমিওতো ঐ জায়াগাটর কাছাকাছি চলে এসেছি আমাকেও কি ডাকে নাকি আবার তার কাপড়টা তুলে দেওয়ার জন্য? সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল মনের সাথে যুদ্ধ; কী করব তখন? খুব দ্রুতই স্পষ্টভাবে মন জানিয়ে দিল,
দাঁড়ানো যাবে না, এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে, সবাই দুপুরের খাবারে আমার উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছে।
তাছাড়া এটা এমন কোন উপকারের কিছু না। কেউ না কেউ তো করবেই বরং এসব ক্ষুদ্র উপকার সমাজের কোন পরিবর্তনও করবে না। যেই আমি ঐ জায়গাটার কাছাকাছি আসলাম একটা ভ্যানগাড়িও সেখানে এসে থামল আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম,
মহিলাটা ‘এ্যা ভাই, এ্যা ভাই’ বলে ডাকতে লাগল।
আমি ঐ ভ্যানচালককে ডাকছে বলে ধরে নিলাম অথবা মনটাকে সেটাই প্রবোধ দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ফিরে আর চাইলাম না।প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খুব ভাল লাগছে, চাচাতো ভাইয়ের বউ ফ্রাইড রাইস রান্না করেছিল। কতটুকু স্বাদ হয়েছে জানি না কিন্তু খেলাম বুক পর্যন্তই। খাওয়া শেষে আসল কাজই এখন বাকি-সিগারেট খেতে হবে। চাচাতো ভাইকে নিয়ে নামলাম সিগারেট খেতে। নিচে নেমে দেখি, ওরে বাবা! ভয়াবহ অবস্থা! রাস্তায় গোড়ালি সমান পানি। আর তো বের হতে পারছিনা, এখন উপায়? মাথা খারাপ হয়ে গেল। টেনশনে পড়ে গেলাম; যে একটা ভুরিভোজ দিয়েছি তারপর সিগাটের না খেলেই না। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুই ভাই ভাবতে লাগলাম কী করা যায়? মক্কেল খুঁজতে থাকলাম দোকানে পাঠানোর জন্য। দোকান খুব কাছেই কিন্তু যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। হঠাৎ একটা ছাতা দেখতে পেলাম কিন্তু মানুষ দেখতে পেলাম না। ছাটাটা কি একাই হেঁটে আসছে নাকি? নাকি ওটা ভূতের ছাতা? দ্বিতীয় ধারণাটা অবশ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না, ভূত কোন কালেই বিশ্বাস করিনি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দেখলাম ৬/৭ বছরের একটা ছোট্ট মেয়ে, খালি গায়ে ছাতাটা নিয়ে এগিয়ে আসছে, মানুষের চাইতে ছাতাটা বেশি বড় হওয়ায় প্রথমে শুধু ছাতাটাই দেখা যাচ্ছিল এখন মানুষটাকেও দেখা গেল। মেয়েটি সম্ভবত গরীব বা যাকে আমরা নিম্ন শ্রেণীর বলি সে ধরনের কোন পরিবারের। মধ্যবিত্ত পরিবারের হলে এই বয়সের মেয়েকে খালি গায়ে বেড় হতে দেয়ার কথা না। কাছে আসতেই ডাক দিলাম। অদ্ভূদ বিষয়! মেয়েটি খুব সহজেই এগিয়ে আসল। সিগারেট এনে দেয়ার কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল। এজাতীয় সেবা করার অভ্যাস হয়তো বেশ ভাল রকমই মেয়েটির আছে। আমরা তার হাতে সিগারেটের টাকা ছাড়াও ২ টাকা ঘুষ দিলাম। মেয়েটি বলল, সেও নাকি দোকানেই যাচ্ছে। এতে আরো ভাল হলো, একদম সোহায় সোহাগা। বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণই দেখছি না। এখন কেন জানি আর বৃষ্টি ভাল লাগছে না। বাড়ি ফিরতে হবে, অতি সাধের বৃষ্টিকেই এখন কেন জানি খোদার গজব মনে হচ্ছে! একটু পরই মেয়েটি সিগারেট এনে দিলো, সিগারেট হাতে দিয়ে মেয়েটি ঐ ২ টাকা ফিরত দিল।
বলল, দুই টাকা কম রাখছে।
আমরা যে মেয়েটিকে দুই টাকা বখশিশ আসলে যা ঘুস দিয়েছিলাম, মেয়েটি তা বুঝতেই পারলো না। আমরা তাকে টাকাটা রেখে দিতে বললাম। মেয়েটি চলে গেল। দূর থেকে আবার শুধু ছাতাটাই দেখা যেতে লাগল। তার যাওয়ার দৃষ্টিটি উপভোগ করতে করতে অতি স্বাদের সিগারেটটা ধরিয়ে ফেললাম। সিগারেটটা আয়েশ করে ধরিয়ে টান দিতেই মগজে একটা ধাক্কা অনুভব করলাম। প্রচণ্ড এক লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম! আসার সময়ে মেথরনির কাপড় পড়ে যাওয়ার বিষয়টা মনে পড়ল। আমি একটা ফিলোসফি খুব পছন্দ করি তা হলো, অন্যের কাছে ভাল হওয়ার দরকার নেই, সবার কাছে কখনোই ভাল হওয়া যায় না কিন্তু নিজের কাছে যেন নিজে ভণ্ড না হই। আয়নায় দাঁড়িয়ে যেন নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারি। নিজেকে বড় হাস্যকর মনে হতে লাগলো! মনে হলো ফিলোসফিটা যেন আমাকে ভেংচি কাটছে! কেন জানি না, কোনো না কোনোভাবে ভণ্ডামি হয়েই যায়!2 Comments
Friends
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
ishan_syed
@put23009laoia-com
ঐন্দ্রিলা আপু
@tjb02611toaik-com
মৌমিতা
@ofd66076toaik-com
Avik_kazi
@rlw81159toaik-com
আহান খান
@ukm39186laoia-com
Mohammad Solayman
@solayman
afrida-jahar
@afrida-jahar
Md-Akadullah
@md-akadullah

মানবিকতা, সামাজিক স্বপ্ন এবং ব্যক্তিগত দুর্বলতার মধ্যেকার সূক্ষ্ম লড়াইটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।