Profile Photo

সাইফুন নেসা সীমা।Offline

  • MeherMeherShima
  • এক সময় মারুফের স্বপ্ন ছিল চাকরি করবে কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে ছিল, তার বাবা ইসমাইল খান মারা যাওয়ার পর তার চাচা ইসহাক তাদের পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা সামলাতেন কিন্তু বড় ভাই বেঁচে থাকাকালীন অবস্থায় তেমন একটা দোকানে বসতেন না এজন্য বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল।তাছাড়া সে ব্যবসার মারপ্যাঁচ বুঝে কম। তাইতো অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারুফ তা দেখে ব্যবসার হাল ধরেন। ছোট থেকে দেখে এসেছে এটার পিছনে তার বাবার পরিশ্রম তা নষ্ট হোক ছেলে হয়ে তা দেখার সাহস হয়নি তাইতো পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসার বড় ডিলগুলো সাধারণত মারুফ নিজেই সামলায়। যাতে তাদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক কোনো কষ্ট করতে না হয়।
    পরিবারে,তার মা,মায়া বেগম ছোট এক বোন, তার নাম,কোমল এবং ছোট ভাই রাশেদ খান ছাড়াও
    চাচা, ইসহাক খানের – দুই মেয়ে,রেশমা (বিবাহিত) ও ঝর্ণা।ও তাদের মা।
    তাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছে তার
    দাদু পরিবানু (দাদী), তিনি তাদের পরিবারের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। মারুফের দাদুর কারণে পরিবারের সবাই একসাথে আছে।

    মারুফ বিয়ে করেছে দাদুর কথা রাখতে। তার বাবার ছোটবেলার বন্ধু জামিল তালুকদারের একমাত্র মেয়ে জেসমিন তালুকদার-এর সঙ্গে।
    জেসিকার মা সাথী খানম,ছোটবেলায় মেয়ের নাম
    রাখেন”জেসমিন” কিন্তু তার মেয়ের তা পছন্দ না।তাই সে নিজেকে “জেসিকা” নামে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে নামে।
    জেসিকা দেখতে যেমন সুন্দরী তেমনি অহংকারী,গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো, টানা চোখ, টকটকে লাল ঠোঁটে রূপবতী দেখায়। তার বয়স বিশ বছর,সে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ ২য়বর্ষে পড়ুয়া। ব্যারিষ্টার বাবা ও গৃহিণী মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় অতিরিক্ত আদরে আল্লাদে —বদমেজাজি, বেয়াদব এবং একরোখা হয়েছে।

    এদিকে কিছু সময়ের মারুফ মধ্যেই বুঝতে পারছে—জেসিকার বাবা তার মেয়ের এই আসল সত্য লুকিয়ে রেখে তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। জেসিকা রূপে অপূর্ব হলেও, স্বভাবে অহংকার, অভদ্রতা ও দম্ভ। এই মেয়ের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে,পরিবার বা বড়দের সম্মান করা শেখেনি। মারুফের জীবনে তুফান তুলে জামিল তালুকদার হয়তো নিশ্চিত হয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
    কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না, মারুফের বিয়ে ঠিক করা ছিল তারেই মামাতো বোনের সাথে।মায়া বেগমের ইচ্ছে ছিল তার ভাইয়ের মেয়েকে পুত্রবধূ করবে,তার এই প্রস্তাবে মারুফের বা অন্য কারো সমস্যা ছিল না। মুখে মুখে বিয়ের কথা দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ের তারিখ ঠিক করতে যাওয়ার আগের দিন জামিল তালুকদার,খান বাড়িতে এসে হাজির হয়।
    তাকে দেখে পরিবারের সবাই খুশি হয়। তিনি মাঝে মাঝে এসে খোঁজ খবর নিতেন। সেজন্য সবাই তার আসা স্বাভাবিক ভেবেছিল কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হয় যখন জামিল তালুকদার পরিবানু এর কাছে আবদার করলেন, মারুফের সাথে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চায়।
    পরিবানু তাকে জানান, তার মারুফের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করা আছে। পাত্রী তাদের পছন্দের।
    সে সময়ে জামিল তালুকদার বলেন, আপনি কথা দিয়ে ছিলেন।আমি কিছু চাইলে ফিরিয়ে দিবেন না!
    এত তাড়াতাড়ি অতীতের দেওয়া ওয়াদা ভুলে গেলেন?
    ভুলিনি তো বাবা, এখনও বলব তুমি এটা ছাড়া অন্য কিছু চাও ইনশাআল্লাহ তা পাবে।
    খালাম্মা একদিন আপনার ছেলের জীবন আমি বাঁচিয়েছি আজকে না হয় আপনি আমার মেয়ের জীবন বাঁচান।
    জামিল তালুকদারের কথা শুনে মারুফ কি বলবে, বুঝতে পারছে না। তাছাড়া এই বাড়িতে সব সিদ্ধান্ত তার দাদু নেন। শাহেদ বিশ্বাস করে তার দাদু যা করবে তাতেই পরিবারের মঙ্গল হবে।
    তাছাড়া সে যতটুকু জামিল তালুকদার কে চেনে তা তার চাচ্চুর বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই।
    ইসহাক খান কিছু খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়ে ধোঁকা খায়।এতে রেগে তাদের সাথে মারামারি করেন।সে সময়ে তাদের মধ্যে একজন মারা যায় এতে তার চাচ্চু ফেঁসে গেলেন। যদিও আঘাত তিনি করেনি কিন্তু আদালতে তো প্রমাণ ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করে না। তাছাড়া এমন কেসে বড় উকিল দরকার হয়।সে সময় ভালো উকিললে খোঁজ করছিল। তখন বাবার এক পুরোনো বন্ধু, পেশায় একজন বিখ্যাত ব্যারিস্টার— জামিল তালুকদার—তাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর আইনি দক্ষতায় মারুফের চাচ্চু মামলা থেকে মুক্তি পান। কিন্তু এই মামলার লড়াইয়ে জন্য তিনি কোনো ফিস নেননি। যদিও মারুফের দাদু টাকা দিতে চেয়েছিলেন।
    মিথ্যা খুনের মামলায় ছেলের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল তা থেকে বেঁচে যাওয়ায় পরিবানু আবেগে আপ্লুত হয়ে জামিল সাহেবকে কথা দেন।—
    তুমি যদি কখনো আমার কাছে কিছু একটা চাও খালি হাতে ফেরাব না।আমি পরিবানু তোমাকে কথা দিচ্ছি।
    মারুফের দাদুর সেই কথা দেওয়ার কারণে জেসিকা আজ খান বাড়িতে।
    দাদুর কথা রাখতে মারুফকে বিয়ে করতে হয়েছে জামিল তালুকদারের একমাত্র মেয়েকে—যাকে সে চিনত না, যার সম্পর্কে কিছু জানতও না। না ছিল ভালোবাসা, না ছিল পারস্পরিক বোঝাপড়া।এই বিয়ে শুধুমাত্র এক কন্যা দায়গ্রস্থ পিতাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু উকিল সাহেবের মেয়ের কথা শুনে মারুফের মনে হচ্ছে তার সাথে ধোঁকা হয়েছে।
    কথাটা ভেবেই মারুফ বারবার ফোন করেও জেসিকার বাবাকে পাচ্ছে না। ফোনের ওপাশে বারবার ব্যস্ত সুর, অথবা স্রেফ নীরবতা।
    যেহেতু মারুফের যৌথ পরিবার। তাই রুমের বাইরে বেশি সময় এভাবে থাকা তার জন্য কঠিন। বাসর রাতে কেউ তাকে বাইরে দেখে যদি প্রশ্ন করে—তখন কি বলবে সে? লজ্জা আর ভয় এ গলা শুকিয়ে আসে। মারুফের তো—সাধারণ, শান্ত একটা জীবন চেয়েছে, যেখানে ভালোবাসা থাকবে, সম্মান থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

    অনেকক্ষণ বাইরে কাটিয়ে অবশেষে সে রুমে ঢুকে দেখে, জেসিকা খাটের সাথে হেলান দিয়ে হেডফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে। কথায় এমনভাবে মগ্ন আছে যেন এই ঘরে সে ছাড়া আর কেউ নেই। এমন হেসে হেসে কথা বলছে, আশপাশে কি ঘটছে, তার কোনো খবরই নেই।

    মারুফ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলো—একটা মেয়ে যে কিনা সদ্য বিবাহিত, কিভাবে এমন উদাসীন হতে পারে!এতো রাতে মারুফ এই মেয়ের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় যেতে চাচ্ছে না, তাই চুপচাপ বারান্দায় চলে গেছে।
    বারান্দায় দুটো চেয়ার একটা ছোট টেবিল রয়েছে। এখানে বসে সে প্রায় চাচার সঙ্গে দোকানের বিষয়ে আলোচনা করে, আবার একা একা বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে। ফুল-ফল গাছে ভরা উঠোন, রাতের আঁধারে আকাশে চাঁদ আর তারার মেলা দেখে মনে—যেন প্রশান্তি বয়ে যায়। অথচ আজ এই প্রশান্তির জায়গা রাতে থাকার আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল।

    একটা চেয়ার লম্বা করে রেখে, আরেকটা চেয়ার তার পাশাপাশি রেখে বসে টেবিলের ওপর পা রেখে চোখ বন্ধ করে ঘুমের চেষ্টা করে। সারাদিনের ধকল, ক্লান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে।

    এমন সময়ে রুমের ভেতর থেকে ভেসে আসে হাসির শব্দ। কখনো আবার কানে আসে অদ্ভুত কিছু শব্দ—যা কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন। মাথা গরম হয় মারুফের। তার ইচ্ছে করে—এই মুহূর্তে জেসিকা কে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে! কিন্তু পরিবারের মান-সম্মান, অতিথিদের উপস্থিতি, দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে শান্ত রাখল।

    মারুফ কান চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলে,
    “হে আল্লাহ, আমি আর পারছি না। যদি এটা আমার নিয়তি হয়ে থাকে তাহলে তুমি আমাকে ধৈর্য দাও। আর যদি মুক্তির পথ থাকে—তুমি সেই পথ খুলে দাও।”

    চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বাবার মৃত্যুর পর এই প্রথম মারুফের চোখে পানি। শত কষ্টের মাঝেও তার চোখে কখনো পানি আসেনি। আজ এমন অবহেলা, অপমান আর শূন্যতায় হয়তো চোখের বাধ ভেঙে গেছে।

    চোখ মুছে নিজেকে প্রবোধ দেয়:
    “আল্লাহ যা করেন, বান্দার ভালোর জন্যই করেন।”
    এসব ভাবনায় ডুবে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল—তা বলতে পারবে না।
    #চলবে

    #নীরব_বন্ধন
    #সাইফুন_নেসা_সীমা
    #২

    6
    6 Comments
Skip to toolbar