Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • ২০০১ সালের শেষের দিকে যখন গবেষণার এর কাজে ঢাকা আসলাম, তখন আমি ঢাকা শহরের কিছুই চিনিনা( এখনো চিনিনা)।এসেছি গোছানো ছিমছাম শহর রাজশাহী থেকে, যার বিশ্ববিদ্যালয় টাও বিশাল পরিসর নিয়ে, কিন্তু গোছানো।আমাকে কাজকরতে হবে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর হামিদা আক্তার ম্যাডামের সাথে।তাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমাকে যেতে হতো। journal খোঁজার জন্য BANSDOC এ প্রতিদিন ই যেতে হতো। কিন্তু কি উপায়! রাস্তা ঘাট কিছুই চিনিনা। বিয়েও হয়েছে নতুন, মনে অনেক আশা যে আমার husband আমাকে সাথে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু তুহিন রাতে বসে খুব সুন্দর করে ম্যাপ এঁকে দিলো( তখন smart phone আমার ছিলো না) । পরের দিন সকালে আমাকে ম্যাপ দিয়ে বললো “সব এঁকে দিয়েছি, কোথায়, কিভাবে যেতে হবে ম্যাপ দেখলেই বুঝতে পারবে।” আমার চোখে পানি টলমল করে, আমি ভেবেই পাইনা কিভাবে ও আমাকে অপরিচিত এই শহরে একা ছেড়ে দিচ্ছে!! যে আমাকে বাড়ির কেউ কোথাও একা যেতে দিতো না, সেই আমি কি না একা একা যাবো! তারমানে তুহিন আমাকে একটুও ভালোবাসে না? কি নিষ্ঠুর! রাগ, অভিমানে ফুঁসতে থাকি আমি। বাধ্য হয়ে একাই যাই। এভাবেই আমার শুরু একা বের হওয়া। তুহিন বলতো – কেন পারবেনা তুমি? কোন সমস্যা হলে ফোন দিবে। একা যেখানেই যেতাম ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিতো ও।
    জীবনের প্রথম সেন্টমার্টিন যাত্রা, সমুদ্রের কাছে যাওয়া, সমুদ্রের পানি ছোঁয়া। সমুদ্র আমার ভীষণ পছন্দের, কিন্তু পানিতে নামতে ভয় পেতাম, সাঁতার জানিনা জন্য।
    জাহাজে করে যাওয়ার পরে জাহাজ থেকে নামার জন্য একটা মই দেওয়া হতো তখন। মই দিয়ে নামার অভ্যাস আমার নেই, তার উপর নীচের দিকে তাকালেই পানি দেখা যায়। আমি ভয়ে অস্থির, তুহিন কে বললাম – আমাকে ধরো, আমি ভয় পাচ্ছি। ও বললো- কিসের ভয়? এই বলে সে নীচে নেমে অনেক দূরে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিন্তু আমি কিছুতেই নামতে পারছিলাম না, থরথর করে কাঁপছিলাম। আমার জন্য অন্যরাও নামতে পারছিলো না।আমার পিছনে একজন দম্পতি ছিলেন, তিনি তার স্ত্রীকে বললেন – উনি ভয় পাচ্ছেন, তুমি ওনাকে ধরে নামিয়ে দেও। মহিলা আমাকে ধরে নামিয়ে দিয়েছিলেন। আমি রাগে, দুঃক্ষে তুহিনের সাথে কথাই বলিনি।
    এই ঘটনার বেশ অনেক বছর পরে আমি যখন অফিসের কাজে পাথরঘাটা, বরগুনায় যাই, তখন কিন্তু আমি একাই গিয়েছিলাম। এবং বিষখালী নদীতেও মই দিয়েই উঠেছিলাম,এবং নেমেছিলাম।
    তুহিনের সাথে ঢাকার মধ্যেই হয়তো কোথাও যাচ্ছি বাসে করে, বাসে সিট নেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। একটা সিট খালি হলো ও আমাকে বসতে বললো, কিন্তু পাশে একজন পুরুষ যাত্রী। কি যে রাগ হতো আমার! এ কেমন স্বামী আমার! একজন পুরুষের পাশে আমাকে বসতে বলছে?
    এরপর কিন্তু আমি গণপরিবহনেই যাতায়াত করি।
    বানিজ্য মেলা, বই মেলায় তুহিন আমাকে নিয়ে গেছে, কিন্তু আমি যেতে চাইতাম না, কারণ প্রচন্ড ভীড়, ধাক্কাধাক্কি আমার একদম ভালো লাগতোনা। তবু্ও ও নিয়ে যাবেই, রাগ করে বলতাম- আমি যাবো না, তুমি আমাকে রেখে আগে হেঁটে ঢুকে যাও! ও বলতো- কেন, ভীড়ের মধ্যে হাঁটতে হবে না? এরপর আমার আর অসুবিধা হতোনা।
    তিনমাসের রেহানকে নিয়েও বইমেলায় গিয়েছিলাম,যে পুলিশ দ্বায়িত্বে ছিলেন তিনি ভীড়ের মধ্যে আমার দূরঅবস্থা দেখে ভিতরে ঢুকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
    তুহিনের এই সব কিছু দেখে আমি সব সময় ভাবতাম, ও আমাকে একটুও ভালোবাসেনা।
    আমাদের বিবাহিত জীবনে রাগ,অভিমান হতো, কিন্তু কখনো তুহিন আমার রাগ ভাংগাতো না। রাগ করে না খেলে কখনো খেতে বলতো না। আমি কিন্তু একবেলাও ওকে না খেয়ে থাকতে দিতাম না, প্রথমে ছেলেদেরকে দিয়ে খেতে ডাকতাম। ও আসতো না, তারপর আমি যেয়ে আগে ওর চোখ থেকে চশমা খুলে নিতাম, মোবাইল নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে টেবিলে বসাতাম। ও মিটমিট করে হাসতো, ছেলেরাও হাসতো। ও খেয়ে উঠে যেতো, কিন্তু আমাকে একবারের জন্যও খেতে বলতো না।
    ও অন্যভূবনে চলে যাওয়ার পরে আমি উপলব্ধি করলাম- এই পরিস্থিতিতে আমাদেরকে খেতে বলার কেউ নেই আমাদের পাশে। আমরা নিজেরাই বেঁচে থাকার জন্য খেয়েছি। বাহিরের দরজায় খাওয়ার রেখে গেছে, আমরা নিয়ে এসে খেয়েছি। তুহিন যদি আমাকে সবসময় ডেকে আদর করে খাওয়াতো, তবে হয়তো আমি ওর ডাকার অপেক্ষায় থাকতাম।

    আসলে মাথার উপরে একজন আছেন যিনি সবকিছুর পরিকল্পনাকারী।তিঁনি তুহিন, আর আমাকে নিয়ে আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। আমার মতো একজন ভীতু, বোকা, দূর্বল, ভীষণ অভিমানী, মেয়েকে কঠিন পরিস্থিতিতে একা চলতে হবে জন্যই তুহিনের জীবনে আমাকে দিয়েছিলেন তিঁনি।
    আমি যেটাকে তুহিনের অবহেলা মনে করতাম আসলো সেটাই ছিলো আমার জন্য ওর সত্যিকারের ভালোবাসা। ও আমাকে বলতো – “তুমি আমার সম্পত্তি না, তুমি আমার সম্পদ।” আমি মুখ ভেংচিয়ে বলতাম- পড়েছোতো জীবনে ওই একটাই গল্প! পড়তে অপলার মামার লেখা, তাহলে বুঝতে আমি কি পছন্দ করি।

    তুহিন আমি তোমার “সম্পদ”, তোমার এই বিশ্বাসটা যেনো সত্যি করে দেন সৃষ্টিকর্তা এই কামনাই করি। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন, আমিন।
    রি-পোষ্ট
    ১৬/০২/২০২১

    2
    1 Comment
    • আপনার এই স্মৃতিচারণটি পড়তে পড়তে আমার চোখের কোণও ভিজে এল।

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar