Profile Photo

Walid ForhadOffline

  • walidforhad
  • Profile picture of Walid Forhad

    Walid Forhad

    2 months, 3 weeks ago

    খুব সম্ভবত শহরে গুটি কয়েক মানুষের মতো আমিও বাস্তবিক অর্থে একা।
    এই শহরটাও আমার মতোই, উপছে পড়া ভীড়, অথচ নিঃসঙ্গ। মানুষ পাশাপাশি হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু ভিতরে কিংবা বাহিরে বিশাল দূরত্ব।

    কর্পোরেট হিসেব নিকেশ শেষে কাঁধে ভাঁজ করা ড্রেস নিয়ে হাঁটছি, ড্রেসটা যেন আমাকে নিয়মে বেঁধে রাখার একমাত্র সাক্ষী।

    পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম,
    ক্যান্সারের জননী ধোঁয়াই আমার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। ধোঁয়া কিছু জানতে চায় না, কোনো ভবিষ্যৎ দাবি করে না। একটু ভেসে থাকে, তারপর মিলিয়ে যায়, যেমন সম্পর্কগুলো হারিয়ে যায়

    মিনিট বিশেক আনমনে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। ঠিক তখনই নজর কাড়ে নিল  কারো ছন্দময় পরিচিত পদচারণা।

    প্রথমে চিনতে পারিনি। তবে হাঁটার ভঙ্গিমা খুবই পরিচিত। যার ফলাফল, চিনতে চাওয়ার তাগিদটা অস্বাভাবিক রকম জোরালো হলো। মানুষ যাকে ভুলে গেছে বলে নিজেকে বোঝায়, তাকেই চিনতে বেশি সময় ব্যায় করে। তবে, সময় মানুষকে বদলায় না, পুরনো পরিচয় থেকে সরিয়ে দেয় কেবল

    খেয়াল করলাম ওপাশ থেকেও আমার দিকে দু-বার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আসলো।
    এবার তার পরিচয় নিশ্চিত, বছর কয়েক আগে হারিয়ে যাওয়া নিরুপমা।

    তার হাঁটার ভঙ্গিতে হঠাৎ একটা তাড়াহুড়ো ঢুকে পড়ল। আমার হাতে সিগারেট দেখেও না দেখার ভান করে দ্রুত কেটে পরতে চাইছে। যেন পুরনো পরিচয়টা অস্বীকার করতে পারলেই বর্তমানটা ঠিক থাকবে।

    আমি সিগারেটটা রাস্তায় ফেলে দিলাম।
    পায়ে চাপা দিয়ে নিভাতে গিয়ে ব্যার্থ হলাম। উল্টে গিয়ে আবার চাপা দিলাম। নিভল। মনে হলো, নিজেকে ধীরে ধীরে খুন করা অস্ত্র নিজেই চাপা দিয়ে আসলাম। যদিও লক্ষ্য এমন ছিল না। এটা কেবল একটা প্রশান্তি। সিগারেট খাওয়ার চেয়ে ফিল্টারের আগুন পায়ে চাপা দেয়ার প্রশান্তি বেশি।

    সাহস বাড়িয়ে ব্রিটিশদের শিখিয়ে যাওয়া রীতিতে পরিচয় পর্ব শুরু করলাম,
    -হ্যালো।
    ডাক শুনে নিরুপমা থামল। কয়েক সেকেন্ড পর ফিরে তাকাল, যেন অপেক্ষায় ছিল আমি ডাকবো।
    অথচ চোখে বিস্ময় নেই।
    আবেগ নেই।
    শুধু শালীনতা! যা আমরা তখনই দেখাই, যখন কাউকে আর অধিকার করে ডাকা যায় না।

    -তুমি?
    -হ্যাঁ। আমি

    এই “তুমি”টা আমাকে ইকটু হলেও চমকে দিল। খুব দ্রুত চিনে ফেলবে ভাবতে পারি নি।

    -অনেকদিন পর।
    -হ্যাঁ… অনেকদিন।

    সদ্য কথা বলতে শেখা শিশুর মত আমাদের অপিরিপক্ষ কথোপকথন বাতাসে ঝুলে রইল।
    যেন আমরা কেউই জানি না এর পর কী বলা উচিত।

    নিরুপমার মুখে সময়ের ছাপ স্পষ্ট।
    আমার মুখেও নিশ্চয়ই তাই।
    আমরা দু’জনেই নিজেদের ভবিষ্যৎ থেকে  খসে পড়েছি।

    জিজ্ঞেস করলাম,
    -কেমন আছো?
    একটু সময় নিয়ে বলল,
    -এইতো চলছে।

    এই এক শব্দে অনেক কিছু ছিল।
    চলার ভেতরে সুখ নেই, কিন্তু থামার সাহসও নেই।

    – তুমি?
    -এইতো আছি। যেভাবে না থাকলে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যার , তার শেষ প্রান্তে আছি।

    কিছুক্ষণ নীরবতা।
    এই নীরবতায় একসময় অনেক স্বপ্ন থাকত।
    আজ আছে কেবল হিসাব।

    আমি ওর হাতের দিকে তাকালাম।
    আঙুলে কোনো আংটি নেই। বিয়ের পর গা থেকে সব ধরনের গহনা খুলে ফেলার মানে হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছি কিছুটা।
    কিছু সত্য প্রশ্ন করে নয়, দেখলেই বোধগম্য হয়। তবুও আমার আগ্রহ হলো।

    আমি জানতে চাইলাম,
    সংসার কেমন যাচ্ছে?
    উত্তর এড়িয়ে নিরুপমা বললো,
    -সবাই ভাবে, সংসার মানেই নিশ্চয়তা।

    এবার মনে একটা কাঁটা দেয়া কথা জেগে উঠলো, অপেক্ষা না করে বলেই ফেললাম,
    -হ্যা, ঠিক যেমন চাকরিই সংসার করার যোগ্যতা।
    ও হালকা হাসল। এটা হাসি ? নাকি অপমানবোধ বুঝতে পারলাম না।

    আর কথা বাড়ালো না।
    হয়তো আমরা দু’জনেই বুঝে গিয়েছি এই দেখা হওয়ার পর আর কিছু যোগ করলে সেটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে।
    – আচ্ছা থাকো তাহলে, ইকটু তাড়া আছে আমার
    শেষ সংলাপ ছুঁড়ে দিয়ে নিরুপমার নিদারুণ বিদায় হলো।
    প্রথমে চোখ সরিয়ে নেওয়া,
    তারপর শরীর ঘুরে যাওয়া,
    তারপর দু’এক পা দূরে সরে যাওয়া।
    আমি আর কিছু বললাম না। বরং বলার সময় পেলাম না।
    নিরুপমা চলে গেল।
    আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
    তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়া নেই, কোনো দ্বিধাও দেখছি না।
    যেন এই শহরে ওর আর কোনো দেনা-পাওনা নেই।
    আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
    তারপর পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করলাম।
    প্রথম টানটা নিলাম খুব গভীর করে।
    ধোঁয়াটা ফুসফুসে ঢুকতেই হঠাৎ মনে হলো, এই ধোঁয়াই হয়তো একদিন আমার শেষ সঙ্গী হবে।
    নিরুপমার একাকিত্বতার সত্যতা নিশ্চিত হলাম। মনে হচ্ছে হয়তো কয়েক বছর পরও সে কোনো এক সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে।
    হয়তো ভাববে, জীবন কি অন্যরকম হতে পারত?

    আর আমি?
    আমি হয়তো তখনো এই শহরেই থাকব।
    আরও বড় পদে চাকরি করব, আরও পরিপাটি জীবনযাপন করব।
    লোকজন বলবে- “বেশ ভালোই তো আছে।”

    যাক এসব চিন্তা। সিগারেট টা মৃত্যুর কিণারে।
    তবে এবার আর আমি পা দিয়ে মাড়ালাম না। পিছনে যাওয়ার ইচ্ছে আর নেই। তাছাড়া সে নিজের ইচ্ছায় চিহ্ন রেখে নিভুক, যেন দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় একসময় সে খুব জ্বলতো।
    যাক এসব কথা, মনে এখন শুধুই নিরুপমা।
    মনে হলো আমরা কেউই কাউকে হারাইনি।
    আমরা শুধু ভুল সময়ে বেঁচে ছিলাম।
    হয়তো সে এখনো ভাবে-
    আমি যদি তখন একটু আলাদা হতাম,
    আর আমি ভাবি,
    ও যদি তখন একটু অপেক্ষা করত।

    আমরা দুজনই এখন মুক্ত, চাইলেই আবার এক হওয়া যায় । অথচ সময়ের ব্যবধানে এমন এক বিস্তর দেয়াল হয়েছে আমাদের, যা কথোপকথনের দীর্ঘতাকেও উপেক্ষা করে!

    বাস্তবতা খুব সৎ। সময়কে ফাঁকি দে না।
    আর কিছু গল্প আমাদের সবার থাকে যা কখনো শেষ হয়না, কেবল বয়সের সাথে গায়ের চামড়ার মত সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে।

    1
    2 Comments
    • গদ্যের শুরু থেকেই একটা আবছা বেদনার আবহ আচ্ছন্ন করে। ভালো লাগল খুব এই গদ্যের স্টাইল … ধন্যবাদ শেয়ারের জন্য। শুভেচ্ছা নিবেন।

Skip to toolbar