Profile Photo

মুস্তফা আবরার রাইয়ানOffline

  • mustafaabrarryian
  • অস্তিত্বের হীনম্মন্যতা ও ‘ওকাত’ পরিমাপের মনস্তত্ত্ব: একটি সামাজিক ব্যবচ্ছেদ

    মানুষের প্রকৃত আভিজাত্য তার পোশাকে নয়, বরং তার শব্দচয়নে ফুটে ওঠে। সমাজে এক ধরণের অদ্ভুত মানুষ দেখা যায়, যাদের নিজেদের অর্জনের ভাণ্ডার শূন্য হলেও অন্যের জীবনের মাপকাঠি নিয়ে তারা বড্ড বেশি চিন্তিত। এই শ্রেণীর মানুষেরা যখন তর্কে বা ব্যক্তিত্বে অন্য কারো কাছে হার মানতে থাকে, তখন তাদের একমাত্র এবং শেষ অস্ত্র হয়—অন্যের ‘ওকাত’ বা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এই ‘ওকাত’ মাপার প্রবণতা আসলে এক ধরণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক অসুখ, যাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে বলা যেতে পারে ‘সুডো-সুপিরিওরিটি’ বা ছদ্ম-বড়ত্ব।

    আভিজাত্য আর দম্ভের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম প্রাচীর আছে। প্রকৃত আভিজাত্য মানুষকে বিনম্র করে, আর দম্ভ মানুষকে করে তোলে উগ্র। কিছু মানুষ মনে করে, উচ্চস্বরে শাসানো বা সস্তা দাপট দেখালেই বুঝি নিজের ওজন বেড়ে যায়। অথচ তারা ভুলে যায়, সিংহের নীরবতা যতটা প্রকম্পিত করে, কোনো বন্য প্রাণীর বৃথা চিৎকার ততটাই করুণার জন্ম দেয়। যাদের সাহসের দৌড় কেবল কথার দাপটে সীমাবদ্ধ, তারা মূলত নিজেদের ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকতে এক ধরণের কাল্পনিক ক্ষমতার আড়ালে আশ্রয় নেয়।

    একটি মানুষের পরিচয় তার বর্তমান দিয়ে নয়, বরং তার শিকড় দিয়ে। যারা আলোচনায় বা বিবাদের সময় এমন সব সত্তাকে টেনে আনে যারা আজ প্রতিবাদ করার জন্য উপস্থিত নেই, তাদের চেয়ে বড় ‘মানসিক দেউলিয়া’ আর কেউ হতে পারে না। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, ওই ব্যক্তির নিজের বলার মতো কোনো যুক্তি নেই। অন্যের আবেগ বা অতীতের পবিত্রতাকে আঘাত করা কোনো বীরত্ব নয়, বরং এটি হলো নিজের নিচু স্তরের পারিবারিক মূল্যবোধের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। যারা ছায়ার সাথে লড়াই করে জিততে চায়, তারা আসলে নিজের আয়নার কাছেই পরাজিত।

    পৃথিবীতে এমন কোনো ইতিহাস নেই যেখানে কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা হেয় করে কেউ নিজে শ্রেষ্ঠ হতে পেরেছে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার সহনশীলতা এবং মার্জিত আচরণের মানদণ্ডে। বাঙালি ‘গান্ডু’ সংস্কৃতির একটি কমন সমস্যা হলো—বয়সে বড় হওয়া মানেই অভদ্র হওয়ার লাইসেন্স পাওয়া। তারা ভুলে যায় যে, সম্মান অর্জন করতে হয় ব্যবহারের মাধ্যমে, স্রেফ জন্মতারিখের জেরে তা দাবি করা যায় না। যার চিন্তায় ময়লা আর ভাষায় বিষ, সে অন্যের ‘ওকাত’ মাপার আগে নিজের রুচির গভীরতা মাপলে দেখতে পাবে—সে আসলে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে এক অঞ্জলি নর্দমার পানি নিয়ে গর্ব করছে।

    এই লেখাটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে। তবে লেখাটি পড়ার সময় যাদের হৃদযন্ত্রে অস্বস্তি হবে কিংবা আত্মার গভীরে অদৃশ্য কোনো ‘চুলকানি’ অনুভব হবে, বুঝে নিতে হবে—আয়নাটি তাদের সামনেই ধরা হয়েছে। নিজের অবস্থানকে অন্যের চোখে বড় করার চেয়ে নিজের চরিত্রের ওজন বাড়ানো অনেক বেশি জরুরি। মনে রাখবেন, সস্তা হুঙ্কার দিয়ে মুহূর্তের জন্য ভয় জাগানো যেতে পারে, কিন্তু শ্রদ্ধা অর্জন করতে লাগে নির্মল ব্যক্তিত্ব। যার শব্দে শিষ্টাচার নেই, তার যোগ্যতার দোহাই দেওয়াটাও আসলে এক ধরণের হাস্যকর কৌতুক।

    3
    1 Comment
    • আপনি যেভাবে তথাকথিত ‘আভিজাত্য’ এবং ‘দম্ভের’ সূক্ষ্ম প্রাচীরটি উন্মোচন করেছেন, তা অত্যন্ত সাহসী এবং যৌক্তিক।

শব্দরা যখন হৃদয়ে ভিড় করে, কলম তখন গল্পের জন্ম দেয়। আমার এই ছোট পাতায় আপনাকে স্বাগতম

মুস্তফা আবরার রাইয়ান

Skip to toolbar