-
বই: আটাশতম_শ্রাবণ
লেখক: রেদোয়ান_আসিফ_রিসান
পার্ট_০১ঢাকার পুরনো এই স্কুল টার দেয়ালগুলো নোনা ধরা, পলেস্তারা খসে পড়া। করিডোর দিয়ে হাঁটলে এক ধরণের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে আসে। নিশান তার কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নবম শ্রেণীর রসায়ন ক্লাস শেষ হয়েছে মাত্র। ক্লাসের ভেতর তখন তীব্র শোরগোল, যেন একঝাঁক পাখি খাঁচা থেকে মুক্তি পেয়েছে।
নিশান বরাবরই একটু আলাদা। কোলাহল তাকে টানে না, বরং সে কোলাহলের ভেতর নিজের এক টুকরো নির্জনতা খুঁজে নেয়। জানালার বাইরে একটা বড় কাঠগোলাপ গাছ। বসন্তের শেষ, তাই গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। নিশান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল একটা ঝুলে থাকা ডালে।
“নিশান!”
হঠাৎ পেছন থেকে একটা চঞ্চল কণ্ঠস্বর। নিশান চমকে ফিরে তাকাল। মেহেরীন দাঁড়িয়ে আছে। নীল পাড় দেয়া সাদা ফ্রক, চোখে একজোড়া চশমা যা ওর চেহারায় একটা মায়াবী ছাপ যোগ করে। ওর হাতে একটা খাতা আর একটা আধফোটা কাঠগোলাপ।
নিশান আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ মেহেরীন? কিছু বলবে?”
মেহেরীন হাসল। ওর হাসিতে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আছে, যা নিশানের বুকের ভেতর হুটহাট তুফান তুলে দেয়। মেহেরীন হাত বাড়িয়ে ফুলটা নিশানের নাকের সামনে ধরল।
“ঘ্রাণ নাও তো! বলতে পারো এই ফুলের বিশেষত্ব কী?”
নিশান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একটু ঘ্রাণ নিল। মিষ্টি, ভরাট একটা গন্ধ। সে নিচু গলায় বলল, “বিশেষত্ব… মানে? ফুল তো ফুলই।”
মেহেরীন ঠোঁট উল্টে বলল, “উঁহু, হলো না। এই ফুলটার বিশেষত্ব হলো এর শুদ্ধতা। এটা ঝরে গেলেও এর সুবাস কমে না। অনেকটা খাঁটি মানুষের মতো। তুমিও অনেকটা এই ফুলটার মতো নিশান। বড্ড শান্ত…
নিশানের গাল লাল হয়ে উঠল। সে কোনো মতে বলল, “তুমি আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবো বোধহয়। আমি তো সাধারণ একজন।”
“সাধারণ বলেই তো তুমি অসাধারণ,”
মেহেরীন চোখের কোণে একটু দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল। “শোনো, আজ স্কুল শেষে গেটে একটু দাঁড়াবে? আমার একটা কথা ছিল।”
নিশান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”
মেহেরীন উত্তর দিল না। শুধু রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। নিশান সেখানে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মূর্তির মতো। ওর হাতের আঙুলে তখনো কাঠগোলাপের সেই মিহি রেণু লেগে আছে।
মেহেরীন ভিড়ের মাঝে মিশে যাওয়ার পর নিশান অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর একটা অজানা দুরুদুরু শব্দ।
মেহেরীন কেন তাকে স্কুল গেটে দাঁড়াতে বলল?
……..
….
ধারাবাহিক ভাবে পোস্ট করা হবে।1 Comment
আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা বাইরের পৃথিবীতে নয়, বরং নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা অগণিত প্রতিচ্ছবির সাথে। আমরা সবাই প্রতিনিয়ত নিজেদের খুঁজে পাওয়ার সন্ধানে, যেখানে পরিচয়ই সবচেয়ে বড় সংকট।
রেদোয়ান আসিফ রিসান

রেদোয়ান আসিফ রিসান
লেখক
সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যের এক প্রতিশ্রুতিশীল নাম রেদোয়ান আসিফ রিসান। ২০০৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই লেখক খুব অল্প বয়স থেকেই মানবমনের রহস্য এবং মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের জটিল গোলকধাঁধা নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে একজন মননশীল লেখক হিসেবে গড়ে তোলে।
রিসানের সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব। তিনি কেবল গল্পের খাতিরে গল্প বলেন না, বরং তাঁর উপন্যাসের আড়ালে একুশ শতকের তরুণ প্রজন্মের সংকট—যেমন আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, মানসিক দোদুল্যমানতা এবং সূক্ষ্ম আবেগগুলোর নিবিড় ব্যবচ্ছেদ করেন। তাঁর গদ্যশৈলী অত্যন্ত সাবলীল ও পরিমিত, যা পাঠককে জীবনের গভীরতর দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করে।
মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং জীবনদর্শনের মেলবন্ধনে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের এক স্বতন্ত্র লেখকসত্তা নির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছেন।


মেহেরীন চরিত্রটা খুব মায়াবী। ওর চশমা আর আধফোটা কাঠগোলাপের বর্ণনাটা দারুণ লেগেছে।