Profile Photo

মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিOffline

  • ‘বৈশাখ এল”
    বৈশাখ উপলক্ষ্যে অনেক মেলা হত, এখনো হয় গ্রাম-বাংলার |
    তালপাখা—লাল সুতোয় বাঁধা, হাতলের গোড়ায় পোড়া দাগ দেওয়া,
    বাতাস করলে শব্দ করে এমন পাখা।

    এক সময় যার বাতাসে জুড়াতো ক্লান্ত গ্রীষ্মের দুপুর, আজ সেই পাখা যেন শুধুই বৈশাখের তালপাখা নামেই নয়, বিরহের পাখা।
    বৈশাখ মাসের তালপাতার তৈরি পাখাটি যেন বিরহের বেদনাকে বাতাসে মেলানো একটি হাতা।
    এটি কেবল শরীরের দাবদাহ নিবারণ করে না, বরং মনের বিচ্ছেদের তাপও যেন ছড়িয়ে দেয়
    চারদিকে।

    বাংলার এই গ্রীষ্ম,
    এই কাঁঠালপাতার রোদ,
    এই পুকুরধারের নিঃশব্দ দুপুর—
    সব কিছু যেন একটি পাখার ভিতর
    খুঁজে পায় তার অস্পষ্ট নিজের মুখ।
    এককালে,
    গ্রাম-বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে বৈশাখ মানেই নতুন তালপাখা।

    নদীর ধারের তালগাছ থেকে কেটে আনা কচি পাতা, রোদে শুকিয়ে, ছাঁচে কেটে, লাল সুতোয় বাঁধা—সবটাই যেন এক মৌসুমি শিল্প।

    বুড়ো শিল্পীরা বলতেন, তালপাতার পাখা কেবল বাতাস করে না,
    সে কথা বলে।

    ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ফরাসি পর্যটক ও লেখক এমিল গিমে এক লেখায় লিখেছিলেন, “বাংলার তালপাখা যেন একটি বাদ্যযন্ত্র।
    বাতাসে তার কর্কশ শব্দ গ্রামের একাকিত্বকে সঙ্গত করে।

    তখনকার জমিদারবাড়ির বৈশাখী মেলায় সেরা তালপাখার প্রতিযোগিতা হতো।
    কিছু পাখা আবার যৌতুকের সামগ্রী হতো—বরের বাড়ি যেত নববধূর হাতে।
    সেসব পাখার গায়ে পোড়া দাগ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হতো মনসা-বিদ্যার মন্ত্র বা পাঁচালি।
    ভালোবাসার পথ একটি পরীক্ষা, যেখানে মানুষ প্রস্তুতি ছাড়াই বিরহের কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়।

    কারণ অধিকাংশ পবিত্র ভালোবাসাই হারিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যেখানে প্রেমিক হৃদয়ের অনুভূতিকে অবহেলা করে।

    আমরা মানুষ যেন অস্তিত্বের গভীরে ,পরস্পরের প্রতিপক্ষ সাপে-নেউলের মতো
    তাই জীবনে চাওয়ার মধ্যে পাওয়ার মধ্যে সাপে-নেউলের সমীকরণ ঘটে |

    বিসমিল্লাহ খানের সুর যেমন শব্দ ছাড়াই মানুষের মনকে নাড়িয়ে দেয়, তেমনি আমার জীবনের অনেক অনুভূতিও প্রকাশ পায় না।

    আমি বাইরে থেকে স্বাভাবিক হলেও, ভেতরে এক অসমাপ্ত গল্পের মতো বেঁচে আছি।
    বিসমিল্লাহ খানের বাঁশির সুর আর বিরহ—দুটোই আলাদা জগৎ নয়; বরং একই অনুভূতির দুই ভিন্ন প্রকাশ, যেখানে কষ্ট শব্দ হয়ে নয়, অনুভব হয়ে বেঁচে থাকে।

    এই দ্বৈত অনুভূতিই আমাকে বিরহের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

    হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলোর মতো আমিও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা বহন করি, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অজানা এক বিষণ্ণতা।

    বিসমিল্লাহ খানের গানটি:
    দিল কা খেলোনা, হায়ে টুট গয়া
    কোঈ লুটেরা আকে লুট গয়া
    দিল কা খেলোনা, হায়ে টুট গয়া
    হুয়া ক্যা কুসুর অ্যায়সা সাঁইয়া হামারা
    জাত্যে হুয়ে জো তুনে হামেঁ না পুকারা |

    কোথাও কেউ নেই। তবু মনে হয়, কেউ একজন ঠিক ছিল… !
    ছিল না শুধু আমার জন্য।

    তুমি যে ছিলে না—
    তা সত্য নয়,
    তুমি যে ছিলে—
    তাও অসত্য,
    তুমি যে “থাকতে পারতে”—
    এইটিই আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে নিষ্ঠুর কারণ।

    হে অন্তরালের গর্ভে গুমরে ওঠা সম্ভাবনা,
    তুমি আসো নাই, তবু আমি প্রতিদিন প্রস্তুত ছিলাম,
    যেন কোনও বিধবা বধূ—
    শ্মশানে স্বামীর অপেক্ষায়।

    তোমার নাম জানে না ইতিহাস,
    তবুও আমার দিনলিপির প্রতিটি পাতায়
    তোমার জন্য রাখা আছে একখানা খালি গদ্য,
    যেখানে তুমি এলেই—
    সমস্ত বাক্য নিজেকে সাজিয়ে নেবে
    তোমার মতো করে।

    — বৈশাখের তালপাখা : বিরহের পাখা

    কলমে: মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি |

    2
    4 Comments
    • তালপাখা অবশ্য কিছু কিছু গ্রামে এখনও আছে। এই তালপাখা আর সাথে জীবনের বিলাপের মেলবন্ধন করেছেন। ভালোই লাগলো

      • আপনি ঠিকই বলেছেন, তালপাখা আজও কিছু গ্রামে টিকে আছে—হাতে বোনা, তালপাতার গন্ধে মাখানো, সময়ের সাক্ষী। আর সেই পাখার প্রতিটি বাতাসে যেন লেগে থাকে নিঃসঙ্গ দুপুর, ক্লান্ত বিকেল, আর মাটির মানুষের সুখ-দুঃখের অমোঘ আবহ।

    • বিসমিল্লাহ খাঁর সানাইয়ের মতো আপনার শব্দগুলোও মনের ভেতর হাহাকার তুলে দিয়ে গেল।

Skip to toolbar