-
“জাতীয় সংসদ ভবন তাওয়াফ করছে শতশত মোটরযান, চোখ বুজে আছেন জনতার ঈশ্বর।”
এখন ঢাকার রাজপথে শত শত মোটরসাইকেল আর গাড়ি জাতীয় সংসদ ভবনকে ঘিরে ঘুরছে—তেলের আশায়। জাহাঙ্গীর গেট থেকে শুরু করে পারিবাগ, মৎস্য ভবন—সব জায়গায় একই দৃশ্য। একটা পাম্পে হাজারের বেশি গাড়ি লাইনে! এটা কোনো ধর্মীয় আচার নয়, এটা সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সবচেয়ে কঠিন মেটাফর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে, দু’লিটার অকটেনের জন্য মাথা ঘুরছে, কিন্তু নীতিনির্ধারকরা সংসদে বসে বলছেন, “সংকট নেই, মজুত আছে।” চোখ বুজে আছেন জনতার ঈশ্বরেরা।
এই ‘মোটর-তাওয়াফ’ শুধু যানজট নয়। এটা আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর নৈতিক দেউলিয়াত্বের ছবি। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশ তো ৯৫ শতাংশ তেল আমদানি করে। সরকারের দায়িত্ব ছিল আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখা, স্বচ্ছতা রাখা, আর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলা। কিন্তু কী হলো? পাম্পে তেল নেই, আর সংসদে ‘তেল আছে’ বলে বক্তৃতা চলছে।
১. সরকারের করণীয়: ‘সব ঠিক আছে’ বলে আর চলবে না, চাই আঙুল তুলে দেখানোর মতো স্বচ্ছতা
নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে বলতে হয়—আপনাদের ‘ডিজিটাল অ্যাপ’ আর ‘আশ্বাস’ দিয়ে এই তাওয়াফ থামবে না। তিনটা জায়গায় এখনই আঘাত করুন:
প্রথমত, পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালু করুন। প্রতিটি পাম্পে রিয়েল-টাইমে কত লিটার তেল আছে, কতটা বিক্রি হয়েছে—এটা জনগণের সামনে খুলে দিন। যাতে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটোছুটি করে মানুষ অসহায় না হয়।
দ্বিতীয়ত, পুরোপুরি ক্যাশলেস পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করুন। ১০০-২০০ টাকা গুঁজে দিয়ে যে ‘লাইন ব্যবসা’ চলছে, তা বন্ধ করুন। বিকাশ, কার্ড, কিউআর—সব বাধ্যতামূলক। নগদ লেনদেন বন্ধ হলে পাম্প মালিক আর কমিটির অন্ধকার সুবিধা বন্ধ হবে।
তৃতীয়ত, বন্টন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করুন। শুধু সংসদ এলাকা বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তেল পাঠিয়ে লাভ নেই। প্রান্তিক পাম্পগুলোতে সরবরাহ বাড়ান। না হলে ঢাকার বাইরের মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়বে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—মন্ত্রীরা সংসদে উঠে “সংকট নেই” বলে যে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছেন, সেটা বন্ধ করুন। জনগণ দেখছে, অনুভব করছে। এই অস্বীকারই সংকটকে আরও গভীর করে।
২. নাগরিকের করণীয়: আমরাও তো কিছু দায় এড়াতে পারি না
সরকারকে দোষ দিলেই হবে না। আমাদের আচরণও অনেক সময় এই তাওয়াফকে লম্বা করে। ট্যাঙ্ক পুরো করে ভরার লোভে যেন অন্যের জরুরি প্রয়োজন বন্ধ না হয়। যতটুকু না হলে নয়, ততটুকু নিন। কালোবাজারি যারা করছে, রাইড শেয়ারিংয়ের নামে বেশি দামে তেল বিক্রি—তাদের কাছ থেকে কিনবেন না। আর সামনে দেখলে প্রমাণসহ হটলাইনে অভিযোগ করুন। এটা শুধু অধিকার নয়, দায়িত্ব।
৩. সমাধানের স্মার্ট পথ: ‘স্মার্ট ডিস্ট্রিবিউশন’ ছাড়া উপায় নেই
সংকট সাময়িক হতে পারে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা স্থায়ী হলে চলবে না।
• অ্যাপের মাধ্যমে স্লট বুকিং চালু করুন—আগে থেকে সময় নিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপমানিত হবেন না।
• পাম্প টু পাম্প অটোমেটেড সিস্টেম—তেল কমলে সরাসরি ডিপোতে অ্যালার্ট যাক, ‘তেল নেই’ নাটক বন্ধ হোক।
• ভ্রাম্যমাণ আদালত রাখুন। যারা হাতেনাতে ঘুল করবে বা ব্ল্যাক মার্কেট চালাবে, তাদের তাৎক্ষণিক জরিমানা আর পাম্প বন্ধ।
শেষ কথা
এই মোটর-তাওয়াফে দাঁড়িয়ে মানুষের ক্লান্তি এখন ঘৃণায় রূপ নিচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা যদি এখনও চোখ বুজে থাকেন, তাহলে জনগণের ধৈর্যও একদিন ফুরিয়ে যাবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু ডলার বা আমদানির বিষয় নয়—এটা সরকারের স্বচ্ছতা আর নাগরিকের দায়িত্বের মিলন। সরকার যদি সত্যি কথা বলে, স্বচ্ছতা আনে আর আমরা যদি ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে উঠি, তবেই এই দীর্ঘ অসহায় চক্র ছোট হবে।
না হলে এই তাওয়াফ চলতেই থাকবে। আর জাতি হিসেবে আমরা কতটা সুসংগঠিত, সেটা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
লেখক: সৃষ্টি5 Comments
It’s not how much you have but how much you enjoy that's makes happiness.
সৃষ্টি

সৃষ্টি
গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও ভিডিও সম্পাদক
ফিল্মমেকার
Friends
Poly Alam
@butterflywords
মামুনুর রশিদ
@mamun01722525933gmail-com
TANVIR MAHATAB AHMED KHAN
@tmaksolemn
Zakaria Ahmod
@zakariaahmod20gmail-com
এস এম সজিবুল ইসলাম
@shojib-rumman
Abul Hasan Tuhen
@abulhasantuhen
সৌরভ রায়
@sourav_roy
Md. Arif Hossain
@arifhossain
মোঃ তালাল উদ্দিন
@talal3944


সমাধানের জন্য আমাদের সবাইকে এক হতে হবে… আমার কাছে একটা বাস্তবসম্মত সমাধানের ধারণা আছে। যারা সত্যিই পরিবর্তন চান… পাঠক, লেখক, সচেতন নাগরিক আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই, তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। একা না… একসাথেই সমাধান।