-
• আরবের সাবা-সাম্রাজ্যের দাস্তান
জাজিরাতুল আরবের দক্ষিণ দিগন্ত তখন সাবা-বংশের শৌর্য-বীর্যে প্রকম্পিত। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীর সেই সুবর্ণলগন থেকে শুরু করে প্রায় আটশত বছর এই ভূখণ্ডে তাদের আধিপত্য কায়েম ছিল। এই প্রতাপশালী রাজবংশের গোড়াপত্তন করেছিলেন কাহতান বিন আবির—যিনি নূহ আলাইহিস সালামের বংশধরদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইয়ামেনের তপ্ত বালুকাধারে সভ্যতার বনিয়াদ গড়ে নিজের নেতৃত্বের ঝাণ্ডা উড্ডীন করেন। কালক্রমে তাঁরই প্রপৌত্র মহাবীর ‘সাহাবা’ দিগ্বিজয়ের নেশায় মত্ত হয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটালেন। জনপদকে শস্য-শ্যামল করতে তিনি ‘মাআরিব’ নামক এক বিস্ময়কর বাঁধ নির্মাণ করেন, যার বুক চিরে সত্তরটি নহর প্রবাহমান হয়ে মরুপ্রান্তরকে কানন-কুঞ্জে পরিণত করেছিল। ফলত, সাবা-রাজ্য উন্নতির শিখরে আরোহণ করে সমৃদ্ধির জোয়ারে ভাসতে থাকে।
সাবার পর তাঁর তনয় হিময়ার মসনদে আসীন হন। তাঁরই ঔরসে জন্ম নেন সাবার প্রখ্যাত সব শাহানশাহ। তাঁদেরই একজন তুব্বা হারেস, যাঁর খ্যাতি দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। হারেসের পুত্র সুআব তো পূর্ব থেকে পশ্চিমের তাবৎ সাম্রাজ্য পদানত করে ‘যুলকারনাইন’ উপাধিতে ভূষিত হন। কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে, এই সেই পুণ্যবান নৃপতি, যাঁর কথা পবিত্র কুরআনের পাতায় বিধৃত হয়েছে।
সময়ের আবর্তনে কওমে সাবার নবজাগরণ বা রেনেসাঁ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে। কৃষিকাজের লহর ছাড়িয়ে তাদের বাণিজ্য-তরী দরিয়ায় দরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুস্তান আর প্রাচ্যের ধন-রত্ন ইয়ামেনের উপকূলে ভিড়ত, আর সেখান থেকে শামের বাজার পর্যন্ত তাদের কাফেলা অবিরাম যাতায়াত করত। কিন্তু বিত্ত-বৈভবের এই মোহিনী মায়া তাদের অকৃতজ্ঞতার অতলে তলিয়ে দিল। আরাম-আয়েশের আতিশয্যে তারা খোদাতাআলার নেয়ামতের না-শোকরি শুরু করল। পরিণামে আসমানি গজব নাজিল হলো—সেই প্রখ্যাত মাআরিব বাঁধ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। প্রলয়ংকরী বন্যায় তছনছ হয়ে গেল জনপদ, ক্ষেত-খামার আর সাজানো বাগান। সাবার সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেল।
সাবার পতনের পর ইয়ামেনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সরদাররা নিজেদের দুর্গে স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করলেও হিময়ারী বা তাবাবিয়া গোষ্ঠী ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। লোহিত সাগর থেকে হাদরামাউত, এমনকি পারস্য ও মধ্য-এশিয়া পর্যন্ত তাদের অশ্বক্ষুরধ্বনি অনুরণিত হতো। সাবার রাজারা কৃষিতে মনোযোগী থাকলেও তাবাবিয়া রাজগণ ছিলেন রণক্লান্ত যোদ্ধা—যাঁদের ধ্যান-জ্ঞান ছিল রাজ্য বিস্তার।
এই বংশের রাজাদের মধ্যে তুব্বা বিন হাসসান ও হারিস বিন আমর ছিলেন ইতিহাসের আলোচিত চরিত্র। হারিস বিন আমর ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করলে গোটা রাজ্যে তার প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে তাঁরই বংশধর ইউসুফ যু-নাওয়াস ঈমানদার নাজরানবাসীদের আগুনের পরিখায় নিক্ষেপ করে এক নৃশংস অধ্যায় রচনা করেন। এই জুলুমই তাদের পতন ত্বরান্বিত করে। অবশেষে হাবশিদের প্রচণ্ড আক্রমণে হিময়ার রাজবংশের তখ্ত উল্টে যায়।
যে জাজিরাতুল আরবে একদা মাআরিব ছিল সাবার শৌর্য-বীর্যের কেন্দ্রবিন্দু, হিময়ারীরা ক্ষমতা দখলের পর তাদের তখ্ত-তাউস স্থানান্তর করল ‘যাফারে’। ইতিহাসের এই উত্থান-পত্তনের গল্প হাহাকার হয়ে আজও আরবের মরুবালুতে মিশে আছে।• রাইহান খালিদার / Rayhan Khalidar
—২৪/০৪/২০২৬1 Comment
Friends
Howlader Muhammad Sakib
@sakib24
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
মোরশেদ সাকিব
@morshedsakib
Syed Farah
@syedfarah
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
Alamgir Job
@alamgirjob
rahat ahmad
@rahatahmad
আহমেদ ছাব্বির
@sabbiroo7
মুহম্মদ জাহিদুল হক
@zahidulhuqzico

এই গদ্যটি ঐতিহাসিক তথ্যের এক নিপুণ বুনন, যা সাবার শৌর্য ও হিময়ারী রাজবংশের উত্থান-পতনের এক জীবন্ত ছবি আঁকে। কাহতান থেকে যু-নাওয়াস পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক এবং মাআরিব বাঁধের মহিমা ও ধ্বংসের বর্ণনা অত্যন্ত ধ্রুপদী ঢঙে তুলে ধরেছেন। ঐশ্বর্য, অহংকার এবং অনিবার্য পতনের এই দাস্তানটি মূলত মানুষের জন্য এক চিরন্তন ও শক্তিশালী শিক্ষামূলক আখ্যান।