Profile Photo

rukaiya rakhiOffline

  • rukaiyarakhi
  • Profile picture of rukaiya rakhi

    rukaiya rakhi

    2 weeks, 6 days ago

    ”ভাঙ্গা ঘড়ির কাঁটা”
    পর্ব – ২
    লেখিকাঃ রুকাইয়া রাখি

    রাইসার বয়স তখন পাঁচ বছর। এই বয়সের শিশুরা সাধারণত পৃথিবীকে খুব সহজভাবে দেখে—মাটি, পাখি, বৃষ্টি, আর মায়ের কোলে ঘুম। রাইসার পৃথিবী একটু আলাদা ছিল। তার পৃথিবীতে ছিল চাপা কান্নার শব্দ, থেমে থেমে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, আর এমন কিছু কথা যার মানে সে বুঝত না, কিন্তু ভয় পেত।

    সেদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল তার। উঠোনে কয়েকটি বড় ব্যাগ রাখা। রাশিদা বেগম কাপড় গুছাচ্ছেন। নুসরাত বই-খাতা বেঁধে রাখছে। আবু সাইফুল বারবার বাইরে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। তাঁর মুখে এক ধরনের গাম্ভীর্য।
    রাইসা মায়ের আঁচল টেনে জিজ্ঞেস করল,
    —আমরা কোথায় যাব, আম্মু?
    রাশিদা বেগম একটু থেমে মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
    —নতুন জায়গায়।
    — কোন জায়গা আম্মু? ওখানে কি ঝগড়া হবে না তোমাদের?
    প্রশ্নটা শুনে রাশিদা বেগমের হাত থেমে গেল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর রাইসাকে কোলে তুলে নিলেন।
    —জানি না মা। তবে চেষ্টা করব।
    “চেষ্টা করব”—এই দুটি শব্দ রাইসা তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু মায়ের গলার কাঁপন সে টের পেয়েছিল।

    উত্তরবঙ্গের সেই ছোট গ্রাম ছেড়ে তারা চলে এল কোলাহলপূর্ণ ঢাকা শহরে ।
    ঢাকা শহর রাইসার কাছে আশ্চর্যের মতো লাগল। এখানে সন্ধ্যায় রাস্তার ধারে বাতি জ্বলে। রিকশার ঘণ্টা বাজে। দোকানের সামনে রঙিন কাঁচের বোতল সাজানো থাকে। দূর থেকে ভেসে আসে ভাজা মুড়ি আর চানাচুরের গন্ধ।
    ছোট্ট অবুঝ রাইসা বিস্ময়ে সব দেখে।
    —এই শহরটা কি আমাদের? সে একদিন নুসরাতকে জিজ্ঞেস করল।
    নুসরাত হাসল।
    —না, তবে চাইলে হয়ে যেতে পারে।

    আবু সাইফুল একটি এনজিওতে চাকরি পেলেন। সংসারে কিছুটা স্বস্তি এল। শহরে চলে আসার পর থেকে রাশিদা বেগমকে আর আগের মতো শ্বশুরবাড়ির সবার জন্য দিন রাত খাটতে হয় না; সবার খোঁচা সহ্যও করতে হয় না। বিকেলে তিনি বারান্দায় বসে কখনো কখনো চুপচাপ আকাশ দেখেন।

    রাইসা ভাবত, নতুন শহরে এলে মানুষ কি নতুন হয়ে যায়?
    প্রথম কয়েকদিন সত্যিই মনে হয়েছিল, সবকিছু বদলে যাবে। রাতগুলো কিছুটা নীরব। বাতাসে অচেনা শহরের গন্ধ। জানালা দিয়ে দূরের আলো দেখা যায়।
    এক রাতে রাইসা ঘুম থেকে উঠে দেখে মা জানালার পাশে বসে আছেন।
    —ঘুমাওনি কেন? সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
    রাশিদা বেগম চমকে তাকালেন।
    —এমনি।
    —তুমি কাঁদছ?
    —না তো।
    রাইসা এগিয়ে গিয়ে মায়ের গাল ছুঁয়ে দেখল। আঙুল ভিজে গেল।
    সে আর কিছু বলল না।
    শিশুরা অনেক কথা বুঝতে পারে না, কিন্তু চোখের জল চিনতে ভুল করে না।

    শহরে আসার পর রাইসা ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করল। বয়সে নয়, ভেতরে ভেতরে। সে শিখল, মানুষ নতুন শহরে আসে; কিন্তু পুরোনো দুঃখ সুটকেসে ভরে সঙ্গে নিয়ে আসে।
    তবু এই শহরেই প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, হয়তো জীবন পুরোটা অন্ধকার নয়। হয়তো কোথাও সামান্য আলো আছে।
    কিন্তু আলো যতই থাকুক, ছায়া তার পিছু ছাড়েনি।

    এক সন্ধ্যায়, বৃষ্টির পর আকাশে হালকা রংধনু উঠেছিল। রাইসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ বাবার উঁচু গলা ভেসে এল।
    তারপর একটি থেমে যাওয়া নীরবতা।
    রাইসা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
    তার মনে হলো, নতুন শহরের গল্পটা হয়তো এত সহজ হবে না। শহরটি তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, শান্তি নয়।
    তবুও এই শহরেই ধীরে ধীরে রাইসার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হতে লাগল ।

    চলবে…

    4
    1 Comment
    • প্রথম পর্বের মতোই এই পর্বটিও ভীষণ মায়াবী আর আকর্ষক। শহর বদলালেও রাইসার জীবনের ছায়া যে পিছু ছাড়েনি, তা শেষ চরণে এসে বুকটা কাঁপিয়ে দিল। পরের পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

Skip to toolbar