-
প্রশ্নের অধিকার ও সত্যের আলো
___ পি কে সরকারযে সমাজে প্রশ্নের অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে সত্য ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়; আর যেখানে প্রশ্ন বেঁচে থাকে, সেখানেই মুক্ত চিন্তার আলো জ্বলে ওঠে। এই সত্যটি যেকোনো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তির অধিকার নয়, বরং সমগ্র জাতির অগ্রগতি ও জ্ঞানচর্চার মূল চালিকাশক্তি।
যখন কোনো সমাজে প্রশ্ন করাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, প্রচলিত ধারণা, ক্ষমতা বা প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সত্য কখনো স্থির নয়, এটি নিরন্তর অনুসন্ধানের ফসল। প্রশ্ন না থাকলে ভুল ধারণা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস গভীর শেকড় গেড়ে বসে। ইতিহাস তার সাক্ষী। মধ্যযুগীয় ইউরোপে গির্জার কর্তৃত্ব যখন প্রশ্নের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, তখন বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। গ্যালিলিওকে শাস্তি দিয়ে সত্যকে দমন করা হয়নি, বরং সমাজ নিজেকেই অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছিল। একইভাবে, যেসব সমাজে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক ক্ষমতা প্রশ্ন এড়িয়ে চলে, সেখানে সুবিধাজনক মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে সৃজনশীলতা মরে যায়, উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং মানুষের চিন্তা দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হয়।
অপরদিকে, যেসব সমাজ প্রশ্নকে উৎসাহিত করে এবং লালন করে, সেখানে মুক্ত চিন্তার আলো ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো জ্ঞানের প্রথম পদক্ষেপ। সক্রেটিস যথার্থই বলেছিলেন, অনুসন্ধানহীন জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। প্রশ্নের মাধ্যমে মানুষ অজানাকে জানে, ভুলকে সংশোধন করে এবং নতুন পথ আবিষ্কার করে। আধুনিক বিজ্ঞান, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ভিত্তি এই প্রশ্নের সংস্কৃতির উপরেই নির্মিত। রেনেসাঁ ও আলোকিত যুগে যখন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছিল, তখনই ইউরোপে বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প ও গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল। আজকের উন্নত সমাজগুলোতে যেখানে শিক্ষা, গবেষণা ও গণমাধ্যমে প্রশ্নের স্বাধীনতা বেশি, সেখানে উদ্ভাবন ও সামাজিক ন্যায়বিচারও তত বেশি।
প্রশ্ন শুধু বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কার করে না, সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায় ও অবিচারকেও উন্মোচিত করে। এটি ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনে। যে সমাজে নাগরিকেরা নির্ভয়ে সরকারের নীতি, সামাজিক রীতি বা প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে অগ্রসর।তাই প্রশ্নের অধিকার সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সমাজের বেঁচে থাকা ও এগিয়ে চলার অপরিহার্য শর্ত। যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে আসলে নিজের অস্তিত্বকেই ভয় পায়। আর যে সমাজ প্রশ্নকে স্বাগত জানায়, সে সমাজ নিজেকে আলোকিত করার পথ খুঁজে পায়। আমাদের সমাজেও যদি শিক্ষা, পরিবার, রাজনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে প্রশ্নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, তাহলে সত্যের পথ প্রশস্ত হবে এবং মুক্ত চিন্তার আলোয় অন্ধকার নিজে থেকেই সরে যাবে। প্রশ্ন করুন, প্রশ্নকে উৎসাহিত করুন—কারণ প্রশ্ন যেখানে বেঁচে থাকে, সেখানেই মানবসভ্যতার সত্যিকারের অগ্রযাত্রা সম্ভব।
2 Comments
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
afrida-jahar
@afrida-jahar
আমীর হামজা (লাম)
@amit
Md-Akadullah
@md-akadullah
Md. Omar Faruk
@mofaruk

প্রশ্ন যেখানে বেঁচে থাকে, সেখানেই সভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব—শেষের এই বার্তাটি মনের ভেতর আলো জ্বেলে দেয়। চমৎকার ও সাহসী লেখনী!