-
লকডাউনের নোনাজল : মহামারী, মানবিকতার অপমৃত্যু ও একজোড়া শূন্য চেয়ার!
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
(সিনিয়র সাব-এডিটর, বিশেষ প্রতিনিধি ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ)”জীবন তো চলমান, চলার পথে জড়িয়ে যায় অজস্র অশ্রু আর বেদনার স্মৃতি। যদি বেঁচেই থাকি আর কিছুটা সময়, তবে অনেক বছর পর সেই সব স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে পড়ে যাবে—পৃথিবীতে একদিন করোনা কেড়ে নিয়েছিল অসংখ্য প্রাণ, ফুটিয়েছিল লাখো লাখো বেদনার ফুল।”
মরণ-উইন্ডোর ওপারে চেনা আকাশসময়টা ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাস। পুরো পৃথিবী তখন এক অদৃশ্য চাবুকের নিচে থরথর করে কাঁপছে। চারদিকে শুধু মৃত্যু আর লকডাউনের স্তব্ধতা। ঠিক সেই সময়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি আর আমার স্ত্রী পাখি খুঁজছিলাম একটুখানি চেনা মুক্ত বাতাস, বেঁচে থাকার যৎসামান্য আশা।
২৫ মার্চ বড়ো বোনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে যে ঝড়ের সূচনা হয়েছিল, তার প্রথম আঘাত এসে লেগেছিল চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে। চারিদিকে যখন ‘করোনা’ নামের আতঙ্ক মানুষের বিবেককে গিলে খাচ্ছিল, তখন আমরাও আক্রান্ত হলাম। ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট আসতে লাগবে তিন দিন। সেই তিন দিন যে কী তীব্র উৎকণ্ঠায় কেটেছে, তা ল্যাবরেটরির কোনো খাতার পাতায় লেখা থাকে না।
অবশেষে হাসপাতালে কর্মরত ডা. আনোয়ার হোসেন রনি যখন ফোন করে আশ্বস্ত করলেন—রিপোর্টে নামের বানানে ভুল এলেও আমরা আসলে করোনা নেগেটিভ, তখন বুকের ভেতর থেকে পাথর নেমে গিয়েছিল। আমার স্ত্রী পাখির চোখে তখন জল, কারণ তার আপন বড় বোন মাত্র ক’দিন আগে ৭ এপ্রিল ঠিক একই রকম লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। হাসপাতাল থেকে ফিরে আমাদের মনে হয়েছিল, আমরা বুঝি নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলাম। কিন্তু আমরা জানতাম না, নিয়তির আসল এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর খেলাটি তখনও বাকি ছিল।সন্ধ্যার আলোয় মায়ের প্রস্থান
১৮ মে, ২০২০। ক্যালেন্ডারের এই তারিখটি আমার জীবনের সমীকরণ ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য ওঁত পেতে ছিল। সেদিন সন্ধ্যারাত ঠিক ৭টা ২০ মিনিট। প্রকৃতির সব নিয়মকে ঠাণ্ডা করে দিয়ে, আমাদের পুরোপুরি এতিম করে আমার মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন। চিকিৎসকেরা জানালেন—’রেনাল ফেইলিউর উইথ রেসপিরেটরি ফেইলিউর’।
লকডাউনের অবরুদ্ধ সেই দিনগুলোতে আমরা তখন এক ঘরে বন্দী। মায়ের শেষ সময়ে যখন একটু তরল খাবার মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তখন ঘড়িতে ৮টা ২০ মিনিট। আমার ছোট বোন ইয়াসমিন আর স্ত্রী পাখি অনবরত চেষ্টা করছিল মায়ের নিথর মুখে প্রাণের স্পন্দন ফেরাতে। কিন্তু ততক্ষণে মায়ের আত্মা উইন্ডো দিয়ে আল্লাহর অসীম রহমতের দিকে ডানা মেলেছে। ডাক্তার দূর থেকে দাঁড়িয়ে বললেন, “রোগী আর নেই।”মায়ের সেই চলে যাওয়ার মুহূর্তে আমরা পাশে থেকেও দূরবর্তী। মহামারী আমাদের এতটা পঙ্গু করে দিয়েছিল যে, মায়ের শেষ সময়ে তার কপালে একটু হাত রাখার অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। ডা. সাজেদা পলিন যখন বললেন, “আম্মাকে ছোঁয়া যাবে না, হাত দেবেন না।” তখন বুকের ভেতরটা কেমন করে করেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা শুধু দূর থেকে চাদরে ঢাকা মায়ের অবয়বটার দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদেছি। কাঁদতে কাঁদতে মেজো ভাই হিসেবে আমি দূর প্রবাসে থাকা বড় ভাই আব্দুল্লাহ ও ছোট বোন জাফরিনকে ফোন করে জানালাম—আমাদের আম্মা আর নেই।
মানবিকতার অপমৃত্যু ও এক অবরুদ্ধ যুদ্ধমৃত্যুর খবর ছড়াতেই যেন এক অদ্ভুত ও বীভৎস রূপ নিল আমাদের চেনা সমাজ। যে গ্রামীণ সৌহার্দ্য আর প্রতিবেশীর টানের কথা আমরা আজীবন শুনে এসেছি, করোনার ভয়ে তা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
মায়ের মরদেহ দাফনের জন্য যখন বাবুরহাট গ্রামের বাড়িতে খবর পাঠানো হলো, তখন ছোট কাকা ফোনে যে কথাটি বললেন, তা কোনো সন্তানের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। কাকা বললেন, “বাড়ির খবর ভালো না। বাড়ির মানুষ চায় না তোমরা তোমাদের আম্মাকে এখানে কবর দেও। তোমরা চাঁদপুর পৌর কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা কর।”
কারণ একটাই—মায়ের সন্তান করোনা আক্রান্ত, তাই গ্রামে লাশ ঢুকতে দেওয়া হবে না! একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার গালে এর চেয়ে বড় চপেটাঘাত আর কী হতে পারে?
আমার ছোট ভাই আনোয়ার হাবিব কাজল জেদ ধরল—মায়ের দাফন পৈতৃক ভিটাতেই হবে। শুরু হলো এক অসম প্রশাসনিক যুদ্ধ। কাজল তার সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করল। ঢাকা থেকে আমার খালাত ভাই লায়ন গভর্নর ডা. জগলুল আব্বাস রতন মজুমদার চাঁদপুরের প্রশাসনকে অনুরোধ জানালেন। আমার বন্ধু ব্রিগেডিয়ার তারিক চাঁদপুরের সেনা কমান্ডার মেজর খায়রুলকে বিষয়টি অবহিত করলেন। বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকও প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা চাইলেন। পুলিশের ডিসি ওবায়দুর রহমান বাবু চাঁদপুরের এসপি সাহেবকে অনুরোধ করলেন।
কিন্তু গ্রামের ভেতরের অন্ধকার তখন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল। রাত এগারোটার দিকে কাজল আবার বাড়িতে ফোন দিলে কাকা জানান, তাকে এবং আরেক চাচাতো ভাই মোতালেবকে বাড়ির মানুষ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। লাঠিসোটা নিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে যেন লাশ গ্রামে না ঢুকতে পারে। এক পর্যায়ে কাজল উত্তেজিত হয়ে ফোনের লাউডস্পিকারে এসপি সাহেবের নাম এবং সেনা সদস্যদের আসার কথা বললে বিরোধিতাকারীরা কিছুটা দমে যায়। মাঝরাতে পুলিশের একটি দল গ্রামে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার পর আমার দুই চাচাতো ভাই মোতালেব ও কামু কবর খোঁড়ে এবং আনু লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করে।
রাত ১টা ২০ মিনিটে ডা. সাজেদা পলিনের পাঠানো ইসলামী আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে মায়ের মৃতদেহ এবং আরেকটি গাড়িতে কাজল ও আমার শ্যালক জুয়েল বাবুরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আমি তখন অসুস্থ শরীর নিয়ে শহরের বাসায় গৃহবন্দী। রাত ৩টায় যখন মায়ের দাফন সম্পন্ন হলো, তখন জানাজায় ইসলামী আন্দোলনের ভাই ছাড়া গ্রামের বা বাড়ির একটি লোকও এগিয়ে আসেনি। রক্ত সম্পর্কের মানুষগুলো তখন ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে আত্মগোপনে ছিল।
ভোরের আলোয় বাবার নীরব প্রস্থান : এক ট্র্যাজেডির মহাকাব্যমায়ের দাফন শেষ করে কাজল যখন রাত শেষে বাসায় ফিরল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কাজল ক্লান্ত শরীরে গোসলে গেল। ড্রয়িংরুমে আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। মায়ের মৃত্যুর শোকে তখন আমাদের চোখের জল শুকিয়ে গেছে।
সেদিন মাঝরাতেও আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বাবা বেঁচে ছিলেন। আমি আমার মেয়ে সামিয়াকে বারবার বলছিলাম, “দাদা কী করে একটু দেখে আয় তো মা।” সামিয়া প্রতি ১৫ মিনিট পর পর এসে বলছিল, “দাদা পা নাড়ছে, মাথা চুলকাচ্ছে।”
ঠিক সেই সময়ে সুদূর আমেরিকা থেকে ফোন করল ছোট বোন ইয়াসমিনের মেয়ে ইমা। সে নানুর দাফনের খবর নেওয়ার পর নানার অবস্থা দেখতে চাইল। ইয়াসমিন ফোনটি নিয়ে যখন আব্বার ঘরের দিকে গেল, তখনো আমরা ভাবিনি পরবর্তী কয়েক সেকেন্ডে আমাদের জন্য কী নির্মম সত্য অপেক্ষা করছে।
আব্বার ঘরের ক্যামেরা ধরতেই ইয়াসমিন চিৎকার করে উঠল, “মেজো ভাই! আমাদের আব্বাও কি নাই?”
কাজল গোসলখানা থেকে ভেজা শরীরে দৌড়ে এল। আমরা গিয়ে দেখলাম, আব্বা একদম নিস্তেজ, নিথর। মায়ের মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, ভোরের আলো ফোটার আগেই আব্বাও আমাদের সকলকে ছেড়ে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন।
কাজল তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মেজো ভাই, ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছিলাম ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’—এর মর্মার্থ তখন বুঝিনি। আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি।” একই রাতে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মা ও বাবাকে হারানো—এই শোক সহ্য করার মতো পাথর আমরা কীভাবে হলাম, তা আজো আমি জানি না। সন্ধ্যায় মা গেলেন, আর ভোরে আব্বা।ইমামের মৃদু হাসি এবং এক অন্তিম বিদায়
বাবার মৃত্যুর পর ডা. সাজেদা পলিনের সহযোগিতায় আবারও ইসলামী আন্দোলনের ভাইয়েরা এলেন। আব্বাকে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড়ে সাজানো হলো। কিন্তু সকালের সূর্য উঠতেই আবারও সেই একই নির্মমতার পুনরাবৃত্তি।
কাকাকে যখন ফোনে বলা হলো আব্বার কবর খোঁড়ার কথা, তিনি উদাসীনভাবে বললেন—বাড়িতে কোনো লোক নেই। রাতে কবর খোঁড়া দুই চাচাতো ভাইও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অগত্যা কাজল চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে দুজন দিনমজুর ভাড়া করে নিয়ে গেল বাবার কবর খোঁড়ার জন্য।
আব্বাকে যখন মায়ের ঠিক পাশে দাফন করা হচ্ছিল, তখনও বাড়ির কোনো মানুষ আসেনি। এমনকি বাড়ির ঠিক পাশে যে মসজিদ, সেখানে জোহরের আজান দেওয়া হলেও কোনো জামাত হয়নি, কেউ নামাজে আসেনি। সবচেয়ে আজব এবং বুক ভাঙা দৃশ্য ছিল—জানাজার সময় মসজিদের ইমাম সাহেব ছাতা মাথায় দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু তিনি জানাজায় অংশ নেননি। দূর থেকে দাঁড়িয়ে তিনি মৃদু হাসছিলেন।
কাজল আজো সেই ইমাম সাহেবের হাসির রহস্য খুঁজে পায়নি। সেই হাসি কি আমাদের অসহায়ত্বের প্রতি উপহাস ছিল? নাকি মহামারীর কাছে হেরে যাওয়া মানবতাবোধের প্রতি এক পৈশাচিক আনন্দ?নীরবতার প্রতিধ্বনি ও শূন্য টেবিল
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন সেই দিনগুলোর কথা ভাবি, তখন চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মহামারী হয়তো একদিন বিদায় নিয়েছে, লকডাউন উঠে গেছে, পৃথিবী আবার তার পুরনো গতিতে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমাদের বুকের ভেতর যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা কি কোনোদিন শুকাবে?
বিশ্বজুড়ে যে মানুষগুলো করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন, পরিসংখ্যানের পাতায় তারা হয়তো শুধুই সংখ্যা। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে এক একটি জীবন্ত নাম ছিল, এক একটি চেনা মুখ ছিল—তা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই জানে। হারিয়ে যাওয়া সেই লাখো মানুষের ভিড়ে আমাদের দুজন সবচেয়ে আপন মানুষ মিশে আছেন। আমার স্নেহময়ী মা আর আমার পরম প্রিয় বাবা।
এখন প্রতিদিন সকালে যখন লেখার টেবিলে বসি, তখন সামনের একজোড়া আসন চিরদিনের জন্য খালি দেখি। যে ঘরটিতে তাঁদের হাসিমুখ আর স্নেহের পরশ ছিল, সেখানে এখন শুধুই নীরবতার প্রতিধ্বনি। সমাজ আমাদের সেদিন দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আপনজনেরা লাশের খাটিয়া ছুঁতে আসেনি; কিন্তু স্রষ্টার অসীম দয়ায় আমার ভাই কাজল, শ্যালক জুয়েল, আর সেই নিঃসার্থ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা যেভাবে বাবা-মায়ের শেষ বিদায়টুকু মর্যাদার সাথে সম্পন্ন করেছিল, তা-ই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সান্ত্বনা।
স্মৃতিগুলো বেদনার, স্মৃতিগুলো অশ্রুর। কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকব, চাঁদপুর কণ্ঠের পাতায় কিংবা আমার অন্তরের গহীন কোণে—এই লকডাউনের নোনাজল আর বাবা-মায়ের সেই শেষ চাহনি এক মহাকাব্যিক হাহাকার হয়ে বেঁচে থাকবে।লেখাটি আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গোলাম সারওয়ার (কচি)-এর জবানিতে, তার সৌজন্যে প্রাপ্ত মূল খসড়ার ওপর ভিত্তি করে চাঁদপুর কণ্ঠের পাঠকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি।
Friends
এম এ খায়ের
@dmpcttc
Md fujal Hossen
@mdfujalhossen
Jawata Afnan Yasha
@jawataafnanyasha
তহমিনা পারভীন
@tohominaparvin
আনিস কবির
@aniskabir
সুরঞ্জিত দাস
@suranjitmastergmail-com
Surjotoron সূর্যতোরণ দূরশিক্ষণ
@surjotoron
Aslam Layek
@aslamlayek
nur jahan
@taniaakter


হৃদয়বিদারক স্মৃতিকথা…..🖤