-
।।প্রান্তজনের রঙ্গ জীবন।।
জগতে মাতৃশক্তির যে কি বিশাল রূপ তা ব্যাখ্যা করা চলে না। জীবনের দৈনন্দিন চাওয়া-পাওয়ার তাগিদ ও সময় আমাদের মধ্যে যে কুহক তৈরি করে তাতে বিলীন হয়ে আমরা সেই শক্তি সবসময় অনুভব করতে পারি না। কিন্তু মায়ের সাথে এক অদৃশ্য সংযোগ আমাদের আত্মাকে চম্বুক শক্তির আধারে জড়িয়ে রাখে। সেই সংযোগে যখন কোনো বিচ্ছেদের সুর বাজতে থাকে তখন কি এক গোপন সংকেতে আমাদের আত্মা অস্থির হয়। চম্বুকের আকর্ষণ তখন সক্রিয় হয়ে নিবিড়ভাবে কেন্দ্রের দিকে টানতে থাকে।
সেই টানেই প্রায় মাস যাবৎ একবার বাড়ি একবার খুলনা এই করছি।
আজও ফুলতলা যাওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠেছি। মহসীন মোড়ের কাছে গেলে দুজন যাত্রী নেমে গেল। শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য সিএনজি চালক সেখানে দাঁড়ালো। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একবারে ফুলতলা যাওয়ার যাত্রী জুটে গেল। তাতে আমাদের সুবিধা হলো। ড্রাইভার মনোযোগ দিয়ে সিএনজি টানতে লাগলো।
সমস্যা হলো গিলেতলা পার হয়ে পথের বাজারে গিয়ে। সেখানে একটি সিএনজি বিকল হয়ে রাস্তার উপর পড়ে আছে। স্বভাবতই বিকল সিএনজি নিয়ে ড্রাইভার ছেলেটি অসহায় অবস্থায় পড়েছে। আমাদের ড্রাইভারকে সে অনুনয় করে বললো,” ভাই আমার গাড়িটা একটু ঠেলে আফিল গেট অবধি নিয়ে দেবে?”
গাড়ি দিয়ে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য। তার উপর আমরা যাত্রী হিসেবে বসে আছি। সিএনজিটা হেড দিয়ে বিকল সিএনজিটার পেছেন থেকে ঠেলতে ঠেলতে আফিল গেট পর্যন্ত নিয়ে গেল। তারপর আমাদের ড্রাইভার পঞ্চাশ টাকা দাবি করে বললো,” ভাই পঞ্চাশটে টাকা দে, আমার অনেকখানি গ্যাস খরচ অয়ে গেছে”।
যাত্রীদের একজন বেশ রসিক। বললো,” ঐ পঞ্চাশ টাকার ভাগ কিন্তু আমরা পাঁচজন পাই!”
ড্রাইভার বেশ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলো,” ক্যান?”
যাত্রী বললো,” তুমি আমাদের ড্রাইভার হয়ে অন্যের গাড়ি ঠেলে দিলে এতে আমাদের মান গেছে না?” ‘তাছাড়া আমাদের সময়ের দাম কে দেবে?”
ড্রাইভারও রসিক কম না! সে হেসে বললো,” ভাগ নিতি চান তা দেব; কিন্তু মানের কথা বলতিছেন?”
“আমাগের চোহি (চোখে) স্বপ্ন আর প্যাটে ক্ষিদে; চোহির স্বপ্ন যত বড়ো অয় প্যাটের ক্ষিদে ততো বাড়ে”। ক্ষিদের চো**নে আমাগে ধো**টাও শুহোয়ে যায়”।
কথাশুনে যাত্রীর অগত্যা পঞ্চাশ টাকার ভাগ ছেড়ে দিতে হলো। বরং সহানুভূতি দেখিয়ে বললো,” না ঠিক আছে ভাই, তোমার দুটো টাকা হলে ক্ষতি কি?”
ড্রাইভার আবার বললো,” তালি আরেকটা কথা কই শোনেন, সহালে শাওড়ি ফোন দিয়ে কি কয় জানেন?”
কয়, “এই দুধ খাবি?”
আমি কলাম,” এ কি কচ্চেন আম্মা?”
শাওড়ি কয়,” না মেলাদিন দুধ খাস নে, আয় এট্টু খাওয়াই দিবানি”।
আমরা যাত্রীরা সব লজ্জায় চুপ করে রইলাম। ড্রাইভার আমাদের নিরবতা ভেঙে দিয়ে জিগ্যেস করলো,” এ কথা ক্যান জিগ্যেস করলো জানেন?” শাওড়ির কাছেরতে টাহা কজ্জ নিছিলাম, সেই টাহা চাওয়ার জন্যি এভাবে লজ্জা দিয়ে শেষে কলো,” এই শুয়োরের বাচ্চা আমার টাহা দিস নে ক্যান?”
আমরা আর কথা বাড়ালাম না।
একসময় ফুলতলা নেমে গেলাম। ফুলতলা থেকে আমার গন্তব্য সিকিরহাটের ঘাট। একটা ভ্যানে উঠে বসলাম। চল্লিশ টাকা ভাড়া। আমি চালককে বললাম টান দিতে। সে টান দিতে যাবে এমন সময় চারজন একসাথের যাত্রী তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। একসাথে ফুল ভ্যানের যাত্রী দেখে তার চোখদুটো ঝলমল করে উঠলো। কিন্তু আমি বাড়তি যাত্রী হয়ে যাচ্ছি দেখে সে একটু বিব্রত হয়ে বললো,” উনারা আগে সিগনাল দেছে”। অগত্যা আমি নেমে দাড়ালাম। কিন্তু ঐ যাত্রীরা ভ্যান ভাড়াটা আমার মতো সহজ অংকে বুঝলো না; তারা বললো, ” আমরা ঘাটে যাবো; চারজন ত্রিশ টাকা দেব”। আমি বেশ কৌতুক অনুভব করলাম। অবশ্য মনে মনে ভাবলাম একজন দরিদ্র ভ্যান চালকের জন্য এইটুকু মিথ্যা বলার অধিকার যেমন আছে; তেমনি এতটুকু লোভ করার স্বভাবজাত অধিকারও নিশ্চয়ই আছে! জগতে কে না মিথ্যা বলে? ক,জনই বা নগদ লাভের লোভ সামলাতে পারে? সে হয়তো ভেবেছিলো চারজন যাত্রী হয়তো তাকে পঞ্চাশ ষাট টাকা দেবে। কিন্তু তার বিধি বাম হলো!
যাই হোক আমি আরেকটি ভ্যান ঠিক করে তাতে উঠে বসলাম। ইঞ্জিন ভ্যান। গতি বেশ। চালক ছেলেটিও যুবক।
পয়গ্রামের মধ্যে রিইউনিয়ন স্কুলের সামনে গেলে একটি মেয়ে চালককে হাতের ইশারায় থামতে বললো। মেয়েটির বয়স আনুমানিক ছাব্বিশ সাতাশ বছর হবে। পরনে ময়লা শাড়ি ব্লাউজ। হাতের কব্জি ও কপালে বিভিন্ন জায়গায় কালি লেগে আছে। বোঝা যায় কোনো হোটেল বা কোথাও রান্নার কাজ করে। গায়ের রং শ্যামলা। কিন্তু শরীরে ঢেউ আছে; চেহারায়ও ঝলক আছে। পোক্ত শরীরের উপর উত্তাল বুক দুটো দ্বীপের মতো জেগে আছে।
মেয়েটি জিগ্যেস করলো,” ঘাটে নিয়ে যাবি?”
ভ্যান চালক বললো,” বিশ টাকা”।
মেয়েটি খেকিয়ে ওঠে,” ক্যান পাঁচ টাকার ভাড়া বিশ টাকা ক্যান?”
যুবক তার বুক দুটোর দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে বললো,” খাতি দিবি?” ‘তালি এমনিই নিয়ে যাবানি”।
মেয়েটি চোখ রাঙিয়ে হাতের ইশারায় মস্ত একটি চড় দেখিয়ে বলে,” তোর দন্তন্নো,র অভাব আছে”।
যুবক সেদিকে একটুও ভ্রুক্ষেপ না করে তার ময়লা দাঁতগুলো বের হাসতে লাগলো। মেয়েটিকে আবার বললো,” তালি তো আরো ভালো হবে নে” হা হা হা”।
খানিকদূর এগিয়ে এসে আমি কৌতুহল আর চেপে রাখতে পারলাম না। জিগ্যেস করলাম, ” মেয়েটি তোমায় কি বললো?” দন্তন্নো,র অভাব আছে কথাটির মানে কি?”
সে এবার হো হো করে হাসতে লাগলো। বললো,” আপনি তালি বুঝতি পারেন নি তাই না?”
বললাম, ” না বুঝতে পারলাম না তো!”
‘মেয়েটি আমারে কইছে তোর চো** নের অভাব আছে” বলেই সে আবার দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগলো।
আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এতবড় একটা গালি খেয়েও মানুষ এভাবে নির্লজ্জের মতো হাসতে পারে?
ততক্ষনে আমি ঘাটে পৌঁছে গেছি। আকাশ মেঘলা। বিভিন্ন জায়গা বৃষ্টি হচ্ছে। নদীর স্রোতে যেমন বেড়েছে জোয়ারের টান আমার নাড়িতেও তেমনি লাগছে মাতৃশক্তির অদৃশ্য টান। ওদিকে ফেরি প্রায় ছেড়ে যায় যায়!2 Comments
Friends
Sahriar Rahman
@sahriarrahman
merajul islam
@merajulislam
Nashid Tahsin
@nashidtahsin
Song For Peace
@songforpeace
Nadia Rifat ritu
@ritu
সজল
@sojol
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat
Daliya Begum
@daliyabegum
Drako Shajib
@drako

প্রান্তিক মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ভাষা দারুণ ফুটেছে।