Profile Photo

Ashrafuj JamanOffline

  • ashrafujjaman
  • Profile picture of Ashrafuj Jaman

    Ashrafuj Jaman

    2 weeks, 4 days ago

    ছোটগল্প- “দেরি”
    আশরাফুজ্জামান
    “ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে।”
    কথাটা বলার পর হিয়া চুপ করে রইল।
    রাতুলও কিছু বলল না।
    পার্কের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো মাথার ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে। বিকেলের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছে ছোপ ছোপ হয়ে। দূরে কোথাও শিশুদের চিৎকার, কাছেই ভাজা বাদামের গন্ধ। অথচ তাদের দুজনের মাঝে শুধু নীরবতা।
    জায়গাটা তাদের চেনা। বহুদিন ধরে তারা এখানে আসে। তবু আজকের বিকেলটা অন্যরকম লাগছে।
    রাতুল ধীরে বলল,
    —তুমি বাসায় কিছু বলোনি?
    —বলেছি।
    —কী বলল?
    হিয়া একটু হাসল। সেই হাসিতে ক্লান্তি ছিল।
    —আমি বলেছি, আমি ওই বেকার ছেলেটাকেই বিয়ে করব।
    রাতুল মাথা নিচু করল। কথাটার ভেতরের অপমান সে শুনতে পেল। শুধু পরিবারের না—নিজের কাছেও।

    ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিকে হিয়া তাকে “রাতুল ভাই” বলেই ডাকত। দুই বছরের জুনিয়র ছিল সে। টিএসসির এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম কথা হয়েছিল তাদের। তারপর কখন যে সম্বোধন বদলে গেছে, সম্পর্কও বদলে গেছে—রাতুল নিজেও জানে না।

    মাস্টার্স শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। প্রথম বছর আত্মবিশ্বাস ছিল, দ্বিতীয় বছরে অস্থিরতা, তৃতীয় বছরে এসে সবকিছু যেন কুয়াশা হয়ে গেছে। সকালে কোচিং, দুপুরে আবেদন, বিকেলে লাইব্রেরি, তারপর পরীক্ষা, ভাইভা, অপেক্ষা। ফলাফলহীন অপেক্ষা।
    তার টেবিলের ড্রয়ার ভর্তি অ্যাডমিট কার্ড।
    কোনোটার কোণা ভাঁজ হয়ে গেছে, কোনোটার কালি ফিকে হয়ে এসেছে।
    প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা করে আশা জড়িয়ে ছিল।

    হিয়া বলল,
    —বাবা-মা খুব চাপ দিচ্ছে।
    —চিন্তা করো না। একটা কিছু হবে।
    —কীভাবে হবে?
    রাতুল উত্তর দিল না। তার মনে হচ্ছিল, এই “হবে” শব্দটার ভেতর আসলে কোনো ভিত্তি নেই। শুধু মানুষ বাঁচার জন্য বলে।
    হিয়া ধীরে বলল,
    —চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি।
    রাতুল চমকে তাকাল।
    —পালিয়ে?
    —তাহলে আমি কী করব বলো?
    রাতুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
    —আর একটু সময় দাও। বিসিএস ভাইভার রেজাল্টটা হোক। যদি হয়ে যায়…
    বাকিটা সে শেষ করল না।
    হিয়া অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
    —তোমার জন্য আমি সব করতে পারি। তুমি শুধু দেরি কোরো না।
    সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে। পার্কের বাতিগুলো একে একে জ্বলছে। তারা উঠে দাঁড়াল।
    রিকশায় ওঠার আগে হিয়া হঠাৎ বলল,
    —তুমি জেনে রাখো, আমি অন্য কারও হব না।
    রাতুল হেসেছিল তখন। কথাটাকে সে ভালোবাসার অভিমান ভেবেছিল।

    এরপর দিনগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।
    চাকরির বই খুলে রাতুল অনেকক্ষণ একই পাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। পড়া এগোয় না। মাঝরাতে মেসের ছাদে হাঁটে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ভোর হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা যেন তার পাশ কাটিয়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে।
    রাতে হঠাৎ হিয়ার মেসেজ আসে।
    “আজ মা আমার সামনে বিয়ের শাড়ির কথা বলছিল।”
    আরেকদিন—
    “ড্রইংরুমে সবাই বিয়ের কথা বলছিল। আমি নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে ছিলাম।”
    তারপর—
    “তুমি কিছু একটা করো রাতুল…”
    রাতুল অনেকক্ষণ টাইপ করল।
    “আর একটু অপেক্ষা করো” লিখে আবার মুছে দিল।
    কারণ তার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছিল না।

    দুই সপ্তাহ পর সকালে রেজাল্ট প্রকাশ হলো।
    রাতুল তখন লাইব্রেরিতে ছিল। এক বন্ধু হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়াল।
    —“রেজাল্ট বের হয়েছে, দেখেছিস?”
    রাতুল ফোন খুলল।
    BPSC-এর ওয়েবসাইট।
    রোল নম্বরের ওপর চোখ আটকে গেল তার।
    একবার মিলিয়ে দেখল।
    তারপর আবার।
    সে আর কিছু না বলে চুপ করে রইল।
    বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে।
    একটা দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে এল তার।
    তার প্রথম ইচ্ছে হলো হিয়াকে খবরটা জানানো।
    সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিল।
    ফোন বন্ধ।
    আবার দিল।
    বন্ধ।
    একটার পর একটা কল।
    একই উত্তর।
    সে আর অপেক্ষা করল না।

    বিকেলের দিকে সে হিয়াদের বাসার দিকে রওনা দিল।
    সেক্টর ছয়ের ঈশাখা এভিনিউ। দশ নম্বর রোড। জায়গাটা তার চেনা। কতবার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কখনো ঢোকার সাহস হয়নি।
    আজ গেটের সামনেই ভিড়।
    অস্বাভাবিক নীরব ভিড়।
    কেউ কথা বলছে না।
    রাতুলের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
    সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
    দুইতলার করিডোরে মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
    কেউ নিচু গলায় কথা বলছে, কেউ এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
    দরজা খোলা।
    রাতুল ভেতরে ঢুকে থেমে গেল।
    ঘরের মাঝখানে হিয়া শুয়ে আছে।
    সাদা কাপড়ে ঢাকা।
    শুধু মুখটা খোলা।
    কেমন শান্ত… যেন গভীর ঘুমে আছে।
    যেন এখন আর কোনো তাড়া নেই তার।
    চারপাশের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। রাতুলের মনে হলো, মেঝেটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে তার পায়ের নিচ থেকে।
    কারও ফিসফিস শব্দ কানে এল—
    —“সকালে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল…”
    রাতুল ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
    তার হাতে তখনও ফোনটা ধরা।
    স্ক্রিনে খোলা রেজাল্ট পেজটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল।
    তার মনে পড়ল, রিকশায় ওঠার আগে হিয়া বলেছিল—
    “আমি অন্য কারও হব না।”
    এবার সে বুঝল, মানুষ সবসময় প্রতিশ্রুতি ভাঙে না।
    কখনো কখনো শুধু একটু দেরি হয়ে যায়।

    2
    2 Comments
Skip to toolbar