Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    2 months ago

    কফিশপের টেবিল নাম্বার সাত
    মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন

    কফিশপের ঘড়ি ঠিক সকাল নয়টার সময় বাজল, আর ঠিক তখনই সে টেবিল নাম্বার সাতের দিকে এগোল। টেবিলটা জানালার পাশে, যেখানে ভোরের সূর্যের হালকা আলো কাচের ফাঁক দিয়ে ঢুকত। সে আগে কখনো এই টেবিলে বসেনি। তবু আজ যেন কোনো অদ্ভুত তাড়না তাকে টেনে এনেছিল।

    টেবিলের across দিকে একজন বসে আছেন, একরাশ নীরবতায়। তিনি বয়সে প্রায় তিরিশ, চশমার ফ্রেম ঘন কালো, গায়ে ধূসর শার্ট, হাতে ল্যাপটপ। সে যেদিকে তাকাল, চোখগুলো যেন ভিজে ভিজে আলো খুঁজছিল। প্রতিদিন এই সময়, ঠিক এই টেবিলে, তিনি বসে থাকতেন।

    সে হেসে স্বাভাবিক স্বরে বলল, “সকালের কফি মানে, নতুন দিনের শুরু?”
    অচেনা মানুষটি কিছুক্ষণ থমথম করে তাকাল। তারপর কাঁধ উঁচু করে হালকা হেসে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই। প্রতিদিন এই সময়।”

    প্রথম দিনটা ছিল অদ্ভুত। তারা শুধু চেয়েছিল কফি। কিন্তু পরের দিন, আর তার পরের দিনও, দুজনেই এই টেবিলে এসে বসতে থাকল। কোন কথা শুরু হলো না। শুধু নীরবতা, আর মাঝে মাঝে হালকা চোখের যোগাযোগ।

    এক সপ্তাহ পর, প্রথমবারের মতো সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি সবসময় এই সময়ে আসেন?”
    “হ্যাঁ,” অচেনা মানুষটি বললেন, “প্রায় তিন বছর ধরে। ঠিক এই সময়, ঠিক এই টেবিলে।”
    তাহলে কী, তিন বছর ধরে টেবিল সাতেই তিনি বসেছেন? সে অবাক হয়ে বলল, “তিন বছর? এবং এই টেবিলে কেউ আপনার সাথে বসেনি?”
    “না,” অচেনা মানুষটি উত্তর দিল, “কেবল আমি। আর আজ, আপনি।”

    এদিকে, প্রতিদিন আসার এই অভ্যাসে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত দৃঢ় বন্ধন তৈরি হলো। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করত না, কেবল থাকত। কখনো কখনো একে অপরের দিকে তাকানো, আরেকজনের চশমার আড়ালে থাকা চোখ পড়ার অনুভূতি, ছিল যেন সারা দিনের সমস্ত কথা।

    একদিন, সে নিজেই ভেঙে পড়ল। “আমি এই টেবিলে কেন আসি, তা জানি না। হয়তো… এখানে কিছু খুঁজছি।”
    অচেনা মানুষটি নীরব রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “আমিও ঠিক তাই। এখানে বসে আমি নিজের ক্ষতগুলো দেখি। আর হয়তো কিছু ঠিক করতে চেষ্টা করি।”

    দিনগুলো কেটে গেল। জানালার আলো বদল হলো, বারান্দার চা-গন্ধ মিশে গেল কফির গন্ধে। টেবিল নাম্বার সাত যেন তাদের দিনের সঙ্গী হয়ে উঠল। কেউ কিছু বলত না, শুধু বসে থাকত।

    এক বিকেল, হঠাৎ বাইরে ঝড় এল। কফিশপের জানালা কাঁপতে লাগল, বাতাসের সঙ্গে কাগজ উড়ে গেল। সে হাত বাড়িয়ে খোলা জানালার পাশে বসা অচেনা মানুষটির দিকে তাকাল। “আজকে কেন এখানে আসলেন?”
    অচেনা মানুষটি ধীরে ধীরে উত্তর দিল, “আজও খুঁজছি। কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু মিলে গেছে। হয়তো আমরা দুইজন একে অপরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, না জানি।”

    এরপর থেকেই তারা কথাবার্তা শুরু করল। ছোট ছোট, অদ্ভুত প্রশ্ন “আপনি আজ কেমন আছেন?” “আজ চা নেবেন নাকি কফি?” এগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ আলোচনায় রূপ নিল।

    একদিন, সে লক্ষ্য করল, অচেনা মানুষটির টেবিলের কোণে ছোট্ট খাতা। খাতার পাতা ভরা অক্ষর, ছোট ছোট নোট। সে আগ্রহ নিয়ে খাতাটি দেখল। অচেনা মানুষটি হালকা হেসে বললেন, “এটা আমার ছোট্ট রহস্য। প্রতিদিন এখানে বসে আমি নিজের গল্প লিখি।”

    সে খাতার পাতায় চোখ পড়ল ছোট গল্প, কবিতা, মানুষের চোখের কথা, শহরের শব্দ, ঝড়ের গন্ধ। যেন সেই নীরবতাতেই অচেনা মানুষটি সমস্ত জীবনকে লিখে রেখেছেন।

    ধীরে ধীরে সে বুঝল, কফিশপের টেবিল নাম্বার সাত শুধু কফি বা নীরবতার স্থান নয়। এটা ছিল এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারত। যেখানে চোখের ভাষা কথা বলে, আর নীরবতা সবচেয়ে বড় সংলাপ হয়।

    কিছুদিন পর, দুজনের মধ্যে অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হলো। তারা একে অপরকে বলল না, কেবল বোঝে। টেবিল নাম্বার সাত যেন তাদের সম্পর্কের এক অদৃশ্য সেতু।

    এক বিকেল, কফিশপের মালিক নতুন করে সাজানোর কথা বলল। সব টেবিল নতুন রঙে রাঙানো হবে। সে ভাবল, যদি টেবিল সাত বদলে যায়? সেই নীরবতা, সেই আলো, সেই ঝড়ের গন্ধ, সব কি হারিয়ে যাবে?

    তাদের অচেনা মানুষটি হেসে বলল, “টেবিল নাম্বার নয়, সময় এবং অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেখানে বসব, সেখানে আমাদের গল্প হবে।”

    আর তাই, প্রতিদিন তারা আসতে থাকল নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট টেবিলে। আর কফিশপের অন্যান্য অতিথিরা তাদের নীরব বন্ধন লক্ষ্য করত। কেউ জানতে চায়, কেন তারা কথা বলেন না। কেউ কৌতূহল দেখায়। কিন্তু তারা শুধু বসে থাকত, কফি চুমুক দিয়ে, চোখের কোণে এক অদ্ভুত হাসি নিয়ে।

    ধীরে ধীরে কফিশপের অন্য গ্রাহকেরাও টেবিল নাম্বার সাতের রহস্য উপলব্ধি করতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, এখানে বসা দুজনের মধ্যে কিছু আছে কোনো সাধারণ কফি সময়ের চেয়ে বেশি। এটা ছিল একটি নীরব অভ্যাস, যা ধীরে ধীরে তাদের জীবনের নিঃশব্দ গল্পের অংশ হয়ে উঠল।

    এক বিকেল, ঝড়ে ভরা শহরের মধ্যে কফিশপের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকল। সে আবার টেবিল নাম্বার সাতের দিকে এগোল। অচেনা মানুষটি সেখানে বসে আছেন, হালকা ধূসর চশমার নিচে চোখে ভরা অজানা গল্প। সে চুপচাপ বসে গেল। দুই চোখের মধ্যে চোখ পড়ল, আর নীরবতা আবার তাদের মধ্যে কথার মতো ভেসে উঠল।

    টেবিল নাম্বার সাতের কাছে বসে, কফির গন্ধ, ঝড়ের শব্দ, সূর্যের আলো সব মিলেমিশে একটি অদ্ভুত সুর তৈরি করল। যেন এই নীরব বন্ধন তাদের নিজের জীবনের অর্ধেক অংশ হয়ে গিয়েছে। তারা জানত না, কখনও এই গল্পের শেষ হবে কিনা। তবে আজ, এই মুহূর্তে, টেবিল নাম্বার সাত ছিল তাদের পৃথিবী।

    প্রতিদিন ঠিক সকাল নয়টার সময়, তারা আসত। অচেনা মানুষটির চোখে কাগজের পাতার গল্প, আর তার নিজের চোখে নতুন দিনের প্রত্যাশা। তারা বলত না, শুধু বুঝত। কফিশপের টেবিল নাম্বার সাতের কাছে, নীরবতা হয়ে গিয়েছিল কথার বিকল্প, এবং কফি হয়ে উঠেছিল একটি সময়ের সাক্ষী।

    এভাবে প্রতিদিন চলতে থাকল। ঝড় এল, রোদ উঠল, শহরের শব্দ এসে গেল। কিন্তু টেবিল নাম্বার সাত তাদের জন্য অচল, অদ্বিতীয়। এখানে বসে তারা বুঝল, কোনো মানুষকে বোঝার জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না, চোখ, অভ্যাস এবং নীরবতা অনেক বেশি বলবৎ হতে পারে।

Skip to toolbar