Profile Photo

rukaiya rakhiOffline

  • rukaiyarakhi
  • Profile picture of rukaiya rakhi

    rukaiya rakhi

    3 months, 2 weeks ago

    “ভাঙ্গা ঘড়ির কাঁটা”
    পর্ব – ৩
    লেখিকাঃ রুকাইয়া রাখি

    রাইসা তখন একটি প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস টু শেষ করেছে। পড়াশোনায় সে ভালো। অদ্ভুত রকম ভালো। ক্লাস এর ফ্রাস্ট গার্ল। কেউ একবার কিছু বুঝিয়ে দিলে সে কখনই ভুলত না। ক্লাস এর শিক্ষকরা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে বলতেন,
    —মেয়েটার মাথা খুব পরিষ্কার। অনেক মেধাবী একটা মেয়ে। ভালভাবে এগিয়ে যেতে পারলে জীবনে অনেক ভাল কিছু করবে।
    রাশিদা বেগম তখন চুপচাপ হাসতেন। সেই হাসিতে গর্বের চেয়ে স্বস্তি বেশি ছিল।
    কারণ তিনি জানতেন, এই মেয়েটার জীবনে সুন্দর কিছু খুব কম এসেছে।

    একদিন দুপুরে রাশিদা বেগম পাশের বাসার এক আপার সঙ্গে কথা বলছিলেন। রাইসা বারান্দায় বসে পেন্সিল দিয়ে খাতায় ফুল আঁকছিল।
    —ভাবছি ওকে প্রাইভেট স্কুলে দেব – রাশিদা বললেন।
    মহিলা অবাক হয়ে তাকালেন।
    —প্রাইভেট স্কুল? খরচ তো অনেক।
    —জানি। তবু চেষ্টা করতে চাই।
    —সাইফুল ভাই মানবে?
    এই প্রশ্নে রাশিদা বেগম চুপ হয়ে গেলেন।
    দূরে তখন আজানের শব্দ উঠছিল। রাইসা খেয়াল করল, মা হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। যেন তিনি এই প্রশ্নের উত্তর ওই আকাশের কাছে খুঁজছেন।

    সেই রাতে খাবার টেবিলে খুব নীরবতা ছিল।
    আবু সাইফুল ভাত খাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে। রাশিদা বেগম কয়েকবার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলেই ফেললেন।
    —আমি ভাবছিলাম রাইসাকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করাব।
    আবু সাইফুল খাওয়া বন্ধ করে রাশিদা বেগম এর দিকে তাকালেন।
    —মানে? আবু সাইফুল ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।
    —এখানকার একটা প্রাইভেট স্কুল আছে…
    —প্রাইভেট স্কুলে পড়ানোর টাকা আছে তোমার?
    গলাটা খুব উঁচু ছিল না। কিন্তু সেই শান্ত গলার ভেতর লুকানো রাগ রাইসা চিনে ফেলেছিল।
    রাশিদা বেগম আস্তে বললেন,
    —মেয়েটা ভালো পড়ে। একটু সুযোগ পেলে—
    —সুযোগ? আমাদের মতো মানুষের আবার সুযোগ কীসের?
    ঘরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
    রাইসা নিঃশব্দে বসে ছিল। তার হাতের আঙুল কাঁপছিল। সে জানত না প্রাইভেট স্কুল কেমন, কিন্তু এটুকু বুঝেছিল—এই স্কুলের নাম উচ্চারণ করাটাই যেন অপরাধ।

    রাশিদা বেগম আবু সাইফুলের অমতেই নিজের জমানো টাকা দিয়ে রাইসাকে শহরের একটি ভালো প্রাইভেট স্কুলে ক্লাস থ্রীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন ।সেদিন রাতে অনেক ঝগড়া হলো।
    দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। থেমে থেমে কান্না। চাপা চিৎকার।
    রাইসা বিছানার কোণে বসে ছিল। নুসরাত তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
    —কান বন্ধ করে রাখ।
    কিন্তু কিছু শব্দ কান বন্ধ করলেও ভেতরে ঢুকে যায়।

    হঠাৎ রাইসা শুনল, একটা থাপ্পড়ের শব্দ।
    তার বুক ধক করে উঠল।
    সে দৌড়ে ঘরের দিকে গেল।
    রাশিদা বেগম মেঝেতে বসে আছেন। মুখ নিচু। আবু সাইফুল দাঁড়িয়ে আছেন দরজার পাশে, চোখ লাল।
    রাইসা কিছু না বুঝেই মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
    —আম্মুকে মারবা না!
    তার ছোট্ট গলা কাঁপছিল।
    কয়েক সেকেন্ড পুরো ঘর নিস্তব্ধ।
    আবু সাইফুল মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টিতে রাগ ছিল, ক্লান্তি ছিল, আর অদ্ভুত এক ভাঙাচোরা অসহায়ত্বও ছিল।
    তারপর তিনি দরজা খুলে বাইরে চলে গেলেন।

    রাইসা মায়ের দিকে তাকাল।
    —আম্মু, তুমি কেঁদো না।
    রাশিদা বেগম মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। খুব শক্ত করে।
    সেই রাতে রাইসা প্রথমবার মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
    সে আরও ভালো করে পড়বে।
    অনেক ভালো।বড় কিছু হবে।
    এত ভালো, যেন একদিন কেউ তার মাকে আর অপমান করতে না পারে।

    পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখল, টেবিলের ওপর একটি নতুন স্কুল ব্যাগ রাখা।
    নীল রঙের।
    রাইসা ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট ব্যাগটার ভেতরে শুধু বই নেই—আরও কিছু আছে।
    হয়তো যুদ্ধ।
    হয়তো মুক্তি।
    অথবা দুটোই।
    আর ঠিক তখনই বাইরে থেকে আবু সাইফুলের গলা ভেসে এল—
    —রাশিদা! আমি কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেইনি!
    রাইসার হাত ব্যাগের ওপর থেমে গেল।
    জানালার বাইরে আকাশটা অদ্ভুত অন্ধকার হয়ে আসছিল।

    চলবে…

Skip to toolbar