Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    3 months, 2 weeks ago

    ব্যাক টু হেল (ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায় তিন
    রকীং স্প্রীং ক্রীকের সকালটা আগের দিনের মতো ছিল না। আলো ছিল পরিষ্কার, কিন্তু তার ভেতর একটা কঠিন ভাব ঢুকে পড়েছিল, যেন সূর্য নিজেই জানে, আজ তার আলো কারও কাজে লাগবে না। ক্রীকের জল আগের মতোই বয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই স্রোতের শব্দে এখন আর শান্তি ছিল না। শব্দটা যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, সবকিছু চলছে, কিন্তু ঠিক পথে নয়।

    জেসন স্কট ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ ধরে। সে কোনো কাজ শুরু করেনি। কাঠে হাত দেয়নি। কুঠার তোলে নি। এই স্থিরতাটাই আজ তার কাজ। সে জানে, আজকের দিনে যে আগে নড়বে, সে-ই ভুল করবে। চারপাশে লোকজন আছে, গতকালের চেয়েও বেশি। তারা আর লুকোচ্ছে না। কেউ ক্রীকের ধারে বসে, কেউ ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ দূরে আগুনের পাশে। সবাই এমনভাবে অবস্থান নিয়েছে, যেন একটা অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যার মাঝখানে জেসনের জমি।

    সে লক্ষ্য করে, আজ কেউ হাসছে না। কথাবার্তা কম। কণ্ঠস্বর নিচু। এই ধরনের নীরবতা সে চিনে, এটা কাজের নীরবতা। ডেডউড শহর থেকে যারা এসেছে, তাদের পোশাকেই সেটা বোঝা যায়। তারা পথিক নয়, শ্রমিকও নয়। তারা এমন মানুষ, যারা কোথায় দাঁড়ালে কী হয়, সেটা জানে।

    সকালের দিকে প্রথম ছোট ঘটনা ঘটে। খুব সাধারণ, কিন্তু অর্থপূর্ণ। জেসনের জমির সীমানার কাছে রাখা তার পানির ড্রামটা সরিয়ে অন্যদিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। উল্টে দেওয়া হয়নি। ভাঙা হয়নি। শুধু জায়গা বদলানো। এই পরিবর্তনটা যেন বলা “….. এখানে যা আছে, তার জায়গা আমরা ঠিক করব।”

    জেসন ড্রামটা আগের জায়গায় ফেরত নেয় না। সে যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে দেয়। এই সিদ্ধান্তটা ছোট, কিন্তু ইচ্ছাকৃত। সে জানে, প্রতিক্রিয়াও একটা ভাষা।

    বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রীকের ওপারে ভিড় জমে। কেউ মাছ ধরছে, কেউ জাল ধুচ্ছে, কেউ কেবল দাঁড়িয়ে আছে। সবকিছুই এমনভাবে করা, যেন জেসন বাধা দিলে সে-ই অযৌক্তিক হবে। এই কৌশলটা সে বুঝতে পারে। শহরে থাকাকালীন সে বহুবার দেখেছে, কীভাবে ভিড়কে ঢাল বানানো হয়।

    দুপুরের ঠিক আগে একজন লোক এগিয়ে আসে। একা। সে সীমানার ঠিক বাইরে দাঁড়ায়। গলার স্বর শান্ত। “পানি সবার দরকার।”

    এই কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন মাথা নাড়ায়। জেসন উত্তর দেয় না। লোকটা আবার বলে, “এখানে এখন অনেক লোক থাকবে।”

    এই বাক্যের মধ্যে কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো অনুরোধ নেই। এটা ভবিষ্যদ্বাণী। জেসন ধীরে বলে, “জমি আমার।”

    লোকটা মুখ টানে। চোখ সরায় না। “সব সময় না।”

    এই কথার পর সে ফিরে যায়। কাউকে ইশারা দেয় না। কিন্তু তার চলে যাওয়ার পর ভিড়ের অবস্থান বদলায়। একটু একটু করে সবাই কাছাকাছি আসে।

    বিকেলের দিকে উত্তেজনা বাড়ে। কোনো বড় ঘটনার মাধ্যমে নয়, ছোট ছোট অনধিকার প্রবেশে। কেউ সীমানা পেরিয়ে এক পা ভেতরে দেয়, আবার ফিরে যায়। কেউ কাঠের গাদার পাশে দাঁড়িয়ে মাটিতে থুথু ফেলে। কেউ ঘোড়াকে ইচ্ছা করে জেসনের জমির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। জেসন কাউকেই থামায় না। এই সহ্য করাটাই তার কৌশল, কিন্তু প্রতিটা সহ্য করার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরে কিছু শক্ত হয়।

    সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন প্রথম সরাসরি ক্ষতি হয়। কাঠের গাদার এক কোণ থেকে আগুনের গন্ধ আসে। খুব সামান্য। কেউ বড় করে আগুন লাগায়নি। শুধু দেখিয়েছে, তারা পারে। জেসন নিজেই আগুন নিভিয়ে ফেলে। কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ বাধা দেয় না। এই নিরপেক্ষতা আসলে অনুমোদন।

    ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ বলে, “আজ তো পুড়ল না।”

    আরেকজন হেসে বলে, “সময় আছে।”

    এই কথাগুলো বাতাসে ঝুলে থাকে। জেসন এবার ভিড়ের দিকে তাকায়। প্রথমবার সে চোখ নামায় না। এই তাকানোটাই আসলে ঘোষণা।

    সন্ধ্যার আলো ম্লান হলে পরিবেশ বদলে যায়। ক্যাম্পের আগুনগুলো জ্বলে, কিন্তু লোকজন সরে যায়। জায়গা ফাঁকা হয়। এটা দুর্ঘটনা নয়। এটা মঞ্চ তৈরি করা। জেসন বুঝে যায়, রাতটা সহজ হবে না। সে ঘরের দরজা শক্ত করে বন্ধ করে। জানালার শাটার টেনে দেয়। বন্দুকটা তুলে নেয়, এবার দেয়ালে নয়, টেবিলের ওপর রাখে।

    রাত নামার পর প্রথম পাথরটা আসে। খুব ছোট। ঘরের দেয়ালে ঠুকে পড়ে। ভাঙে না। শব্দটাই উদ্দেশ্য। জেসন নড়ে না। দ্বিতীয় পাথর আসে একটু জোরে। তৃতীয়টা জানালার শাটারে লাগে। এবার সে দরজা খুলে বাইরে আসে।

    ক্রীকের ধারে ছায়াগুলো নড়ে ওঠে। কেউ সামনে আসে না। কিন্তু সবাই প্রস্তুত। জেসন জোরে বলে, “এটাই শেষ।”

    কোনো উত্তর আসে না। শুধু একটা ধাতব শব্দ, কোথাও কেউ বন্দুকের হ্যামার টানছে।

    এই শব্দটা বাতাসে কাটার মতো ঢুকে যায়। জেসন বুঝে যায়, এখান থেকে আর পিছু হটার সুযোগ নেই।

    ধাতব শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশের সবকিছু স্থির হয়ে যায়। ক্রীকের জল বয়ে চলে, কিন্তু সেই শব্দ এখন আর আলাদা করে শোনা যায় না। আগুনের আলো কাঁপে, ছায়াগুলো লম্বা হয়, আবার ভেঙে পড়ে। জেসন স্কট দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, এক পা বাইরে, এক পা ভেতরে। এই অবস্থানটাই তার সিদ্ধান্ত। সে পালাচ্ছে না, আবার ঝাঁপিয়েও পড়ছে না। সে অপেক্ষা করছে, কে প্রথম সীমা পেরোয়।

    ক্রীকের ধারের ছায়াগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। মানুষ বেরিয়ে আসে অন্ধকার থেকে, কিন্তু কেউ সামনে আসে না। সবাই এমনভাবে দাঁড়িয়ে, যেন একে অন্যের পিঠে ভর দিয়ে আছে। এই ভিড়ের মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। আছে নিয়ন্ত্রণ। আর এই নিয়ন্ত্রণটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

    একজন কণ্ঠ ভেসে আসে অন্ধকার থেকে, “এখনো সময় আছে।”

    কথাটা হুমকি নয়। অনুরোধও নয়। এটা একটা হিসাবের অংশ। জেসন উত্তর দেয় না। সে জানে, উত্তর দিলে খেলাটা বদলে যাবে। নীরবতা তার শেষ ঢাল।

    আরেকজন বলে, “শুধু জমিটা ছেড়ে দাও।”

    এই কথার সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ নড়ে ওঠে। যেন এটাই ছিল সংকেত। জেসন এবার কথা বলে, কিন্তু গলা উঁচু করে না। “না।”

    এই একটা শব্দই অনেক ভারী। ক্রীকের শব্দ যেন আরো জোরে বয়ে ওঠে।

    পরের মুহূর্তেই ঘটনাটা ঘটে, হঠাৎ, কিন্তু পরিকল্পিতভাবে। ভিড়ের একপাশ থেকে একজন এগিয়ে আসে। খুব দ্রুত নয়। সে সীমানা পেরোয়। এক পা, তারপর আরেক পা। এইবার কেউ তাকে থামায় না। সে জেসনের কাঠের গাদার দিকে যায়। হাতে আগুন ধরানো কাপড়। দৃশ্যটা এত স্পষ্ট যে ভুল বোঝার সুযোগ নেই।

    জেসন দৌড়ে যায় না। সে হাঁটে। ঠিক তখনই প্রথম গুলিটা ছোড়া হয়।

    শব্দটা খুব জোরে নয়, কিন্তু রাতকে ছিঁড়ে ফেলে। গুলি মাটিতে লাগে, জেসনের পায়ের খুব কাছ দিয়ে। স্পষ্ট বার্তা। ভিড়ের ভেতর একটা শ্বাস ছাড়ার শব্দ ওঠে। কেউ হেসে ওঠে। কেউ চুপ করে যায়।

    জেসন আর অপেক্ষা করে না। সে বন্দুক তোলে। লক্ষ্য করে না আকাশে, না মাটিতে। সে লক্ষ্য করে মানুষটাকে, যে আগুন হাতে এগোচ্ছিল। গুলি ছোড়ে।

    শব্দটা এবার আলাদা। গুলিটা লাগে। মানুষটা চিৎকার করে পড়ে যায়। আগুনের কাপড়টা হাত থেকে ছিটকে পড়ে। ক্রীকের ধারে এক মুহূর্তের জন্য সব থেমে যায়।

    এই থেমে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। তারপর হইচই। কেউ চেঁচায়, “গুলি লাগছে!”

    আরেকজন বলে, “ওকে মারছে!”

    ভিড়ের ভেতর নড়াচড়া শুরু হয়। কেউ পিছিয়ে যায়, কেউ সামনে আসে। কেউ বন্দুক তোলে, কেউ আবার নামিয়ে রাখে। এই বিশৃঙ্খলার ভেতর জেসন দাঁড়িয়ে থাকে, বন্দুক উঁচু, চোখ স্থির। সে আর কাউকে লক্ষ্য করে না। সে শুধু জায়গাটা ধরে রাখে।

    পড়ে থাকা লোকটা নড়ছে। মরেনি। রক্ত বেরোচ্ছে তার পা থেকে। প্রথম রক্ত। ক্রীকের মাটিতে গাঢ় হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্যটা সবাই দেখে। কেউ এগিয়ে আসে না তাকে তুলতে। এই একা পড়ে থাকাটাই প্রমাণ, শুরুতে সে একা ছিল না, কিন্তু এখন সে আর কারো দায়ও নয়।

    একজন গলা তোলে ভিড়ের পেছন থেকে, “এইটা ভুল।”

    আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলে, “এখন আর ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই।”

    এই কথাগুলোর পর বন্দুকের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু কেউ গুলি ছোড়ে না। সবাই বুঝে গেছে, প্রথম গুলি হয়ে গেছে। এখন প্রতিটা গুলি হিসাবের।

    জেসন ধীরে পিছিয়ে যায়। ঘরের দরজার কাছে। সে জানে, খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানে নিজেকে উন্মুক্ত করা। দরজার আড়ালই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। সে ভেতরে ঢোকে, দরজা বন্ধ করে না। খোলা রাখে। এটা দুর্বলতা নয়, এটা ঘোষণা।

    রাতের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আগুনের আলোতে ছায়াগুলো আবার নড়ে। কেউ কেউ আহত লোকটাকে টেনে সরিয়ে নেয়। কেউ তাকে দেখে না। সবাই এখন জেসনের দিকে তাকিয়ে।

    এইবার একটা নাম শোনা যায়। খুব নিচু গলায়, কিন্তু স্পষ্ট। “বাক এটা শুনবে।”

    এই নামটার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ বদলে যায়। এটা আর স্থানীয় চাপ নয়। এটা ক্ষমতার কথা।

    জেসন জানে, এই রাত এখানেই শেষ হবে না। কিন্তু প্রথম ধাপ শেষ। সে আর নিরীহ মানুষ নয়, যে কেবল জমি বানাচ্ছিল। সে এখন সেই মানুষ, যে রক্ত ঝরিয়েছে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে।

    ভোরের আলো আসতে দেরি আছে। কিন্তু রাতটা আর আগের মতো নয়।

    প্রথম রক্ত ঝরেছে। এখন আর পরীক্ষা নেই। এখন প্রতিশোধ আসবে।
    (চলবে)

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar