Profile Photo

Puja ChakrabarttyOffline

  • pujachakrabartty
  • Profile picture of Puja Chakrabartty

    Puja Chakrabartty

    2 months ago

    #অদৃশ্য বন্ধু

    কর্মসূত্রে আজই পুনের একটা ছোট্ট এপার্টমেন্টে শিফ্ট হতে হয়েছে শৈলীকে। শৈলী কলকাতার মেয়ে। বেশ স্বচ্ছল পরিবারেই তার বড়ো হয়ে ওঠা। কিন্তু বাবার রিটায়ারমেন্ট আর মায়ের অসুস্থতা সব মিলে পরিবারটা এখন আর আগের মতো নেই।আর তাই ই এখন জীবিকার তাগিদে তার এই চাকরি নেওয়া। আর সেই সূত্রেই নিজের চেনা শহর , পরিবার পরিজন ছেড়ে তার এই এতদূরে আসা।
    এটা একটা ছোট একতলা বাড়ি। বেশ পুরনো বাড়ি একটু মেরামত করে এখন ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বাড়ির মালিক এখানে থাকেনা।  শৈলী সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে এসে পৌঁছয় ।  এরপর ওর সাথে আনা সামান্য জিনিসপত্র গোছগাছ করে বাড়িটা ভালোভাবে একটু দেখতে দেখতেই অনেকটা রাত হতে যায়। কখন যে এতটা রাত হয়ে গেল খেয়ালই করেনি শৈলী। ” বাপরে রাত একটা বেজে গিয়েছে। নাহ আর দেরি করা যাবেনা। কাল আবার সকাল সকাল অফিস আছে। এখন ঘুমোতেই হবে।” রুমের দেওয়ালে আটকানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই কথাগুলো বলতে বলতেই শৈলী বিছানায় চলে যায়।  হঠাৎ মাঝরাতে পায়ের দিকটায় একটা শীতল স্পর্শে। যেন কেউ একটি হিমশীতল হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলো পায়ের নিচটা। আর সেই সাথে তার সারা শরীর যেন ঠান্ডা হয়ে গেল কিন্তু সেই অনুভূতি ক্ষণিকের জন্যই ।  পরক্ষনেই সে অনুভব করলো তার পায়ের কাছে সাজানো কম্বলটা কেউ যেন তার গায়ে টেনে দিল। আর তারপর আর কিছু ভাবতে পারেনা শৈলী। কারণ তারপর হঠাৎই যেন একটা গভীর ঘুমের চাদর নেমে আসে তার চোখে।
    সকালে এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে শৈলীর। তাড়াতাড়ি এলার্মটা বন্ধ করে বিছানা ছেড়ে উঠতে যেতেই শৈলী লক্ষ্য করে তার গায়ের ওপর কম্বল দেওয়া। কম্বলটা দেখেই হঠাৎ গতকাল রাতের কথাটা মনে পড়ে যায় শৈলীর।  কিন্তু পুরো বিষয়টা কী কোনো স্বপ্ন ছিল নাকি সত্যি তা সে বুঝে উঠতে পারেনা । এদিকে এভাবে এখন বসে ভাবার সময়ও নেই তার। কারণ ভাবতে বসলে তার অফিসের জন্য দেরি হয়ে যাবে। তাই সে গতকালের সমস্ত বিষয়টাকে তার স্বপ্ন ভেবে দ্রুত পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমের চলে যায়। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে তার।এখন বাড়ি থেকে না বের হলে অফিসে পৌঁছতে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। এদিকে কাল রাত থেকে তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি তার। কিন্তু এখন এসব চিন্তা করার সময় নেই। পরে নাহয় বাইরে থেকে কিছু একটা খেয়ে নেওয়া যাবে। এসব ভাবতে ভাবতেই দ্রুত হতে শৈলী তার  ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে। এরপর একটা অটো নিয়ে অফিসের সামনে পৌঁছে ভাড়া দেওয়ার জন্য ব্যাগে হাত দেয় শৈলী। আর তখনই তার হতে কিসের যেন একটা ছোট্ট প্যাকেট বাঁধে । টাকার সাথে প্যাকেটটাও বের করে আনার পর সে দেখে একটা বিস্কুটের প্যাকেট।  প্যাকেটটা দেখে বেশ অবাকই হয় সে। আর ভাবে ” এটা আমি আবার কবে কিনেছিলাম রে বাবা?! আমার তো মনেই পড়ছেনা। যাক এতো ভেবে কাজ নেই। যেদিনই কিনেছিলাম ভালই হয়েছে।” ভাবতে ভাবতে বিস্কুটের প্যাকেটটা খেয়ে শেষ করে তারপর বেশ খুশি মনেই অফিসে ঢুকে যায় শৈলী।
    বিকেলে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে হঠাৎই পরিষ্কার আকাশে মেঘ জমতে দেখা যায়। শৈলী এবার আর দেরি না করে দ্রুত অফিস থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কারণ সে বাড়ির ছাদে তার কিছু জমা কাপড় রোদ লাগানোর জন্য দিয়ে এসেছিল। আর এখন বৃষ্টি পড়লেই সেগুলো ভিজে গেলে  রাতে ঠান্ডায় কাপতে হবে। এসব চিন্তা করতে করতেই সে দ্রুত বাড়ির দিকে আসতে থাকে। কিন্তু মাঝ রাস্তায় পৌঁছতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। কোনো মতে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে একটা অটো নিয়ে বিমর্ষ মুখে বাড়িতে পৌঁছয় শৈলী।
    কিন্তু এবার তার অবাক হওয়ার পালা ছিল। বাড়িতে পৌঁছে নিজের ঘরে ঢুকে সে দেখে ছাদে থাকা সমস্ত জমা কাপড় কে যেন তুলে এনে তার বিছানার ওপর গুছিয়ে রেখে দিয়েছে। শৈলী এবার বেশ ভয় পায়। কারণ সে যেখানে থাকে তার আসে পাশে তেমন কোনো বাড়ি নেই। আর যারা আছে তাদের মধ্যে কাউকেই শৈলী চেনে না। আর বাড়ি বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় কেউ যে বাইরে থেকে এসে জমা কাপড় ছাদ থেকে তুলবে তার ও উপায় নেই।
    মারাত্মক ভয় পায় শৈলী।  আর কাপা কাপা গলায় সে জিজ্ঞেস করে,” এ বাড়িতে কি আমি ছাড়া আর কেউ আছো?? থাকলে আমাকে প্লিজ উত্তর বা কোনো সংকেত দাও।” আর তার কথা শেষ হতে না হতেই রান্নাঘর থেকে ঝনঝন শব্দে কিছু বাসন নিচে পড়ার শব্দ আসে। শৈলীর আর বুঝতে বাকি থাকেনা যে এ বাড়িতে সে ছাড়াও অন্য কেউ আছে। যে তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এবার শৈলী আরো বেশি ভয় পায়। আর আরো বেশি ভীত কণ্ঠে বলে,” দেখো তুমি যে ই হও, প্লিজ আমার কোনো ক্ষতি করোনা। আমি তোমাকে কোনো বিরক্ত করবো না। আমি কালকেই এ বাড়ি থেকে চলে যাব। কিন্তু প্লিজ তুমি আমার কোনো ক্ষতি করোনা।”
    এবার শৈলী অনুভব করে  তার পাশে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। আর তার হিমশীতল নিশ্বাস পড়ছে শৈলীর ঠিক কানের কাছে। আর ওভাবেই একটা ফিস ফিসে মেয়েলি কণ্ঠে কেউ এবার যেন ওর কানের কাছে বলে ওঠে ,” তুমি আমাকে ভয় পেওনা। আর প্লিজ আমাকে আবার একা করে দিয়ে চলে যেওনা। আমি তোমার বন্ধু। তোমার কোনো ক্ষতি করবনা।” শৈলী তার কথাগুলো শুনে প্রথমে বেশ ভয় পেলেও শেষের বন্ধু কথাটা শুনে সে বেশ শান্ত হয়ে যায়।

    “আসলেই তো। ও যে ই হোক ও তো আমার উপকার ছাড়া কোনো ক্ষতি তো করেনি আমার। তবে কি ও সত্যিই আমার বন্ধু?!” ” হ্যাঁ আমি সত্যি ই তোমার বন্ধু। আমাকে ভয় পেওনা।” আবারো সেই আগের মত ফিস ফিস করেই কথাগুলো বলে যায় সেই অদৃশ্য বন্ধু। আসলে শৈলীর কোনো বন্ধু নেই। ছিল ও না কখনো। তাই আজ এই কথাটা শুনে মনে মনে অনেকটা প্রশান্তি অনুভব করেছি শৈলী।
    এরপর থেকে সেই হিমশীতল অবয়বটি শৈলীর প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে। শৈলী ও তার সমস্ত কথা শেয়ার করতে থাকে থাকে তার সাথে। আর শৈলী ওর নাম দেয় অদৃশ্য বন্ধু। আর সে হয়ে ওঠে শৈলীর সরবক্ষণের সাথী। শৈলীর মন খারাপ হলে এখন তার বন্ধু তার পাশে থাকে। মাঝ রাতে শৈলীর গায়ে কম্বল টেনে দেয়। শৈলী সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই এখন তার ব্রেকফাস্ট রেডি হয়ে যায়। শৈলী ও এখন এগুলোর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। সে এখন আর অবাক হয়না। ভয়ও পায়না তার অদৃশ্য বন্ধুকে।
    হ্যাঁ কিন্তু শৈলী মাঝে মাঝে অবাক হতো যখন দেখতে তার বন্ধু বাড়িতে সবসময় তার সাথে সাথে থাকলেও বাড়ির বাইরে তার কোনো অস্তিত্ব থাকতো না। তাই একদিন শৈলী জিজ্ঞেস করে বসলো,” আচ্ছা অদৃশ্য বন্ধু তুমি  বাড়িতে সবসময় আমার সাথে সাথে থাকলেও বাইরে কেন যাওনা?” কিন্তু আর আর অদৃশ্য বন্ধু থেকে কোনো উত্তর আসেনা। শৈলী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার জিজ্ঞেস করে,” কি গো বন্ধু বললে না?!” আবার চারিদিকে নিরবতা। অতঃপর সেই নিরবতা ভঙ্গ করে সে উত্তর দেয়,” কারণ আমি এ বাড়িতে বন্দী। আর এখান থেকে আমার মুক্তি নেই।” এরপর ওইদিন শৈলীর সাথে আর কথা হয়না তার অদৃশ্য বন্ধুর। শৈলী সেদিন সারাটা রাত অদৃশ্য বন্ধুর বলা কথাগুলোও নিয়ে ভাবে। আর ঠিক করে সেই তার বন্ধুর এই কষ্ট থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবে।
    আর তাই পরদিন সে অফিস থেকে ফেরার পথে একটা মন্দিরে যায়। আর সেখানের পুরোহিত মশাইকে সব খুলে বলে। তিনি শৈলীকে তার বন্ধুর মুক্তির উপায় বলেন। 
    আর সে জানতে পারে তার বন্ধুর মুক্তি মানে সে আর তার সাথে থাকতে পারবেনা। এবার শৈলী বেশ ভেঙে পড়ে। আর নিজের মনেই অনেক কিছু চিন্তা করে। কিন্তু সব শেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে যা ই  হোক সে এবার তার বন্ধুকে মুক্তি দিয়েই ছাড়বে। আর তাই আজ বাড়িতে বেশ হাসি মুখে বাড়ি ফিরে তার বন্ধুকে ডাক দেয়। আর বলে ,” বন্ধু তোমার জন্য একটা খুশির খবর আছে। আমি আজ তোমার মুক্তির উপায় জেনে এসেছি। আমি জানি এভাবে থাকতে তোমার খুব কষ্ট হয়। আমি আর কষ্ট পেতে দেবনা তোমাকে। কালকেই তোমাকে আমি মুক্তি দেব।”

    এবার সেই অদৃশ্য অবয়বটি শৈলীর একদম কাছে এসে শৈলীকে ফিস ফিস করে বলে” সত্যি বন্ধু?! তুমি আমাকে মুক্তি দেবে?! ”
    “হ্যাঁ গো সত্যি।” উত্তর দেয় শৈলী। ” কিন্তু বন্ধু আমি মুক্তি পেলে তো আর তোমার কাছে আসা হবেনা আমার।”। ” হ্যাঁ জানি আমি।” উত্তর দেয় শৈলী।

    “এটা জানার পরেও তুমি আমাকে মুক্তি দিতে চাইছ? ”  “হ্যাঁ বন্ধু চাইছি। কারণ আমি জানি তোমার অনেক কষ্ট হয় এভাবে থাকতে। আর আমি চাই না আমার বন্ধু আর কষ্টে থাকুক। আর তাই আমি তোমাকে এবার মুক্তি দেব।” এটুকু বলে শৈলী দৌড়ে তার চোখের জল আর কষ্টটা লোকাতে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দেয়। আর তার পরদিন নিজের দেওয়া কথা মতো তার অদৃশ্য বন্ধুর মুক্তির ব্যবস্থা করে। কিন্তু সেই বন্ধু যাওয়ার আগে শৈলীকে কথা দিয়ে যায় যে সে খুব শীগ্রই আবার ফিরে আসবে তার কাছে নতুন কোনো রূপে।
    আর সেই বন্ধু তার কথা রেখেছে। শৈলীর বিয়ের পর শৈলী মেয়ে হয়ে সে আবার শৈলীর কাছে ফিরে এসেছে চিরতরে। …..
    সমাপ্ত।

    6
    4 Comments
    • সুন্দর হয়েছে.. আমি চাই এমন কিছু যে তার নিজের অজান্তেই আমার সাথে থাকবে..

    • খুবই সহজ, সাবলীল আর আকর্ষণীয় বর্ণনাশৈলী। ভৌতিক আবহের মাঝেও যে মানবিকতা আর আবেগের এত সুন্দর মেলবন্ধন মন চুয়ে গেলো।

    • পুজা চক্রবর্তী,ভালো লেগেছে!আপনার কল্পনাশক্তি, বর্ণনা করার কৌশল, বাক্য গঠন এবং সংলাপ প্রক্ষেপণ __সব মিলিয়ে গল্পের যে গঠনশৈলী এবং বন্ধু হয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা কথা রাখার যে দৃষ্টান্ত আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন সেটা শিক্ষনীয় __এই সময়ের মানুষদের জন্য! ভালো লিখেছেন।আপনারা আরো লেখা পড়তে চাই। শুভকামনা!

Skip to toolbar