Profile Photo

SharminOffline

  • sharmin1
  • Profile picture of Sharmin

    Sharmin

    2 weeks, 3 days ago

    দেশ গঠনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা
    ……. স্বপন বিশ্বাস

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম কারিগর হিসেবে তিনি আজও আলোচিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে আত্মনির্ভর, উৎপাদনমুখী ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তার প্রভাব এখনও দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনে দৃশ্যমান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। ঠিক সেই সময় জাতীয় জীবনে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন- একটি রাষ্ট্রকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, বরং উৎপাদন, শৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় ঐক্যের ভিতের ওপর দাঁড়াতে হয়। তাই তার রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন। জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। তিনি মনে করতেন, ভাষা, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও স্বাধীনতার চেতনার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠতে হবে। তার এই দর্শনের উদ্দেশ্য ছিল বিভক্ত রাজনৈতিক সমাজকে একটি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামাজিক নৈতিকতার অংশ হিসেবে দেখলেও রাষ্ট্রকে উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
    অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে গ্রামের মানুষের মধ্যে। তাই তিনি “খাল খনন”, “গ্রাম সরকার”, “পল্লী উন্নয়ন” এবং “স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি” চালু করেন। তার বিখ্যাত কর্মসূচি ছিল-“খাল কাটো, দেশ গড়ো”। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা উন্নত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করা হয়। জিয়াউর রহমান কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহ দিতে তিনি সার, বীজ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ কমে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। এজন্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তার বিশ্বাস ছিল, কেন্দ্র থেকে নয়,উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি আসবে তৃণমূল থেকে। জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। স্বাধীনতার পর দেশে যখন একদলীয় শাসনের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তখন তিনি রাজনৈতিক বহুমতের পথ উন্মুক্ত করেন। সংবাদপত্র, রাজনৈতিক দল ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্র কিছুটা প্রসার লাভ করে। যদিও তার শাসনামল নিয়েও বিতর্ক রয়েছে, তবুও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতির পুনর্জাগরণে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
    পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করার পেছনে তার সরকারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আজকের বৈদেশিক রেমিট্যান্সভিত্তিক অর্থনীতির প্রাথমিক ভিত অনেকাংশে সেই সময়েই তৈরি হয়।
    শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও তার চিন্তা ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি কর্মমুখী শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্য ছিল,একটি দরিদ্র দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের সংস্কৃতি।
    তবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। সামরিক শাসন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ইতিহাসের বিচারেও এসব বিতর্ক আলোচিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, তিনি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন।
    আজকের বাংলাদেশে যখন উন্নয়ন, গণতন্ত্র, জাতীয় পরিচয় ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার প্রশ্ন সামনে আসে, তখন জিয়াউর রহমানের কিছু চিন্তা নতুনভাবে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তার দর্শন এখনও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন অনেকে। দেশ গঠনের স্বপ্ন কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন। জিয়াউর রহমান সেই দর্শনের মধ্যেই বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলেন,যেখানে থাকবে আত্মমর্যাদা, উৎপাদনশীলতা, জাতীয় ঐক্য ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন। তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়া এই মানুষটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যাকে ঘিরে আলোচনা কখনও শেষ হবে না। কারণ, তিনি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করেননি; তিনি একটি দারিদ্র্যপীড়িত জাতিকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর সেই স্বপ্নের প্রতিধ্বনি এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অনুভূত হয়।
    …..
    স্বপন বিশ্বাস
    কবি ও কলামিস্ট

Friends

Skip to toolbar