-
❤️ “শৈলীর প্রেমের আত্মকাহিনী” ❤️
✍️ পর্ব এগারো: ( ১৯৯৮ এবং একই প্রান্তরে দুটি পরীক্ষা )
সাল ১৯৯৮। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো তখন যেন বড্ড দ্রুত এগোচ্ছিল, আবার একই সাথে বুকের ভেতরটা কেমন একটা অদ্ভুত ভারী পাথরের মতো চেপে বসছিল। দ্রুত—কারণ সামনে পরীক্ষা, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অলিখিত এক সন্ধিক্ষণ। ভারী—কারণ এই সময়টাই ঠিক করে দেবে তাদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন আর কিশোরী বয়সের সেই অবুঝ ভালোবাসার শেষ পরিণতি। মধ্যবিত্ত পরিবারের নিয়মের বেড়াজাল আর সমাজ-সংসারের বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে তখন শুধুই একটা ভালো ফলাফলের অপেক্ষা।
অল্প সময়ের ব্যবধানে দুজনেরই ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছিল। শৈলী—এস.এস.সি পরীক্ষার্থী, যার চোখে একরাশ চঞ্চলতা আর চাপা ভয়; আর রবিন—এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী, যার কাঁধে বড় হয়ে ওঠার অলিখিত এক দায়িত্ব। কিন্তু নিয়তি এবার তাদের দূরে সরায়নি, পরীক্ষার কঠিন নিয়মের আড়ালে এসে যেন এক চমৎকার অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে দিল দুজনকে। শৈলীর এস.এস.সি পরীক্ষার কেন্দ্র পড়ল রবিনের নিজের কলেজেই! খবরটা যেদিন প্রথম জানা গেল, শৈলীর বুকের ভেতর একঝাঁক পায়রা যেন একসাথে ডানা ঝাপটে উঠেছিল।
স্থানটা তাই এক হয়ে গেল—একই চিরচেনা ক্যাম্পাস, একই পাথুরে করিডোর, একই কৃষ্ণচূড়া তলার সবুজ মাঠ। এই সময়টা হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত রুটিন আর তীব্র নীরব অপেক্ষার এক মহাকাব্য। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক তিন দিন আগে, বিকেলবেলা পড়ার টেবিল থেকে উঠে শৈলী তীব্র এক অস্থিরতা অনুভব করল। ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে নীল কালির কলমে দ্রুত হাতে সে নিজের মনের কথাগুলো সাজাল। তারপর তার পরম নির্ভরযোগ্য বান্ধবী নীরার মাধ্যমে ছোট্ট একটি ভাঁজ করা চিরকুটে রবিনকে লিখে পাঠাল—
“প্রিয় রবিন,
জানি না কথাগুলো কেন লিখছি, তবে তোমার অবয়ব দেখলে আমার পড়াশোনার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ভালো রেজাল্ট না হলে তুমি যদি রাগ করো—সবসময় সেই চিন্তাই আমার মাথায় ঘোরে। যদিও তোমার দেওয়া প্রতিটি বিষয়ের সাজেশন আমি অক্ষরে অক্ষরে ফলো করছি। তা-ও বলছিলাম কি, আমার প্রতিটি পরীক্ষা শুরুর আগে অন্তত একবার তোমাকে দেখতে চাই, রবিন। তোমার নিজের পরীক্ষার পড়াশোনার একটু কষ্ট হলেও প্রতিদিন ঠিক সময়ে কলেজের গেটের কাছে থেকো কিন্তু—এটা আমার আবদার নয়, আদেশ। না থাকলে কিন্তু তোমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলব না, আড়ি!ইতি — তোমার শৈলী”
বিকেলের হালকা আলোয় কলেজের পেছনের মাঠে বসে চিরকুটটা পড়ার পর রবিন কিছুক্ষণ একদম চুপ করে রইল। চারপাশের কোলাহল যেন এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চেনা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল— ‘শৈলী, তুমিও তাহলে ধীরে ধীরে ভালোবাসার বরফ টুকরো হয়ে সাগরে ভাসতে শিখে গেলে? সেই চঞ্চলা, চপলা মেয়েটা, যে কিনা সারাক্ষণ প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াত, সে আজ কত ধীরস্থিরভাবে অনুরোধ করতে শিখে গেছে… বড্ড পাগলী একটা!’ সেই হাসির ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল দায়িত্ব, অপার মমতা আর এক শান্ত, গম্ভীর হৃদয়ের স্বীকৃতি।
পরদিন সকাল থেকেই শুরু হলো এক নতুন নিয়ম, এক নীরব প্রেমের উৎসব। প্রতিদিন সকালে কেন্দ্রের সামনে একই চেনা দৃশ্য—গেটের সামনে অভিভাবকদের ভিড়, শেষ মুহূর্তে নোটবই ওল্টানোর খসখস শব্দ, করিডোরে পরীক্ষার্থীদের চঞ্চল দৌড়াদৌড়ি, রিকশার টুংটাং শব্দ আর চারপাশের এক চাপা অস্থিরতা। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝখানে ঠিক একটা নির্দিষ্ট শান্ত মুহূর্ত তৈরি হতো।
শৈলী পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে ভিড়ের মাঝে চশমাটা ঠিক করতে করতে একবার চোখ বুলিয়ে খুঁজে নিত রবিনকে। রবিনও জানত শৈলীর চোখ দুটি ঠিক কোথায় এসে থামবে। কখনো কলেজের মূল গেটের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাশে, কখনো করিডোরের শেষ মাথার জানালার ধারে, কখনোবা নোটিশ বোর্ডের আড়ালে—এক মুহূর্তের জন্য শুধু চার চোখের মিলন হতো। কোনো কথা হতো না, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখার সুযোগও ছিল না।
কিন্তু সেই এক মুহূর্তের চাহনিতেই শৈলীর ভেতরের সব ভয়, সব অস্থিরতা যেন কর্পূরের মতো বাতাসে উড়ে যেত। অবাধ্য বুকটার ধড়ফড়ানি থেমে গিয়ে মুখে আসত এক শান্ত, আত্মবিশ্বাসী দৃঢ়তা—যেন পুরো পৃথিবীটা এক নিমেষে ভীষণ সহজ হয়ে গেছে। রবিনও এই দেখার গুরুত্ব মনে-প্রাণে বুঝত। নিজের এইচ.এস.সি পরীক্ষার প্রচণ্ড চাপ, দিন-রাত জাগা পড়াশোনার ক্লান্তি—সবকিছুর মাঝেও সে প্রতিদিন ঠিক সময়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গায় হাজির থাকত। দূর থেকে শুধু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, যেন তার এই নীরব উপস্থিতিই শৈলীর জন্য এক মহাসমুদ্রের সমান শক্তি আর সাহস।
একদিন গণিত পরীক্ষার ঠিক আগে, যখন চারপাশের সবাই উপপাদ্য আর সূত্রের টেনশনে নীল হয়ে আছে, শৈলী ভিড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব আস্তে করে, প্রায় ফিসফিসিয়ে রবিনকে বলে ফেলেছিল, “আজ যদি দেখা না হতো, মনটা শান্ত হতো না হয়তো। জ্যামিতি সব ভুলে যেতাম।”
রবিন হালকা হেসে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে নিচু গলায় উত্তর দিয়েছিল, “তাহলে ধরে নাও, এটা এখন তোমার নতুন কলেজের নিয়ম। পরীক্ষা শুরু হবে আমাকে দেখেই। এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না।”
শৈলী প্রথমে লজ্জায় ও ভালোলাগায় লাল হয়ে হেসে ফেলেছিল, তারপর পরীক্ষার হলের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নিচু গলায় বলেছিল, “পাগল একটা…”
কিন্তু সেই ‘পাগল’ শব্দটার ভেতরেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, এক পরম নির্ভরতার আকাশ।দিনগুলো এভাবেই কাটছিল—পরীক্ষা, রাত জেগে পড়াশোনা আর ভোরের এই ছোট্ট ছোট্ট দেখার অপার্থিব আনন্দ। একই সময়, একই বাতাস, একই ক্যাম্পাস—তবুও দুটি আলাদা জীবনের পরীক্ষা। কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভেতরের গল্পটা ছিল এক ও অভিন্ন।
শৈলীর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যখন রবিনের নিজের পরীক্ষার দিনগুলো ঘনিয়ে এল, তখন রবিনের ভেতরে এক অদ্ভুত, অলৌকিক শক্তি কাজ করছিল। পড়ার টেবিলে হারিকেনের আলোয় যখন সে একা বসত, তখন তার মনে হতো—তাকে জিততেই হবে। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা শুধু কোনো আবেগ বা পাওয়ার নাম নয়, ভালোবাসা মানে অপর প্রান্তের মানুষটার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলার দায়িত্ব নেওয়ার নামও বটে।
এক গভীর সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসে, জানলা দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় যখন তার খাতার পাতাগুলো উড়ছিল, তখন সে পড়া থামিয়ে নিজের ডায়েরির এক কোণে কলম দিয়ে যত্ন করে লিখে রাখল—
“ভালোবাসা শুধু সাময়িক কোনো অনুভূতি নয়… এটা একটা বিশাল বড় দায়িত্ব। আর দায়িত্ব মানে, জীবনের শত ঝড়েও নিস্পৃহ থেকে নীরবে পাশে থাকা—সব সময়, সব পরিস্থিতিতে।”
গল্প চলমান…
5 Comments
Friends
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সবুজ) সিকদার
@attokendrik
মোঃ আবু সাঈদ বিশ্বাস
@mdabusayeedbiswas
জিনাতুন নেছা
@zinatunnesa99
মোহাম্মদ তোফায়েল হাছান
@mohammedtofaylgmail-com
Smsadek__
@smsadek__
Hossain Muhammad Anwar
@hossainmuhammadanwar
Suranjit Master
@suranjitmaster
মিনহাজ লিমন
@minhaz-limon
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain



Sundor