Profile Photo

AlockOffline

  • alock
  • Profile picture of Alock

    Alock

    1 week, 2 days ago

    “শৈলীর প্রেমের আত্মকাহিনী”

    ✍️ পর্ব বারো: (অলিখিত চুক্তি ও নতুন পত্র মাধ্যমের খোঁজ)

    পরীক্ষার শেষ ঘণ্টার তীব্র আওয়াজটা যখন স্কুলের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেল, তখন বুকের ভেতরটা যেন এক অচেনা শূন্যতায় মুচড়ে উঠল। অবশেষে জীবনের একটা বড়, চঞ্চল আর রঙিন অধ্যায় শেষ হলো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই, বিদায়ী শিক্ষার্থীদের কোলাহলমুখর করিডোরের এক শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে নীরার হাত থেকে শেষ চিঠিটা এসে পৌঁছাল রবিনের হাতে। নীরা যখন চিঠিটা বাড়িয়ে দিচ্ছিল, ওর চোখে ছিল এক অদ্ভুত বিদায়ের বিষাদ, ঠোঁটের কোণে ম্লান একটুখানি মায়াভরা হাসি। রবিন তখনো জানত না, এই সামান্য কাগজের টুকরোটি শুধু একটা চিঠি নয়—এ তাদের ভালোবাসার এক নতুন অগ্নিপরীক্ষার অলিখিত দলিল।
    নিরালা এক জায়গায় গিয়ে, চারপাশের শোরগোল থেকে নিজেকে আড়াল করে কাঁপা কাঁপা হাতে রবিন ভাঁজ খুলল। চিঠিটা খুলতেই হালকা গোলাপী আভার একটা রেইন্ট্রি গাছের ফুল আলতো করে এসে পড়ল রবিনের হাতের তালুতে। চিঠির প্রতিটি ভাঁজে শৈলীর হাতের চেনা ও প্রিয় সুবাস, আর প্রতিটি লাইনের অক্ষরে অক্ষরে মিশে আছে এক বুক আকুলতা আর গভীর ভালোবাসা। চিঠির ভাষায় যেমন ছিল,
    ________________________________________
    “আমার প্রিয় রবিন,
    ________________________________________
    আমাদের পরীক্ষা আজকে শেষ হলো। খাতার পাতায় শেষ কলমের আঁচড়টা কেটে যখন উঠে দাঁড়ালাম, বুকটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠেছিল। পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হয়েছে, আমার জন্য একটু মন থেকে দোয়া কোরো, কেমন?
    শোনো রবিন, বুকটা ফেটে যাচ্ছে এটা বলতে গিয়ে যে, নীরার সাথে আমার আর প্রতিদিন দেখা হবে না। আমাদের এতদিনের চেনা, সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগের উপায়টা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নীরা এখন আর আমাদের এই গোপন চাতক পাখি হয়ে থাকতে পারছে না। ওর বাড়িতে বিয়ের জোর কথাবার্তা চলছে, আজ শুনলাম বিয়েটা নাকি মোটামুটি ফাইনালও হয়ে গেছে। ওর জন্য যেমন মনটা ভীষণ খারাপ, তেমনি বুকটা কেঁপে উঠছে আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। নীরা চলে গেলে আমি কার হাত ধরে তোমার কথা বলব? কার বুকে মুখ গুঁজে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলব বলো?
    এখন আমাদের যা করতে হবে, সেটাকে আমাদের দুজনের হৃদয়ের মাঝখানের এক ধরনের ‘অলিখিত চুক্তি’ বলতে পারো। এই চুক্তি ভাঙার অধিকার কিন্তু আমাদের কারও নেই। আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা বজায় রেখে দুজনেরই পড়াশোনায় খুব ভালো করতে হবে। তুমি কিন্তু নিজের বিন্দুমাত্র অবহেলা করবে না, খুব ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। অল্প কিছুদিন পরেই তোমার এইচ.এস.সি পরীক্ষা শুরু, মনে আছে তো? আমার ভালোবাসা যেন তোমার এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয় রবিন, কখনো দুর্বলতা নয়।
    পড়াশোনার সমান্তরালে আমাদের এই পবিত্র ভালোবাসাকে বুকে আগলে রেখে যদি আমরা পথ চলতে পারি, তবে আমাদের সম্পর্কের পরিপক্ক বয়স পর্যন্ত পৌঁছাতে পৃথিবীর কোনো শক্তি, কোনো দূরত্ব বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দুজনের ভালোবাসার পবিত্র দায়িত্ব আমাদের দুজনকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে। এই পরিপক্ক দায়িত্ববোধই পারে একদিন আমাদের একটা সুন্দর, নিটল ও সামাজিকভাবে স্বীকৃত ভালোবাসা উপহার দিতে। আর যদি আমরা কোনো কারণে হেরে যাই, তবে এই নিষ্ঠুর সমাজ হাসাহাসি করবে, সবাই আমাদের পবিত্র অনুভূতি নিয়ে মজা নেবে। আমি মরে গেলেও সেই অপমান সইতে পারব না রবিন।
    মনে রেখো, এই পত্রের উত্তর পেতে তোমার যত দেরি হবে, তুমি কিন্তু ওপারে থাকা আমাকে তত বেশি কাঁদাবে। প্রতিটি সেকেন্ড আমার কাছে তখন একেকটি যুগের মতো কাটবে। এখন নীরাকে যেহেতু সবসময় পাচ্ছি না, তাই মন খারাপ করে বসে থেকো না। একটু চেষ্টা করে দেখো ‘রিসা’-কে আমাদের এই ভালোবাসার নতুন মাধ্যম হিসেবে ম্যানেজ করা যায় কিনা। আমি মাঝে মাঝে আমাদের পুরনো বাড়ি যাওয়ার কথা বলে রিসাদের বাড়ির পাশ দিয়েই হেঁটে যাই। তুমি যদি রিসাকে রাজি করাতে পারো, তবে ওর কাছ থেকে তোমার চিঠিটা লুকিয়ে নিজের মুঠোয় পুরে নিতে আমার খুব সুবিধা হবে।
    চিঠির সাথে একটি রেইন্ট্রি গাছের ফুল দিলাম তোমায়। গাছতলায় কুড়িয়ে পাওয়া ফুলটার মিস্টি মিস্টি ঘ্রাণটা বেশ ভালোই লাগছে আমার, তোমার ভাল লাগবে কিনা জানিও পরে। এই ফুলের স্পর্শ যেমন নরম, আমিও ঠিক এভাবেই প্রতিদিন তোমায় ছুঁয়ে থাকি আমার মনের এবং চিন্তার গভীর নরম অংশ থেকে। তুমি আফটার সেভের পর তোমার মুখাবয়বে এই ফুলের স্পর্শটা একটু বুলিয়ে নিও, কেমন? মনে কোরো আমিই তোমায় ছুঁয়ে দিলাম…
    উত্তরের চাতক হয়ে পথ চেয়ে রইলাম। খুব ভালো থেকো আমার রবিন।
    ________________________________________
    ইতি— তোমার হৃদয়ের, তোমার ভালোবাসার শৈলী”
    ________________________________________

    চিঠিটা পড়া শেষ করে রবিন একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলল। সে হাতের তালুতে রাখা নরম রেইন্ট্রি ফুলটা নাকের কাছে ধরল। অদ্ভুত এক বুনো মিষ্টি সুবাস তার স্নায়ুতে মিশে গেল। এরপর সে পরম আবেশে চোখ বুজে চিঠির পাতায় শৈলীর হাতের স্পর্শের সেই চেনা ঘ্রাণটা নেওয়ার চেষ্টা করল। মনে হলো, শৈলী যেন ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, তার নিঃশ্বাস এসে পড়ছে রবিনের মুখে। আলতো করে ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে চিঠি আর ফুলটা ফোল্ড করে সে তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি—বাম পাশের বুক পকেটে রেখে দিল। যেখানে তার হৃদস্পন্দন প্রতি মুহূর্তে শৈলীর নামের সাথে তাল মিলিয়ে চলে।

    নীরার চলে যাওয়াটা রবিনের বুকে একটা বড় ধাক্কা দিয়ে গেল, তৈরি করল এক গভীর শূন্যতা। রবিন মনে মনে নীরার প্রতি এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা বোধ করল। এই নীরাই তো ছিল তাদের ছায়াসঙ্গী, দুই হৃদয়ের অঘোষিত দূত। রবিন পরবর্তীতে জানতে পেরেছিল, নীরা শুধু চিঠিই আনা-নেওয়া করেনি, বরং শৈলীর একাকীত্বের দিনগুলোতে তাকে সবসময় আগলে রেখে সঙ্গ দিয়েছে। এমনকি রবিন আর শৈলীর অবুঝ মনের কত শত অভিমান, রাগ-গোসসার মাঝে নীরা নিজেই শৈলীর কাছে গিয়ে রবিনের হয়ে বারবার ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে, আলতো হাতে জোড়া লাগিয়েছে তাদের মান-অভিমানের সুতো। সেই নিঃস্বার্থ মেয়েটার এভাবে হুট করে পর হয়ে যাওয়াটা মেনে নেওয়া সত্যিই বড্ড কঠিন।

    তবে নীরার এই চলে যাওয়ার বেদনার মাঝেই শৈলীর এই পরিণত, ভালোবাসায় মোড়ানো চিঠিটা রবিনের চোখের সামনে এক নতুন আশার আলো জ্বেলে দিল। চিঠির পাতায় ছড়ানো প্রতিটি কথায় সে পরম বিস্ময়ে ও ভালোলাগায় উপলব্ধি করল, তাদের কৈশোরের সেই চপল, লুকোচুরি প্রেমটা আজ সময়ের হাত ধরে এক দায়িত্বশীল ও পরিপক্ক গভীর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। শৈলী এখন আর শুধু এক চঞ্চল প্রেমিকা নয়, সে এক দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গিনী—যে রবিনকে আগলে রাখার মন্ত্র শিখে গেছে।

    রবিন জানত, সামনের দিনগুলো ভীষণ কঠিন। পড়াশোনার কঠিন চাপ, সমাজের হাজারো চোখরাঙানি আর প্রিয়তমার থেকে দূরে থাকার একাকীত্বের এক দীর্ঘ লড়াই। কিন্তু আজ তার বুকে আর কোনো ভয় নেই, কোনো সংশয় নেই। বুক পকেটে পরম যত্নে রাখা শৈলীর সেই ভালোবাসার পরশমণি আর রেইন্ট্রি ফুলের মৃদু সুবাস, আর মনের ভেতর প্রিয়তমাকে আজীবন নিজের করে জয় করার তীব্র জেদ নিয়ে সে এক নতুন, সুন্দর এবং আলোয় ভরা ভবিষ্যতের দিকে চোখ মেলল। যে ভবিষ্যতে শুধু তারা দুজন থাকবে, আর থাকবে এক পৃথিবী পবিত্র ও নিটোল ভালোবাসা।

    গল্পের পর্ব চলমান থাকবে…

    3
    3 Comments
    • “নীরার চলে যাওয়াটা রবিনের বুকে একটা বড় ধাক্কা দিয়ে গেল, তৈরি করল এক গভীর শূন্যতা। রবিন মনে মনে নীরার প্রতি এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা বোধ করল। “

    • ‘ভালোবাসা যেন এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয়, দুর্বলতা নয়’—এই জেনারেশনের জন্য ভালোবাসার জন্য অবশ্য পাঠ হওয়া দরকার।

      • ‘অলিখিত চুক্তি’ বলতে পারো।
        -এই চুক্তি ভাঙার অধিকার কিন্তু আমাদের কারও নেই। আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা বজায় রেখে দুজনেরই পড়াশোনায় খুব ভালো করতে হবে। তুমি কিন্তু নিজের বিন্দুমাত্র অবহেলা করবে না, খুব ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। অল্প কিছুদিন পরেই তোমার এইচ.এস.সি পরীক্ষা শুরু, মনে আছে তো? আমার ভালোবাসা যেন তোমার এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয় রবিন, কখনো দুর্বলতা নয়।”

Skip to toolbar