-
প্রসংগ – কবি ও কবিতা
———————————
“সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”। সমস্যা হল সকলেই কবি হতে চায়। কেন চায়? কবিতা লেখা খুব সহজ তাই? অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য? নাকি বাংগালী মাত্রই কবি? আর, সকলেই যদি কবি হয়ে যায় তাহলে কবিতার পাঠক কে হবেন? সমালোচক কে হবেন? নানা প্রশ্ন, নানা জিজ্ঞাসা। উত্তর জানা নেই কারো। থাকুক। আমি নিজের কথাটুকু বলি। সকলেই কবি নয়। নির্ঘাৎ। আজকের বাংগালী সমাজে মূলতঃ দুই শ্রেণীর মানুষ রয়েছে কবিতাকে ঘিরে। এক শ্রেণীর মানুষ কবিতা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। নিজেদের অজ্ঞতার কারনে এরা কবিতা পড়েন না, কবিতা শোনেন না, এবং নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে গিয়ে এরা কবিতার দুর্বোধ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আর করেন অহেতুক সমালোচনা। আরেক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যারা কবিতা পড়েন এবং লেখেন। এর ভেতরে আবার এক শ্রেনীর মানুষ ভালোভাবে কোনোকিছু না বুঝেই কবিতা পড়েন এবং লেখেন। আর অতি ক্ষুদ্র একটি শ্রেণীর মানুষ আছে যারা কবিতা পড়া এবং লেখার কাজটি করেন ভালোভাবে বুঝে শুনে। শেষের এই ক্ষুদ্র শ্রেণী ব্যতীত আর কেউই কবি হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা সম্পন্ন নয়। কেনো নয়? সেকথাই বলা যাক। প্রথম ভাগের মানুষ যারা কবিতা পছন্দই করেন না, তাদের নিয়ে কিছু বলার নেই। কি বলব? যদিও এদের ভেতরেও কেউ কেউ মাঝে মাঝে কবি হয়ে যেতে চান। দ্বিতীয় ভাগের প্রথম শ্রেণির মানুষ, যারা না বুঝেই কবিতা পড়েন এবং লেখেন, সর্বনাশের কাজটি করেন এরাই। ইনারা জানেন না যে – পদ্য, ছড়া এবং কবিতা এক জিনিস নয়। বিশেষ করে আধুনিক কবিতা। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত আর অক্ষরবৃত্ত চিনে নিলেই কবিতা হয়ে যায় না। এতে অংক কষা হতে পারে, কবিতা নয়। এর ভেতরে আবার অনেকেই মনে করেন অন্তমিল দেয়াই হল কবিতার মূল মুন্সিয়ানা। আর তাই আজকাল আমরা দেখতে পাচ্ছি ভুরি ভুরি নবীন কবি আমের সংগে জাম, আমির সংগে তুমি মিলিয়ে কবিতা লিখে ভরিয়ে ফেলছেন আর দুঃখ করে বেড়াচ্ছেন কেনো তাদের স্বীকৃতি মিলছে না। এদের সংগে আছেন আধুনিক গদ্য কবিতা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ আর উদাসীন একটি শ্রেণী। কি বলব !
প্রথমতঃ আজকের দিনে একজন কবি ও কবিতার পাঠককে ভালো করে জানতে হবে কবিতার বিবর্তন এবং আবেগ সম্পর্কে। বিশেষ করে ষাটের দশকের কবিতা আন্দোলন সম্পর্কে। যে সময় আবির্ভাব হয়েছিল হাংরি, স্যাড ও এংরি জেনারেশনের। যে আন্দোলনের ম্যানুফেষ্টোতে বলা হয়েছিল কবিতার রয়েছে নিজস্ব স্বাধীনতা, প্রবাহমানতা। কবিতা কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণীর কাছে দাসখত দিয়ে তাদের গোলাম হয়ে যায়নি। কবিতার প্রকাশভংগিতে কারো প্রেস্ক্রিপশন গ্রহনযোগ্য নয়। এমনকি যতিচিহ্ন ব্যবহারেও থাকতে হবে কবিতার স্বাধীনতা। তাছাড়া বাক্যগঠনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পদ্য লেখা যেতে পারে, কবিতা নয়। একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। আমি ভাত খাই। এটি একটি বাক্য, ঠিক আছে, এটি দিয়ে পদ্যও হতে পারে, কিন্তু কবিতা নয়। কবিতায় দ্যোতনা থাকতে হবে, আবেগ থাকতে হবে, আরো থাকতে হবে বাক্যতত্ত্বকে ভেংগে দেয়ার প্রক্রিয়া। সেটা কেমন? আমি ভাত খাই, এই বাক্যটি দিয়েই উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন বলা হল, ভাত আমাকে খায়। বাক্য গঠন প্রক্রিয়ায় এটি একটি ভুল বাক্য। কিন্তু কবিতা নির্মানে, এটিই সঠিক। দীর্ঘ আলোচনায় যেতে চাইছি না এখন। একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আপাতত শেষ করব। একজন কবিকে মনে রাখতে হবে কেন তিনি কবিতা লিখছেন। শত শত বছর ধরে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, একজন কবি কেন আবার তা বলতে যাবেন? লিখতে যাবেন? একজন কবির দায় কোথায়? এক্ষেত্রে পার্সি ও উর্দু কবি মির্জা গালিব কে স্মরণ করছি। গালিব কেন শায়েরি বলেন (সে সময় কবিতা বলা হত, আজকাল লেখা হয়) এর উত্তরে বলেছিলেন – শায়েরি বলার জন্য আমি যখন উঠে দাড়াই, শব্দেরা তখন আমার পায়ের কাছে এসে করজোড় মিনতি করে বলে, গালিব, তুমি আমাদেরকে নতুন কিছু অর্থ দান কর। সেইসব বহু ব্যবহারে ক্লান্ত, চর্চিত, জীর্ণ, ক্লীষ্ট শব্দমালা, বেচে থাকার জন্য নিজেদের নতুন অর্থ খোঁজে তারা। একজন কবির প্রধানতম কাজ শব্দের এই নতুন অর্থ প্রদান করা। যিনি তা করতে পারবেন, তিনিই কবি।
অনেক কথা বলার বাকি রইল। হয়তো পরে বলব, যদি মনে পড়ে। সেই কথাটি বলেই আপাতত শেষ করছি – সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি….4 Comments
Friends
Hafizur Rahman shakil
@shakilahamed72gmail-com
Mirza A.parvez
@mirzaa-parvez
মোঃ রাকিমুন ইসলাম রাকিব
@rakimunislam
Ritwick chowdhury NAYAN
@ritwickchowdhurynayan
রহমান শিবলু
@anisurtsc1970gmail-com
Johur Munim
@johurmunim
মোঃ মেহেদী হাসান মুন্না
@mehedihasanmunna
Rahat Islam
@rahatislam
Shruti Radhe
@shrutiradhe


কবিতা কী, কবি কে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো নেই। তবে এমন প্রশ্ন তোলার মধ্যেই সাহিত্যচর্চার প্রাণ নিহিত।