-
অতৃপ্ত ভালবাসা- সাব্বির আহমেদ সেন্টু
নাদিম শহরের ব্যস্ততম তরুণ ব্যবসায়ীদের একজন। ইট-পাথরের ধূসর জীবন থেকে মুক্তি পেতে এবং ব্যবসায়িক একটি কাজে সে পাড়ি জমিয়েছিল চট্রগ্রামের পাহাড়ী এক জনপদে। নির্জন এক পাহাড়ি ডাকবাংলোতে তার থাকার ব্যবস্থা। চারদিকে ঘন সবুজের সমারোহ আর মেঘেদের লুকোচুরি। বেশ কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর এক বিকেলে বাংলোর বাগানে হাঁটতে হাঁটতে নাদিম থমকে দাঁড়াল।
তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক তরুণী। নাদিম অনেক আধুনিক মেয়ে দেখেছে, কিন্তু এমন সুশ্রী মুখ সে আগে দেখেনি। গায়ের রঙ যেন কাঁচা সোনার মতো ঝলমল করছে, আর চেহারার মধ্যে এক অদ্ভুত আভিজাত্য। নাদিমের মনে হলো, কোনো নিপুণ শিল্পী বুঝি যত্ন করে এই প্রতিমা গড়েছেন। মুগ্ধতা এতটাই ছিল যে, নাদিম অবচেতন মনেই মেয়েটির পিছু নিল।
এভাবে কয়েকদিন চলল। নাদিম যেন এক মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে। একদিন বনের পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তরুণীটি হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছনে তাকিয়ে ধীর কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, “আপনি আমাকে কয়েকদিন ধরে অনুসরণ করছেন কেন?”
নাদিম প্রথমে একটু ব্যবাচেকা খেলেও পরক্ষণেই সামলে নিল। সে মিথ্যে বলতে পারল না। অকপটে স্বীকার করল, “আসলে আপনার রূপ আর ব্যক্তিত্ব আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে, আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে।”
নাদিমের সাহসিকতা আর সততা মেয়েটিকে মুগ্ধ করল। শুরু হলো পরিচয়, তারপর নিয়মিত দেখা হওয়া। মেয়েটির নাম অরণি। নাদিম এমনকি অরণির পাহাড়ী বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গেও পরিচিত হলো। তাদের আতিথেয়তায় নাদিম বিমোহিত। তাদের সম্পর্কটা খুব দ্রুত গভীর থেকে গভীরে পৌঁছাতে শুরু করল।
নাদিমের ফোনে তখন বারবার ঢাকা থেকে কল আসছে। তার বাবা তার এক বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে নাদিমের বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন। বাড়িতে ফেরার তাগিদ। কিন্তু নাদিমের মন পড়ে আছে এই পাহাড়ে, অরণির কাছে। সে বুঝতে পারছে না কী করে বাবা-মাকে এই ভিনজাতের পাহাড়ী মেয়ের কথা বলবে।
অবশেষে ঢাকায় ফেরার সময় হলো। বিদায়বেলায় নাদিম অরণির হাত ধরে বলল, “আমি গিয়েই বাবা-মাকে ম্যানেজ করব। তারপর তোমাকে নিতে আসব। তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে?”
অরণি শান্ত চোখে নাদিমের দিকে তাকাল। তার চোখে এক বিষাদমাখা বিশ্বাস। সে বলল, “আমি আপনার অপেক্ষাতেই থাকব। বিশ্বাস হারালে কিন্তু আমি হারিয়ে যাব।”ঢাকায় ফিরে নাদিম অস্থির হয়ে পড়ল। তার বাবা বন্ধুর কাছে দেয়া কথা ভাঙ্গতে নারাজ। নাদিমের এই অস্থিরতা দেখে তার ছোটবোন এগিয়ে এল। নাদিম সব খুলে বলল তাকে। ছোটবোন মায়ের কানে কথাটি তুলল। মা যখন বাবার কাছে প্রস্তাবটি নিয়ে গেলেন, বাবা প্রথমে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। কিন্তু নাদিমের মা ছিলেন অনড়। তিনি স্বামীকে বোঝালেন, “নাদিম কখনো আমাদের কথা অমান্য করেনি। ও এখন প্রাপ্তবয়স্ক। বিয়ের মতো একটা বড় বিষয়ে ওর সম্মতি নেওয়া আমাদের দরকার ছিল। ছেলেটা যখন একটা মেয়েকে পছন্দই করেছে, তখন একবার গিয়ে দেখতে তো দোষ নেই।”
মায়ের যুক্তি আর ভালোবাসার কাছে বাবা হার মানলেন। নাদিম উচ্ছ্বসিত হয়ে অরণিকে ফোন করে সব জানাল। ঠিক হলো, আগামী এক মাসের মধ্যেই তাদের বিয়ে হবে। নাদিম ও তার পরিবার রওনা দিল সেই সুদূর পাহাড়ী এলাকার উদ্দেশ্যে।
সকাল ১০টায় রওনা দিয়ে বিকেল ৪টায় তারা সেই ডাকবাংলোতে পৌঁছালেন। নাদিমের ভেতরটা খুশিতে কাঁপছে। ওইদিন সন্ধ্যায় সে অরণিকে বারবার ফোন দিল, কিন্তু ফোনটি বন্ধ। অথচ পৌঁছানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কথা হয়েছে। নাদিম ভাবল হয়তো নেটওয়ার্কের সমস্যা। সে তো বাড়ি চেনে, কাল সকালেই সবাইকে নিয়ে সেখানে গিয়ে উঠবে।
পরদিন সকাল ১১টা। নাদিম তার বাবা-মাকে নিয়ে সেই লোকেশনে পৌঁছাল। গাড়ি থেকে নামতেই নাদিম পাথরের মতো জমে গেল। এ কোন জায়গা? অরণিদের সেই কাঠের বাড়িটি কোথায়? পুরো এলাকাটি এক নিবিড় বাগানের মতো, ঘন বড় বড় গাছ লাগানো। নাদিম পাগলের মতো এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। বাবা-মা বারবার জিজ্ঞেস করছেন, “নাদিম, এটাই কি সেই জায়গা?” নাদিম নিশ্চিত ছিল এটাই সেই জায়গা, কিন্তু সেখানে এখন কোনো বাড়ি বা প্রাণের চিহ্ন নেই।
নাদিম এলাকার কয়েকজনকে অরণি আর তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করল। কেউ চিনতে পারল না। অবশেষে এক শতায়ু বৃদ্ধের কাছে গিয়ে তাদের নাম বলতেই বৃদ্ধের চোখ কপালে উঠল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “তারা তো এখন এখানে থাকে না। তারা থাকে ওই দূরে পাহাড়ের ঢালে, নাদিম বৃদ্ধটিকে প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধ তাদের নিয়ে যান কবরস্থানের দিকে সেইদিকে নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখান এখানেই তারা শুয়ে আছেন। বৃদ্ধের কথা শুনে নাদিম আর তার বাবা-মা চমকে উঠলেন। “কবরস্থান মানে?” নাদিম চিৎকার করে উঠল।
বৃদ্ধ ধীর গলায় বললেন, “বাবা, তুমি যাদের কথা বলছ, তারা তো ১০০ বছর আগেই মারা গেছেন। নাদিম আবারো বৃদ্ধকে প্রশ্ন করলো কি বলেন, বৃদ্ধ তাকে বললো তাহলে শোন, তুমি যেই মেয়েটির কথা বলছো আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে সেই মেয়েটি শহরের এক ছেলেকে ভালোবেসেছিল। ছেলেটি তাকে কথা দিয়েছিল ঢাকায় গিয়ে তার বাবা-মাকে ম্যানেজ করে এসে ধুমধাম করে তাকে বিয়ে করবে। সেই ছেলেটি একদিন এই বাংলোতে এসেছিল ঠিকই কিন্তু অন্য এক নারীকে নিয়ে এই বাংলোতে ফুর্তি করতে এসেছিল। সেই খবর শুনে মেয়েটি অভিমানে আত্মহত্যা করে। তার শোকে কয়েক বছর পর তার বাবা-মা’ও মারা যান।”বৃদ্ধ আরও বললেন, “মাঝে মাঝে অনেক পর্যটক এলে মেয়েটি নাকি তাদের সামনে দেখা দেয়। হয়তো সে আজও সেই বিশ্বাসী ভালোবাসাকে খুঁজে বেড়ায়।”
নাদিম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা-সবই কি তবে এক ভৌতিক মায়া? সে যাকে ছুঁয়েছিল, যার বাড়িতে বসে চা খেয়েছিল, সে কি তবে এক শতাব্দী আগের কোনো অতৃপ্ত আত্মা?
এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। নাদিম এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সংসারী মানুষ। তার হাসিখুশি সন্তান আর স্ত্রী আছে। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে কিংবা পাহাড়ের মেঘের কথা মনে পড়ে, তখন সেই ‘অদৃশ্য ভালোবাসা’র স্মৃতি তাকে উদাস করে দেয়। সে আজও উত্তর খুঁজে পায় না—সেদিন অরণি যা দিয়েছিল, তা কি শুধুই মায়া ছিল, নাকি এক অমর প্রেমের এক টুকরো অনুভূতি?
লেখক:
সম্পাদক দৈনিক বিজয় ও
সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘ধ্রুব’
০১৯১১৮২১৩৪৩।5 Comments-
-
Gm Rohman, পাহাড়ি পরিবেশের পটভূমিতে এই মায়াবী আখ্যানটি পড়ার সময় আমি যেন নিজেই সেই মেঘে ঢাকা বাংলোয় হারিয়ে গিয়েছিলাম, বিশেষ করে অরণির সঙ্গে নাদিমের শেষ কথোপকথনটি বেশ আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী ছিল। আপনি চাইলে এই রহস্যময় পরিনতির আগে অরণির ছায়াঘেরা উপস্থিতি বা পাহাড়ের নীরবতাকে আরও কিছুটা বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে পারেন। আপনার লেখনী সত্যিই চমৎকার, ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক সুন্দর কাজ আপনার কাছ থেকে পাওয়ার প্রতীক্ষায় রইলাম।
-
Friends
Najir Hossain
@najirhossain
A i Bangla
@aibangla
Muntasir Maruf
@muntasirmaruf
Md. Afzal Hossain Afzal
@md-afzalhossainafzal
khusbuislamic shop
@khusbuislamicshop
faiza adila
@faizaadila
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
অভিমানী মন
@ovimanimon

গল্পটি আশা করি সবার কাছে ভাল লাগবে।