Profile Photo

আনিস কবিরOffline

  • aniskabir
  • Profile picture of আনিস কবির

    আনিস কবির

    • 1 month, 4 weeks ago

    প্রসঙ্গ – ভাষার ভিন্নতা
    —————————————–
    ভাষার ভিন্নতা নিয়ে বলার আগে দু’টি কথা বলে নিতে চাই। ১) আমি কোনো ভাষাবিষয়ক একাডেমিয়ান নই ২) আমি কাউকে জ্ঞান দেয়ার কোনো চেষ্টা করছি না। এই দু’টি কথা বলার মূল কারণ কেউ যেন আমাকে ভুল না বোঝে। কথা হল ভাষার ভিন্নতা নিয়ে আমি তাহলে কি বলব? আমি শুধু ভাষার ভিন্নতা বিষয়ক আমার অভিজ্ঞতা আর কিছু পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বলব। তার সাথে হয়তো কিছু প্রসঙ্গ আসতে পারে, যেটা নিতান্তই প্রয়োজনে। এই যেমন, ভাষার ভিন্নতা সম্পর্কে কথা বলার আগে আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে ভাষা মানে কি? কিংবা ভাষা কখন ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
    মানুষের যোগাযোগের সহজাত মাধ্যম বা বাহনই হল ভাষা। ভাষার সংজ্ঞায়ন করতে হলে, যে সংজ্ঞাটি সবার প্রথমে মাথায় আসে; তা হল, মানুষের বাকযন্ত্র থেকে উৎপন্ন এবং ভাবপ্রকাশে সক্ষম অর্থবোধক ধ্বনিকে বলা যায় ভাষা। তবে ভাষা শুধুমাত্র মৌখিক কোন বিষয় নয়, অঙ্গভঙ্গিও ভাষা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, ভাষা হল অঙ্গভঙ্গি, মৌখিক শব্দ বা লিখিত শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগের একটি প্রতীকী মাধ্যম, যা কিনা অর্থ প্রকাশে সক্ষম। যে কোনো স্বীকৃত ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- নিজস্ব বর্ণমালা থাকবে, উচ্চারণ রীতি থাকবে, আরো থাকবে বানান রীতি। তবে ভাষা প্রবাহমান নদীর মতো, দেশ কাল সময়ভেদে ভাষার পরিবর্তন, পরিমার্জন ঘটে।
    মূল বিষয়ে আসি। ভাষার ভিন্নতা। ভাষার ভিন্নতা আসলে কি? নির্দিষ্ট একটি ভাষার সাথে অন্য একটি ভাষার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য? হ্যাঁ, সেটা ঠিক, তবে আমি এ বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহী নই। এটা একেবারেই ফর্মাল বা স্ট্রাকচার্‌ড আলোচনা। আমি বরং একটি নির্দিষ্ট ভাষার ভেতরকার ভিন্নতা নিয়েই আলোচনা করতে চাই। সেটা কেমন? A language difference is a natural variation in how a person speaks. It reflects their regional, cultural, social, or linguistic background rather than a medical or developmental problem. This includes speaking a different native tongue, using a regional accent or dialect, or learning a second language. বাংলা ভাষার কথাই ধরা যাক। বাংলার সাধু বা লিখিত যে ভাষায় আমরা পড়াশোনা করি, বাস্তবে খুব কম সংখ্যক মানুষই সে ভাষায় কথা বলি। আমরা কথা বলি কথ্য ভাষায়, চলতি ভাষায়, আঞ্চলিক ভাষায়। কিন্তু আমাদের এই ডেফিনিশনেও ভুল আছে। শুরুতেই বলেছি একটি ভাষাকে ভাষা হতে হলে তিনটি আবশ্যিক বৈশিষ্ট থাকতে হয়। বর্ণমালা, উচ্চারণ, বানান। এই যে আমরা বলি কথ্য ভাষা, ঢাকাইয়া ভাষা, নোয়াখাইল্যা ভাষা, সিলটি ভাষা, এগুলো কি আসলে ভাষা? যদিও একসময় চট্টগ্রাম বা সিলেটের ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বিস্মৃত ইতিহাস। তাহলে এগুলোকে আমরা কেন ভাষা বলি? আসলে এই বলাটাও একধরনের কথ্য ভাষা। মানে বলতে বলতে চালু হয়ে গেছে। সঠিক তাহলে কি? আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে আমি মনে করি এগুলো বাংলা মূল ভাষার আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট। এই আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট কিন্তু পৃথিবীর সব ভাষারই রয়েছে। আমরা বুঝি না বলেই হয়তোবা ধরতে পারি না। ধরা যাক ইংরেজি ভাষার কথা। ইংরেজি ব্যকরণ শিখে, ভাল করে ইংরেজি রপ্ত করতে করতেই আমাদের জীবন শেষ হয়ে যায়, আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট সম্পর্কে জানব কখন, বুঝব কিভাবে? তবে আমরা যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করি, তখন সেই ভূখণ্ডের এক বা একাধিক ভাষা ও এর আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট সম্পর্কে জানাটা খুবই দরকারি। ভাষার ভিন্নতা বা আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট সম্পর্কে জানা থাকলে সেটা আমাদেরকে আরো অনেক বেশি মানুষের সাথে সহজ যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। যেমন ধরা যাক, আপনি ঢাকা শহরে বসবাস করা প্রমিত বাংলায় কথা বলা একজন মানুষ, হঠাত কাজের প্রয়োজনে গিয়ে হাজির হলেন চট্টগ্রামে। শহরে নয়, একেবারে চট্টগ্রামের কোনো এক অজ পাড়াগায়। আপনার একটি ঠিকানা জানা প্রয়োজন। একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই এই ঠিকানাটা কোথায়? ভদ্রলোক জবাব দিলেন “সোজা গেইশ্যে উয়াইর গুরি পাঁচহউ গজ তুন আগোত।“ বুঝলেন? না বুঝলে কি করবেন? তিনি বলেছেন- সোজা গিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে পাঁচশ গজ সামনে এই জায়গা। তিনি যদি বরিশালের হতেন, তাহলে বলতেন- “সোজা হেইয়া গ্যায়া ডান হর ঘুইরা পাঁচ শত গজ সামনে য্যাহেন।” আঞ্চলিক ভাষা বা ডায়ালেক্ট শুনতে অনেক সময় ফানি মনে হলেও জরুরী প্রয়োজনে এই ডায়ালেক্টই আপনাকে রক্ষা করতে পারে। সিলেট শহরে এক সন্ধ্যার পিক টাইমে আমি কিছুতেই একটি রিক্সা ভাড়া করতে পারছিলাম না। যাকেই জিজ্ঞেস করি সেই বলে যাবে না। এতোটা দুরত্বে যে হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। শেষে কোনোরকমে একটা টুকটুক ভাড়া করে ফিরতে পেরেছিলাম। শুধু এটুকু যদি বলতে পারতাম “বুলাই দিমু”, তাহলেই হয়ে যেতো। মানে- চিন্তা কোরো না, পুষিয়ে দেব। আহ্‌। আমার এক বন্ধু একবার এক সরকারি কাজে নোয়াখালি গিয়েছিল। কাজ শেষে অফিসের বড় কর্তা তাকে তার নিজ বাড়িতে চারটে ডাল ভাত খাওয়ানোর কথা বলে সাথে করে নিয়ে গেলেন জোর করে। বাড়িতে গিয়ে এটা ওটা বলার পর কাউকে ডেকে তাড়া দিলেন দ্রুত একটা রাতা জবাই দেয়ার জন্য। আমার বন্ধুটি জানতো না নোয়াখালির ডায়ালেক্ট, সে ভয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থির। বুঝতে পারছিল না তাকে কি খাওয়ানো হবে। কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছে না যে “রাতা” জিনিসটি কি?
    বাংলাদেশ নামক এই ছোট্ট ভূখণ্ডে এক বাংলার আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট নিয়ে আমরা যে রকম স্ট্রাগল করি, ভেবে দেখুন সারা পৃথিবীর শতশত ভাষা আর অজস্র আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট নিয়ে আমাদেরকে যদি চিন্তা করতে হতো, কি অবস্থা দাঁড়াত? আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল দেশগুলির বিভিন্ন স্টেট্‌স বা রাজ্যগুলোর ইংরেজি চলন, উচ্চারণ, প্রয়োগ ভিন ভিন্ন হয়। এমনকি একই স্টেট্‌সের শহর ও গ্রামের মধ্যেও ভাষাগত ভিন্নতা দেখা যায়। তারচাইতে বেশি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো সব দেশেই একেবারে নতুন এবং অপ্রচলিত কিছু শব্দ বা বাক্য ব্যবহৃত হয়। টিনএজার বা রক ব্যান্ডগুলি যার উদ্ভাবক। এই যেমন বাংলায় এখন চলছে- মামা, প্যারা, জোশ কিংবা ফাটাফাটি। ব্রিটিশরা তাদের ঐতিহ্যগত ইংরেজি চল, উচ্চারণ বা বানানরীতি ফলো করতে পছন্দ করে, আমেরিকানরা তেমনি পছন্দ করে ইংরেজিকে ভাংতে। উচ্চারণ, বানান কিংবা প্রয়োগ ভেঙ্গে ফেলাই যেন আমেরিকানদের নেশা। ক্যালিফোর্নিয়া শহরতলি থেকে একবার এক আমেরিকান প্যাসেঞ্জার এক বাঙ্গালী ট্যাক্সি ড্রাইভারের গাড়িতে উঠে একটা ঠিকানা দিয়ে বলল নর্থ কালি। বেচারা আমেরিকায় আসা নতুন বাঙ্গালি, ঠিকমতো ইংরেজি বলতে পারে না, নর্থ কালি চিনবে কি কারে? জিজ্ঞেস করতেও ভয় পাচ্ছে। কি একটা অবস্থা! আমেরিকার কিছু কমন ইংরেজি যা নবাগত অনেকের কাছেই নতুন বা অপরিচিত- যেমনঃ Elevator এলিভেটর- লিফট, Alligator এলিগেটর- কুমির, Gas গ্যাস- তেল/ফুয়েল, Trash ট্র্যাশ- আবর্জনা, Sneakers স্নিকার্স- স্পোর্টস সু, Y’all ইয়াল- তোমারা সবাই, Homie হোমি- ভাল বন্ধু, Nigga নিগা- কালো মানুষ, ইত্যাদি। প্রথম প্রথম যখন অস্ট্রেলিয়ার গিয়েছি, অল্প বয়সী বাঙ্গালি ছেলেপুলে দেখি খুব খুশি। আমাকে বলল, ভাইয়া, অস্ট্রেলিয়ানরা খুব ভাল, আমাদেরকে বলে মাইট। আমি জিজ্ঞেস করি মাইট মানে কি? তারা বলে মাইট মানে বন্ধু। আমি বলি আচ্ছা ভাল। কিছুদিন পর দেখি দুই ছোটভাইয়ের মধ্যে বিষম ঝগড়া। একজন বলে মাইট, আরেকজন বলে মেট। মাইট বলে কিছু নাই রে ব্যাটা মুর্খ। আমার কাছে আসল শালিস নিয়ে। আমি বললাম শান্তি শান্তি, ঝগড়া করার কিছু নেই। ইংরেজি Met শব্দটি এরা এমনভাবে উচ্চারণ করে যেটা শুনতে মনে হয় মাইট। আসলে এটা ইংরেজি Met ই। অস্ট্রেলিয়ার কিছু কমন ইংরেজি যা নবাগত অনেকের কাছেই নতুন বা অপরিচিত- যেমনঃ Brekkie ব্রেকি- ব্রেকফাস্ট, Servo সার্ভো- প্যাট্রল পাম্প, Dunny ডানি- টয়লেট, Esky এসকি- আইস বক্স, Bogan বোগান- নোংরা কেউ, Garbo গার্বো- আবর্জনা পরিষ্কার করে যারা, Cuppa কুপ্পা- এক কাপ চা বা কফি, Bloke ব্লোক- পুরুষ, Sheila শীলা- মহিলা, ইত্যাদি। আরেক ছোটভাইয়ের গল্প বলি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় সে শুনতে পায় “রেকেন” শব্দটি, কিন্তু মানে বুঝতে পারে না। অনেকেই তাকে যখন প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইউ রেকেন? সে তখন হা হু করতে থাকে, জবাব দিতে পারে না। কারণ, জানে না কি উত্তর দেবে। একদিন আমাকে এসে ধরল, ভাইয়া এর মানে কি? আমি তো বুঝি না। কি বিব্রতকর অবস্থা দেখেন!! আমি বললাম ইংরেজি Recognize কে এরা সংক্ষেপে Reckon “রেকেন” বলে, মানে তারা তোমার মতামত, বা ধারনা বা অনুমান সম্পর্কে জানতে চায়। আহ্‌, হাফ ছেড়ে যেন বাঁচল সে। শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার ভিন্নতা নিয়ে গবেষণা করলেই এক জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব। ব্রিটিশ ইংরেজি, আমেরিকান ইংরেজি, অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজি, ইউরোপিয়ান ইংরেজি, লাতিন ইংরেজির সাথে সাথে ভারত পর্যন্ত এক ভিন্ন ইংরেজি তৈরি করে বসে আছে। ভিন্ন ইংরেজি বলছি এই কারণে যে ভারতের অনেক অঞ্চলের মানুষ ইংরেজি শেখে বই পড়ে। মানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইংরেজি উচ্চারণ ও ব্যবহারিক প্রয়োগ না জেনেই এরা ইংরেজি রপ্ত করে শুধুমাত্র বই পড়ে। আর তাই আমরা দেখি স্কুলে বাচ্চাদেরকে পড়ানো হচ্ছে Knowledge এর উচ্চারণ “নলেডগে”, Dangerous “ডাঙ্গারস”, Nature “নাটুরে্‌”, Future “ফুটুরে” Google “গুলুগুলু”। (ভারতের প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রামাণিক চিত্র)
    সব ধরণের ইংরেজিরই আছে শুদ্ধ বা লিখিত রূপ, এরপর আঞ্চলিক, ভৌগোলিক, গোষ্ঠীগত, অরিজিনগত পার্থক্য। এছাড়া আছে বানান ভিন্নতা, উচ্চারণ ভিন্নতা, এমনকি ব্যকরণগত ভিন্নতা। পৃথিবীর সমস্ত ভাষার সমস্ত ভিন্নতা একজন মানুষের পক্ষে জেনে নেওয়া সম্ভব নয়, তবে যে ভাষায় আমরা কথা বলি বা যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, সেই ভাষার ভিন্নতা সম্পর্কে যথাসম্ভব ধারণা রাখা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের বিশেষ যোগ্যতার পরিচায়ক হতে পারে।

    If language were liquid
    It would be rushing in
    Instead here we are
    In a silence more eloquent
    Than any word could ever be

    These words are too solid
    They don’t move fast enough
    To catch the blur in the brain
    That flies by and is gone
    And in gone

    And is gone, Gone
    Gone, gone
    And is gone

    Language — Suzanne Vega

    2
    3 Comments
    • চমৎকার নন-ফিকশন ধরণের লেখা। সাবলীলতা আর আন্তরিকতার কারণে পড়তে ভালো লাগল বেশ। শুভেচ্ছা নিবেন।

    • আনিস কবির, ভাষার বিচিত্র রূপ ও আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণগুলো পড়ে সত্যিই দারুণ লাগল। বিশেষ করে “ভাষা প্রবাহমান নদীর মতো, দেশ কাল সময়ভেদে ভাষার পরিবর্তন, পরিমার্জন ঘটে”—আপনার এই লাইনটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।

    • আপনার লেখাটি পড়ে ভাষার বিচিত্র রূপ ও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার এক চমৎকার সমন্বয় খুঁজে পেলাম, যা পাঠকদের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে আগ্রহী করবে। এমন জীবনঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভাষার জটিলতাকে সহজভাবে উপস্থাপন করার এই চর্চাটি আপনি নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারেন।

Skip to toolbar