-
তোমাকে_ভালোবাসা_নিষেধ
লেখিকাঃLittle_Miss_Danger
পর্ব — ০১
সকালটা বেশ শান্ত ছিল।
বগুড়ার জালেশ্বরীতলার ব্যস্ততা অবশ্য সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেছে। রাস্তার নিচে গাড়ির শব্দ, দোকান খোলার ব্যস্ততা, মানুষের আনাগোনা—সব মিলিয়ে চারপাশে প্রতিদিনের মতোই কোলাহল।
কিন্তু দশতলার ওই apartment-টার ভেতরে তখন অন্যরকম একটা পরিবেশ।
ডাইনিং টেবিলের একপাশে বসে আধীরা বই খুলে রেখেছিল। সামনে Chemistry-এর একটা chapter পড়া থাকলেও তার মনটা অবশ্য বইয়ের পাতায় খুব একটা ছিল না।
বারবার কলমটা আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে আবার একই লাইন পড়ছিল সে।
পাশ থেকে মেঘ সেটা বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর বিরক্ত হয়ে বলল,
— “কী হয়েছে তোর? একটা লাইন এতক্ষণ ধরে পড়ছিস কেন?”
আধীরা চোখ না তুলেই বলল,
— “পড়ছি।”
— “দেখেই তো বুঝছি।”
মেঘ একটু ঝুঁকে আধীরার বইয়ের দিকে তাকাল।
— “একটা কাজ কর, বইটা বন্ধ করে দে। তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে Chemistry তোকে পড়ছে, তুই Chemistry পড়ছিস না।”
আধীরা এবার বইটা বন্ধ করে বিরক্ত চোখে তাকাল।
— “সকাল সকাল শুরু করিস না তো।”
সামনের চেয়ারে বসে থাকা আবির এতক্ষণ চুপচাপ নাশতা করছিল। কথাটা শুনে হেসে ফেলল।
— “মেঘ, ওকে ছেড়ে দে। Final exam সামনে। মাথা এমনিতেই গরম।”
আধীরা সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
— “দেখেছিস? আবির ভাইয়াটা অন্তত আমার কথা বোঝে।”
আবির ভ্রু তুলে বলল,
— “বুঝি বলেই বলছি—আজ কলেজ থেকে ফিরে সরাসরি পড়তে বসবি।”
আধীরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “উফফ! তোমরাও বাবার মতো কথা বলো।”
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে রাজীব বেরিয়ে এলেন।
— “আমার মতো কথা বললে সমস্যা কী?”
তিনজনই একসঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল।
রাজীবের হাতে একটা ফাইল। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
আধীরা সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাসি এনে বলল,
— “কিছু না বাবা।”
রাজীব মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে চেয়ার টেনে বসলেন।
— “তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?”
— “ভালো।”
— “ভালো মানে?”
আধীরা একটু থেমে বলল,
— “ভালোই তো।”
রাজীব মেয়ের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর হেসে মাথা নাড়লেন।
— “তোর এই ‘ভালোই তো’ কথাটার মানে আমি বুঝি।”
আধীরা হেসে ফেলল।
রান্নাঘর থেকে প্রিয়া তখন নাশতা নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
— “এই নাও, আগে সবাই খেয়ে নাও। তারপর যার যার কাজ।”
প্রিয়া খাবার সাজাতে সাজাতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আধীরা, আজ কলেজ থেকে কখন ফিরবি?”
— “7 টার মধ্যে।”
— “সোজা বাড়ি আসবি কিন্তু।”
আধীরা অবাক হয়ে তাকাল।
— “কেন?”
— “এমনিই। তোকে একটা কথা বলব।”
— “কী কথা?”
প্রিয়া মুচকি হেসে বললেন,
— “আগে বাড়ি আয়। তারপর বলব।”
আধীরা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিন্তু তার কৌতূহলটা থেকেই গেল।
—
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে গেল।
আবির অফিসের জন্য বের হলো।
মেঘ নিজের ক্লাসের প্রস্তুতি নিতে চলে গেল।
আর আধীরা কলেজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পেছনে তাকাল।
প্রিয়া তখনও রান্নাঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
রাজীব নিজের ঘরে কিছু একটা খুঁজছিলেন।
আধীরা হেসে বলল,
— “বাবা, আমি গেলাম।”
ভেতর থেকে রাজীবের গলা এলো,
— “সাবধানে যাস।”
— “হুম।”
দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে গেল আধীরা।
জালেশ্বরীতলায় দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল আধীরা।
সময় তখন সকাল সাড়ে আটটা।
নয়টায় কলেজ। অর্থাৎ হাতে আর মাত্র আধঘণ্টা। তার ওপর ফাহমিদার এখনো কোনো দেখা নেই।
আর এক মিনিট দেরি হলে কলেজের গেট দিয়ে ঢুকতে দেবে না।
দেবেই বা কেন?
বগুড়ার অন্যতম নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি আজিজুল হক কলেজ। এখানে ভর্তি হওয়া বগুড়ার অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। নামী এই কলেজের নিয়মকানুনও বেশ কড়া। আধীরাও SSC-তে Golden A+ সহ ভালো ফলাফল করার পর নিজের যোগ্যতায় Science বিভাগে এখানে ভর্তি হয়েছে।
কিন্তু আজ সেই নিয়মকানুনের কথা মাথায় রেখেও তার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।
ফাহমিদা আসছে না কেন?
আধীরা অস্থির হয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। তারপর বিরক্তিতে নিজের নখ কামড়াতে শুরু করল।
ঠিক তখনই—
টুপ!
মাথায় একটা গুঁতো পড়ল।
আধীরা চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, সামনে ফাহমিদা দাঁড়িয়ে আছে। মুখে দুষ্টু হাসি।
ফাহমিদা হেসে বলল,
— “কী রে জ্বলন্ত মোমবাতি, আবার নখ খাচ্ছিস? Carnivorous নাকি?”
আধীরা সঙ্গে সঙ্গে হাতটা মুখ থেকে নামিয়ে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল।
— “দেখ, আমাকে জ্বলন্ত মোমবাতি বলবি না। ভালো হচ্ছে না কিন্তু!”
ফাহমিদা ভীষণ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
— “কেন বলব না?”
— “কারণ নামটা একদম বাজে!”
ফাহমিদা এবার আধীরার লাল চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— “বাজে? এই সুন্দর লাল চুল নিয়ে তোকে জ্বলন্ত মোমবাতি ছাড়া আর কী ডাকব বল?”
আধীরা চোখ ঘুরিয়ে বলল,
— “যা খুশি ডাক, শুধু ওই নামটা বাদ দে।”
ফাহমিদা শুনলই না।
আধীরার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চোখ ছোট করে বলল,
— “তার ওপর তোর ঠোঁটের কোণে ওই ছোট্ট তিলটা…”
একটু নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “উফ! প্রেমে পড়ার জন্য একদম পারফেক্ট! আমি যদি ছেলে হতাম, তো এতক্ষণে তোর প্রেমে পড়েই যেতাম।”
আধীরা এবার হেসে ফেলল।
— “তুই ছেলে হলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হতো।”
— “কী! আমি এতটাই খারাপ?”
— “তার থেকেও খারাপ।”
ফাহমিদা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “বাহ! এত সুন্দর একটা মেয়েকে এত attitude কে দিয়েছে?”
আধীরা কিছু বলার আগেই আবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
— “চল, আর দেরি করলে কিন্তু সত্যিই ঢুকতে দেবে না।”
ফাহমিদা ব্যাগটা কাঁধে তুলে হেসে বলল,
— “চল জ্বলন্ত মোমবাতি। আজ দেখি তোর আগুনে কলেজের gate গলে কি না!”
— “ফাহমিদা!”
দুজনের হাসির শব্দে সকালটা আরও একটু প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
তারপর তারা দ্রুত কলেজের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
রিকশাটা তখন বগুড়ার ব্যস্ত রাস্তায় যানজটের মধ্যে আটকে আছে।
চারপাশে গাড়ির হর্ন, রিকশার ঘণ্টি, মানুষের চিৎকার—সব মিলিয়ে একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থা। সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু গাড়ি আর গাড়ি।
আধীরা বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
আর মাত্র ষোলো মিনিট।
কিন্তু কলেজ এখনো অনেকটা দূরে। বড়গোলা পার হতেই যেন অর্ধেক সময় চলে যাবে।
আধীরা বিরক্তিতে ঠোঁট ফুলিয়ে আবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
— “আমি তোকে বলেছিলাম, ফাহমিদা! এত দেরি করে বের হলে এমনই হবে।”
পাশে বসা ফাহমিদা নির্বিকারভাবে রিকশার হাতল ধরে বসে ছিল।
— “আরে বাবা, আমি কি ইচ্ছে করে দেরি করেছি নাকি?”
আধীরা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
— “হ্যাঁ, তুই ইচ্ছে করেই করিস! প্রতিদিন একই কাণ্ড। আগে বলবি, ‘চল চল, আজ একদম সময়মতো পৌঁছে যাব।’ তারপর বের হওয়ার সময় তোর আর কোনো তাড়া থাকে না।”
ফাহমিদা হেসে বলল,
— “এত রাগ করছিস কেন? পৌঁছে যাব তো।”
— “কীভাবে পৌঁছাবি? উড়ে?”
আধীরা হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে বলল,
— “ষোলো মিনিট!”
তারপর সামনে বিশাল যানজটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
— “আর আমরা এখনো বড়গোলার কাছেই! আজকে যদি এক মিনিটের জন্যও গেট বন্ধ হয়ে যায়, আমি কিন্তু তোকে ছাড়ব না।”
ফাহমিদা এবার হেসে ফেলল।
— “তুই আগে কলেজে পৌঁছা, তারপর আমাকে যা ইচ্ছা করিস।”
— “তোর জন্যই যদি আজ আমাকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপমানিত হতে হয়, তাহলে কিন্তু সত্যিই তোকে—”
কথাটা শেষ করার আগেই সামনে থেকে একটা গাড়ির তীব্র হর্ন বেজে উঠল।
আধীরা চমকে উঠে রিকশাওয়ালার দিকে তাকাল।
— “চাচা, আর কতক্ষণ লাগবে?”
রিকশাওয়ালা অসহায় মুখে সামনে তাকিয়ে বললেন,
— “মা, জ্যাম না ছাড়লে আমি কী করুম কন?”
আধীরা হতাশ হয়ে সিটে ধপ করে বসে পড়ল।
— “আজকে আমার শেষ!”
ফাহমিদা এবার তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “জলন্ত মোমবাতি, এত রাগ করলে কিন্তু আরও লাল হয়ে যাবি।”
আধীরা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
চোখ দুটো সরু হয়ে গেল।
— “ফাহমিদা…”
— “হুম?”
— “আজকে তোর বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম।”
ফাহমিদা সঙ্গে সঙ্গে রিকশার অন্য পাশে সরে গিয়ে বলল,
— “চাচা, রিকশাটা একটু জোরে চালান! আমার বান্ধবী আমাকে খুন করবে!”
আধীরা রাগী মুখে বসে থাকলেও নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
ঘড়িতে সময় তখন ৮টা ৪৭ মিনিট।
আর মাত্র তেরো মিনিট পেরিয়ে গেছে।
এখন হাতে আছে মাত্র তিন মিনিট।
আধীরা আবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
— “আর মাত্র তিন মিনিট! ফাহমিদা, আমরা শেষ!”
ফাহমিদা সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আরে সামনে তো মহিলা কলেজটা পার হলেই আর একটু! তারপরই তো আজিজুলের গেট!”
আধীরা অধৈর্য হয়ে রিকশাওয়ালার দিকে তাকাল।
— “চাচা, একটু জোরে চালান না প্লিজ! আর দেরি হলে আমাদের ঢুকতে দেবে না!”
রিকশাওয়ালা মাথা নেড়ে বললেন,
— “চেষ্টা করতেছি মা।”
অটো-রিকশাটা এবার যতটা সম্ভব দ্রুত এগোতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ আগেও যে যানজটটাকে মনে হচ্ছিল শেষ হওয়ার নয়, সেটাই ধীরে ধীরে একটু ফাঁকা হতে লাগল।
আধীরা একবার সামনে তাকাচ্ছে, একবার ঘড়ির দিকে।
৮টা ৫৮ মিনিট।
দূর থেকেই আজিজুল হক কলেজের গেটটা দেখা গেল।
আধীরার চোখ বড় হয়ে গেল।
— “ওই যে! ওই যে কলেজ!”
ফাহমিদাও উঠে বসার মতো করে সামনে তাকাল।
— “হ্যাঁ! চলে এসেছি!”
অটোটা গেটের সামনে পৌঁছাতেই আধীরা ভাড়া দেওয়ার জন্য ব্যাগ থেকে টাকা বের করল।
ঠিক তখনই গেটের দায়িত্বে থাকা লোকজন গেট বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
আধীরা টাকা ফাহমিদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
— “তুই দে! আমি যাচ্ছি!”
— “কোথায় যাচ্ছিস?”
— “ভেতরে!”
কথা শেষ করেই আধীরা অটো থেকে নেমে দৌড় দিল।
— “এই! আধীরা, দাঁড়া!”
ফাহমিদাও তাড়াতাড়ি অটো থেকে নেমে তার পেছনে ছুটল।
গেট প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে।
আধীরা একবার পেছনে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
— “ফাহমিদা, দৌড়!”
— “দৌড়াচ্ছিই তো!”
দুজনেই প্রাণপণে ছুটতে ছুটতে গেটের কাছে পৌঁছে গেল।
গেট বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আধীরা ফাহমিদার হাত ধরে টেনে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ধাম!
তাদের ঠিক পেছনেই গেটটা বন্ধ হয়ে গেল।
দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
আধীরা বুকের ওপর হাত রেখে গভীর শ্বাস নিল।
— “উফফ… আর এক মিনিট হলে আজকে শেষ!”
ফাহমিদা হাঁপাতে হাঁপাতে আধীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “দেখলি? তোকে আজ Olympic runner বানিয়ে দিলাম!”
আধীরা হাঁপাতে হাঁপাতেই চোখ রাঙিয়ে বলল,
— “তোর জন্যই যদি প্রতিদিন এভাবে দৌড়াতে হয়, তোর জন্য কলেজই পালটাবো যা!।”
ফাহমিদা হেসে বলল,
— “মিথ্যা কথা। আমাকে ছাড়া তুই একদিনও টিকতে পারবি না।”
আধীরা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর দুজনেই আবার হেসে উঠল।
সকালের সেই ছোট্ট দৌড়ঝাঁপের মধ্য দিয়েই শুরু হলো আধীরার আরেকটা সাধারণ কলেজ-দিন।
আজিজুল হক কলেজের গেট পেরিয়ে আধীরা আর ফাহমিদা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দুজনেই সোজা কলেজের ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল।
আধীরার নিজের সেকশন B।
কিন্তু প্রতিদিনের মতো আজও সে নিজের সেকশনে না গিয়ে সোজা চলে গেল D section-এর দিকে।
কারণ ওর বেশিরভাগ close friend-ই D section-এ।
ফাহমিদা আধীরার পেছন পেছন যেতে যেতে বলল,
— “তোর নিজের section আছে, সেটা কি ভুলে গেছিস?”
আধীরা হেসে বলল,
— “জানি তো। কিন্তু আমার বন্ধুরা সব কোথায়?”
— “D section-এ।”
— “তাহলে আমিও D section-এ।”
ফাহমিদা মাথা নেড়ে বলল,
— “তুই একটা আস্ত ঝামেলা।”
আধীরা হেসে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ভেতরে তখন বেশ কোলাহল। কেউ গল্প করছে, কেউ বই খুলে বসেছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে assignment দেখছে।
আধীরা দরজার কাছ থেকেই একবার পুরো ক্লাসটা চোখ বুলিয়ে দেখল।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক জায়গায়।
সামনের দিকের একটা বেঞ্চে বসে আছে মুমতাহিনা।
তার পাশেই বসে সাবেরা আর মাইশা।
মুমতাহিনা আধীরাকে দেখেই হাত নাড়ল।
— “এই যে! অবশেষে মহারানীর আগমন!”
আধীরা সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,
— “চুপ কর! আজকে তোদের জন্যই এত দৌড়াতে হলো।”
মাইশা ভ্রু তুলে বলল,
— “আমাদের জন্য? নাকি তুই আবার দেরি করে বের হয়েছিলি?”
ফাহমিদা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— “ওর দোষ না। আমি দেরি করেছিলাম।”
আধীরা অবাক হয়ে ফাহমিদার দিকে তাকাল।
— “এই প্রথম জীবনে নিজের দোষ স্বীকার করলি?”
সাবেরা হেসে বলল,
— “আজ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠেছে মনে হচ্ছে।”
মুমতাহিনা হাত দিয়ে পাশের খালি জায়গাটা দেখিয়ে বলল,
— “আয়, এখানে বস।”
আধীরা ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ মাইশা আধীরার লাল চুলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— “এই লাল চুল নিয়ে আবার আজ কী কাণ্ড করতে যাচ্ছিস, জ্বলন্ত মোমবাতি?”
আধীরা থমকে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে চোখ সরু করে মাইশার দিকে তাকাল।
— “ফাহমিদা তোকে বলেছে, তাই না?”
ফাহমিদা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— “আমি কিছু বলিনি।”
মুমতাহিনা আর সাবেরা একসঙ্গে হেসে উঠল।
আধীরা বিরক্ত মুখে বলল,
— “তোরা সবাই মিলে আমাকে একদিন পাগল করে ছাড়বি।”
তারপরও নিজের হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না।
বন্ধুদের সঙ্গে বসতেই কয়েক মিনিট আগের কলেজে ঢোকার দৌড়ঝাঁপ, গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভুলে গেল আধীরা।
দিনটা এরপর আর কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভালোভাবেই কেটে গেল।
ক্লাস, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সব মিলিয়ে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল, আধীরা নিজেও টের পেল না।
সন্ধ্যার দিকে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরল সে।
সারাদিনের ক্লান্তিতে যেন শরীরের আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই। দরজা দিয়ে ঢুকেই ব্যাগটা একপাশে রেখে জুতো খুলে কোনো রকমে বসার ঘরের সোফার দিকে এগিয়ে গেল।
তারপর—
ধপাস!
সোফার ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল আধীরা।
— “উফফ… আজ আর নড়তে পারব না।”
চোখ দুটো বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে শুয়ে রইল সে।
সোফার ঠিক পাশেই একটা ছোট টেবিল।
সেই টেবিলের ওপর গোল হয়ে বসে আছে তাদের বাড়ির আদরের পার্সিয়ান বিড়াল—কোকো।
সাদা তুলতুলে লোম, গোল গোল চোখ আর মুখভর্তি রাজকীয় ভাব নিয়ে সে একদৃষ্টিতে আধীরার দিকে তাকিয়ে আছে।
আধীরা এক চোখ খুলে কোকোর দিকে তাকাল।
— “কী দেখছিস?”
কোকো কোনো উত্তর দিল না।
শুধু লেজটা ধীরে ধীরে নাড়ল।
আধীরা ক্লান্ত গলায় বলল,
— “তুই অন্তত আমাকে দেখে একটু সহানুভূতি দেখাতে পারিস।”
কোকো এবারও নির্বিকার।
আধীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চোখ বন্ধ করল।
— “তুই একটা স্বার্থপর বিড়াল…”
কোকো যেন কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে টেবিলের ওপর বসেই নিজের থাবা চাটতে লাগল।
আধীরা সেটা দেখে মৃদু হেসে ফেলল।
সারাদিনের ব্যস্ততার পর এই শান্ত বাড়িটা আর পাশে থাকা কোকো—মুহূর্তের জন্য যেন তার সমস্ত ক্লান্তি একটু কমিয়ে দিল।
সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার পড়তে বসে গেল আধীরা।
টেবিলের ওপর Biology-এর বই খোলা। কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তি থাকলেও পড়াশোনায় বসলে আধীরা বেশ মনোযোগী। এক অধ্যায় শেষ করে বইটা বন্ধ করতেই চোখ পড়ল ব্যাকরণের খাতায়।
খাতা খুলে পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শব্দে তার চোখ আটকে গেল—
“আমৃত্যু।”
শব্দটা দেখেই আধীরার মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
মুখে অজান্তেই মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
— “আমৃত্যু…”
শব্দটা কয়েকবার মনে মনে আওড়াতেই তার মনে পড়ে গেল সম্প্রতি পড়া সেই উপন্যাসের কথা। ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমান—সব মিলিয়ে গল্পটার কিছু লাইন তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
আধীরা বইয়ের ওপর হাত রেখে চেয়ারে হেলান দিল।
তারপর হঠাৎই গুনগুন করে গান ধরল।
চোখ দুটো যেন মুহূর্তেই অন্যরকম হয়ে উঠেছে—স্বপ্নে ডুবে থাকা, একেবারে রূপকথার রাজকন্যার মতো।
সে নিজের মনেই গাইতে লাগল—
“দৃষ্টিতে যেন সে রাসপুতিন
খুন হয়ে যাই আমি প্রতিদিন,
নাম জানি, জানি তার সবকিছু,
তবুও নিলাম আমি তার পিছু…”
গান গাইতে গাইতে আধীরা নিজেই মুচকি হাসল।
তারপর খাতার পাতায় আবার চোখ রাখল।
কিন্তু পড়ায় আর মন বসছে না।
একটা মাত্র শব্দ—
আমৃত্যু।
আর সেই একটা শব্দই তার কিশোরী মনের ভেতর কোথা থেকে যেন ভালোবাসার হাজারটা কল্পনা এনে হাজির করেছে।
আধীরা হঠাৎ নিজের গাল দুটো চেপে ধরল।
— “ছি ছি! কীসব ভাবছি আমি! প্রেম-ট্রেম চাই না বাবা!”
নিজের মাথায় নিজেই হালকা একটা টোকা দিয়ে আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর আবার মনে পড়ল মুমতাহিনার কথা।
— “মুমতাহিনা তো বলছিল, প্রেমে নাকি অনেক ঝামেলা…”
আধীরা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,
— “Boyfriend থাকলে সারাক্ষণ overprotective! এটা করো না, ওটা করো না, কোথায় যাচ্ছিস, কার সঙ্গে কথা বলছিস—উফ! মাথা খারাপ!”
কথাগুলো বলতে বলতে নিজেই আবার হেসে ফেলল।
তারপর একটু ভেবে বলল,
— “তবে রাজ ভাইয়া মানুষটা ভালো।”
মুমতাহিনার প্রেমিক রাজের কথা তার মনে পড়ল। দূর থেকেই বোঝা যায়, মুমতাহিনাকে সে বেশ care করে।
আধীরা কলমটা আঙুলের মাঝে ঘুরিয়ে বলল,
— “ও মুমতাহিনাকে নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করে ঠিকই… কিন্তু মানুষ হিসেবে ভালো।”
একটু থেমে নিজের খাতার দিকে তাকিয়ে আবার গম্ভীর মুখ করল।
— “কিন্তু আমার এসবের দরকার নেই। প্রেম-ট্রেম ছাড়াই আমি ভালো আছি।”
তারপর বইটা টেনে নিয়ে Biology-এর পরের অধ্যায় খুলে ফেলল।
দুই লাইন পড়েই আবার থেমে গেল।
— “উফ! প্রেমের কথা মাথায় ঢুকল কীভাবে আবার!”
নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে আধীরা এবার সত্যিই পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
Biology, ব্যাকরণ—সব পড়া শেষ করে অবশেষে বই-খাতা বন্ধ করল আধীরা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো।
মায়ের ঘরে যাওয়া যাক।
পড়াশোনার পর মাকে একটু জ্বালাতন না করলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়!
আধীরা চুপিচুপি উঠে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে গিয়েই দেখল, প্রিয়া আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে একমনে ওয়ার্ডরোব গোছাচ্ছেন।
আধীরা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মিষ্টি গলায় বলল,
— “মা…”
প্রিয়া ফিরে তাকিয়ে মেয়েকে দেখে হেসে ফেললেন।
— “কী হয়েছে?”
আধীরা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
— “কিছু হয়নি। তোমাকে একটু জ্বালাতে এলাম।”
প্রিয়া হেসে মাথা নাড়লেন।
— “তোর আর কোনো কাজ নেই?”
— “না। সব কাজ শেষ।”
— “পড়া শেষ করেছিস?”
— “হ্যাঁ।”
প্রিয়া অবাক হয়ে বললেন,
— “সত্যি?”
আধীরা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
— “আমি কিন্তু খুব ভালো মেয়ে।”
প্রিয়া হেসে বললেন,
— “সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
— “মা!”
মেয়ের মুখ দেখে প্রিয়া হেসে ফেললেন।
কথা বলতে বলতেই আধীরার চোখ ঘরের একপাশে রাখা একটা পুরোনো আলমারির ওপর গিয়ে পড়ল।
সেখানে একটা মোটা ফটো অ্যালবাম রাখা।
আধীরার চোখ চকচক করে উঠল।
— “মা, এটা কী?”
প্রিয়া কিছু বলার আগেই আধীরা অ্যালবামটা তুলে নিল।
— “পুরোনো ছবি?”
— “হ্যাঁ, কিন্তু ওগুলো এখন দেখার দরকার নেই।”
আধীরা ততক্ষণে অ্যালবাম খুলে ফেলেছে।
পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা ছবিতে তার আঙুল থেমে গেল।
ছবিটায়—
তিনজন তরুণ ছেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
তিনজনের মুখেই হাসি।
আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা মেয়ে।
আধীরা ভ্রু কুঁচকে ছবিটার দিকে ঝুঁকে গেল।
— “মা… এরা কারা?”
প্রিয়া হঠাৎ থেমে গেলেন।
কিন্তু আধীরা তখন ছবিটা আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করছে।
মাঝখানের ছেলেটাকে অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগছে।
আর ছোট্ট মেয়েটা—
কে সে?
আধীরা ছবিটা চোখের আরও কাছে তুলতেই—
পেছন থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
— “ওটা আমাকে দাও।”
আধীরা চমকে পিছনে তাকাল।
রাজীব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
তিনি আর কোনো কথা না বলে আধীরার হাত থেকে অ্যালবামটা নিয়ে নিলেন।
আধীরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “বাবা, কী হয়েছে? আমি তো শুধু ছবিটা দেখছিলাম।”
রাজীব অ্যালবামটা বন্ধ করে ফেললেন।
কণ্ঠটা এবারও শান্ত, কিন্তু তাতে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে আধীরা আর কিছু বলতে পারল না।
— “কিছু ছবি শুধু ছবি হয় না, আধীরা।”
এক মুহূর্ত থেমে তিনি অ্যালবামটা আলমারিতে তুলে রাখলেন।
— “ওগুলো পুরোনো কথা মনে করিয়ে দেয়।”
আধীরা চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
কেন যেন তার মনে হলো—
ছবিটায় এমন কিছু ছিল, যেটা তার বাবা কখনোই তাকে দেখতে দিতে চান না।
#চলিত…।3 Comments
Friends
Md. Polash Ahamad
@md-polashahamad
মো: আমিরবিন আনোয়ার
@writeramir
রেহনুমা তাসনীম
@tasneem-rahnumagmail-com
আমানত উল্লাহ মানিক
@mdamanatullahmanik
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
অভিমানী মন
@ovimanimon
Prithula Zaman
@prithula

নতুন একটা বাংলা গল্প শুরু করেছি 🥀
“তোমায় ভালোবাসা নিষেধ” 🖤
গল্পপ্রেমী হলে একবার Page-এ ঘুরে যেও। 📖✨