-
ডার্ক ম্যাটার কি অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল?
বিজ্ঞানীরা হয়তো প্রথমবারের মতো ডার্ক ম্যাটারের ঝলক দেখতে পেয়েছেন। ধারনা করা হয়, মহাবিশ্বকে একসঙ্গে ধরে রাখে এই রহস্যময় পদার্থ। গবেষকরা ভূগর্ভের গভীরে এমন একটি অস্বাভাবিক কণার মিথস্ক্রিয়া শনাক্ত করেছেন, যার ব্যাখ্যা দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তারা এমন একটি সংঘর্ষের সম্ভাব্য চিহ্ন দেখেছেন, যেখানে একটি সাধারণ পরমাণুর সঙ্গে বিজ্ঞানের কাছে অজানা একটি কণার সংঘর্ষ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তাহলে এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি সমাধানে সহায়তা করতে পারে- মহাবিশ্বের বড় একটি অংশ আসলে কী দিয়ে গঠিত, তা জানা যেতে পারে।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের ধারণা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে অনুসন্ধান চালিয়েও বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সরাসরি এর অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারেননি। ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার। তবে এটি আলো শোষণ, প্রতিফলন বা নির্গত করে না। ফলে এটি কার্যত অদৃশ্য।
এবার ছয়টি দেশের ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর একটি আন্তর্জাতিক দল এমন কিছু শনাক্ত করেছে, যা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। গবেষকরা বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ডার্ক ম্যাটার শনাক্তকারী যন্ত্র লাক্স-জেপেলিন (এলজেড) পরীক্ষার দুই বছরের তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটায় প্রায় এক মাইল পাথরের নিচে স্থাপিত বিশাল এই শনাক্তকারী যন্ত্রটিতে ১০ টন অতি বিশুদ্ধ তরল জেনন রয়েছে। ডার্ক ম্যাটারের কোনো কণা জেনন পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে যে অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হওয়ার কথা, সেটি ধরাই এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
উপরের পাথরের স্তর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে পরীক্ষাটিকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত শনাক্তকারী যন্ত্র ও অত্যাধুনিক কম্পিউটার ব্যবস্থা ব্যবহার করে সাধারণ পদার্থ থেকে সৃষ্ট সংকেতগুলো বাদ দেয়া হয়। কিন্তু গবেষকরা যখন তথ্য বিশ্লেষণ করেন, তখন প্রত্যাশিত পটভূমি সংকেতের মধ্যে একটি কণার মিথস্ক্রিয়া তাদের নজরে আসে, যা অন্যগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী ছিল। এটি সম্ভবত উইকলি ইন্টার্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিকল বা ডব্লিউআইএমপি-ডার্ক ম্যাটারের অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য বিষয়- থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের গবেষক এবং এই বিশ্লেষণের প্রধান লেখক ড. স্যাম এরিকসেন বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ পদার্থ গঠনকারী ডার্ক ম্যাটারকে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, এই বিশ্লেষণে তারা যা পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা ডার্ক ম্যাটারকে একটি কণা হিসেবে বোঝার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিপুল বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার পর এমন একটি ফলাফল পাওয়া অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি মাত্র একটি ঘটনা। ডার্ক ম্যাটার আবিষ্কৃত হয়েছে বলে ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এই ফলাফলের পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য ২.৬ সিগমা। অর্থাৎ প্রত্যাশিত স্বাভাবিক পটভূমি প্রক্রিয়া থেকে এতটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ০.৫ শতাংশ। সাধারণত কোনো আবিষ্কার নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করার আগে পদার্থবিজ্ঞানীরা ৫ সিগমা মাত্রার পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য চান। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিক গেইটস্কেল বলেন, যে অঞ্চলে ডার্ক ম্যাটারের সংকেত পাওয়ার প্রত্যাশা করা হয় এবং যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পটভূমি সংকেত খুবই কম, ঠিক সেখানেই এই ঘটনাটি তথ্যের মধ্যে দেখতে পাওয়া অত্যন্ত আগ্রহোদ্দীপক। তিনি বলেন, মাত্র একটি ঘটনা নিয়ে আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যেতে চাই না। আমরা ডার্ক ম্যাটার দেখেছি বলে দাবি করছি না। তবে আমরা এমন কিছু আকর্ষণীয় বিষয় দেখেছি, যা বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই, যাতে তারা এটি নিয়ে মতামত দিতে পারেন।
গবেষকরা জানিয়েছেন, সাধারণ পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলো তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করেছেন। তবে এখনো এই অস্বাভাবিক ঘটনার কোনো সুস্পষ্ট কারণ তারা খুঁজে পাননি। ড. এরিকসেন জাপানে অনুষ্ঠিত ২০২৬ টেভি পার্টিকল অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। ফলাফলগুলো এখন অন্যান্য বিজ্ঞানীর পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং প্রকাশের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতেও জমা দেয়া হয়েছে।
ডার্ক ম্যাটার কী?
ডার্ক ম্যাটার একটি কাল্পনিক পদার্থ, যা মহাবিশ্বের মোট গঠনের আনুমানিক ২৭ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়। এই রহস্যময় পদার্থ অদৃশ্য, কারণ এটি আলো প্রতিফলিত করে না। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এটিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণও করতে পারেননি। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করেন পরিচিত পদার্থের ওপর এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে। সম্পূর্ণ অন্ধকার একটি ঘরে টর্চ জ্বালালে টর্চের আলো যেখানে পড়ে, কেবল সেখানেই আমরা কিছু দেখতে পাই। এর অর্থ এই নয় যে আলোর বাইরে ঘরটির কোনো অস্তিত্ব নেই। একইভাবে, বিজ্ঞানীরা জানেন ডার্ক ম্যাটার রয়েছে, কিন্তু এখনো তারা এটিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি। ধারণা করা হয়, ডার্ক ম্যাটারই মহাকর্ষীয় ‘আঠা’ হিসেবে কাজ করে গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে।
হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটারের বিপুল উপস্থিতি না থাকলে অনেক গ্যালাক্সি নিজেদের মহাকর্ষীয় কাঠামো ধরে রাখতে পারত না এবং ঘূর্ণনের সময় ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ পরিচিত পদার্থÑযেমন পরমাণু ও উপপরমাণবিক কণা-দিয়ে গঠিত।6 Comments
Friends
MI Shaikh
@mishaikh
সুমি আক্তার
@anisurrahman5976674gmail-com
Alvee Mallik
@alveemallik
মুহাম্মদ রফিক ইসলাম
@96d08550a60c8a43763fedc16dc97f46
Noyontara
@bablee
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
খাঁন মোঃ সুমন
@60faca207f945a8a409dbe1b2e47beb7
মুহিববুল্লাহ আল মামুন
@muhib
Rabi Bhowmik
@rabibhowmik



Mohammad Abul Hosein, মহাবিশ্বের এই রহস্যময় বিষয়টিকে আপনি যেভাবে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তা সত্যিই দারুণ। জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্যের এই চমৎকার বিশ্লেষণটি আমাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করতে সাহায্য করবে বলে মনে করি। আমাদের এই গ্রুপের অন্য সদস্যদের লেখাগুলোতেও আপনার উৎসাহব্যঞ্জক মতামত এবং ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে আপনি নিয়মিত যুক্ত থাকবেন বলে আশা করছি।