Profile Photo

রতন চন্দ্র রায়Offline

  • ratanchandraroy
  • ▫️ স্মৃতির বৈপরীত্য
    ✍️রতন চন্দ্র রায়

    বর্ষার শেষ বিকেলের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজছিল নীলিমা। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে যেন নিজের ভেতরেই অন্য এক জগত খুঁজে ফিরছিল। কিছুক্ষণ আগেই সে শহর থেকে ফিরে আসা এক পুরোনো পরিচিতের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছে—এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে একসময় তার গভীর আবেগের কিছু মুহূর্ত জড়িয়ে ছিল। তার উপস্থিতি নীলিমার মনে সাময়িক এক আলোড়নের সৃষ্টি করলেও গোসলখানা থেকে বের হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেল।

    চুলের জল গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল নীলিমা। অবাক করা বিষয় হলো, শরীরের ওপর ঝরে পড়া ঠান্ডা জলের প্রতিটি ফোঁটার সাথে সাথেই যেন তার মনের ভেতর থেকে একটু আগের সব স্মৃতি অলক্ষ্যে ধুয়েমুছে গেছে। কোনো গ্লানি নেই, নেই অতীতের প্রতি কোনো সূক্ষ্ম ব্যাকুলতা। সে এক নিমেষেই একদম নির্ভার, হালকা এবং নতুন এক মানুষ। “নারী গোসলের পর ভুলে যায় একটু আগে সে কার সঙ্গে ছিল”— এই প্রচলিত কথাটি যেন নীলিমার জীবনচরিত্রের এক গভীর সত্য হয়ে সামনে এলো। সে যেন প্রতি মুহূর্তেই নতুন করে জন্ম নেয়; পুরোনো স্মৃতি বা অনুভূতির বন্ধনে আটকে থাকা তার স্বভাব নয়।

    একই শহরের অন্য প্রান্তে, জীর্ণ এক পুরোনো ঘরের নিঃশব্দ বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছটফট করছিলেন প্রবীণ লেখক রহমান সাহেব। আয়ু শেষ হয়ে এসেছে, নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। চারপাশের ডাক্তার আর স্বজনদের উদ্বিগ্ন আনাগোনা তাকে আর স্পর্শ করছে না। তার ঘোলাটে ও ঝাপসা চোখ দুটি কেবল জানালার বাইরের ওই দূর অসীম আকাশের দিকে স্থির হয়ে আছে।

    রহমান সাহেবের মনে এখন আর দুনিয়ার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই, নেই মৃত্যুকে ঘিরে কোনো ভয় বা অনিশ্চয়তা। তার সমস্ত চেতনা ও স্মৃতির ক্যানভাস জুড়ে শুধুই ভেসে উঠছে তার জীবনের প্রথম ও একমাত্র ভালোবাসার সেই মায়াবী মুখটি—যে নারী তাকে বহুকাল আগে একাকী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যৌবনের সেই দিনগুলো থেকে জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত তিনি বহু পথ হেঁটেছেন, জীবনের কত লড়াইয়ে হেরে গেছেন, কিন্তু হৃদয়ের গহীন কোণ থেকে সেই একটি নাম কখনো মুছে ফেলতে পারেননি।

    “পুরুষ মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তার কথা ভাবে, যাকে সে ভালোবেসেছিল।” অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগের ঠিক আগের মুহূর্তে রহমান সাহেবের চোখ থেকে একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার জীর্ণ ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় অথচ পরম তৃপ্তির হাসি। সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে হৃদয়ে গভীরভাবে ধারণ করেই তিনি চিরতরে চোখ বুজলেন।

    একই শহরের দুটি ভিন্ন জীবনের এই বৈপরীত্যের মধ্যেই যেন প্রকাশ পেল মানব হৃদয়ের এক চিরন্তন গল্প—একদিকে নিমেষেই সবকিছু ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বাভাবিক ক্ষমতা, আর অন্যদিকে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্মৃতির আলো জ্বালিয়ে ভালোবাসাকে বয়ে বেড়ানোর অবুঝ ব্যাকুলতা।

    3
    6 Comments
    • স্মৃতি কারো কাছে সহজে ধুয়ে যায় কারো কাছে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জ্বলতে থাকে…..🤍🖤

    • লেখাটা পড়ে বেশ অদ্ভুত এক ঘোর কাজ করছে মনে। নারী আর পুরুষের মনস্তত্ত্বের এই বৈপরীত্য আপনি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। শেষ মুহূর্তের ওই অনুভূতির বর্ণনাটা পড়ে সত্যিই খুব আবেগপ্রবণ লাগছিল।

    • আপনার চমৎকার এই লেখনীতে স্মৃতির বিস্মৃতি ও স্থায়িত্বের যে বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই গভীর ও মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। চরিত্রগুলোর অনুভূতির এই ভিন্নতা ফুটিয়ে তোলার জন্য আপনি চাইলে কোনো একটি বিশেষ মুহূর্তের বর্ণনায় আরও কিছুটা আবেগ যোগ করতে পারেন, যা আপনার চমৎকার লেখার মানকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

    • মানুষ চলে যায় থেকে যায় মেমোরিস 😌

রতন চন্দ্র রায়

ইম্পোজিটর

রতন চন্দ্র রায় 

পেশা - সরকারি চাকরি

শখ- লেখা / কবিতা/ গল্প/ উপন্যাস

কর্মস্থল- বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস), তেজগাঁও, ঢাকা- ১২০৮

ঠিকানা- ৪১০ নবীনবাগ উত্তর গোড়ান,

  1. খিলগাঁও,  ঢাকা ১২১৯
Skip to toolbar