Profile Photo

A K Sarker ShaonOffline

  • aksarker
  • Profile picture of A K Sarker Shaon

    A K Sarker Shaon

    5 hours, 38 minutes ago

    বিশ্বব্যাপী কিশোরদের মেধা কি কমছে?
    এ কে সরকার শাওন

    হঠাৎ The Economist-এ একটি লেখা পড়ে আমি আঁতকে উঠলাম। শিরোনামটা এমন- “Are teenagers growing dimmer?” অর্থাৎ, কিশোরেরা কি ক্রমেই কম মেধাবী হয়ে উঠছে?

    সঙ্গে দেওয়া রেখাচিত্রটি আরও ভাবিয়ে তুলল। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে উন্নত বিশ্বের বহু দেশে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতার সূচক নিচের দিকে নামছে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল পড়ার দক্ষতার রেখাটি। সেটির পতন বেশ স্পষ্ট।
    প্রথমেই মনে হলো এটা এ কী করে সম্ভব?

    আজকের কিশোর-কিশোরীরা আমাদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তথ্যের নাগাল পায়। তাদের হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ডিজিটাল লাইব্রেরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতা ওল্টাতে হয় না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।

    তাহলে জ্ঞান এত সহজলভ্য হওয়ার পরও শেখার দক্ষতা কমছে কেন?
    কৌতূহল থেকেই আমি তথ্যটির মূল উৎস খুঁজতে শুরু করলাম। দেখলাম, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা OECD-এর সদ্য প্রকাশিত PISA 2025 ফলাফল। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের তথ্য সত্যিই চিন্তার।

    তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এই ফলাফল প্রমাণ করে না যে আজকের কিশোরেরা জন্মগতভাবে আগের প্রজন্মের চেয়ে কম বুদ্ধিমান হয়ে যাচ্ছে। PISA কোনো আইকিউ পরীক্ষা নয়। বরং এটি দেখতে চায়, একজন ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যা শিখেছে, তা কতটা বুঝতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যায় সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারে।

    PISA ও OECD কী?
    PISA-এর পূর্ণ নাম Programme for International Student Assessment। আর OECD-এর পূর্ণ নাম Organisation for Economic Co-operation and Development, বাংলায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা। এই OECD-ই PISA নামের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নটি পরিচালনা করে।

    ২০২৫ সালের PISA ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আয়োজন। ৯১টি দেশ ও অর্থনীতির ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছে। নমুনা হিসেবে নেওয়া এসব শিক্ষার্থী বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে মূলত বিজ্ঞান, গণিত ও পড়ার দক্ষতা যাচাই করা হয়। এবারের প্রধান বিষয় ছিল বিজ্ঞান। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ডিজিটাল জগতে শেখা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও মূল্যায়নের আওতায় এসেছে।

    PISA-এর বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু মুখস্থবিদ্যা যাচাই করে না। একটি লেখা পড়ে শিক্ষার্থী তার অর্থ বুঝতে পারছে কি না, তথ্য বিচার করতে পারছে কি না, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না কিংবা গণিত ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছে কি না- এসবের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর এখানেই উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়েছে।

    সংখ্যাগুলো কী বলছে?
    ২০২৫ সালে OECD দেশগুলোর গড় স্কোর হয়েছে বিজ্ঞানে ৪৮২, গণিতে ৪৬৩ এবং পড়ায় ৪৬১। OECD জানিয়েছে, PISA-তে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা তিনটি মূল বিষয়েই এটি OECD-এর সর্বনিম্ন গড় ফলাফল।
    এক দশকের ব্যবধানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

    ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে OECD দেশগুলোতে পড়ার গড় স্কোর ৪৮৯ থেকে ৪৬১-তে নেমেছে; পতন ২৮ পয়েন্ট। একই সময়ে গণিতে গড় স্কোর ৪৮৫ থেকে ৪৬৩-তে নেমেছে; পতন ২২ পয়েন্ট। বিজ্ঞানের পতন তুলনামূলক কম, ৪৮৯ থেকে ৪৮২।

    OECD-এর হিসাবে গণিতের ২২ পয়েন্ট পতনের মাত্রা এক বছরের কিছু বেশি শেখার অগ্রগতির সমতুল্য। পড়ার ক্ষেত্রে ২৮ পয়েন্টের পতন প্রায় দেড় বছরের শেখার অগ্রগতির সমান।

    আরও উদ্বেগজনক একটি সংখ্যা আছে। OECD দেশগুলোতে এখন প্রতি পাঁচজন ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর একজন বিজ্ঞান, গণিত ও পড়া; তিনটি বিষয়েই নিম্ন দক্ষতার পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৬ শতাংশ।

    সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে পড়ার দক্ষতা
    তিনটি বিষয়ের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে পড়ার দক্ষতার পতন।
    কারণ পড়া কোনো একটি বিষয়ের দক্ষতা নয়। এটি অন্য প্রায় সব ধরনের শিক্ষার দরজা।
    একটি গণিতের সমস্যা সমাধানের আগে প্রশ্নটি বুঝতে হয়। বিজ্ঞানের একটি জটিল ধারণা আয়ত্ত করতে হলে সেটি মন দিয়ে পড়তে হয়। ইতিহাস বুঝতে পড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে হলে দীর্ঘ গবেষণাপত্র পড়তে হয়। কর্মজীবনে প্রতিবেদন বুঝতেও পড়তে হয়।
    এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সত্য ও মিথ্যা তথ্যের পার্থক্য বুঝতেও প্রয়োজন পড়া, বোঝা এবং বিচার করার ক্ষমতা।

    ২০২২ থেকে ২০২৫; মাত্র তিন বছরেই OECD দেশগুলোতে পড়ার গড় ফলাফল আরও ১৪ পয়েন্ট কমেছে। OECD বলছে, PISA-এর দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে পড়ার ক্ষেত্রে এত বড় পতন আগে দেখা যায়নি।

    আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি কেড়েছে; ‘hasty reading’ বা তাড়াহুড়ো করে পড়া।
    অর্থাৎ শিক্ষার্থী লেখা পড়ছে ঠিকই, কিন্তু গভীরভাবে বুঝে পড়ার বদলে দ্রুত চোখ বুলিয়ে উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। OECD-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় এমন তাড়াহুড়ো করে পড়া শিক্ষার্থীর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
    কথাটি শুনে আমাদের দৈনন্দিন জীবনটার কথা মনে হয়।
    আমরাও কি এখন আগের মতো পড়ি?
    নাকি শিরোনাম পড়ি, কয়েক লাইন দেখি, দ্রুত স্ক্রল করি, তারপর পরের বিষয়ে চলে যাই?

    তাহলে কি করোনাই দায়ী?
    প্রথমে মনে হতে পারে, এর উত্তর খুব সহজ; করোনা মহামারি। মহামারির সময় দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব শিক্ষায় পড়েছে।
    কিন্তু PISA-এর দীর্ঘমেয়াদি রেখাটি দেখলে বোঝা যায়, গল্পটি এত সহজ নয়।

    অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের নিম্নমুখী প্রবণতা করোনার আগেই শুরু হয়েছিল। বিজ্ঞানের ফলাফল প্রায় ২০০৯ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে কমছিল। পড়ার ফলাফল সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল প্রায় ২০১২ সালের দিকে, তারপর থেকে সেটিও নিচের দিকে যেতে শুরু করে। গণিতের বড় পতন দেখা যায় ২০১৮ সালের পর।
    আর করোনা-পরবর্তী সময়েও সমস্যাটি থামেনি।
    ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিজ্ঞানের গড় ফলাফল মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও গণিতে আরও ৯ পয়েন্ট এবং পড়ায় ১৪ পয়েন্ট কমেছে।
    অর্থাৎ করোনার ধাক্কা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই পুরো গল্প নয়।

    স্মার্টফোন কি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে?
    এখানেই আসে প্রযুক্তির প্রশ্ন।
    আজকের একজন কিশোরের মনোযোগের জন্য যত কিছু প্রতিযোগিতা করছে, সম্ভবত মানব ইতিহাসে কোনো প্রজন্মকে এত কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি।

    স্মার্টফোনে একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টের পর আরেকটি। নোটিফিকেশন আসছে, বার্তা আসছে। গেম আছে, রিলস আছে, শর্ট ভিডিও আছে।

    এই পরিবেশে দশ মিনিটের একটি ভিডিওও কখনো দীর্ঘ মনে হয়। সেখানে একটি বই নিয়ে এক ঘণ্টা বসে থাকা আরও কঠিন।
    PISA 2025-তেও ডিজিটাল বিভ্রান্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। OECD দেশগুলোতে প্রতি চারজনের একজনের বেশি শিক্ষার্থী জানিয়েছে, বিজ্ঞানের অধিকাংশ বা প্রতিটি ক্লাসে সহপাঠীরা ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে বিভ্রান্ত হয়। এমন পরিবেশে থাকা শিক্ষার্থীদের ফলাফলও তুলনামূলক খারাপ।

    তবে এখানেও সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
    এই তথ্য থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে স্মার্টফোনই শিক্ষার অবনতির একমাত্র কারণ। একই সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষায় দলীয়করণ, পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পড়ার অভ্যাস এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সম্পৃক্ততা; সবকিছুই ভূমিকা রাখতে পারে।
    প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। সমস্যাটি প্রযুক্তির ব্যবহার।

    AI: শিক্ষক, সহযোগী নাকি শর্টকাট?
    এখন এই আলোচনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
    একজন শিক্ষার্থী আগে একটি রচনা লিখতে বসলে তাকে ভাবতে হতো। তথ্য খুঁজতে হতো। প্রথম বাক্যটি কী হবে, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হতো। লিখতে গিয়ে ভুল হতো। সেই ভুল কাটিয়ে আবার লিখতে হতো।
    এই কষ্টটুকুই আসলে শেখার একটি অংশ।
    এখন AI-কে নির্দেশ দিলে কয়েক সেকেন্ডে সুন্দর একটি রচনা পাওয়া সম্ভব।

    এটি অসাধারণ প্রযুক্তিগত অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তৈরি করে; শিক্ষার্থী যদি প্রতিবার চিন্তা করার কঠিন অংশটুকু যন্ত্রের হাতে তুলে দেয়, তাহলে তার নিজের চিন্তার ক্ষমতার অনুশীলন হবে কখন?

    PISA 2025-এ দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী লেখার কাজের খসড়া তৈরিতে AI ব্যবহার করেনি, তারা গড়ে AI ব্যবহারকারীদের তুলনায় বিজ্ঞানে ভালো করেছে। তবে একই প্রতিবেদনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক রয়েছে। নিয়মিত AI ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা AI-কে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং AI থেকে পাওয়া তথ্যের মান যাচাই করতে শেখানো হয়েছে, তাদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো ছিল।

    সুতরাং AI-কে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।
    বরং আমাদের শিখতে হবে; AI দিয়ে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, AI-কে দিয়ে কীভাবে চিন্তা করিয়ে নিতে হয় না।

    বইয়ের কাছে কি আবার ফিরতে হবে?
    আমার মনে হয়, উত্তরটি অনেকাংশে হ্যাঁ। তবে তার অর্থ প্রযুক্তি ছেড়ে আবার শুধু কাগজের যুগে ফিরে যাওয়া নয়। আমাদের ফিরতে হবে গভীরভাবে পড়ার অভ্যাসে।

    একটি দীর্ঘ লেখা পড়লে মস্তিষ্ককে আগের অনুচ্ছেদের তথ্য মনে রাখতে হয়। একটি যুক্তির সঙ্গে আরেকটি যুক্তি মেলাতে হয়। লেখকের বক্তব্য নিয়ে ভাবতে হয়। কোথাও দ্বিমত হলে নিজের যুক্তি তৈরি করতে হয়।
    এটি সময় নেয়।
    আর আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী আমাদের ক্রমাগত শেখাচ্ছে; সময় নিও না, দ্রুত পরেরটিতে চলে যাও।
    সম্ভবত এখানেই দ্বন্দ্ব।
    জ্ঞান অর্জনের জন্য গভীরতা প্রয়োজন, কিন্তু ডিজিটাল জৌলুশ আমাদের মনোযোগকে ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ করে ফেলতে চায়।

    আশার কথাও আছে
    PISA 2025-এর ফলাফল শুধু হতাশার নয়।
    সব দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে না। অংশগ্রহণকারী চীনা অঞ্চল ও সিঙ্গাপুর ২০২৫ সালে তিনটি মূল বিষয়েই সর্বোচ্চ ফলাফলকারী শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে। এস্তোনিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চাইনিজ তাইপে ও যুক্তরাজ্যও বিজ্ঞান, গণিত ও পড়া; তিন ক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে।

    কিছু দেশ আবার গত এক দশকে উন্নতিও করেছে। তার অর্থ, পতনটি অনিবার্য নয়।
    শিক্ষককে শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় বিষয়ে গভীরভাবে শেখানো, অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা, পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়া এবং প্রযুক্তিকে পরিমিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা; এসবের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব বলে OECD গুরুত্ব দিয়েছে।

    বাংলাদেশের জন্যও বার্তা আছে
    বাংলাদেশ OECD সদস্য নয় এবং এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ফলাফল হিসেবে দেখা যাবে না। কিন্তু যে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কথা এখানে বলা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমাদের সমাজেও দৃশ্যমান।

    আমাদের শিশুর হাতেও স্মার্টফোন পৌঁছেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, রিলস, গেম এবং এখন AI তাদের জীবনেও উপস্থিত।
    তাই আমাদেরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার।
    আমাদের সন্তান প্রতিদিন কতক্ষণ বই পড়ছে? শুধু পরীক্ষার বই নয়; কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, বিজ্ঞান কিংবা নিজের পছন্দের কোনো দীর্ঘ লেখা?
    সে কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে প্রথমে নিজে ভাবছে, নাকি সঙ্গে সঙ্গে গুগল বা AI-এর কাছে যাচ্ছে?
    সে কোনো তথ্য পেলে যাচাই করছে, নাকি প্রথম উত্তরটিকেই সত্য ধরে নিচ্ছে?
    স্কুলে আমরা কি শিক্ষার্থীদের শুধু সঠিক উত্তর শেখাচ্ছি, নাকি কেন উত্তরটি সঠিক, সেটিও ভাবতে শেখাচ্ছি?
    এ প্রশ্নগুলো এখন জরুরি।

    AI নিষিদ্ধ করে এর সমাধান হবে না। স্মার্টফোন কেড়ে নিয়েও স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রযুক্তির সঙ্গে বসবাস করেই নতুন প্রজন্মকে মনোযোগ, ধৈর্য, গভীর পাঠ এবং স্বাধীন চিন্তার অভ্যাস শেখাতে হবে।

    শেষ কথা
    তাহলে কিশোরেরা কি সত্যিই কম মেধাবী হয়ে যাচ্ছে? PISA-এর তথ্য দিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমার কাছে বিষয়টি অন্য রকম মনে হয়েছে।

    আমাদের শিশুরা সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া একটি প্রজন্ম। একই সঙ্গে তারা এমন একটি সময়েও বড় হচ্ছে, যখন তাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার আয়োজন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

    একসময় মানুষের বড় সমস্যা ছিল তথ্যের অভাব। আজকের সমস্যা হয়তো উল্টো; তথ্যের সমুদ্রে মনোযোগ ধরে রাখা।

    হাতে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জ্ঞান থাকার পরও যদি একটি দীর্ঘ লেখা মন দিয়ে পড়তে না পারি, একটি কঠিন সমস্যার সামনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ভাবতে না পারি কিংবা কোনো যন্ত্রের দেওয়া উত্তর নিজের বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করতে না পারি, তাহলে তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের জ্ঞানী করে তুলবে না।

    PISA 2025 তাই আমার কাছে কিশোরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়।
    বরং এটি আমাদের; অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

    আমরাই শিশুদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিয়েছি। এখন আমাদেরই তাদের শেখাতে হবে, কখন স্ক্রিনের দিকে তাকাতে হয় আর কখন স্ক্রিন বন্ধ করতে হয়। কখন AI-এর সাহায্য নিতে হয় আর কখন নিজের মাথা খাটাতে হয়। কখন দ্রুত উত্তর প্রয়োজন আর কখন একটি কঠিন প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘ সময় ভাবতে হয়। কারণ আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটি হয়তো সে নয়, যে সবচেয়ে দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করতে পারে।

    বরং সে, যে তথ্যের ভিড়ের মধ্যেও মনোযোগ দিয়ে পড়তে, গভীরভাবে বুঝতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে।

    তথ্যসূত্র:
    ১. OECD (2026), PISA 2025 Results (Volume I): Future-Ready Students, OECD Publishing, Paris।
    ২. OECD (2026), PISA 2025: Students’ Reading and Mathematics Performance Declined Sharply Across the OECD, 8 September 2026।
    ৩. OECD (2026), International Launch of PISA 2025, Remarks by OECD Secretary-General Mathias Cormann।

    1 Comment
    • এ কে সরকার শাওন, গভীর পর্যবেক্ষণে ভরা আপনার এই বিশ্লেষণধর্মী লেখাটি পড়ে দারুণ সমৃদ্ধ হলাম, বিশেষ করে ‘তথ্যের সমুদ্রে মনোযোগ ধরে রাখা’—আপনার এই অসামান্য উক্তিটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এক অনন্য উপলব্ধি, যা পড়ার সময় আমি নিজেও বেশ ভাবিত ছিলাম। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তথ্যনির্ভর ও গঠনমূলক এমন চিন্তাশীল লেখা নিয়মিত লিখে যাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক শুভকামনা জানাই।

এ কে সরকার শাওন

কবি ও সাহিত্যিক

কবি, গীতিকবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওন (দালিলিক নাম মোঃ আবদুল কাদের সরকার) ১৯৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরের সোনালী দিনগুলো ঝালকাঠিতে কাটানোর পর কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নাটোরে অবস্থান করেন এবং বর্তমানে ঢাকার উত্তরখানের নিভৃত আলয় ‘কবিকুঞ্জ শাওনাজ ভিলা’য় স্থায়ীভাবে বসবাস করে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাধনা করছেন।

ঝালকাঠি শহরের উদ্বোধন হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি এবং সেই বিদ্যালয়ে পাঠকালেই তাঁর ভেতর সৃষ্টিশীল মননের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে তাঁকে সাহিত্যের আঙিনায় সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। জীবনের পরতে পরতে তিনি জ্ঞানার্জনের স্পৃহাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন; অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্য, আইন ও ইনফরমেশন টেকনোলজির মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন দেশে ও বিদেশে। খাদ্য নিরাপত্তার উপর আইএফসি ও প্রান গ্রুপের যৌথভাবে প্রদেয় তিনটি অভিজ্ঞানপত্র রয়েছে তাঁর।

তাঁর কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও গৌরবোজ্জ্বল। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সুদীর্ঘ ১৮ বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি এয়ারম্যান ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (ATI) অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে টানা ১০ বছর সফল প্রশিক্ষক হিসেবে নতুনদের গড়ে তুলেছেন। বিমান বাহিনীর পাট চুকিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীতে প্রশাসনিক ও উচ্চ ব্যবস্থাপনা পদে কাজ করে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠিন পেশাগত জীবনের মাঝেও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে তিনি কখনো ভাঁটা পড়তে দেননি। তাঁর লেখনীতে রোমান্টিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে, যা পাঠক হৃদয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে।

সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর রয়েছে বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'কথা-কাব্য', 'নীরব কথোপকথন', 'আপন-ছায়া', কাব্যধর্মী উপন্যাস 'অতল জলে জলাঞ্জলি' এবং অটোফিকশন উপন্যাস 'শাওনাজ আইল্যান্ড' সুধী মহলে সমাদৃত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে কসমিক ফিকশন 'মস্তিষ্কে মহাকাশ' (ও এর ইংরেজি সংস্করণ 'Metacosm Of Mind'), উপন্যাস 'বাঁশফুল', ইংরেজি রোমান্টিক উপন্যাস 'Layla: The Modern Ruth', এবং 'চেয়ার ও চোর', 'প্রণয়-প্রলাপ', 'প্রলয়-প্রলাপ', 'সজনী', 'আলো-ছায়া', 'প্রান্তিক-প্রান্তরে', 'ঋতুরং', শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ 'বাঁকা চাঁদের হাসি', গল্পগ্রন্থ 'মেকাপ-বক্স', ও 'মোমের শেষ শিখা', ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ 'Songs of Insane' সহ বেশ কিছু গ্রন্থ। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে লিখছেন তাঁর ৮০ পর্বের বৃহৎ আত্মজীবনী 'আমার জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে'।

সাহিত্যের পাশাপাশি দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমেও তাঁর অবদান অনুস্বীকার্য। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে তাঁর রচিত জনপ্রিয় টেলিফিল্ম 'শুটিং', 'আদর্শ-লিপি' ও 'পরিবর্তন'। গান রচনায় তাঁর দক্ষতা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বেতারে এবং ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান সম্প্রচারের মাধ্যমে। শুধু লেখালেখিই নয়, সঙ্গীতচর্চায়ও তিনি শৌখিন শিল্পী হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এবং স্টারমেকার প্ল্যাটফর্মে বেশ উপরের সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। সাহিত্য ও শিল্পকলায় এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে তিনি কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা এক্সপ্রেস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।

ব্যক্তিজীবনে ১৯৯১ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক নাজমা আশেকীন শাওনের সাথে, যিনি ষাটের দশকের নন্দিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এ কে এম জহিরুল হক ইব্রাহিমের (চলচ্চিত্রে আশেক জহির) দ্বিতীয় কন্যা। এক সফল ও রত্নগর্ভা দাম্পত্যে তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে তিন রাজকন্যা, যাঁরা বর্তমানে নিজ মেধা ও যোগ্যতায় যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও ভারত সরকারের পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ (Full-funded Scholarship) নিয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন করছেন।

Skip to toolbar