Profile Photo

আবু তাহের রিপনOffline

  • abutaherripon
  • Profile picture of আবু তাহের রিপন

    পাড়ার লোকে আমাকে নিয়ে যা বলে, সবটাই সত্যি। আবার একটা কথাও সত্যি না।

    এই দুটো কথা একসাথে কীভাবে সত্যি হতে পারে, সেটা বোঝাতেই আজ কলম ধরলাম।

    রাত নয়টায় আমি একা বের হই ঘর থেকে, এটা সত্যি। কালো বোরকা বা ওড়না গায়ে জড়িয়ে অন্ধকার গলি দিয়ে হাঁটি, এটাও সত্যি। মাঝেমধ্যে ভোররাতে ফিরি, সেটাও কেউ মিথ্যা বলেনি।

    পাড়ার মুরুব্বিরা আমার নাম শুনলে মুখ ফিরিয়ে নেন। মহিলারা নিজেদের মেয়েদের সাবধান করেন, “ওই মেয়ের মতো হইস না যেন।”

    আমার নাম তাদের মুখে মুখে একটাই “চরিত্রহীন।”

    আমার স্বামী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে, একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে। তখন আমার বয়স তেইশ, কোলে একটা দুধের বাচ্চা। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো ছয় মাসের মধ্যেই – সম্পত্তির ভাগ নিয়ে ঝামেলা।

    তখন আমি একটা কাজ পেলাম শহরের একটা হাসপাতালে নাইট শিফটের নার্স হিসেবে। প্রথম যেদিন রাতের বেলা কালো ওড়না জড়িয়ে গলি দিয়ে হাঁটছিলাম, পাশের বাড়ির রহিমা খালা জানালা দিয়ে দেখে ফেললেন। পরদিন সকালেই পুরো পাড়া জেনে গেল, “ওই মেয়ে রাতে বাইরে যায়, নিশ্চয়ই কোনো নষ্টামি করে।”

    কে শুনবে, আমি হাসপাতালে ডিউটি করি? একজন বিধবা মেয়ে রাতে একা বের হয় – এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল একটা জীবনভর তকমা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য।

    আজ পাঁচ বছর পর, এই লেখাটা লিখছি একটা কারণে। কাল রাতে এমন কিছু ঘটেছে, যেটা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে – এই পাড়ায় “চরিত্র” শব্দটার আসল মানে কী।

    কাল রাতে ডিউটি চলাকালীন একটা ইমার্জেন্সি কেস এলো – বুকে ছু*রিকা*ঘাত, প্রচুর র*ক্ত*ক্ষরণ। আলোর নিচে আসতেই আমি চমকে উঠলাম। লোকটা আমাদের পাড়ার সবচেয়ে “সম্মানিত” মানুষ – মসজিদ কমিটির সভাপতি, হাজী সাহেব।

    আর রক্তাক্ত রোগীটা ছিল তার নিজের গাড়িচালকের কিশোরী মেয়ে।

    মেয়েটার নাম রূপা, বয়স ষোলো। হাজী সাহেবের ব্যক্তিগত গাড়িচালক মতিনের একমাত্র মেয়ে।

    “মেয়েটা কীভাবে আহত হলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    “সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে, নার্স।” তার গলার স্বরে একটা অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো ছিল। সিঁড়ি থেকে পড়ে বুকে এমন গভীর, ধারালো ক্ষত হয় না।

    মধ্যরাতে অপারেশন শেষ হলে রূপা স্থিতিশীল হলো। ভোররাতে জ্ঞান ফিরতেই সে ফিসফিস করে বলল, “তিনি… তিনি আমাকে…” তারপর আবার অচেতন হয়ে গেল।

    সকালে হাজী সাহেব আবার এলেন, আমাকে করিডোরে ডেকে বললেন, “নার্স, মেয়েটা সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে, এটাই যেন লেখা থাকে রিপোর্টে।” একটা খাম বের করলেন। “এটা তোমার কষ্টের জন্য।”

    আমি খামটা নিইনি। “আমি রিপোর্টে যা সত্যি, তাই লিখব, হাজী সাহেব।”

    তার চোখে হিংস্র ঝিলিক। “তুমি তো সেই মেয়ে, যাকে নিয়ে পাড়ায় সবাই কানাঘুষা করে। তোমার কথা আদালতে কে বিশ্বাস করবে, নার্স?”

    কথাটা সত্যি ছিল, বাস্তবতার হিসেবে। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই রাতেই – এবার চুপ থাকব না।

    সকালে আমি গেলাম মতিন সাহেবের কাছে। “আপনার মেয়ের সাথে যা হয়েছে, সেটা সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া না।”

    মতিন সাহেবের চোখ ছলছল করে উঠল। “আপা, আমি বিশ বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করি। যদি হাজী সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলি, আমার চাকরি যাবে, আমার তিনটা বাচ্চা না খেয়ে মরবে।”

    “আমিও গরিব, মতিন ভাই। আমিও বিধবা, আমার নামেও বদনাম। কিন্তু আজ যদি আমরা চুপ থাকি, আগামীকাল আরও মেয়েরা এই বাড়িতে একা থাকবে।”

    মতিন সাহেব ধীরে ধীরে বললেন, “রূপা আমাকে বলেছিল, কয়েক সপ্তাহ ধরে হাজী সাহেব তাকে ডাকতেন বাড়ির ভেতরের ঘরে। কাল রাতে যখন সে বাধা দিয়েছিল, তখনই…”

    “আপনি এই কথা আদালতে বলবেন?”

    “যদি আপনি পাশে থাকেন, আপা।”

    সেদিন বিকেলে আমি হাসপাতালের রিপোর্টে সত্যি ঘটনা লিখলাম। রূপাও রাজি হলো পুলিশের কাছে বলতে, “আমি চাই না আর কোনো মেয়ের সাথে এমন হোক।”

    খবরটা পাড়ায় ছড়াতে সময় লাগল না – এবার আমার নামে বদনাম না, ছড়াল হাজী সাহেবের আসল রূপের কথা। ধীরে ধীরে আরও দুটো মেয়ের পরিবার সাহস করে এগিয়ে এলো।

    মামলা দায়ের হলো এক সপ্তাহের মধ্যে। হাজী সাহেব প্রভাবশালী উকিল ভাড়া করলেন, “এসব ষড়যন্ত্র” বলে প্রচার চালালেন।

    পাড়ার অনেকে প্রথমে তার পক্ষে দাঁড়াল। “তুই একটা চরিত্রহীন মেয়ে, তোর কথায় কেউ বিশ্বাস করবে কেন?”

    আদালতে প্রথম শুনানিতে আমি সাক্ষী হিসেবে দাঁড়ালাম। “আমি জানি পাড়ায় আমাকে নিয়ে কী বলা হয়। আমি রাতে একা কাজে বের হই, কারণ আমার স্বামী নেই, সন্তান আছে। এই সত্যিটা যদি আমাকে ‘চরিত্রহীন’ বানায়, আমি সেই তকমা মাথা পেতে নেব। কিন্তু যা সত্যি, সেটা বলা থেকে আমাকে কেউ থামাতে পারবে না।”

    মামলা আট মাস চলল। আমার বাড়িতে দুইবার ইট ছোঁড়া হলো, একবার আমার বাচ্চাকে ভয় দেখানো হলো। কিন্তু মতিন সাহেব আর রূপা প্রতিটা শুনানিতে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।

    অবশেষে তিন-তিনটা মেয়ের সাক্ষ্যের সামনে হাজী সাহেবের সব প্রভাব টিকল না। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করল।

    রায়ের দিন রহিমা খালা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, চোখে লজ্জা। “আমরা ভুল বুঝেছিলাম তোমাকে, মা। ক্ষমা করে দিও।”

    আমি হাসলাম। “একটা মানুষের ভেতরটা না জেনে, শুধু বাইরের কয়েকটা ঘটনা দিয়ে তাকে ‘চরিত্রহীন’ বা ‘সম্মানিত’ বলে দাগিয়ে দেওয়াটাই তো সবচেয়ে বড় ভুল, তাই না?”

    আমার নাম আজও কারো কারো মুখে “চরিত্রহীন নার্স।” কিন্তু আমি আর সেই তকমায় লজ্জা পাই না। কারণ আমি জানি, যে রাতে একটা মেয়ের সত্যি কথা বলার মতো কেউ ছিল না, সেই রাতে আমিই ছিলাম তার পাশে।

    সমাজ যাকে দাগিয়ে দেয়, সে সবসময় দোষী না। আর সমাজ যাকে সম্মান দেয়, সে সবসময় নির্দোষ না। আসল চরিত্র বোঝা যায় সংকটের মুহূর্তে, কে পালায় আর কে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটা দেখে অন্য কিছুতে না।

    ━━━━━━━━━━
    আজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি বাংলার ঘরে ঘরে একটা করে চরিত্র রেখে গেছেন, যাদের সাথে আমরা বড় হই, কাঁদি, ভালোবাসতে শিখি।

    নবম কি দশম শ্রেণিতে পড়ি তখন। বাবার আলমারিতে চার খণ্ডের একটা পুরনো সংকলন ছিল, মলাট কিছুটা জীর্ণ, পাতাগুলো হলুদ হয়ে আসা। সেখান থেকেই প্রথম হাতে তুলে নিয়েছিলাম শরৎ বাবুর শ্রীকান্ত।

    পরের শুরুটা হয়েছিল বিরাজবৌ আর দেবদাস দিয়ে – জীবনের সেই বয়সে, যখন প্রেম শব্দটা শুনলেই বুক কাঁপত, ভালোবাসাকে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্যি। তারপর একে একে এসেছে দত্তা, গৃহদাহ, শেষ প্রশ্ন, বিন্দুর ছেলে, সতী, রামের সুমতি – প্রতিটা বই যেন জীবনের একেকটা ধাপে নতুন করে চেনাল মানুষকে, সম্পর্ককে, আর নিজেকেও।

    শরৎ বাবুর চরিত্ররা কোনো এক সময়ের বন্দি না – তারা প্রতিটা প্রজন্মের পাঠকের ভেতরেই নতুন করে বেঁচে ওঠে, কারণ তিনি লিখেছিলেন মানুষের হৃদয়ের ভাষায়, যা কখনো পুরনো হয় না।

    ━━━━━━━━━━

    ✒️ এই গল্পের বীজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস *চরিত্রহীন* থেকে নেওয়া যেখানে মূল প্রশ্ন ছিল, সমাজ যাকে “চরিত্রহীন” বলে দাগিয়ে দেয়, সেই দাগটা কি তার সত্যি পরিচয়, নাকি সমাজের নিজের সংকীর্ণ মাপকাঠির প্রতিফলন মাত্র।

    আবু তাহের রিপন
    পনের সেপ্টেম্বর ছাব্বিশ।
    গল্পের ভেতরের গল্প।

    3
    6 Comments
    • আপনার লেখাটি পড়ে মনটা একদম ছুঁয়ে গেল, বিশেষ করে “আসল চরিত্র বোঝা যায় সংকটের মুহূর্তে, কে পালায় আর কে দাঁড়িয়ে থাকে” – এই কথাটি ভীষণ সত্যি। আপনি যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে রুখে দাঁড়িয়েছেন, তা সত্যিই সবার জন্য অনেক বড় একটা অনুপ্রেরণা।

    • গল্পটা পড়ার পর মনে হলো, কাউকে বিচার করার আগে তার না-বলা গল্পটাও একবার শোনা দরকার। শরৎচন্দ্রকে স্মরণ করার অংশটুকুও ভালো লাগল। তাঁর চরিত্রগুলো যে এখনও আমাদের জীবনের সঙ্গে কথা বলে, সেটাই যেন এই গল্পে ফিরিয়ে আনলেন।

      • অবশ্যই। সবার নিজস্ব গল্প থাকে, আমাদের জেনে হয়ে ওঠে না। ভাল লেগেছে শুনে আনন্দিত হলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ ❤️

    • আপনার লেখাটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং সাহসী একটি বর্ণনায় পূর্ণ, যেখানে সমাজের তৈরি করা মিথ্যে খোলসগুলো চমৎকারভাবে উন্মোচিত হয়েছে। আপনার সাহসী উচ্চারণগুলো পাঠকদের মনে গভীর দাগ কাটবে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অটল থাকার দৃঢ় সংকল্পটি দারুণ ফুটে উঠেছে। আপনি আপনার লেখনীর মাধ্যমে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন যা পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে, তাই আপনার এই চমৎকার সৃজনশীলতার ধারা অব্যাহত থাকুক।

Friends

Profile Photo
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Profile Photo
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Profile Photo
Salful Alam
@alamict9
Profile Photo
1 Sen
@1sen
Profile Photo
Shruti Radhe
@shrutiradhe
Profile Photo
Shruti
@shruti
Profile Photo
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
Profile Photo
Farhan Sadik
@farhansadik
Skip to toolbar