Profile Photo

Israt Jahan IqraOffline

  • isratjahaniqra
  • Profile picture of Israt Jahan Iqra

    Israt Jahan Iqra

    • 1 month, 1 week ago

    শহরটা কার?

    সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত রকম ভারী।

    বৃষ্টি হবে কি হবে না—বোঝার উপায় নেই। সেপ্টেম্বরের সকাল অথচ গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে ক্লান্তির ছাপ।

    আরিফ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল।

    পাশের চায়ের দোকানের পুরোনো টেলিভিশনে খবর ভেসে উঠল—

    “আগামী কয়েক ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। নগরবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।”

    চায়ের দোকানের বৃদ্ধ লোকটা চায়ে চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

    —“প্রতি বছরই তো সতর্ক করে। শহরটাকেই কেউ সতর্ক করে না!”

    কেউ কথাটার উত্তর দিল না।

    বাস এলো।

    আরিফ উঠে জানালার পাশে বসল।

    শহরটা পেছনে ছুটতে লাগল।

    যেখানে একসময় বড় বড় গাছ ছিল, সেখানে এখন কাচের দেয়ালওয়ালা উঁচু ভবন। ফুটপাতের অর্ধেক দোকানের দখলে, বাকি অর্ধেক গাড়ির।

    রাস্তার পাশে একটি শুকিয়ে যাওয়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে।

    গাছটার গায়ে একটি চকচকে বিজ্ঞাপন—

    “নতুন শহর—নতুন ভবিষ্যৎ।”

    আরিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল।

    অফিসে পৌঁছানোর আগেই বৃষ্টি শুরু হলো।

    প্রথমে টুপটাপ।

    তারপর হঠাৎ যেন আকাশের সব দরজা খুলে গেল।

    দুপুরের মধ্যেই রাস্তা পানির নিচে।

    অফিসের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়েছে। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কেউ ছুটির আশায় হাসাহাসি করছে।

    আরিফের ফোন বেজে উঠল।

    মা।

    —“বাবা, তুই কোথায়?”

    —“অফিসে।”

    —“বাসায় ফিরবি কীভাবে? আমাদের গলিতেও পানি ঢুকেছে।”

    আরিফ জানালার বাইরে তাকাল।

    —“চিন্তা করো না মা। আমি আসব।”

    ফোনটা কেটে গেল।

    বাইরে তখনও বৃষ্টি।

    আরিফের হঠাৎ মনে হলো, শহরটা বৃষ্টিতে ভাসছে না।

    শহরটা যেন নিজের জমিয়ে রাখা ভুলগুলোর নিচে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।

    —

    সন্ধ্যার দিকে পানি একটু কমলে আরিফ বের হলো।

    রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাতে ভাঙা ছাতা।

    —“আমার দোকানটা… সব শেষ হয়ে গেল।”

    কথাটা তিনি কাকে বললেন, বোঝা গেল না।

    একটু সামনে কয়েকজন তরুণ পানি সরানোর চেষ্টা করছিল।

    আরিফও তাদের সঙ্গে দাঁড়াল।

    একজন পানির নিচে হাত দিয়ে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,

    —“ভাই, এখানে তো ড্রেন ছিল!”

    অন্যজন চারপাশে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

    —“ছিল। এখন বিল্ডিং।”

    সামনেই বিশাল একটি ভবন।

    নিচে মার্বেলের ফলক—

    “উন্নয়ন প্রকল্প।”

    আরিফ কিছুক্ষণ ফলকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

    তারপর চোখ তুলে ভবনটার দিকে তাকাল।

    কথাটা মুখে এল না।

    শুধু মনে হলো—

    যে শহরে পানি বের হওয়ার জায়গা নেই, সেখানে ভবনগুলো এত উঁচু হয় কীভাবে?

    —

    কয়েকদিন পর অফিসে আরেকটা ঘটনা ঘটল।

    দশ বছর ধরে কাজ করা একজন কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো।

    লোকটি ফাইল হাতে নিয়ে কর্মকর্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

    মুখে কোনো রাগ নেই।

    শুধু ক্লান্তি।

    আরিফ তাকে জিজ্ঞেস করল,

    —“স্যার, কী হলো?”

    লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

    —“যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলাম। পরিচয় না থাকায় হারালাম।”

    তারপর চলে গেলেন।

    আরিফ অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

    সেদিন প্রথমবার নিজের নীরবতাটা তার কাছে খুব ভারী মনে হলো।

    —

    এক বিকেলে আরিফ শহরের পুরোনো নদীর পাড়ে গেল।

    ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এখানে আসত সে।

    তখন নদী এত প্রশস্ত ছিল যে ওপারের বাড়িগুলোকে খেলনার মতো দেখাত।

    এখন নদীর বুক সরু।

    পানি কালো।

    পাড়ে প্লাস্টিকের স্তূপ।

    আর নদীর জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি দালান।

    একজন মাঝবয়সী মাঝি নৌকা বাঁধছিল।

    আরিফ জিজ্ঞেস করল,

    —“চাচা, নদীটা এত ছোট হয়ে গেল কীভাবে?”

    লোকটি নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

    তারপর বলল,

    —“নদী নিজে ছোট হয় নাই বাবা।”

    একটু থেমে যোগ করল,

    —“আমরাই ছোট করছি।”

    আরিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

    কিছু প্রশ্নের উত্তর শুনলে পরের প্রশ্নটা নিজের কাছেই করতে হয়।

    —

    কয়েকদিন পর শহরে নির্বাচন এলো।

    দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার।

    মাইকে স্লোগান।

    “নিরাপদ শহর।”

    “নদী রক্ষা।”

    “দুর্নীতিমুক্ত সমাজ।”

    “সবার জন্য উন্নত জীবন।”

    আরিফ পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে হাঁটত।

    কথাগুলো সুন্দর।

    এত সুন্দর যে বাস্তব শহরটার সঙ্গে তাদের কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না।

    একদিন বন্ধু সাকিব বলল,

    —“তুই এত কিছু নিয়ে ভাবিস কেন?”

    আরিফ বলল,

    —“কারণ এই শহরেই তো থাকতে হবে।”

    সাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

    তারপর নিচু গলায় বলল,

    —“তাহলে চুপচাপ থাক।”

    —“কেন?”

    সাকিব চারপাশে তাকাল।

    —“সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নিরাপদ না।”

    আরিফ হেসে বলল,

    —“উত্তর না পেলেও প্রশ্নটা তো থেকেই যায়।”

    সাকিব এবার আর কিছু বলল না।

    —

    সেদিন রাতেই আবার বৃষ্টি হলো।

    সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আরিফ দেখল, রাস্তার পাশে একটি বস্তির ঘর ভেঙে পড়ে আছে।

    একটি ছোট মেয়ে ভাঙা টিনের পাশে দাঁড়িয়ে।

    বুকের সঙ্গে ভেজা স্কুলব্যাগ।

    আরিফ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

    —“তোমার বাড়ি কোথায়?”

    মেয়েটি ভাঙা ঘরটার দিকে আঙুল তুলল।

    —“ওখানে।”

    —“তোমার মা?”

    মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

    —“মা পানি কমার অপেক্ষা করছে।”

    আরিফ কিছু বলতে পারল না।

    তার চোখ চলে গেল সামনের বিশাল বিলবোর্ডে।

    “সবার জন্য উন্নত জীবন।”

    বৃষ্টির পানিতে বিলবোর্ডের নিচের অংশ ভিজে গিয়েছিল।

    মেয়েটার স্কুলব্যাগটাও।

    কিন্তু দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল—

    একটাকে শুকিয়ে আবার টাঙানো যাবে।

    অন্যটাকে হয়তো আর কোনোদিন স্কুলে নেওয়া হবে না।

    —

    সেদিন রাতে আরিফ ঘুমাতে পারল না।

    জানালার বাইরে শহর তখন অন্ধকার।

    তার মাথার ভেতর একে একে ফিরে আসছিল—

    ভাঙা দোকান।

    কালো নদী।

    চাকরি হারানো মানুষ।

    সাকিবের ভয় পাওয়া চোখ।

    ভেজা স্কুলব্যাগ।

    আর দেয়ালে ঝুলে থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো।

    হঠাৎ তার মনে হলো—

    এসব আলাদা কোনো ঘটনা নয়।

    একটা জায়গায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ছায়া অন্য একটা জায়গায় গিয়ে পড়ে।

    কেউ নদী দখল করে।

    কেউ ঘর হারায়।

    কেউ চাকরি হারায়।

    কেউ প্রতিবাদ করার আগেই চুপ হয়ে যায়।

    আর কেউ সবকিছু দেখে নিজের দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

    আরিফ উঠে বসল।

    টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ ছিল।

    অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকার পর সে শুধু একটি বাক্য লিখল—

    “এই শহরটা কার?”

    —

    পরদিন সকালে সে কাগজটা নিয়ে বের হলো।

    শহরের পুরোনো এক দেয়ালে পোস্টারটা লাগিয়ে দিল।

    কেউ থামল।

    কেউ হাসল।

    কেউ বলল,

    —“এসব করে কী হবে?”

    আরিফ কোনো উত্তর দিল না।

    সে হাঁটতে লাগল।

    কিছুদূর গিয়ে পেছনে তাকাল।

    একজন বৃদ্ধ পোস্টারটার সামনে দাঁড়িয়ে।

    তারপর একজন রিকশাচালক।

    তারপর স্কুলের পোশাক পরা একটি ছেলে।

    কেউ কিছু বলছে না।

    শুধু পড়ছে।

    —

    সন্ধ্যার দিকে পোস্টারের নিচে কেউ লিখে গেল—

    “শহরটা আমাদের।”

    পরদিন তার নিচে আরেকটি লাইন—

    “তাহলে অন্যায়টা কার?”

    তারও পরদিন—

    “চুপ করে থাকা মানুষেরও কি দায় নেই?”

    কে লিখছে, কেউ জানল না।

    শুধু দেয়ালটা ধীরে ধীরে প্রশ্নে ভরে উঠল।

    শহর অবশ্য বদলাল না।

    নদী তখনও কালো।

    রাস্তা তখনও ভাঙা।

    দুর্নীতি তখনও আছে।

    ভয়ও আছে।

    ক্ষমতার লড়াইও আছে।

    তবু কিছু একটা বদলেছিল।

    মানুষ আর শুধু পোস্টার পড়ছিল না।

    কেউ থামছিল।

    কেউ প্রশ্ন করছিল।

    কেউ অন্য কাউকে প্রশ্নটা পড়ে শোনাচ্ছিল।

    এক বিকেলে আরিফ সেই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

    ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটি ছোট ছেলের দিকে।

    সেই মেয়েটির মতোই বয়স হবে।

    ছেলেটি স্কুলব্যাগ নামিয়ে দেয়ালের সামনে দাঁড়াল।

    কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

    তারপর খাতা বের করল।

    খাতার শেষ পাতাটা ছিঁড়ে দেয়ালের নিচে লিখে দিল—

    “শহরটা যদি আমাদের হয়,
    তাহলে শহরের দায়ও কি আমাদের নয়?”

    আরিফ অনেকক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

    কিছু বলল না।

    দূরে তখন মাইকে আবার নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি ভেসে আসছিল।

    আর তার নিচে, পুরোনো দেয়ালে, ছোট ছোট অক্ষরে জন্ম নিচ্ছিল আরও কিছু প্রশ্ন।

    দেয়ালের একেবারে ওপরে তখনও সেই প্রথম প্রশ্নটা লেখা—

    “শহরটা কার?”

    আর তার নিচে, দিনের পর দিন, অচেনা হাতের লেখা বাড়তেই থাকল।

    কেউ উত্তর লিখল না।

    শুধু প্রশ্নগুলো একটু একটু করে বড় হতে লাগল।

    2
    3 Comments
    • “এই শহরটা কার?”—একটা প্রশ্ন, অথচ এর ভেতরে কতগুলো প্রশ্ন লুকিয়ে আছে!

    • Israt Jahan Iqra, আপনার এই লেখাটিতে জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে যে সংবেদনশীলতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজ এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের এমন নিপুণ বয়ান পাঠকদের ভাবনার জগতে এক গভীর আলোড়ন তৈরি করবে, তাই আপনি নিয়মিত লিখুন।

    • Israt Jahan Iqra, “শহরটা যদি আমাদের হয়, তাহলে শহরের দায়ও কি আমাদের নয়?”—এই লাইনটি পড়ে মনটা সত্যিই খুব ভারী হয়ে গেল। আপনার লেখার মতো অন্যদের এমন সুন্দর লেখায়ও নিয়মিত লাইক ও কমেন্ট করে সক্রিয় থাকুন, এতে আমাদের এই কমিউনিটিটা অনেক প্রাণবন্ত থাকবে।

Friends

Skip to toolbar