-
(( বিধি কিচ্ছা)) প্রথম পরিচ্ছদঃ
”বৈশাখ মাসের অলস তপ্ত দুপুর। চারপাশের চরাচর যখন রোদের চাদর গায়ে জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক সেই নিঝুম মুহূর্তেই পাড়ায় ভাঙল এক পিনপতন নীরবতা।
আচমকা ধেয়ে এলো নুড়ি আপুর সেই চেনা কড়া হাঁক— “সানি, ওঠ! চল, এক্ষুনেই মিশনে বেরোতে হবে। এইমাত্র খোদেজার মাকে দেখে এলাম, বারান্দায় হোগলা বিছিয়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করলে আর জীবনেও আসবে না!”
আমি তখনো ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একনাগাড়ে বকুনি শুরু করলেন। তাঁর দাবি— আমি নাকি আপাদমস্তক এক আত্মভোলা মানুষ! গত রাতেই নাকি আজকের এই গোপন অভিযান নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল এবং সেখানে নাকি আমিও উপস্থিত ছিলাম। আর এখন নাকি আমি কিছুই না জানার ভান করে সাধু সেজে বসে আছি!
নুড়ি আপুর অভিযোগের তূণ এখানেই খালি হলো না। তিনি আরও যোগ করলেন, লাভের গুড় বা ভাগের বেলায় নাকি আমি কসাইয়ের মতো ধারালো ছুরি চালিয়ে নিজের অংশটুকু কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিই!”তার নিজস্ব আদালতপদ্ধতিতে আমি একপ্রকার নির্মম কসাই ছাড়া আর কিছুই নই।
।তবে এসবের পরেও নুড়ি আপুর প্রতি আমার এক অদ্ভুত, নিবিড় সমর্থন কাজ করে। আমাদের দুজনের মধ্যকার রসায়নটা এমনই চমৎকার— নুড়ি আপুর মুখের প্রতিটি কথাই যেন চিরন্তন সত্য। একজন ফুফাতো বোনকে কতটা বুক উজাড় করে ভালোবাসা যায়, তা বোধহয় আপুর সান্নিধ্যে না এলে আমার কোনোদিনই শেখা হতো না। নুড়ি আপু যেন আমার কাছে এক চিরকালীন আশ্রয়ের নাম
নুড়ি আপুর তীব্র তাগাদায় বিছানা ছেড়ে যখন উঠেই পড়লাম, তখন আমার ভেতরেও এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের দোলাচল শুরু হয়ে গেছে। সত্যি বলতে, খোদেজার মার গাছের সেই ডাঁসা ‘বোম্বাই আম’টার ওপর আমারও নজর ছিল বহুদিনের। কিন্তু ধরা পড়লে যে জুটবে পিঠের ওপর ঝাড়ুর বাড়ি— সেই ভয়েই এতকাল পিছপা হয়েছিলাম। কিন্তু আজ সেনাপতি স্বয়ং নুড়ি আপু, তাই ডর-ভয় সব
উবে গেল।
পা টিপে টিপে আমরা যখন খোদেজার মার পেছনের আমবাগানে পৌঁছালাম, তখন চারদিক যেন থমথম করছে। কেবল রোদের তীব্রতায় একটা কাঠঠোকরা গাছের ডালে ঠোকর দিয়ে যাচ্ছিল। নুড়ি আপু কোমরে শাড়ি গুঁজে, চোরের মতো চতুর চোখে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “সানি, তুই নিচে দাঁড়িয়ে খোদেজার মার বারান্দার দিকে কড়া নজর রাখ। একটুও নড়াচড়া দেখলেই শিস দিবি। আমি গাছে উঠছি।” কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নুড়ি আপু বিড়ালের মতো চটপটে ভঙ্গিতে তরতর করে তরতাজা আম গাছটায় উঠে গেলেন। পাতার আড়ালে থোকায় থোকায় ঝুলছে সবুজ টসটসে আম। ওপর থেকে একটা একটা করে আম নিচে পড়তে লাগল, আর আমি বুক টিপটিপ করা উত্তেজনা নিয়ে সেগুলো কুড়িয়ে গামছায় জড়ো করতে লাগলাম।
ঠিক তখনই ঘটল অঘটনটা। একটা বড় সাইজের আম টুপ করে সরাসরি নিচে থাকা একটা শুকনো পাতার স্তূপের ওপর পড়ল। আর সেই মচমচে শব্দে যেন পুরো বাগানের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
দূর থেকে একটা খসখসে গলার আওয়াজ ভেসে এলো—
“কে রে ওখানে? আমার গাছের আম পাড়ে কোন হতচ্ছাড়া? ”
খোদাজার মার সেই তীব্র চিৎকারে আমাদের আত্মারাম খাঁচা হওয়ার জোগাড়! কিন্তু সেনাপতি নুড়ি আপু আর আমাদের সাথে যোগ দেওয়া বড় আপু দমে যাওয়ার পাত্রী নন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি আঁচ করে আমরা সংগৃহীত আমগুলো বগলে চেপে একছুটে পালালাম। আমাদের বৈঠকখানার পাশে ধানের গোলার আড়ালে এসে যখন ঘাপটি মেরে বসলাম, তখনো সবার বুক কামারের হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে। ওদিকে দূর থেকে খোদাজার মার অশ্রাব্য গালাগালির খই ফোটার শব্দ ভেসে আসছিল। চোরকে হাতেনাতে ধরতে না পারার চরম আক্ষেপে শূন্য বাতাসে কিছুক্ষণ বিষোদগার করে একসময় তিনি শান্ত হলেন, চারপাশটা আবার নিঝুম হয়ে এলো।
ধানের গোলার পেছনের সেই থমথমে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ফেটে পড়লেন নুড়ি আপু। আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “সব দোষ এই সানির!”
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম— “আরে, আমি আবার কী করলাম?”
নুড়ি আপুর এই অন্যায় দাবির পালে হাওয়া দিয়ে বড় আপুও গম্ভীর মুখে সায় দিলেন, “হ্যাঁ সানি, নুড়ি যখন অত কষ্ট করে ওপর থেকে আমগুলো ছুড়ছিল, তুই যদি ঠিকঠাক ক্যাচ ধরতে পারতিস, তবে শুকনো পাতার
মচমচে শব্দে খোদেজার মা জেগে উঠত না। তোর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।”
আমাকে বলির পাঁঠা বানানোর এমন নিখুঁত ও তাৎক্ষণিক মহাপরিকল্পনা বোধহয় স্বয়ং চাণক্যের মাথায়ও আসত না। নুড়ি আপুর প্রতি বড় আপুর এই অন্ধ ভালোবাসার নিখুঁত সোপান দেখে আমি বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম! যেই কথা, সেই কাজ। নুড়ি আপুর তাৎক্ষণিক আদালতের রায় হলো— মোট পাঁচটি আমের এক ভাগ পাবে সানি, আর বাকি চারটা দুই বোন দুটো দুটো করে ভাগ করে নেবে।
আমি রাগে গজগঞ্জ করে বললাম, “সব মিলিয়ে আমই তো মোটে পাঁচটা! তার মানে তোমরা দুটো করে নেবে আর আমি পাব মাত্র একটা?”
তাদের সাফ জবাব— আম চুরির পুরো কৃতিত্ব তাদের দুই বোনের, এখানে আমার কোনো অবদানই নেই। সুতরাং, নিলে নাও, না নিলে পথ দেখো!
অপমানের এমন চরম মুহূর্তে রাগে-দুঃখে আমার চোখে পানি চলে এলো। এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে আমি সোজা গিয়ে হাজির হলাম স্বয়ং খোদেজার মার দরবারে! নিজের দলের পিঠে ছুরি মেরে সব সত্য উগরে দিয়ে এলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খোদেজার মা আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। কিন্তু এ কী অলৌকিক পরিবর্তন! একটু আগের সেই রণচণ্ডী মূর্তি কোথায় উবে গেছে! আমার মাকে পরম আহ্লাদে ‘ভাবী ভাবী’ সম্বোধন করে অত্যন্ত শান্ত ও নরম গলায় তিনি এই চুরির সুবিচার চাইলেন। মা-ও ওনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “ওরা ঘরে ফিরুক, আমি আজই এর একটা হিল্লা করছি।” মা হয়তো জানতেন না, আসন্ন বিপদের গন্ধ পেয়ে দুই চোর ততক্ষণে পগার পার হয়ে নুড়ি আপুদের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
খোদেজার মার এই অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্র দেখে আমার কিশোর মন বিস্ময়ে থমকে গেল। চোর ধরতে না পেরে যে মুখে একটু আগে খইয়ের মতো খোটা গালিগালাজ ছুটছিল, সেই মুখেই এখন চোরের বাড়িতে এসে কী মোলায়েম অনুযোগ! যাওয়ার সময় মায়ের হাতের খিলিপান চিবোতে চিবোতে তিনি আফসোসের সুরে আরও বলে গেলেন, “ভাবী, মেয়েমানুষের এমন চোর-চোর স্বভাব ভালো না। ভবিষ্যতে বিয়েশাদিতে কত অসুবিধা হয়, বোঝেনই তো!” আরও কত নীতিবাক্য!
খোদেজার মার সেই নরম গলার আড়ালে কি আসলে কোনো রাগ ছিল, নাকি আমাদের এই চপলতা দেখে তাঁর নিজের বুকের ভেতরেও কোনো হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের নস্টালজিয়া মোচড় দিয়ে উঠেছিল? কে জানে!7 Comments-
-
-
বৈশাখের দুপুরে আম চুরিকে কেন্দ্র করে নুড়ি আপুর সঙ্গে আপনার এই দুষ্টুমি ভরা অভিযানের বর্ণনাটি পড়তে বেশ দারুণ লেগেছে, বিশেষ করে শেষভাগে খোদেজার মার আচরণের বিবর্তন ফুটে ওঠার দৃশ্যটি অত্যন্ত জীবন্ত ও প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। আমাদের এই গ্রুপের অন্যদের লেখাতেও আপনার সক্রিয় উপস্থিতি ও সুন্দর সব মন্তব্য আমাদের আড্ডাটিকে আরও প্রাণোচ্ছল করে তুলবে বলে আমি আশা করি।
-
Friends
Kazi Adam
@kaziadam
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Zakir Hossan
@zakirhossan
Mikdad Hossain
@mikdadhossain
সামিরা হিমু
@himu56
Md Al Maun
@mdalmaun
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Drako Shajib
@drako


গল্পটা শুধু আম চুরির নয়; এর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শৈশবও খুজে পেলাম